দেশের সামষ্টিক অর্থনীতি যখন নানামুখী চাপের মুখে ধুঁকছে, ঠিক তখনই সংকট সামাল দিতে আবারও নতুন করে টাকা ছাপানোর সেই পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছে সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সরাসরি ‘হাইপাওয়ারড মানি’ বা নতুন ছাপানো টাকা ঋণ নেওয়ার এই প্রবণতা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য এক বড় অশনিসংকেত। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, রাজস্ব আদায়ের চরম ব্যর্থতা ঢাকতে সরকারের এই সাময়িক পদক্ষেপ বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়িয়ে দেবে, যার অনিবার্য ফল হিসেবে দেশে মূল্যস্ফীতির আগুন আরও দাউদাউ করে জ্বলে উঠবে। বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) রাজধানীর বনানীতে পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত ‘বাণিজ্য ও প্রবৃদ্ধির জন্য পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক সেমিনারে দেশের অর্থনীতির এই ভয়াবহ চিত্র এবং আসন্ন বিপদের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।
পিআরআইয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. আশিকুর রহমান সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করতে গিয়ে একটি উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান সামনে আনেন। তিনি জানান, শুধুমাত্র সদ্য বিদায়ী মার্চ মাসেই সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যার পুরোটাই নতুন ছাপানো টাকা। গত দেড় বছর ধরে দেশের অর্থনীতি যে পুনরুদ্ধারের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তার ভিত্তি অত্যন্ত নড়বড়ে। বর্তমানে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে, যা করোনা মহামারির পর দেশের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। এর পাশাপাশি ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে তা ৩০ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। আর্থিক খাতের এই চরম অব্যবস্থাপনা এবং তারল্য সংকটের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশে আটকে আছে, যা দেশের সার্বিক ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানকে খাদের কিনারায় দাঁড় করিয়েছে।
অর্থনীতির এই নাজুক পরিস্থিতি এখন অভ্যন্তরীণ নীতিগত ব্যর্থতার পাশাপাশি তিনটি বড় ধরনের বহিরাগত বা আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির অস্থিরতা, আসন্ন এলডিসি উত্তরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ এবং যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির চরম অনিশ্চয়তা দেশের অর্থনীতিতে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও সরবরাহ চেইনে ব্যাঘাতের কারণে আমদানি ব্যয় বাড়ছে, অথচ প্রত্যাশা অনুযায়ী রপ্তানি বাড়ছে না। সেমিনারে ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স, বাংলাদেশের (আইসিসিবি) সভাপতি মাহবুবুর রহমান অত্যন্ত হতাশার সুরে বলেন, ইতিহাসে এর আগে কখনো এত দীর্ঘ সময় ধরে দেশে এমন উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করেনি। এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে টাকা ছাপিয়ে বড় প্রকল্পগুলোতে খরচ করলে তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে আরও দুর্বিষহ করে তুলবে। তিনি সতর্ক করেন যে, গ্যাস ও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রাপ্তি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার কারণে দেশি উদ্যোক্তারাই এখন নতুন করে বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছেন, আর দেশীয় বিনিয়োগ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ আশা করাটা একেবারেই অবাস্তব।
সেমিনারে উপস্থিত অন্যান্য বিশেষজ্ঞরাও দেশের এই অবস্থাকে ‘আত্মসৃষ্ট’ বা নিজেদের তৈরি করা সংকট বলে অভিহিত করেছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, এই সংকটগুলো মূলত আর্থিক খাতের সুশাসনের ঘাটতি এবং সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ না নেওয়ারই ফল। অন্যদিকে, পিআরআইয়ের চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তার এবং অস্ট্রেলিয়ান হাইকমিশনের ডেপুটি হেড অব মিশন ক্লিনটন পবকে উভয়ই একমত পোষণ করেন যে, অর্থনীতিকে এই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে নির্বাচিত সরকারকে এখনই অত্যন্ত সাহসী ও কাঠামোগত সংস্কারের পথে হাঁটতে হবে। ১৯৯১ সালের মতো একটি ব্যাপক ও যুগান্তকারী অর্থনৈতিক সংস্কার এবং ব্যাংকিং খাতে কঠোর শৃঙ্খলা ফেরানো ছাড়া বর্তমানের এই অস্বচ্ছতা থেকে দেশের অর্থনীতিকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব।