সোমবার, ২৫ মে ২০২৬, ০১:৪৯ পূর্বাহ্ন

সুন্দরবনে ফের জলদস্যু আতঙ্কে জেলে ও বনজীবীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৫ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৪ মে, ২০২৬

দীর্ঘ আট বছর আগে যে সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দস্যুমুক্ত’ ঘোষণা করা হয়েছিল, বিশ্বের বৃহত্তম সেই ম্যানগ্রোভ বন আজ আবারও সশস্ত্র জলদস্যুদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অপহরণ, মুক্তিপণ দাবি, চাঁদাবাজি এবং বনজীবী সাধারণ মানুষের ওপর নির্মম নির্যাতনের ঘটনাগুলো উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন করে চরম আতঙ্ক আর হতাশার জন্ম দিয়েছে। বেশ কয়েক বছর এলাকাটি তুলনামূলক শান্ত থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে দস্যুদের এই ভয়ংকর প্রত্যাবর্তন সাধারণ জেলে ও বনজীবীদের জীবিকাকে চরম হুমকির মুখে ফেলেছে।

যে কারণে আবার দস্যুতার উত্থান

২০১৬ সালের মে থেকে ২০১৮ সালের নভেম্বরের মধ্যে র‍্যাবের অভিযানে ৩২টি দস্যু দলের ৩২৮ জন সদস্য বিপুল অস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে আনুষ্ঠানিকভাবে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। কিন্তু ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতিতে দস্যুদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অনেকটাই থমকে যায়। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চাওয়া অনেক প্রাক্তন দস্যু অভিযোগ করেছেন যে, তারা পুরোনো ও সাজানো আইনি জটিলতায় পড়ে চরম অর্থনৈতিক সংকটে নিপতিত হন। এছাড়া প্রশাসনিক কড়া নজরদারির কারণে তাদের স্বাভাবিক কাজকর্মেও বাধা আসে। ফলশ্রুতিতে হতাশা, ক্ষোভ এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে তাদের অনেকেই আবারও অপরাধ জগতে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক হয়রানি এবং স্থানীয় আধিপত্যের লড়াইও নতুন করে অপরাধী চক্র গড়ে উঠতে সাহায্য করেছে।

দস্যুদের অভিনব কৌশল ও ‘টোকেন’ বাণিজ্য

বর্তমানে সুন্দরবনে অন্তত ২০টি সক্রিয় দস্যু দল কাজ করছে বলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০ জন ভারী অস্ত্রে সজ্জিত সদস্য নিয়ে গঠিত ‘জাহাঙ্গীর বাহিনী’ সবচেয়ে ভয়ংকর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। আগের চেয়ে অনেক বেশি বেপরোয়া এই দস্যুরা চাঁদাবাজির জন্য এখন অভিনব সব কৌশল অবলম্বন করছে। সরকারি অনুমতিপত্রের পাশাপাশি দস্যুদের দেওয়া নিজস্ব ‘টোকেন’ ছাড়া বনে ঢোকা যাচ্ছে না। সাধারণত ১০ টাকার একটি ব্যাংক নোটে হাতে লেখা (যেমন: “সোহেল, চরপাটা”) সাংকেতিক শব্দই বনে প্রবেশের অবৈধ ছাড়পত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দস্যুরা এখন মধু আহরণ মৌসুম শুরুর আগেই মৌয়ালদের কাছ থেকে অগ্রিম চাঁদা আদায় করছে এবং জিম্মিদের মুক্তিপণের টাকা বিকাশের মাধ্যমে গ্রহণ করছে। স্থানীয় দাদনদারদের হিসাব মতে, মাত্র ছয় থেকে সাত মাসের ব্যবধানে এই জলদস্যু সিন্ডিকেটগুলো প্রায় ৫০ কোটি টাকার বেশি চাঁদা হাতিয়ে নিয়েছে।

বন বিভাগ ও বনজীবীদের ওপর মারাত্মক প্রভাব

দস্যুতার এই বিস্তারে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ জেলে ও বাওয়ালিরা। বাগেরহাটের সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডাকাতির আতঙ্কে বনে যাওয়ার জন্য অনুমতিপত্র নেওয়ার হার মারাত্মকভাবে কমে গেছে। গত বছর যেখানে ৩০০টি পাস দেওয়া হয়েছিল, এ বছর তা কমে মাত্র ১০০টিতে দাঁড়িয়েছে। এতে যেমন সাধারণ মানুষের রুটি-রুজি বন্ধ হচ্ছে, তেমনি সরকারের রাজস্ব আয়েও বড় ধস নেমেছে। পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, সশস্ত্র দস্যুদের হামলার ভয়ে খোদ বন বিভাগের কর্মীরাও অন্ধকার নামার পর গভীর বনে টহল দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। এর পাশাপাশি বনের প্রতিবেশ ব্যবস্থার ওপরও চরম হুমকি তৈরি হয়েছে। দস্যুরা বনের গভীরে অবস্থান করায় নিজেদের খাবারের জন্য নির্বিচারে বন্যপ্রাণী শিকার করছে, যা সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বকেও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা ও সাম্প্রতিক অস্থিরতা

দস্যুদের এই দৌরাত্ম্য দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তাদের অভিযান অব্যাহত রেখেছে। গত মে মাসে কোস্ট গার্ড ও র‍্যাব যৌথ ও এককভাবে একাধিক অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকজন দস্যুকে গ্রেপ্তার করেছে এবং অপহৃত বহু জেলেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে। তবে এর মধ্যেই গত ১৮ মে সুন্দরবনের পশ্চিম অঞ্চলে কাঁকড়া ধরা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির জেরে বন বিভাগের এক কর্মীর গুলিতে এক জেলের নিহত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ক্ষুব্ধ জনতার বুড়িগোয়ালিনী বন স্টেশনে হামলার পর সৃষ্ট প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিচ্ছে দস্যু দলগুলো। সরকারের তরফ থেকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও, সাধারণ বনজীবীদের কাছে সুন্দরবন এখন আবারও এক গভীর আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্যসূত্র: টাইম অব বাংলাদেশ


এ জাতীয় আরো খবর...