ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার অবৈধ অভিবাসন রোধে এক অভিনব ও বিতর্কিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে। রাজ্যে বসবাসকারী বেআইনি বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা অভিবাসীদের চিহ্নিত করার লক্ষ্যে এবার অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স – এআই) ব্যবহার করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে যখন অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী অভিযান চলছে, ঠিক সেই সময়েই প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে এমন একটি সংবেদনশীল বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
মহারাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তর এবং পুলিশ প্রশাসন গত প্রায় দশ মাস ধরে অবৈধ অভিবাসীদের খুঁজে বের করতে বিশেষ অভিযান চালাচ্ছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের নথিপত্র যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ারই পরবর্তী ধাপ হিসেবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানোর কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি একটি জাতীয় টেলিভিশন চ্যানেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডনবিশ এই ঘোষণা দেন। তিনি জানান, বিখ্যাত শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) বম্বে সরকারের হয়ে এই বিশেষ এআই টুলটি তৈরির কাজ করছে।
প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা ও বর্তমান অবস্থা
মহারাষ্ট্র সরকারের দাবি অনুযায়ী, এই এআই টুলটি ব্যবহার করে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে লুকিয়ে থাকা অবৈধ বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের সহজেই শনাক্ত করা সম্ভব হবে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আইআইটি বম্বের গবেষকদের সঙ্গে যৌথভাবে এই প্রযুক্তির উন্নয়ন করা হচ্ছে। সরকারের দাবি, বর্তমানে এই টুলটি প্রায় ৬০ শতাংশ নির্ভুলভাবে কাজ করতে সক্ষম। আগামী চার মাসের মধ্যে এর কার্যকারিতা বা নির্ভুলতার হার শতভাগ বা ১০০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে এই প্রযুক্তি ঠিক কীভাবে কাজ করবে, বা এর অ্যালগরিদম কোন কোন প্যারামিটারের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্বচ্ছ কোনো ধারণা এখনও পাওয়া যায়নি। বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই এআই টুলটির কার্যপদ্ধতি সম্পর্কে আইআইটি বম্বে বা মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত কোনো রূপরেখা প্রকাশ করা হয়নি। এমনকি আইআইটি কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করা হলেও এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো উত্তর মেলেনি। ফলে প্রযুক্তিটি ঠিক কোন পদ্ধতিতে একজন মানুষকে ‘বিদেশি’ বা ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে ট্যাগ করবে, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে।
এআই কীভাবে কাজ করতে পারে: বিশেষজ্ঞদের ধারণা
প্রযুক্তিটির কার্যপদ্ধতি গোপন রাখা হলেও, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডেটা সায়েন্স বিশেষজ্ঞরা এর সম্ভাব্য কার্যপ্রণালী নিয়ে বেশ কিছু ধারণা পোষণ করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই নিজে থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, যদি না তাকে বিপুল পরিমাণ তথ্য দিয়ে আগে থেকেই প্রশিক্ষিত (Train) করা হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে প্রযুক্তির ভাষায় ‘মেশিন লার্নিং’ বা ‘ডিপ লার্নিং’ বলা হয়ে থাকে।
ধারণা করা হচ্ছে, এই নির্দিষ্ট টুলটির ক্ষেত্রে ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ বা মাল্টিমোডাল এআই ব্যবহার করা হতে পারে। এখানে একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি, ভিডিও ফুটেজ, অডিও বা গলার স্বর, কথা বলার ভঙ্গি এবং অন্যান্য জনতাত্ত্বিক তথ্য ‘ইনপুট’ হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এআই সিস্টেমটিকে সম্ভবত শেখানো হবে যে, একজন সাধারণ বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা দেখতে কেমন হন, তাদের কথা বলার ধরণ কেমন, বা তারা কী ধরনের পোশাক পরিধান করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিস্টেমটিতে সম্ভবত হাজার হাজার বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গার ছবি, ভিডিও এবং অডিও স্যাম্পল ‘ফিড’ বা আপলোড করা হয়েছে। এর ভিত্তিতে যন্ত্রটি একটি নির্দিষ্ট ‘প্রোফাইল’ তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো ব্যক্তি দাড়ি রাখেন কি না, টুপি পরেন কি না, বা নারীদের ক্ষেত্রে বোরকা পরার ধরণ কেমন—এসব বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যকে নির্দেশক হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে। এছাড়া তাদের বাংলা বলার উচ্চারণের টান বা আঞ্চলিকতাকেও এআই বিশ্লেষণের আওতায় আনা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
শারীরিক ও সাংস্কৃতিক প্রোফাইলিংয়ের ঝুঁকি
এআই ব্যবহার করে মানুষ চিহ্নিত করার এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটি বিশেষজ্ঞরা দেখছেন, তা হলো ‘স্টিরিওটাইপিং’ বা গৎবাঁধা ধারণা। ভারতের মতো একটি বৈচিত্র্যময় দেশে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম এবং ত্রিপুরার মতো রাজ্যে বাঙালি মুসলমানদের জীবনযাপন, পোশাক-আশাক এবং খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের ব্যাপক মিল রয়েছে।
যদি এআই টুলটিকে শেখানো হয় যে, নির্দিষ্ট ধরণের দাড়ি বা টুপি পরিহিত ব্যক্তিরাই সন্দেহভাজন, তবে তা বড় ধরণের বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। কারণ, ভারতের কোটি কোটি মুসলিম নাগরিক একই ধরণের ধর্মীয় পোশাক পরেন বা দাড়ি রাখেন। এমনকি অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মানুষও দাড়ি রাখেন বা আঞ্চলিক ভেদে ভিন্ন ধরণের টুপি পরেন। একটি যন্ত্রের পক্ষে শুধুমাত্র বাহ্যিক অবয়ব দেখে একজন ভারতীয় মুসলমান এবং একজন বাংলাদেশি মুসলমানের মধ্যে পার্থক্য করা প্রায় অসম্ভব।
প্রযুক্তিবিদরা প্রশ্ন তুলছেন, যন্ত্র কীভাবে বুঝবে যে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি পরা বা টুপি পরা একজন ব্যক্তি ভারতের মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা নাকি বাংলাদেশের রাজশাহীর? দুই স্থানের সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় রীতিনীতির এই অভিন্নতা এআই-এর অ্যালগরিদমের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। এর ফলে বৈধ ভারতীয় নাগরিকদের, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের অহেতুক হয়রানির শিকার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়।
ভাষাগত জটিলতা ও এআই-এর সীমাবদ্ধতা
মানুষ চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এআই যদি ভাষার ওপর নির্ভর করে, তবে সেখানেও বড় ধরণের বাধার সম্মুখীন হতে হবে। বাংলা ভাষা এবং এর উপভাষাগুলো কাঁটাতারের বেড়া মেনে চলে না। বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোর মানুষের মুখের ভাষা প্রায় অভিন্ন।
ভাষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা উদাহরণ হিসেবে সিলেট ও আসামের বরাক উপত্যকার কথা উল্লেখ করেছেন। বাংলাদেশের সিলেটি উপভাষা এবং ভারতের আসামের বরাক উপত্যকা বা ত্রিপুরার মানুষের মুখের ভাষার মধ্যে পার্থক্য করা একজন সাধারণ মানুষের পক্ষেই কঠিন, সেখানে একটি যন্ত্রের পক্ষে তা নিখুঁতভাবে করা আরও দুষ্কর। একইভাবে, বাংলাদেশের রাজশাহীর উপভাষার সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ বা মালদহ জেলার মানুষের কথার টানের মিল রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মধ্যেই বাংলা ভাষার বিশাল বৈচিত্র্য বিদ্যমান। পুরুলিয়ার বাংলা, মেদিনীপুরের বাংলা, কলকাতার প্রমিত বাংলা এবং উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি বা কোচবিহারের বাংলার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। কোচবিহারের ভাষার সঙ্গে আবার বাংলাদেশের লালমনিরহাটের ভাষার মিল পাওয়া যায়। ওড়িশা সংলগ্ন মেদিনীপুরের ভাষায় আবার ওড়িয়া ভাষার প্রভাব স্পষ্ট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষ কথা বলার সময় প্রায়ই ‘কোড-সুইচিং’ করে বা বিভিন্ন ভাষার শব্দ মিশিয়ে কথা বলে। এআই সাধারণত একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন বা ছক খোঁজে। কিন্তু মানুষের মুখের ভাষার কোনো নির্দিষ্ট জ্যামিতিক আকার নেই। তাই এআই দিয়ে ‘বাংলাদেশি বাংলা’ এবং ‘ভারতীয় বাংলা’র মধ্যে নিশ্চিত বিভাজন রেখা টানা কার্যত অসম্ভব। এটি করতে গেলে এআই-কে অনুমানের ওপর নির্ভর করতে হবে, যা অনেক ক্ষেত্রেই ভুল ফলাফল বা ‘ফলস পজিটিভ’ দিতে পারে। নাগরিকত্বের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে ১ শতাংশ ভুলও বড় ধরণের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
ডেটা বায়াস বা তথ্যগত পক্ষপাতিত্ব
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে ‘ট্রেনিং ডেটা’র ওপর। অর্থাৎ, যন্ত্রকে যা শেখানো হবে, সে তাই শিখবে। প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এই এআই টুল তৈরির সময় যে তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করা হচ্ছে, তা পক্ষপাতদুষ্ট হতে পারে।
যদি এআই-কে যারা প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, তাদের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক বা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্য কাজ করে, তবে তারা যন্ত্রকে এমন তথ্য দিতে পারেন যা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানাবে। উদাহরণস্বরূপ, যন্ত্রকে যদি শেখানো হয় যে নির্দিষ্ট ধরণের পোশাক বা উচ্চারণের মানুষরাই ‘অনুপ্রবেশকারী’, তবে যন্ত্রটি সেই প্যারামিটারের বাইরে চিন্তা করতে পারবে না।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেখা গেছে, এআই সিস্টেমে প্রায়শই লিঙ্গ বৈষম্য বা বর্ণবৈষম্য লক্ষ্য করা যায়, কারণ এটির নির্মাতারা বা ডেটা স্যাম্পলগুলো প্রায়শই একপেশে হয়। ভারতের ক্ষেত্রে, অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিতকরণের মতো রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর বিষয়ে তথ্যের নিরপেক্ষতা বজায় রাখা অত্যন্ত কঠিন। এআই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, লক্ষ লক্ষ ভয়েস স্যাম্পল বা গলার স্বরের নমুনা বিশ্লেষণ করে নাগরিকত্ব নির্ধারণের চেষ্টা বৈজ্ঞানিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ হতে পারে। কারণ, এই পৃথকীকরণ যারা করবেন, তাদের ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিশ্বাস অ্যালগরিদমে প্রভাব ফেলতে পারে।
রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা
মহারাষ্ট্র সরকারের এই উদ্যোগকে অনেকে রাজনৈতিক চমক বা প্রপাগান্ডা হিসেবেও দেখছেন। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে নাগরিকত্ব এবং অনুপ্রবেশ নিয়ে আন্দোলন ও গবেষণা করা অর্থনীতিবিদ ও সমাজকর্মীরা এই উদ্যোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে এর আগেও ভোটার তালিকা সংশোধন বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অনুপ্রবেশকারী খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। কোটি কোটি টাকা খরচ করে পরিচালিত সেই সব অভিযানে খুব নগণ্য সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী পাওয়া গেছে।
সমালোচকদের মতে, সরকারগুলো প্রায়ই দাবি করে যে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি বা রোহিঙ্গা ভারতে প্রবেশ করেছে, কিন্তু সরকারি নথিপত্র বা অভিযানে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। এসআইআর-এর মতো ম্যানুয়াল বা মানুষের দ্বারা পরিচালিত নিবিড় প্রক্রিয়াতেই যেখানে বিপুল সংখ্যক অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পাওয়া যায়নি, সেখানে এআই টুল ব্যবহার করে হঠাৎ করে লক্ষ লক্ষ অনুপ্রবেশকারী খুঁজে পাওয়ার আশা করাটা অবাস্তব।
অনেকে মনে করছেন, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক আখ্যান বা ন্যারেটিভ টিকিয়ে রাখার কৌশল। নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক প্রয়োজনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটিকে জিইয়ে রাখতে এবং নির্দিষ্ট জনগষ্ঠীকে চাপের মুখে রাখতে প্রযুক্তির এই মোড়ক ব্যবহার করা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের মতে, পুরো বিষয়টিই এক ধরণের মিথ্যাচার এবং সাধারণ মানুষের করের টাকার অপচয়। এআই-এর মোড়কে মূলত ভীতি প্রদর্শনের একটি পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।
মানবাধিকার ও হয়রানির আশঙ্কা
প্রযুক্তিটি যদি ভুলভাবে কাউকে চিহ্নিত করে, তবে তার পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে। গত কয়েক মাসে ভারতজুড়ে, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে এমন অনেক ঘটনার খবর পাওয়া গেছে যেখানে বাংলাভাষী ভারতীয় মুসলমানদের ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে আটক করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাদের সীমান্তে ‘পুশ-আউট’ বা জোরপূর্বক বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
মানবাধিকার কর্মীদের আশঙ্কা, এআই টুলের ভুল বিশ্লেষণের কারণে অসংখ্য প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক, বিশেষ করে দরিদ্র ও নিরক্ষর বাংলাভাষী মুসলমানরা হয়রানির শিকার হবেন। যন্ত্র যদি কাউকে ‘সন্দেহভাজন’ হিসেবে লাল তালিকাভুক্ত করে, তবে সেই তকমা মুছে ফেলা একজন সাধারণ মানুষের জন্য আইনি ও সামাজিকভাবে অত্যন্ত কঠিন লড়াই হয়ে দাঁড়াবে। এআই টুলটি অবধারিতভাবে বহু ভারতীয়কে সন্দেহ করবে এবং তাদের মুখের ভাষা বা পোশাককেই তাদের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে দাঁড় করাবে।
যদিও সীমান্তে অবৈধ পারাপার একটি বাস্তবতা এবং কিছু মানুষ বেআইনিভাবে বসবাস করছেন, কিন্তু এআই-এর মতো একটি পরীক্ষামূলক ও ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মতো গুরুতর কাজ করাটা বিপজ্জনক। বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে এর আগে উঠে এসেছে যে, অনেক সময় সত্যিকারের ভারতীয় নাগরিকদেরও ‘অনুপ্রবেশকারী’ অপবাদ দিয়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বা ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা হয়েছে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার এই প্রবণতাকে আরও উসকে দিতে পারে এবং প্রশাসনিক দায়বদ্ধতাকে কমিয়ে যন্ত্রের ওপর দোষ চাপানোর সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
মহারাষ্ট্রে অবৈধ অভিবাসী চিহ্নিতকরণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ঘোষণাটি প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের চেয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বেশি। আইআইটি বম্বের মতো প্রতিষ্ঠানের কারিগরি সহায়তা সত্ত্বেও, ভাষা ও সংস্কৃতির জটিল মিশেলের এই উপমহাদেশে এআই দিয়ে নাগরিকত্ব নির্ধারণের ধারণাটি বিশেষজ্ঞদের কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে। প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা, তথ্যের পক্ষপাতিত্ব এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের ঝুঁকি—সব মিলিয়ে এই উদ্যোগটি ভারতীয় বাংলাভাষী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য নতুন এক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই প্রযুক্তি কতটা সফল হবে তা সময় বলে দেবে, কিন্তু এর নৈতিক ও মানবিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্নগুলো এখনই অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।