সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০১:৫০ পূর্বাহ্ন

মোদীর আমন্ত্রণ এড়িয়ে বেজিং সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী?

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

ভূরাজনীতি বা জিওপলিটিক্স হলো বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে জটিল, সূক্ষ্ম ও হিসাবনিকাশের এক চরম স্নায়ুক্ষয়ী দাবা খেলা। এই খেলায় প্রতিটি চালের নেপথ্যে থাকে সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ও স্বার্থের সংঘাত। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভূরাজনীতির এমনই এক অভাবনীয় ও দুঃসাহসিক চাল চালতে যাচ্ছেন, যা আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে ব্যাপক আলোচনার ঝড় তুলেছে। তাঁর এই সম্ভাব্য কৌশলগত পদক্ষেপ চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মুখে চওড়া হাসি ফোটালেও, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের শীর্ষ নীতিনির্ধারক ও সাউথ ব্লককে তীব্র স্নায়ুচাপ ও দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণের পর দক্ষিণ এশিয়ার দুই বৃহৎ পরাশক্তি—ভারত ও চীন, উভয়েই তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় ছিল। সবার একটাই প্রবল কৌতূহল, সরকারপ্রধান হিসেবে তারেক রহমান তাঁর প্রথম আনুষ্ঠানিক বিদেশ সফরের গন্তব্য হিসেবে কোন দেশটিকে বেছে নেবেন। ভূরাজনৈতিক প্রথা ও অতীতের ইতিহাস অনুযায়ী বাংলাদেশের সরকারপ্রধানদের প্রথম সফরের পাল্লা সবসময় দিল্লির দিকেই ভারী থাকে। কিন্তু বর্তমান পরিবর্তিত বাস্তবতায় সেই পুরোনো হিসাবের খাতা এবার পুরোপুরি উল্টে যাওয়ার পথে।

প্রথম সফরের কূটনৈতিক তাৎপর্য ও ঐতিহ্যের পালাবদল

আন্তর্জাতিক কূটনীতির দুনিয়ায় কোনো দেশের নবনির্বাচিত সরকারপ্রধানের প্রথম বিদেশ সফর নিছক কোনো আনুষ্ঠানিকতা, সৌজন্য সাক্ষাৎ বা সাধারণ প্রটোকল নয়। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও নীরব বার্তা। এই প্রথম সফরের মাধ্যমে বিশ্বমঞ্চে সুস্পষ্টভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়, বর্তমান মুহূর্তে রাষ্ট্র হিসেবে কার সঙ্গে কার কৌশলগত সম্পর্ক সবচেয়ে গভীর এবং জাতীয় স্বার্থের নিরিখে কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে এবং পরবর্তীতে টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকার সময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সব সময়ই তাঁর প্রথম সফরের জন্য ভারতকে বেছে নিয়েছিলেন। কিন্তু তারেক রহমান যদি এই দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে দিল্লির বদলে বেইজিংকে তাঁর প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন, তবে সেটি হবে ভারতের বুকে একটি নীরব অথচ চরম শক্তিশালী কূটনৈতিক আঘাত। অন্যদিকে, এটি হবে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সাম্রাজ্য বিস্তারের ক্ষেত্রে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন।

জনমনের ক্ষোভ এবং দিল্লির অস্বস্তি

কেন তারেক রহমান ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীনকে বেছে নিচ্ছেন—এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বাংলাদেশের বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, অর্থনীতি এবং ভূকৌশলগত স্বার্থের এক জটিল সমীকরণ বেরিয়ে আসে। বিগত দেড় দশকের শাসনকালে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি দিল্লির একতরফা, নিঃশর্ত ও অন্ধ সমর্থন বাংলাদেশের জনমনে একটি তীব্র নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রবলভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, দিল্লির নিরঙ্কুশ সমর্থনের কারণেই বিগত সরকার দেশে অবাধ দমন-পীড়ন ও স্বৈরতান্ত্রিক শাসন চালাতে সক্ষম হয়েছিল।

তদুপরি, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতেই রাজনৈতিক আশ্রয়ে অবস্থান করছেন। এমন একটি চরম সংবেদনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারেক রহমানের জন্য চাইলেও রাতারাতি দিল্লির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শন করা সম্ভব নয়। জনআকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে তড়িঘড়ি করে ভারত সফর করাটি তাঁর বর্তমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমর্থন ও জনপ্রিয়তার জন্য রীতিমতো আত্মঘাতী হতে পারে।

অর্থনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও চীনের বিলিয়ন ডলারের হাতছানি

রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কারণের পাশাপাশি এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে দেশের উদীয়মান অর্থনীতি। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের শেষের দিকে স্বল্পোন্নত দেশ (LDC) থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হতে যাচ্ছে। শুনতে এটি অত্যন্ত সম্মানজনক ও ইতিবাচক মনে হলেও এর একটি অত্যন্ত কঠিন অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের পর বাংলাদেশ এতদিন বিদেশে তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যে বিশাল শুল্কমুক্ত সুবিধা পেয়ে আসছিল, তা পর্যায়ক্রমে বন্ধ হয়ে যাবে।

দেশের অর্থনীতিকে বর্তমানের ৪৫০ বিলিয়ন ডলার থেকে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন (১০০০ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত করার যে বিশাল স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখছে, তা বাস্তবায়ন করতে হলে এখন প্রয়োজন শত শত বিলিয়ন ডলারের ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সহজ শর্তের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ। আর বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় এই বিশাল অর্থনীতির চাবিকাঠি একমাত্র চীনের হাতেই রয়েছে।

ইতিমধ্যে চীন তার অত্যন্ত সুচতুর কৌশলগত পদক্ষেপ নেওয়া শুরু করে দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন পর্যায় পেরিয়ে তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার পর গত কয়েক মাসে চীন বাংলাদেশে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগ সম্পন্ন করেছে। ঢাকা-বেইজিং সরাসরি ফ্লাইটের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো হয়েছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা এখন চোখের পলকে চীনের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা পাচ্ছেন। চীনের প্রধানমন্ত্রীও তারেক রহমানকে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই অত্যন্ত উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন, যা ভবিষ্যতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ইঙ্গিত দেয়।

তিস্তা নদীর মাস্টারস্ট্রোক এবং ভারতের ‘চিকেনস নেক’ আতঙ্ক

কূটনৈতিক হিসাবনিকাশ কেবল অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নেই। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বহুল আলোচিত এবং বছরের পর বছর ধরে ঝুলে থাকা একটি অন্যতম প্রধান বিষয় হলো তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তি। ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের চরম বিরোধিতার কারণে এই চুক্তি কখনোই আলোর মুখ দেখেনি। এবার বাংলাদেশ এই বঞ্চনার জায়গায় একটি বড় ধরনের ‘মাস্টারস্ট্রোক’ খেলতে যাচ্ছে। তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা এবং এর তীরবর্তী পলি অপসারণ ও উন্নয়নের বিশাল মেগা প্রজেক্টটি নিজস্ব অর্থায়নে চীনকে দিয়ে দেওয়ার বিষয়ে গভীরভাবে চিন্তাভাবনা চলছে।

আর ভারতের সবচেয়ে বড় ভয় ও মাথাব্যথার কারণ ঠিক এখানেই। তিস্তা নদীর অবস্থান ভারতের অত্যন্ত সংবেদনশীল এলাকা ‘শিলিগুড়ি করিডোর’ বা ‘চিকেনস নেক’-এর খুব কাছাকাছি। মাত্র ২২ কিলোমিটার চওড়া এই অত্যন্ত সরু ভূখণ্ডটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি বিচ্ছিন্ন রাজ্যকে (সেভেন সিস্টার্স) যুক্ত করেছে। ভারতের সামরিক ও ভূকৌশলগত বিশেষজ্ঞদের প্রবল আশঙ্কা, চীনের প্রকৌশলী ও কর্মীরা যদি তিস্তা প্রকল্পের অজুহাতে বাংলাদেশের এই অঞ্চলে শক্ত অবস্থান তৈরি করে, তবে তা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। যুদ্ধের সময় এই করিডোরটি বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলে পুরো উত্তর-পূর্ব ভারত অবরুদ্ধ হয়ে পড়বে।

প্রতিরক্ষা খাতে পালাবদল ও নতুন মিত্রতা

অর্থনীতির পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতেও চীনের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। সমরাস্ত্র কেনাকাটায় বাংলাদেশ নীরবে চীনের দিকে ঝুঁকছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চীনের সঙ্গে অত্যাধুনিক সামরিক ড্রোন তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এমনকি চীন ও পাকিস্তানের যৌথ প্রযুক্তিতে তৈরি ‘জেএফ-১৭ (JF-17)’ ফাইটার জেট বিমান বাংলাদেশের কেনা নিয়ে বাতাসে জোর গুঞ্জন ভাসছে। প্রতিরক্ষা খাতে এই একচেটিয়া নির্ভরতা দিল্লির নীতিনির্ধারকদের রাতের ঘুম হারাম করার জন্য যথেষ্ট।

ভারসাম্যের কূটনীতি এবং ভারতের পাল্টা চাল

তবে এতসব ঘটনার মানে এই নয় যে, তারেক রহমান ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি চুকিয়ে ফেলছেন বা বৈরিতা তৈরি করছেন। বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। তিনি মূলত শেখ হাসিনার আমলের ‘অতি ভারতমুখী’ নীতি থেকে বাংলাদেশকে বের করে এনে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও মর্যাদাপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হলো ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’।

অন্যদিকে, ভারতও কিন্তু নীরব দর্শক হয়ে হাত গুটিয়ে বসে নেই। তারেক রহমান শপথ নেওয়ার পরপরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁকে দ্রুত দিল্লি সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। গত এপ্রিলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেন। সেখানে সীমান্ত হত্যা বন্ধ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এবং দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিয়ে ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তাঁর বেশ ইতিবাচক ও ফলপ্রসূ আলাপও হয়েছে। ভারত আপ্রাণ চেষ্টা করছে তাদের হারানো প্রভাব পুনরায় সুসংহত করার।

সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে বলা যায়, তারেক রহমান যদি সত্যিই জুনে বেইজিং সফরে যান, তবে তা নিঃসন্দেহে দিল্লির জন্য একটি বড় মাপের কূটনৈতিক ধাক্কা। বাংলাদেশ এখন আর কোনো নির্দিষ্ট পরাশক্তির ছায়াতলে বশংবদ হয়ে থাকতে রাজি নয়। দক্ষিণ এশিয়ার বর্তমান উত্তপ্ত ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ অত্যন্ত চতুর, স্বাধীন ও বাস্তবমুখী একটি খেলা খেলছে। ভারতের মতো বিশাল প্রতিবেশীর আঞ্চলিক প্রভাব যেমন অস্বীকার করার উপায় নেই, তেমনি চীনের অর্থনৈতিক বিশালত্ব ও প্রযুক্তিগত সহায়তাকেও দূরে ঠেলে দেওয়া অসম্ভব। তারেক রহমানের এই সম্ভাব্য চীন সফর সফল হলে তা দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে, যেখানে বাংলাদেশ কোনো একক পরাশক্তির নির্দেশে নয়, বরং সম্পূর্ণ নিজস্ব জাতীয় স্বার্থের ওপর ভিত্তি করে দুই পরাশক্তির সঙ্গেই সমান মর্যাদায় ভারসাম্য বজায় রেখে চলবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা ওয়েভ


এ জাতীয় আরো খবর...