আমাদের দেশের নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া যেন সেই বিখ্যাত গল্পের মতো—রাজা নতুন জামা পরেছেন, সবাই হাততালি দিচ্ছে, শুধু একটি শিশু চিৎকার করে বলছে, “রাজা তো উলঙ্গ!” কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের এই দেশের বাস্তবতায় সেই সত্য বলা শিশুটিও আর বেঁচে থাকে না। কারণ, নীতিগত ব্যর্থতা এবং অযোগ্যতার বলি হয়ে মারা গেছে ২০৪টি শিশু। এরা কোনো অজানা ভাইরাসের শিকার হয়নি, কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা যায়নি। এরা মারা গেছে চরম প্রশাসনিক অবহেলা, হটকারী সিদ্ধান্ত এবং জবাবদিহির অভাবে।
দায় কার? শীর্ষ নেতৃত্ব ও বিশেষ সহকারী
এই বিপর্যয়ের শুরু শীর্ষ পর্যায় থেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে একজন ‘বিশেষ সহকারী’ নিয়োগ দেন। কিন্তু যখন বিপর্যয়ের খতিয়ান সামনে এল, তখন প্রধান উপদেষ্টা বললেন, “ঘটনাগুলো পুরনো, মনে নেই।” যেন ২০৪ শিশুর মৃত্যু ব্যক্তিগত ডায়েরির কোনো পুরনো পাতা!
আসল নাটকটির কেন্দ্রীয় চরিত্রে রয়েছেন সেই বিশেষ সহকারী—অধ্যাপক ডা. মাহমুদ সাইদুর রহমান। তথ্য অনুযায়ী, তিনি স্বাস্থ্য খাতের ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’ হয়ে উঠেছিলেন। একের পর এক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছেন, একক সিদ্ধান্তে পুরো খাত চালিয়েছেন এবং সব ধরনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বারবার বিকল্প কাঠামোর কথা বললেও তিনি শোনেননি। এই অবহেলা শুধু নীতিগত ব্যর্থতা নয়, এটি জেনেশুনে ঝুঁকি নেওয়া, যা শেষ পর্যন্ত দায়বদ্ধ অপরাধে পরিণত হয়েছে।
সতর্কবার্তা ছিল, কিন্তু কেউ শোনেননি
মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন। পরিবার পরিকল্পনা খাতের কর্মকর্তা ডা. মঞ্জুর আহমেদ জানিয়েছিলেন, সিস্টেমের ভেতরেই ‘রেড অ্যালার্ট’ বাজছিল। ইপিআই-এর (EPI) ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. রাজিব সরকার পরিষ্কার বলেছিলেন, “ওপি (Operational Plan) হঠাৎ বাতিল হওয়ায় টিকাদান কর্মসূচিতে ভাঙন নেমেছে, অর্থায়নে ছেদ পড়েছে এবং পরিকল্পনা থেমে গেছে।” সাবেক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও এই সিদ্ধান্তকে ‘হঠকারী’ ও ‘একক সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।
২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৈঠকগুলোতে অভিজ্ঞ কর্মকর্তারা বারবার বলেছিলেন যে হুট করে কাঠামো বদলানো যাবে না। জনবল বেতন পাবে না, সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং টিকাদানে গ্যাপ তৈরি হবে। একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এসব মতামত বিবেচনায় নেওয়ার কথা। কিন্তু ডা. সাইদুর রহমানের হাতে এমন বিশেষ ক্ষমতা ছিল যে, তিনি কারও কথা মানতে বাধ্য ছিলেন না। তিনি শুনলেন, কিন্তু মানলেন না এবং ‘ওপি’ বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলেন।
ওপি বাতিল: একটি ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভাঙার পরিণতি
ওপি (Operational Plan) কোনো ছোট প্রশাসনিক বিষয় নয়, এটি ছিল পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মেরুদণ্ড। বিকল্প কোনো কাঠামো তৈরি করার আগেই এই পুরনো কাঠামো ভেঙে দেওয়ায় এক বিশাল শূন্যতা তৈরি হয়। ফলে যা হলো:
টিকা কেনার প্রক্রিয়া থমকে গেল। নতুন ওপেন টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সময় লাগল অনেক বেশি।
মাঠপর্যায়ে হাজার হাজার কর্মীর বেতন বন্ধ হয়ে গেল।
কমিউনিটি ক্লিনিকের ১৪ হাজার জনবল অনিশ্চয়তায় পড়ল।
যানবাহন আছে কিন্তু জ্বালানি নেই, ওষুধ আছে কিন্তু সরবরাহ নেই।
হামের প্রাদুর্ভাব ও মৃত্যুর মিছিল
এই অরাজক অবস্থার সুযোগেই হামের মতো ছোঁয়াচে রোগ ভয়াবহ রূপ নেয়। হাম এমন একটি রোগ, যার একটি আক্রান্ত শিশু আরও ১২ থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। টিকাদানে গ্যাপ তৈরি হওয়ায় এবং মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় এই প্রাদুর্ভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
বিশ্বব্যাংক আগেই সতর্ক করেছিল যে সময়সীমার মধ্যে কর্মসূচি অনুমোদন না হলে অর্থায়নে বিলম্ব হবে। সেই ঝুঁকি নেওয়ার ফলেই অর্থায়ন বন্ধ হয়, টিকা কেনা ব্যাহত হয় এবং পুরো কর্মসূচি থমকে যায়।
দায়বদ্ধতার অভাব এবং নীরবতা
এখন প্রশ্ন হলো, এই বিপর্যয়ের দায় কে নেবে? যারা এই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তারা এখন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন। তারা ফোন ধরেন না, মন্তব্য করেন না। কেউ কেউ অবলীলায় বলে ফেলেন, “ভুলে গেছি!” যেন ২০৪ শিশুর মৃত্যু কোনো স্মরণীয় ঘটনাই নয়।
অপরাধ কখনো নিজে নিজে ঘটে না; এর পেছনে থাকে সিদ্ধান্ত, অবহেলা আর জবাবদিহির অভাব। একটি কার্যকর কাঠামো ভেঙে দেওয়া এবং সতর্কবার্তা উপেক্ষা করাটাই এই শিশুদের মৃত্যুর মূল কারণ। এর জন্য শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে, ভবিষ্যতে আবার কেউ একই ভুল করবে এবং আরও অনেক মায়ের বুক খালি হবে।
আমরা সবকিছু জানতাম, সতর্কবার্তা ছিল, তথ্য ছিল, তবুও আমরা সেই পথেই হাঁটলাম, যা আমাদের বিপর্যয়ের দিকে নিয়ে গেল। এখন হয়তো বলা হচ্ছে, “জরুরি টিকাদান চলছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে।” কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণটা আগে কেন ছিল না? ২০৪টি শিশু অকালে ঝরে যাওয়ার পর কেন আমাদের টনক নড়ল?
এই ২০৪টি শিশুর মৃত্যুর দায় কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে, আজ যে সংখ্যা ২০৪, কাল তা আরও বাড়বে।