দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা দেশের চারটি বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার তদন্ত নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দিনদিন প্রকট হচ্ছে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, নারায়ণগঞ্জের মেধাবী ছাত্র ত্বকী, কুমিল্লার তনু এবং টেকনাফের কাউন্সিলর একরামুল হক হত্যা মামলার তদন্ত শেষ হতে আর কত সময় লাগবে—সেই অপেক্ষায় আজ নিস্তব্ধ বিচারপ্রার্থী পরিবারগুলো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এসব মামলার তদন্তে কিছুটা গতি এলেও শেষ পর্যন্ত কোনো কূলকিনারা না হওয়ায় নতুন সরকারের ওপর এখন দেশবাসীর দৃষ্টি।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের ফ্ল্যাটে নৃশংসভাবে খুন হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সারওয়ার ও এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। এই দীর্ঘ ১৪ বছরে একের পর এক তদন্ত সংস্থা বদল হলেও চার্জশিট পেশ করা সম্ভব হয়নি। পিবিআই বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করলেও সংস্থাটির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামাল জানান, মামলার রহস্যভেদ করার মতো অকাট্য কোনো উপাদান এখনও পাওয়া যায়নি। রুনির ভাই নওশের রোমান আক্ষেপ করে বলেন, “আগের সরকারগুলো সুষ্ঠু তদন্ত করতে চায়নি, নতুন সরকার চাইলে হয়তো এবার বিচার পাব।”
২০১৩ সালের ৬ মার্চ নারায়ণগঞ্জ থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর শীতলক্ষ্যা নদীতে পাওয়া গিয়েছিল মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকীর মরদেহ। এ মামলার তদন্তে দীর্ঘ ১১ বছর পর র্যাব-১১-এর পক্ষ থেকে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা বলা হলেও কোনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা পড়েনি। ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি জানান, অন্তর্বর্তী সরকার আন্তরিকভাবে চাইলে তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দিতে পারত। তবে ইদানীং সাক্ষী ও জবানবন্দি নেওয়ার প্রক্রিয়ায় কিছু গতি এসেছে বলে তিনি মনে করেন।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দেশব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছিল। গত ১০ বছরে এ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বদলেছে ছয়বার। বর্তমানে পিবিআই ঢাকা উত্তর মামলাটির তদন্ত করছে। পিবিআইয়ের পরিদর্শক তরিকুল ইসলাম জানান, সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ প্রোফাইল মিলিয়ে দেখার জন্য আদালতের নির্দেশে কাজ চলছে। তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন রুবেল বলেন, “ডিএনএ মেলানোর এই উদ্যোগ যেন কেবল কালক্ষেপণ না হয়, আমরা বিচারের অপেক্ষায় আছি।”
২০১৮ সালের ২৬ মে মাদকবিরোধী অভিযানের নামে টেকনাফের যুবলীগ নেতা ও কাউন্সিলর একরামুল হককে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যা করা হয়েছিল। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনায় সাত বছর পর বিচার শুরু করার উদ্যোগ নিয়েছে ট্রানজিশনাল জাস্টিস সিস্টেম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা এই মামলার প্রতিবেদন ইতোমধ্যে জমা দিয়েছে। একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম জানান, মূল আসামিরা দেশের বাইরে পালিয়ে গেছেন, তাদের ফিরিয়ে এনে বিচারের আওতায় আনা এখন নতুন সরকারের কাছে প্রধান দাবি।
অধ্যাপক মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ক্রিমিনোলজি বিশেষজ্ঞ): তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক বা অন্য কোনো কারণে এসব মামলার বিচার এতদিন থমকে ছিল। বর্তমান সরকারের জন্য এটি একটি ‘প্রাইম টাইম’ এসব স্পর্শকাতর মামলার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে নজির সৃষ্টি করার।
ড. তৌহিদুল হক (সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ): তার মতে, আগের কোনো সরকারই এসব মামলার ক্ষেত্রে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি, যার ফলে অপরাধী প্রভাবশালীরা সুযোগ পেয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকারের সদিচ্ছার পরীক্ষা হবে এই মামলাগুলোর বিচারে।
এ এইচ এম শাহাদাত হোসেন (সহকারী মহাপরিদর্শক, পুলিশ সদরদপ্তর): তিনি জানান, মামলাগুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও জটিল হওয়ায় প্রমাণভিত্তিক পদ্ধতি অনুসরণ করে সর্বোচ্চ সতর্কতার সঙ্গে তদন্ত চালানো হচ্ছে।
জনসাধারণের প্রত্যাশা, সরকার এই স্পর্শকাতর মামলাগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত তদন্ত শেষ করার ব্যবস্থা নেবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিচারপ্রাপ্তি কেবল ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকেই শান্ত করবে না, বরং দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা আরও সুদৃঢ় করবে।