বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ১২:১৩ পূর্বাহ্ন

বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার: লাগামহীন খরচের বাজারে নতুন চিন্তার ভাঁজ

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৭ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬
Getty Images

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস সিলিন্ডারের বর্ধিত মূল্য এবং গণপরিবহনের ভাড়ার কারণে দেশের সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এমনিতেই চরম অর্থনৈতিক হিমশিম অবস্থার মধ্য দিয়ে দিন পার করছে। সংসারের মাসিক খরচের হিসাব মেলাতে গিয়ে প্রতিটি পরিবারকে এখন প্রতিনিয়ত কাটছাঁট করতে হচ্ছে। এর ওপর বিদ্যুৎ বিভাগ কর্তৃক আবাসিকে বিদ্যুতের নতুন মূল্যহার কার্যকর করার পর থেকে সাধারণ মানুষের কপালে চিন্তার নতুন ভাঁজ পড়েছে। মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল কত বেশি আসবে—এই ভাবনায় ব্যাকুল প্রত্যেকেই। আয়ের সাথে ব্যয়ের এই চরম অসঙ্গতি দেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে এখন এক বড় উদ্বেগের নাম। তবে এই নতুন ভীতি ও বিভ্রান্তির মাঝে সাধারণ গ্রাহকদের জন্য স্বস্তির খবর হলো, সরকার দেশের সিংহভাগ প্রান্তিক মানুষের কথা বিবেচনা করে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর থেকে বর্ধিত মূল্য প্রত্যাহার করে নিয়েছে। নতুন নিয়মে সাধারণ মানুষের পকেটের ওপর ঠিক কতটা প্রভাব পড়বে এবং বিলের অংক কত বাড়বে, তা বুঝতে হলে প্রথমে বিদ্যুতের অভ্যন্তরীণ হিসাব ও এর স্ল্যাব বা ধাপগুলো ভালো করে জেনে নেওয়া দরকার।

বিদ্যুতের ‘ইউনিট’ ও মিটারের ভেতরের জটিল সমীকরণ

বিদ্যুৎ বিলের কাগজ হাতে পেলেই আমাদের চোখে যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি পড়ে, তা হলো ‘ইউনিট’। সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে বলা যায়, আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী এক ইউনিট বিদ্যুৎ মানে হলো ১ কিলোওয়াট-ঘণ্টা (kWh) শক্তির ব্যবহার। অর্থাৎ, আপনার বাসায় যদি ১,০০০ ওয়াট ক্ষমতার কোনো উচ্চ প্রযুক্তির বৈদ্যুতিক ইস্ত্রি, ওভেন বা ওয়াটার হিটার টানা এক ঘণ্টা সচল থাকে, তবে মিটারে ঠিক এক ইউনিট বিদ্যুৎ খরচ জমা হবে। একইভাবে, কম ক্ষমতার ১০০ ওয়াটের একটি সাধারণ বাল্ব যদি ১০ ঘণ্টা জ্বালিয়ে রাখা হয় কিংবা একটি ৫০ ওয়াটের সিলিং ফ্যান যদি টানা ২০ ঘণ্টা চলে, তাহলেও সমপরিমাণ অর্থাৎ এক ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হবে। বিদ্যুৎ বিতরণকারী কোম্পানিগুলো গ্রাহকের বাড়িতে বসানো মিটারের এই রিডিং দেখেই মাস শেষে বিলের কাগজ তৈরি করে।

অনেকের মনেই নতুন মিটার বসালে রিডিং নিয়ে নানা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। শুরুতে রিডিং শূন্য থাকার কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার ল্যাব টেস্ট বা পরীক্ষার কারণে নতুন মিটারে ১৫-২০ ইউনিট আগে থেকেই উঠে থাকতে পারে। যত বিদ্যুৎ ব্যবহার হবে, মিটারের সংখ্যা তত বাড়তে থাকবে। মাস শেষে বিদ্যুৎ কর্মীরা মিটারের বর্তমান রিডিং থেকে আগের মাসের রিডিং বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট মাসের প্রকৃত ইউনিট নির্ধারণ করেন। তবে শুধু ইউনিট দেখেই বিলে টাকার পরিমাণ মেলানো যায় না, কারণ এর সাথে সরকারের নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট মিটার ভাড়া, ভ্যাট এবং ডিমান্ড চার্জের মতো ফিক্সড খরচগুলো যুক্ত হয়ে চূড়ান্ত বিল তৈরি হয়। অবশ্য প্রিপেইড মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহারের বিষয়ে কাজ করছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

ধাপে ধাপে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের বর্তমান মূল্যতালিকা

বিইআরসি কর্তৃক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘোষণার পর দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের কথা চিন্তা করে সরকার খুচরা মূল্যহারে বড় ধরণের সংশোধন এনেছে। বিদ্যুৎ বিভাগের বিশেষ চিঠির প্রেক্ষিতে লাইফলাইন গ্রাহক (০-৫০ ইউনিট) এবং আবাসিক প্রথম ধাপের (০-৭৫ ইউনিট) গ্রাহকদের জন্য বর্ধিত মূল্যহার বাতিল করে পূর্বের সাশ্রয়ী দামই বহাল রাখা হয়েছে। দেশের মোট চার কোটি বিদ্যুৎ গ্রাহকের মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি গ্রাহকই এই ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি সাধারণ মানুষ এই মূল্যবৃদ্ধির কোপ থেকে সম্পূর্ণ বেঁচে গেছেন। বর্তমানে কার্যকর থাকা বিদ্যুতের স্ল্যাবভিত্তিক মূল্যতালিকাটি নিচে দেওয়া হলো:

  • লাইফলাইন (০ থেকে ৫০ ইউনিট): প্রতি ইউনিটের দাম আগের মতোই ৪.৬৩ টাকা বহাল রয়েছে।

  • প্রথম ধাপ (০ থেকে ৭৫ ইউনিট): এই ধাপেও দাম বাড়ানো হয়নি, প্রতি ইউনিটের দাম আগের মতো ৫.২৬ টাকা রাখা হয়েছে।

  • দ্বিতীয় ধাপ (৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট): এই ধাপ থেকে বর্ধিত মূল্য কার্যকর হয়েছে, প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৮.৫০ টাকা।

  • তৃতীয় ধাপ (২০১ থেকে ৩০০ ইউনিট): এই ধাপে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের জন্য প্রতি ইউনিটের দাম ৯.৫৯ টাকা।

  • চতুর্থ ধাপ (৩০১ থেকে ৪০০ ইউনিট): এই মাঝারি ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে magnetism বা চার্জসহ ৯.৬২ টাকা।

  • পঞ্চম ধাপ (৪০১ থেকে 6০০ ইউনিট): এই উচ্চ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের জন্য গুণতে হবে ১৫.০১ টাকা।

  • ষষ্ঠ ধাপ (৬০০ ইউনিটের বেশি): যারা মাসে ৬০০ ইউনিটের বেশি বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তাদের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম সবচেয়ে বেশি, ১৭.৩৫ টাকা।

আপনার বর্তমান বিল যেভাবে মাল্টিপল স্ল্যাবে হিসাব করবেন

নতুন নিয়মে বিদ্যুৎ বিলের হিসাবটি সরল ঐকিক নিয়মের মতো পুরো ইউনিটের ওপর একবারে বসবে না। বিইআরসির নিয়ম অনুযায়ী, যখনই কোনো গ্রাহকের মাসিক ব্যবহার ৭৫ ইউনিট পার হয়ে যাবে, তখনই বিলটি ‘মাল্টিপল স্ল্যাব’ বা একাধিক ধাপের মিশ্র নিয়মে গণনা করা হবে। অর্থাৎ, আপনি যদি কোনো মাসে মোট ৩০০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন, তবে পুরো ৩০০ ইউনিটের জন্য একটি নির্দিষ্ট রেট বা সর্বোচ্চ ধাপের মূল্য প্রযোজ্য হবে না। এর হিসাব হবে ভেঙে ভেঙে। প্রথম ৭৫ ইউনিটের জন্য ৫.২৬ টাকা হারে, পরবর্তী ১২৫ ইউনিটের (৭৬ থেকে ২০০) জন্য ৮.৫০ টাকা হারে এবং অবশিষ্টাংশ ১০০ ইউনিটের (২০১ থেকে ৩০০) জন্য ৯.৫৯ টাকা হারে আলাদা আলাদাভাবে বিল বের করে তা একসাথে যোগ করা হবে।

এই নিয়মের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ যত উপরের স্ল্যাবে যাবে, বিলের পরিমাণও জ্যামিতিক হারে তত বাড়তে থাকবে। উদাহরণস্বরূপ, আগে যাদের মাসিক বিল গড়ে ২,০০০ টাকার মতো আসতো, উচ্চ ব্যবহারের কারণে নতুন মাল্টিপল স্ল্যাবের মারপ্যাঁচে তাদের বর্তমান বিল প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে অনায়াসে ২,৫০০ টাকা বা তার বেশি চলে আসতে পারে। আবার যারা মাঝারি মানের ব্যবহারকারী, অর্থাৎ মাসে ২০০ ইউনিটের মতো বিদ্যুৎ খরচ করেন, তাদের আগের ১,০০০ টাকার বিলটি নতুন হারে প্রায় ২০ শতাংশ বেড়ে এখন প্রায় ১,২০০ টাকার কাছাকাছি গিয়ে ঠেকবে।

প্রিপেইড মিটার বনাম পোস্টপেইড মিটারের আসল সত্য

গ্রাহকদের মধ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি গুঞ্জন রয়েছে যে, পোস্টপেইড মিটারের চেয়ে প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বিল অনেক বেশি আসে। তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল এবং এক ধরণের মানসিক বিভ্রম মাত্র। প্রিপেইড এবং পোস্টপেইড—উভয় পদ্ধতিতেই গ্রাহকের ব্যবহৃত ইউনিটের ওপর ভিত্তি করেই একই নিয়মে টাকা কাটা হয়। মূল তফাৎটি কেবল টাকা পরিশোধের মাধ্যমে ঘটে। পোস্টপেইড মিটারে গ্রাহক পুরো মাস বিদ্যুৎ ব্যবহার করে মাস শেষে ব্যাংকের মাধ্যমে বিল দেন, যেখানে ভ্যাট ও অন্যান্য চার্জ একবারে চোখে পড়ে। অন্যদিকে, প্রিপেইড মিটারে গ্রাহককে আগেই কার্ড বা মোবাইলের মাধ্যমে টাকা রিচার্জ করতে হয় এবং রিচার্জ করার মুহূর্তেই সরকার তার প্রাপ্য ভ্যাট ও ডিমান্ড চার্জের টাকা অগ্রিমে কেটে নেয়। এই কারণে প্রিপেইড গ্রাহকদের মনে হয় যে টাকা রিচার্জ করলেই ব্যালেন্স দ্রুত কমে যাচ্ছে। তবে বর্তমানে প্রিপেইড মিটারের বাড়তি মিটার চার্জ মাইনাস বা মওকুফ করার প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় এই প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে বরং বিদ্যুতের অপচয় অনেক কমে এসেছে।

কেন বাধ্য হয়ে এই মূল্যবৃদ্ধি এবং সাশ্রয়ের অব্যর্থ কৌশল

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে মাত্রাতিরিক্ত আমদানি নির্ভরতার কারণে সরকারকে এই কঠিন ও অপ্রিয় সিদ্ধান্তটি নিতে হয়েছে। বাজেট ব্যবস্থাপনা ঠিক রাখতে বাধ্য হয়ে এই দাম সমন্বয়ের পথে হাঁটতে হয়েছে। তবে সাধারণ জনগণের ওপর যাতে বাড়তি চাপ না পড়ে, সেই সিদ্ধান্ত মেনেই লাইফলাইন ও প্রান্তিক গ্রাহকদের এই দাম বৃদ্ধির বাইরে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নিজের পকেটের টাকা বাঁচাতে গ্রাহকদের নিজেদের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং ঘরের ভেতরে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের কিছু সহজ কৌশল অ্যাপ্লাই করতে হবে। বাসায় প্রচলিত বাতির পরিবর্তে উন্নত এলইডি বা বাতি ব্যবহার করলে বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক কমে আসে। এছাড়া ফ্রিজ, এসি বা ওয়াশিং মেশিন কেনার সময় অবশ্যই ইনভার্টার প্রযুক্তিসম্পন্ন স্টার রেটিং দেখে কেনা উচিত, যা বিল প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কাটিয়ে আনে। বাসাবাড়িতে এসি চালানোর সময় তাপমাত্রা সবসময় আদর্শ মান অর্থাৎ ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে লক করে রাখতে হবে। ঘর নির্দিষ্ট মাত্রায় ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়ার পর এসি বন্ধ করে ফ্যান চালালে অর্ধেকের বেশি বিল বাঁচানো সম্ভব। এছাড়া সংযোগ নড়বড়ে হলে লাইনে লো-ভোল্টেজ তৈরি হয়, যা মিটারে অতিরিক্ত বিল টেনে আনে; তাই ওয়্যারিং পরীক্ষা করানো এবং দিনের বেলা সূর্যের আলোর স্বাভাবিক সুবিধা নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করলে মাস শেষে বিদ্যুৎ বিলের বড় ধাক্কা থেকে অনায়াসে বাঁচা সম্ভব।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা


এ জাতীয় আরো খবর...