বাংলাদেশ সচিবালয়, যা সমগ্র দেশের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র এবং রাষ্ট্রের যাবতীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রধান সূতিকাগার, বর্তমানে এক নজিরবিহীন ও চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রজ্ঞাপন জারি, বদলি, পদায়ন এবং এরপরই আবার প্রত্যাহার বা বাতিলের মতো ঘটনাগুলো এখন সচিবালয়ের নিত্যদিনের সাধারণ চিত্রে পরিণত হয়েছে। অবস্থা এমন এক হাস্যকর অথচ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সকালে হয়তো রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনো পদে একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিয়োগ দিয়ে ঘটা করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে, আর বিকেল গড়াতেই কোনো এক অজ্ঞাত কারণে সেই আদেশ বাতিল বা স্থগিত করে দেওয়া হচ্ছে। নীতিনির্ধারক ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ যেন নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্তে স্থির থাকতে পারছেন না, তারা বুঝে উঠতে পারছেন না যে তারা আসলে কী করবেন বা কাকে কোথায় পদায়ন করবেন। প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে এই ধরনের সিদ্ধান্তহীনতা এবং বারবার নির্দেশ পরিবর্তনের কারণে পুরো আমলাতন্ত্রে একধরনের ‘চেইন অব কমান্ড’ বা আদেশের শৃঙ্খলার মারাত্মক সংকট তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনের এই অস্থিরতা এবং সিদ্ধান্তহীনতার মাত্রা কতটা ভয়াবহ, তা সাম্প্রতিক কিছু পরিসংখ্যান ও ঘটনার দিকে নজর দিলেই খুব সহজে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নির্ভরযোগ্য সূত্র ও গণমাধ্যমের প্রাপ্ত তথ্যমতে, মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে প্রশাসনে অন্তত ১৫ জন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার নিয়োগ, বদলি বা পদায়নের আদেশ প্রত্যাহার অথবা বাতিল করা হয়েছে। শীর্ষ পর্যায়ের এই রদবদলের খামখেয়ালিপনা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে এক বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। মাত্র ৬০ দিনের মধ্যে ১৫ জন শীর্ষ কর্মকর্তার আদেশে পরিবর্তন আনার অর্থ হলো, গড়ে প্রতি চার দিনে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হচ্ছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকদের মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব রয়েছে। একটি প্রজ্ঞাপন জারির আগে যে ধরনের সতর্কতা ও গভীর বিচার-বিশ্লেষণ প্রয়োজন, তার বিন্দুমাত্র প্রতিফলন এই ঘটনাগুলোতে দেখা যাচ্ছে না।
সাম্প্রতিক কিছু চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত এই বিশৃঙ্খলার গভীরতাকে আরও স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
এলজিইডি’র প্রধান প্রকৌশলী নিয়োগ ও বাতিল: স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর বা এলজিইডি (LGED) হলো দেশের গ্রামীণ ও নগর অবকাঠামো উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সংস্থা। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প এই সংস্থাটির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। এমন একটি বৃহৎ ও সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানের প্রধান প্রকৌশলী পদে নতুন একজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়করভাবে মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় সেই নিয়োগ আদেশটি বাতিল করা হয়। একজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে পাঁচ দিনের মাথায় সরিয়ে দেওয়ার ফলে ওই সংস্থার চলমান প্রকল্প অনুমোদন, দরপত্র প্রক্রিয়া এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে যে বিশাল স্থবিরতা নেমে আসে, তা রাষ্ট্রের জন্য বিপুল আর্থিক ক্ষতির কারণ।
বেরোবি উপাচার্য নিয়োগের কয়েক ঘণ্টার আয়ুষ্কাল: একইভাবে, রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) উপাচার্য হিসেবে একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদকে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদটি অত্যন্ত সম্মানের এবং এটি সরাসরি আচার্য বা রাষ্ট্রপতির অনুমোদনে হয়ে থাকে। কিন্তু সেই প্রজ্ঞাপনের আয়ুষ্কাল ছিল মাত্র কয়েক ঘণ্টা। প্রজ্ঞাপন জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা অজ্ঞাত কারণে বাতিল করে দেওয়া হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদে এমন ‘সকালে নিয়োগ আর বিকেলে বাতিলের’ ঘটনা দেশের উচ্চশিক্ষা খাত এবং প্রশাসনিক নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ার জন্য চরম অবমাননাকর বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রশাসনে এই মুহূর্তে কেবল নিয়োগ বাতিলের অস্থিরতাই চলছে না, বরং এর চেয়েও ভয়ংকর আরেকটি প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। সেটি হলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অমান্য করা বা নতুন কর্মস্থলে যোগ না দেওয়ার প্রবণতা। যখন রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা নিজেরাই নিজেদের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারছেন না, তখন অধস্তন কর্মকর্তারাও সেই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছেন।
গত ২৬ এপ্রিল দেশের ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও দপ্তরের শীর্ষ পদে নতুন কর্মকর্তাদের (অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার) নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। জনপ্রশাসনের বিধিমালা অনুযায়ী, বদলি বা পদায়নের আদেশ পাওয়ার পর একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে (সাধারণত কয়েক দিনের মধ্যে) নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, সেই প্রজ্ঞাপন জারির পর ইতিমধ্যে এক মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, অথচ ওই ১৫ জনের মধ্যে অন্তত ছয়জন অতিরিক্ত সচিব এখনো তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগদান করেননি। তারা সরকারের আদেশকে কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আগের কর্মস্থলেই অবস্থান করছেন অথবা যোগদানে কালক্ষেপণ করছেন।
প্রশাসনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ এভাবে প্রকাশ্যে উপেক্ষিত হওয়ার ঘটনা চেইন অব কমান্ড বা প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ার এক জ্বলন্ত প্রমাণ। কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছেন যে, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যেহেতু দুর্বল, তাই রাজনৈতিক তদবির বা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে হয়তো এই বদলির আদেশও যেকোনো মুহূর্তে বাতিল, স্থগিত বা নিজেদের সুবিধামতো পরিবর্তন করানো সম্ভব। ফলে তারা আদেশ পালনের চেয়ে তদবিরের পেছনেই বেশি সময় ব্যয় করছেন।
প্রশাসনের এই টালমাটাল অবস্থা এবং বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নেপথ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ ও কাঠামোগত দুর্বলতা চিহ্নিত করেছেন প্রশাসন ও জননীতি বিশেষজ্ঞরা।
১. তাড়াহুড়ো করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ: অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, কোনো শূন্য পদ পূরণের জন্য বা নির্দিষ্ট কোনো গোষ্ঠীকে খুশি করার জন্য তড়িঘড়ি করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই সাময়িক সমস্যা সমাধানের এই চেষ্টা হিতে বিপরীত হচ্ছে।
২. সঠিক যাচাই-বাছাই ও তথ্যের অভাব: একজন কর্মকর্তাকে যখন রাষ্ট্রের কোনো গুরুত্বপূর্ণ শীর্ষ পদে বসানো হয়, তখন তার অতীত রেকর্ড, পেশাগত দক্ষতা, সততা এবং পূর্ববর্তী কর্মস্থলের সাফল্য-ব্যর্থতা নিয়ে গভীরভাবে পর্যালোচনা করতে হয়। কিন্তু বর্তমানে এই যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের ফাঁক রয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারকদের কাছে কর্মকর্তাদের সম্পর্কে পর্যাপ্ত বা হালনাগাদ সঠিক তথ্য থাকছে না।
৩. গোয়েন্দা প্রতিবেদনকে অবহেলা: যেকোনো স্পর্শকাতর পদে পদায়নের আগে জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (এনএসআই, ডিজিএফআই, এসবি) ক্লিয়ারেন্স বা প্রতিবেদন নেওয়া একটি অলিখিত কিন্তু অত্যন্ত জরুরি নিয়ম। অনেক সময় দেখা যায়, নিয়োগ দেওয়ার পর হয়তো এমন কোনো নেতিবাচক তথ্য বা গোয়েন্দা প্রতিবেদন সামনে আসছে, যার কারণে বাধ্য হয়ে সেই নিয়োগ বাতিল করতে হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রতিবেদনগুলো নিয়োগের আগেই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত ছিল।
রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো খেলা নয়। এটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলায় আবদ্ধ একটি প্রক্রিয়া। প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন আমলারা নিজেরাও এই বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক জ্যেষ্ঠ আমলার মতে, সরকার বা মন্ত্রণালয় যদি এভাবে বারবার নিজেদের সিদ্ধান্ত পাল্টাতে থাকে, তবে প্রশাসনের ভেতরে থাকা ‘চেইন অব কমান্ড’ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
একবার এই শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে তা পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। এর ফলে সৎ, যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তারা মানসিকভাবে চরম হতাশ হয়ে পড়েন। তারা কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, কারণ তারা দেখেন যে যোগ্যতার চেয়ে তদবির এবং লবিংয়ের জোর বেশি। অন্যদিকে, প্রশাসনিক স্থবিরতার কারণে সাধারণ মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত সরকারি সেবা থেকে বঞ্চিত হয় এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর গতি শ্লথ হয়ে যায়।
সময়ের আলোর এক প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে যে, এই ধরনের বিশৃঙ্খলা প্রশাসনের ভেতরে কতটা গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করছে। যেকোনো বড় ও সংবেদনশীল পদে নিয়োগের আগে কর্মকর্তাদের চাকরিজীবনের পূর্ণাঙ্গ এসিআর (বার্ষিক গোপনীয় অনুবেদন) বা অতীত রেকর্ড অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করা উচিত। রাজনৈতিক চাপ, ব্যক্তিস্বার্থ বা সাময়িক আবেগের বশবর্তী হয়ে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে এ ধরনের বিব্রতকর পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
একটি স্থিতিশীল, গতিশীল এবং জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তুলতে হলে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই প্রজ্ঞাপন জারির আগে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে করতে হবে সম্পূর্ণ ত্রুটিমুক্ত ও স্বচ্ছ। একবার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর অত্যন্ত যৌক্তিক ও আইনগত কারণ ছাড়া তা বাতিলের সংস্কৃতি থেকে অবিলম্বে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রশাসনিক মেরুদণ্ড শক্ত না হলে রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়ন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই নীতিনির্ধারকদের এখনই সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে, যাতে প্রশাসনকে আর কখনোই “সকালে নিয়োগ, বিকেলে বাতিল” করার মতো কোনো বিব্রতকর অবস্থার মুখোমুখি হতে না হয়।
তথ্যসূত্র: সময়ের আলো