শিরোনামঃ
দুই মাসেই তলানিতে বিএনপির জনপ্রিয়তা, সরকারের দলীয়করণ নিয়ে তোপ নাহিদের জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর সরকার, বিয়ামের অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বার্তা গণভোটের ৭০ শতাংশ রায় উপেক্ষিত, নতুন ফ্যাসিবাদ নিয়ে বিএনপিকে জামায়াতের তোপ ১ মে পল্টনে শ্রমিক দলের সমাবেশ, নির্বাচন নিয়ে জামায়াতকে ফখরুলের তোপ বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের অভিবাসী ভিসা স্থগিত, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নতুন কড়াকড়ি রাজধানীর ৮০ পাম্পে ১২ লাখ বাইকের জটলা রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে? “ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরানে ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধ, যুদ্ধবিরতির উদ্দেশ্য নিয়ে ধোঁয়াশা সংসদে বিকল্প কাঠামোর ছক, ছায়া মন্ত্রিসভা গঠনে জামায়াতের জোর প্রস্তুতি ‘লাফিং গ্যাস’: যে কারণে যুক্তরাষ্ট্রে এটি মারাত্মক আসক্তির কারণ হয়ে উঠেছে
শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৬:৪০ অপরাহ্ন

তেহরান কি পারমাণবিক বোমা তৈরীর প্রান্তসীমায়

বিশেষ বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন / ৫ বার
প্রকাশ: শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

আন্তর্জাতিক কূটনীতি এবং ভূ-রাজনীতির সবচেয়ে উত্তপ্ত এবং স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। সম্প্রতি এই আলোচনা নতুন করে বৈশ্বিক মনোযোগের কেন্দ্রে উঠে এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি মন্তব্যের জেরে। তিনি দাবি করেছিলেন যে, চলমান উত্তেজনার অবসান ঘটাতে তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তর করতে সম্মত হয়েছে। কিন্তু ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ এই দাবিকে “একেবারেই অগ্রহণযোগ্য” বলে সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন।

দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার পথ খোঁজার চেষ্টা চললেও, একটি বিষয় একেবারে নিশ্চিত—ইরানের মজুতকৃত এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎই হতে যাচ্ছে যেকোনো আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এই ‘সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম’ আসলে কী? কেন এই পদার্থটি নিয়ে বিশ্বজুড়ে এত আতঙ্ক? এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ইরানের বর্তমান মজুত দিয়ে কি তারা সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে পারবে?

সম্প্রতি বিবিসি ওয়ার্ল্ড এর একটি প্রামাণ্যচিত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্য এবং বৈজ্ঞানিক পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতার একটি বিশদ বিশ্লেষণ নিচে তুলে ধরা হলো।


ইউরেনিয়ামের বিজ্ঞান: প্রকৃতির এক বিরল শক্তির উৎস

ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট তেজস্ক্রিয় মৌল, যা পৃথিবীর ভূত্বকে পাওয়া যায়। তবে খনি থেকে তোলা প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম সরাসরি কোনো পারমাণবিক চুল্লি বা বোমায় ব্যবহার করা যায় না। এর বৈজ্ঞানিক কারণটি লুকিয়ে আছে এর আইসোটোপিক গঠনের মধ্যে।

প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম মূলত দুটি আইসোটোপ দিয়ে গঠিত:

  • ইউ-২৩৮ (U-238): এটি প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের সবচেয়ে বড় অংশ, যা মোট পরিমাণের প্রায় ৯৯.৩%। এটি অপেক্ষাকৃত ভারী এবং স্থিতিশীল। এটি সহজে বিভাজিত হয় না এবং পারমাণবিক চেইন রিঅ্যাকশন (ধারাবাহিক পারমাণবিক বিক্রিয়া) ধরে রাখতে পারে না।

  • ইউ-২৩৫ (U-235): এটি প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের মাত্র ০.৭%। এই অতি সামান্য অংশটিই হলো পারমাণবিক শক্তির মূল চাবিকাঠি। ইউ-২৩৫ আইসোটোপটি সহজে বিভাজিত (Fission) হতে পারে এবং বিপুল পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন করতে সক্ষম।

যেহেতু প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামে ফিসাইল বা বিভাজনযোগ্য ইউ-২৩৫-এর পরিমাণ একেবারেই নগণ্য, তাই পারমাণবিক শক্তি বা অস্ত্র তৈরির জন্য এই ইউ-২৩৫-এর ঘনত্ব কৃত্রিমভাবে বাড়াতে হয়। এই ঘনত্ব বাড়ানোর জটিল, ব্যয়বহুল এবং অত্যন্ত প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়াটিকেই বলা হয় ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ’ বা Uranium Enrichment


সেন্ট্রিফিউজের ঘূর্ণন: কীভাবে সমৃদ্ধ হয় ইউরেনিয়াম?

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কোনো সাধারণ রাসায়নিক প্রক্রিয়া নয়। এটি একটি নিখুঁত ভৌত প্রক্রিয়া।

প্রথম ধাপে, কঠিন প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামকে রূপান্তর করে ‘ইউরেনিয়াম হেক্সাফ্লোরাইড’ (UF6) নামক একটি গ্যাসে পরিণত করা হয়। এরপর এই গ্যাসকে পাঠানো হয় বিশাল সিলিন্ডার আকৃতির যন্ত্রে, যাকে বলা হয় সেন্ট্রিফিউজ (Centrifuge)

এই সেন্ট্রিফিউজগুলো শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে নিজেদের অক্ষের ওপর ঘুরতে থাকে। এই প্রচণ্ড ঘূর্ণনের ফলে একটি কেন্দ্রাতিগ বল তৈরি হয়। ভৌতবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, ইউ-২৩৮-এর কণাগুলো (যা ইউ-২৩৫ এর চেয়ে সামান্য ভারী) ছিটকে সেন্ট্রিফিউজের দেয়ালের দিকে বা বাইরের দিকে সরে যায়। অন্যদিকে, হালকা ইউ-২৩৫-এর কণাগুলো সেন্ট্রিফিউজের কেন্দ্রের দিকে জমা হতে থাকে।

এরপর কেন্দ্রের এই উচ্চ ঘনত্বের ইউ-২৩৫ গ্যাসকে সংগ্রহ করে পরবর্তী সেন্ট্রিফিউজে পাঠানো হয়। হাজার হাজার সেন্ট্রিফিউজকে একত্রে যুক্ত করে তৈরি করা হয় ‘ক্যাসকেড’ (Cascade)। এই ক্যাসকেডের ভেতর দিয়ে গ্যাস বারবার অতিক্রম করার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ইউ-২৩৫-এর মাত্রা বা ঘনত্ব বাড়ানো হয়।


সমৃদ্ধকরণের মাত্রা: বিদ্যুৎ থেকে ধ্বংসযজ্ঞ

ইউরেনিয়াম কতটা সমৃদ্ধ করা হয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করে এর ব্যবহার নির্ধারিত হয়। বিবিসি এবং নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ-এর তথ্যচিত্র বিশ্লেষণ করলে সমৃদ্ধকরণের চারটি প্রধান পর্যায় বা গ্রেড দেখতে পাওয়া যায়:

  • প্রাকৃতিক ইউরেনিয়াম: এতে ইউ-২৩৫ আছে মাত্র ০.৭%

  • নিম্ন মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (LEU): যখন ইউ-২৩৫-এর মাত্রা বাড়িয়ে ৩% থেকে ৫% করা হয়। এটি সাধারণত বাণিজ্যিক পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এটি নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় শক্তি উৎপাদন করে, তবে অস্ত্র তৈরির জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত।

  • উচ্চ মাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম (HEU): যখন ইউ-২৩৫-এর মাত্রা ২০%-এ পৌঁছায়। এই ইউরেনিয়াম সাধারণত চিকিৎসা বিজ্ঞান বা বৈজ্ঞানিক পারমাণবিক গবেষণা চুল্লিতে ব্যবহৃত হয়।

  • অস্ত্র গ্রেডের ইউরেনিয়াম (Weapons-Grade): পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য ইউরেনিয়ামকে সাধারণত ৯০% বা তার বেশি সমৃদ্ধ করতে হয়।

বেসামরিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সামরিক বোমার মধ্যে মূল পার্থক্য হলো বিক্রিয়ার গতি। বিদ্যুৎকেন্দ্রে ৫% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দিয়ে অত্যন্ত ধীরগতিতে, নিয়ন্ত্রিতভাবে মাসের পর মাস ধরে শক্তি উৎপাদন করা হয়। অন্যদিকে, একটি পারমাণবিক বোমায় ৯০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের পরমাণুগুলোকে এক সেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিভাজিত হতে দেওয়া হয়, যার ফলে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ ধ্বংসাত্মক শক্তির বিস্ফোরণ ঘটে।


গোলকধাঁধার আসল সত্য: কেন ২০% সমৃদ্ধকরণ একটি ‘রেড লাইন’?

পারমাণবিক বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞদের সবচেয়ে বড় আতঙ্কের জায়গাটি লুকিয়ে আছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের গাণিতিক হিসাবের মধ্যে। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হতে পারে ২০% থেকে ৯০% এ পৌঁছানো অনেক সময়ের ব্যাপার। কিন্তু বাস্তব বিজ্ঞান সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।

প্রদত্ত ইনফোগ্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের ‘প্রচেষ্টা’ বা ‘Effort’-এর হিসাবটি অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং ভয়ঙ্কর:

  1. প্রথম ধাপ (৪% সমৃদ্ধকরণ): প্রাকৃতিক ০.৭% ইউরেনিয়াম থেকে মাত্র ৪% বা ৫% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করতে সবচেয়ে বেশি সময়, সেন্ট্রিফিউজ এবং শক্তির প্রয়োজন হয়। বোমার জন্য প্রয়োজনীয় মোট প্রচেষ্টার ৮৩.৫% কাজ এই প্রাথমিক ধাপেই সম্পন্ন হয়ে যায়। কারণ, এই পর্যায়ে বিপুল পরিমাণ অপ্রয়োজনীয় ইউ-২৩৮ কে আলাদা করে ফেলে দিতে হয়।

  2. দ্বিতীয় ধাপ (২০% সমৃদ্ধকরণ): ৫% থেকে ২০%-এ পৌঁছাতে পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের আরও প্রায় ৮.৫% প্রচেষ্টা ব্যয় করতে হয়।

  3. চূড়ান্ত ধাপ (অস্ত্র গ্রেড বা ৯০% সমৃদ্ধকরণ): এই অংশটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। একবার কোনো দেশ ২০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করে ফেললে, সেখান থেকে ৯০% বা অস্ত্র মানের ইউরেনিয়ামে পৌঁছাতে তাদের মোট প্রচেষ্টার মাত্র ৮% কাজ বাকি থাকে।

অর্থাৎ, কোনো দেশ যখন ২০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম তৈরি করে ফেলে, প্রযুক্তিগতভাবে তারা একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির ৯২% পথ অতিক্রম করে ফেলে। ২০% থেকে ৯০% এ যাওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুত এবং এর জন্য তুলনামূলকভাবে খুব কম সংখ্যক সেন্ট্রিফিউজ লাগে। এই কারণেই ইরানের উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়াম মজুত নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এত বেশি উদ্বিগ্ন।


২০১৫ সালের চুক্তি এবং বর্তমান মজুতের চিত্র

২০১৫ সালে ছয়টি বিশ্বশক্তির (চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য) সঙ্গে ইরানের যে ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি (JCPOA) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, সেখানে অত্যন্ত কঠোর কিছু শর্ত ছিল:

  • ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাত্রা কোনোভাবেই ৩.৬৭%-এর বেশি বাড়াতে পারবে না।

  • তাদের মোট ইউরেনিয়ামের মজুত ৩০০ কেজি-এর মধ্যে সীমিত রাখতে হবে।

  • সেন্ট্রিফিউজের সংখ্যা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হবে এবং ভূগর্ভস্থ ‘ফোর্দো’ স্থাপনায় কোনো সমৃদ্ধকরণ করা যাবে না।

কিন্তু ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র একতরফাভাবে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, ইরান ধীরে ধীরে চুক্তির শর্তগুলো মানা বন্ধ করে দেয়। বর্তমান মজুতের চিত্রটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক সংঘাত শুরুর সময় ইরানের কাছে যে পরিমাণ মজুত ছিল, তা হলো:

  • ৩.৬% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম: প্রায় ৮,৫০০ কেজি (যা মূলত বেসামরিক কাজের উপযোগী)।

  • ২০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম: প্রায় ১,০০০ কেজি (যা একটি বিপজ্জনক মাইলফলক)।

  • ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম: প্রায় ৪৪০ কেজি।

এই ৪৪০ কেজি ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়েই বর্তমান দরকষাকষি চলছে। ৬০% থেকে ৯০% এ পৌঁছানো আক্ষরিক অর্থেই কয়েক দিন বা সপ্তাহের ব্যাপার। ধারণা করা হয়, এই উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশই সংরক্ষিত আছে ‘ইসফাহান’ নামক ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনায়, যা গত বছর ইসরায়েলি বিমান হামলার অন্যতম লক্ষ্যবস্তু ছিল।


‘ব্রেকআউট টাইম’ এবং আইএইএ-এর সতর্কতা

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি গত বছরের অক্টোবরে একটি ভয়ঙ্কর তথ্য দিয়েছিলেন। তিনি বার্তা সংস্থা এপি-কে জানান, ইরানের হাতে বর্তমানে যে পরিমাণ ইউরেনিয়াম আছে, তা যদি তারা আরও সমৃদ্ধ করে ৯০%-এ নিয়ে যায়, তবে তা দিয়ে অন্তত ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করা সম্ভব।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো ‘ব্রেকআউট টাইম’ বা অস্ত্রমানের উপাদান তৈরির সময়সীমা। ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির (DIA) মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ইরান চাইলে “সম্ভবত এক সপ্তাহেরও কম সময়ে” একটি পারমাণবিক ডিভাইসের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্রমানের (৯০%) ইউরেনিয়াম উৎপাদন করতে পারে।

বর্তমান শান্তি আলোচনায়, ইরান ২০ বছরের জন্য তাদের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করার পশ্চিমা প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে। এমনকি তারা তাদের কাছে থাকা ৪৪০ কেজি ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য কোনো দেশের হাতে তুলে দিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এর পরিবর্তে তারা প্রস্তাব দিয়েছে যে, তারা এই ৬০% ইউরেনিয়ামকে প্রাকৃতিক ইউরেনিয়ামের সাথে মিশিয়ে লঘু বা কম মাত্রায় (Dilute) নামিয়ে আনবে।


সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থাকলেই কি বোমা তৈরি সম্ভব?

সবশেষে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ—ইরানের কাছে যদি পর্যাপ্ত অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম চলেও আসে, তার মানেই কি তারা পরদিনই পারমাণবিক হামলা চালাতে পারবে?

বিজ্ঞান এবং সামরিক কৌশল বলছে, না

অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম (৯০% ইউ-২৩৫) তৈরি করা পারমাণবিক বোমা তৈরির সবচেয়ে কঠিন এবং সময়সাপেক্ষ কাজ হলেও, এটিই শেষ কাজ নয়। একটি কার্যকরী পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে সেটি নিক্ষেপ করার জন্য আরও বেশ কয়েকটি অত্যন্ত জটিল প্রযুক্তিগত ধাপ পার হতে হয়:

  1. ওয়ারহেড ডিজাইন (Weaponization): ৯০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের গ্যাসকে কঠিন ধাতব বস্তুতে রূপান্তর করে একটি নিখুঁত গোলক তৈরি করতে হয়।

  2. বিস্ফোরণ কৌশল (Detonation Mechanism): এই ইউরেনিয়ামকে ‘ক্রিটিক্যাল মাস’ বা সংকটপূর্ণ ভরের স্তরে নিয়ে যাওয়ার জন্য এর চারদিকে প্রচলিত বিস্ফোরকের (Conventional Explosives) অত্যন্ত নিখুঁত লেন্স তৈরি করতে হয়। এই বিস্ফোরকগুলোকে মাইক্রোসেকেন্ডের ভগ্নাংশের মধ্যে একই সাথে বিস্ফোরিত হতে হয়, যাতে ভেতরের ইউরেনিয়াম সংকুচিত হয়ে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটে (Implosion design)। এটি অত্যন্ত জটিল একটি প্রকৌশল।

  3. ডেলিভারি সিস্টেম (Delivery System): এই পুরো পারমাণবিক ডিভাইসটিকে এমনভাবে ছোট (Miniaturization) করতে হয়, যাতে সেটি একটি ব্যালিস্টিক মিসাইলের মাথায় (Warhead) বসানো যায়। এরপর সেই মিসাইলকে বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের (Re-entry) সময় চরম তাপ এবং চাপ সহ্য করে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা অর্জন করতে হয়।

স্বাধীন অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া লুইস এই বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। তিনি জানান, “২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরান ওয়ারহেড নকশার কিছু সক্ষমতা তৈরি করেছিল, এরপর সেই কর্মসূচি বন্ধ হয়েছে বলে মনে হয়।” তবে তিনি এও সতর্ক করেছেন যে, নতুন চুক্তির আলোচনা ব্যর্থ হলে ইরান আবারও ওয়ারহেড তৈরির সক্ষমতা বাড়ানোর পথে হাঁটতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো (DIA) তাদের মূল্যায়নে জানিয়েছে যে, ইরান “প্রায় নিশ্চিতভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না।” তবে ইসরায়েল দাবি করেছে যে তাদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে, যা প্রমাণ করে ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান তৈরিতে “সুনির্দিষ্ট অগ্রগতি” সাধন করেছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, ইরান বর্তমানে একটি ‘পারমাণবিক থ্রেশহোল্ড’ বা প্রান্তিক সীমানায় দাঁড়িয়ে আছে। তাদের কাছে থাকা বিপুল পরিমাণ ২০% এবং ৬০% সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম প্রমাণ করে যে, পারমাণবিক উপাদান তৈরির সবচেয়ে কঠিন অংশটি তারা ইতিমধ্যে সম্পন্ন করে ফেলেছে। অস্ত্রমানের ইউরেনিয়ামে পৌঁছাতে তাদের এখন মাসের নয়, বরং সপ্তাহের হিসাব কষতে হবে। তবে একটি কার্যকর, বহনযোগ্য এবং ব্যবহারযোগ্য পারমাণবিক বোমা বা মিসাইল তৈরি করতে তাদের এখনও প্রকৌশলগত কিছু বাধা অতিক্রম করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ।

ইরানের বর্তমান অবস্থানটি অনেকটা একটি লোড করা বন্দুকের মতো—যার ভেতরে গুলি আছে, ট্রিগারে আঙুল আছে, কিন্তু এখনো সেফটি ক্যাচ খোলা হয়নি। আন্তর্জাতিক কূটনীতির ব্যর্থতা যেকোনো সময় এই সেফটি ক্যাচ খুলে দিতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এক অভূতপূর্ব হুমকি তৈরি করবে।


এ জাতীয় আরো খবর...