শিরোনামঃ
‘ধর্মকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করতে চাই না’: প্রধানমন্ত্রী ফুটবল মাঠের পরিচিত মুখ থেকে শীর্ষ সন্ত্রাসী: গুলিতেই শেষ হলো মাফিয়া টিটনের অধ্যায় কক্সবাজারে বন্যহাতির আক্রমণে মা ও শিশুকন্যার মর্মান্তিক মৃত্যু বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে আগুন আবারও গাজা অভিমুখী গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলায় ইসরায়েলের হামলা পরমাণু চুক্তি ছাড়া নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারে ট্রাম্পের ‘না’, ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যুতে পুতিনের প্রস্তাব, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের শর্ত ট্রাম্পের ধাপে ধাপে আসছে নবম পে-স্কেল: প্রথম ধাপেই বাড়ছে মূল বেতন বেঙ্গালুরুতে হাসপাতালের দেয়াল ধসে ৭ জনের মৃত্যু ফ্লোরিডায় নিহত শিক্ষার্থী লিমনের মরদেহ ৪ মে দেশে আসছে
বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৯ অপরাহ্ন

হুমকিতে সই হওয়া ঢাকা-ওয়াশিংটন বাণিজ্য চুক্তি কি টিকবে?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৫ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২৬

মুহাম্মদ ইউনূস প্রশাসনের অধীনে ২০২৬ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তড়িঘড়ি করে স্বাক্ষরিত ‘যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি’র (Reciprocal Trade Agreement) আইনি ভিত্তি এখন এক নজিরবিহীন সংকটের মুখে। চুক্তির পটভূমিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী শুল্ক আরোপের হুমকিকে সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট বেআইনি ঘোষণা করায়, অসম এই চুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে এখন গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।


আইনি ভিত্তির পতন ও ট্রাম্প প্রশাসনের ধাক্কা

যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট সম্প্রতি ‘আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন’ বা আইইইপিএ (IEEPA)-এর অধীনে ট্রাম্প প্রশাসনের আরোপিত সার্বিক শুল্ক বাতিল করেছে। আদালতের এই আদেশের পর ইতোমধ্যে ওই শুল্ক পরিশোধ করা আমদানিকারকদের প্রায় ১৬৬ বিলিয়ন ডলার ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়ে গেছে।

ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য এটি যেমন একটি বিশাল আইনি ও রাজনৈতিক ধাক্কা, তেমনি বাংলাদেশের জন্য এটি চুক্তির বৈধতা নিয়ে নতুন করে ভাবার এক বিশাল সুযোগ।

“এই চুক্তি কোনো স্বাভাবিক কূটনৈতিক সমঝোতা বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার ফসল ছিল না, বরং এটি ছিল একটি তাৎক্ষণিক, কঠোর ও সর্বগ্রাসী শুল্ক আরোপের হুমকির মুখে করা একপ্রকার বাধ্যবাধকতা।”

এখন সুপ্রিম কোর্টের রায়ে যখন সেই হুমকির ভিত্তিই বেআইনি বলে প্রমাণিত হয়েছে, তখন ভেঙে পড়া আইনি ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকা এমন একটি অসম চুক্তি বাংলাদেশ কেন মেনে চলবে—সেটিই এখন প্রধান আলোচ্য বিষয়।


চুক্তির ফাঁদ ও মালয়েশিয়ার দৃষ্টান্ত

এটি কেবল ছোটখাটো কোনো কূটনৈতিক ত্রুটি নয়, বরং চুক্তির রাজনৈতিক ভিত্তিকেই সরাসরি প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশ মূলত এমন একটি শুল্ক শাস্তি এড়াতে এই চুক্তিতে বড় ধরনের ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছিল, যার আইনি বৈধতা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের আদালতই টিকিয়ে রাখেনি। এর চেয়েও উদ্বেগের বিষয় হলো, চুক্তির শর্তগুলোতে এমন ফাঁক রাখা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতেও ওয়াশিংটন ঢাকার ওপর অন্যায্য চাপ প্রয়োগ করতে পারে।

এক হুমকির মুখে ছাড় দিতে বাধ্য হওয়া এবং সেই হুমকি আইনিভাবে দুর্বল হয়ে যাওয়ার পরও প্রভাব বজায় রাখার এই চেষ্টা চুক্তিটিকে আপত্তিকর করে তুলেছে। এই একই বাস্তবতায় মালয়েশিয়া ইতোমধ্যে একটি সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কুয়ালালামপুর তাদের অনুরূপ চুক্তিটিকে বাতিল ঘোষণা করেছে। মালয়েশিয়া পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, চাপ প্রয়োগের আইনি ভিত্তি যখন ধসে পড়েছে, তখন সেই অসম চুক্তিকে আর অটুট ধরা যায় না।


যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিকল্প আইনি অস্ত্র কতটা ধারালো?

আইইইপিএ বাতিল হলেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চাপ প্রয়োগের একেবারে কোনো পথ নেই, বিষয়টি এমন নয়। তারা এখন বিকল্প আইনি কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। তবে সেগুলো আগের মতো তাৎক্ষণিক বা একচেটিয়া নয়:

  • সেকশন ৩০১ (ট্রেড অ্যাক্ট, ১৯৭৪): এর মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হলে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে প্রমাণ করতে হবে যে, সংশ্লিষ্ট দেশটি অন্যায্য বাণিজ্য চর্চা করছে।

  • সেকশন ২৩২ (ট্রেড এক্সপ্যানশন অ্যাক্ট, ১৯৬২): এই ধারায় কোনো ব্যবস্থা নিতে হলে বিষয়টিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র সাথে সম্পৃক্ত হতে হবে।

এই বিকল্প আইনগুলো চাপ সৃষ্টির উপায় হলেও এগুলো অত্যন্ত ধীরগতির, সীমিত পরিসরের এবং আইনিভাবে চ্যালেঞ্জযোগ্য। ফলে আইইইপিএ-এর মতো রাতারাতি ‘অপরিহার্য’ শুল্ক হুমকির যে খড়গ ঢাকার ওপর ঝুলছিল, তা এখন আর কোনোভাবেই টেকসই নয়।


নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন

এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে চুক্তির সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নীতিনির্ধারকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের ভূমিকা এখানে নিবিড় পর্যালোচনার দাবি রাখে। তিনি এই চুক্তি আলোচনা ও স্বাক্ষরে সরাসরি যুক্ত ছিলেন এবং পরবর্তীতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে তিনি এটিকে ‘দেশের স্বার্থ রক্ষাকারী’ বলে দাবি করেছিলেন।

এখানেই মূল সংকট: যিনি নিজে চুক্তির পক্ষে জোরালো যুক্তি দিয়েছেন, তিনিই যদি এখন পুনঃআলোচনায় বসেন, তবে বাস্তবভিত্তিক পুনর্মূল্যায়নের বদলে তিনি নিজের আগের অবস্থান রক্ষারই চেষ্টা করতে পারেন। এই চুক্তিটি কেবল সাধারণ শুল্ক সমন্বয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বাংলাদেশের সরকারি ক্রয়, মানদণ্ড নির্ধারণ, কৌশলগত অবস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি বাজার কাঠামোর মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে।


এখন বাংলাদেশের করণীয় কী?

চুক্তি স্বাক্ষরের সময় দেশবাসীর সামনে এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল যেন অর্থনৈতিক ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচার জন্য এটি একটি ‘অপরিহার্য মূল্য’। কিন্তু সেই জরুরি পরিস্থিতি তৈরির জন্য ব্যবহৃত শুল্ক হুমকিই যখন অবৈধ প্রমাণিত, তখন যারা এই চুক্তির পক্ষে ছিলেন, তাদের এখন ব্যাখ্যা দিতে হবে:

১. সুপ্রিম কোর্ট যে চাপের ভিত্তি বাতিল করে দিয়েছে, সেই চাপের মুখে আদায় করা অসম শর্তে বাংলাদেশ কেন আবদ্ধ থাকবে?

২. যুক্তরাষ্ট্রের আইনি সীমালঙ্ঘনকে যারা ‘অনিবার্য ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা’ হিসেবে তুলে ধরেছিলেন, দেশের মানুষ কেন তাদের সিদ্ধান্তে আস্থা রাখবে?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খাটানোর সক্ষমতা এখনো আছে, কিন্তু আগের মতো এই চুক্তিকে “তাৎক্ষণিক শুল্ক আক্রমণ এড়ানোর একমাত্র পথ” হিসেবে দেখানোর সুযোগ আর নেই। তাই, ‘কোনো উপায় ছিল না’—এমন ভ্রান্ত ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে সরকারের উচিত এই চুক্তিটিকে অবশ্যম্ভাবী কিছু হিসেবে দেখা বন্ধ করা।

বাংলাদেশের সামনে এখন দুটি পরিষ্কার পথ খোলা রয়েছে:

  • পুরো চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অবিলম্বে স্থগিত করা।

  • পুনরায় আলোচনার টেবিলে ফিরে গিয়ে চুক্তির ব্যাপক পুনর্মূল্যায়নের দাবি তোলা।

যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও একই ধরনের ছাড় চায়, তবে এবার আর কোনো বেআইনি হুমকির জোরে নয়, বরং তাদের যৌক্তিক প্রমাণ দিয়ে টেবিলে বসতে হবে। এতে হয়তো পুরোপুরি ন্যায্যতা রাতারাতি নিশ্চিত হবে না, তবে অযৌক্তিক ধারায় মোড়ানো একটি অসম চুক্তির আড়ালে থাকা ভ্রান্ত ধারণাটি চিরতরে ভেঙে যাবে।


এ জাতীয় আরো খবর...