বাংলাদেশে প্রতিবছরই আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং এর কারণে মৃত্যুর সংখ্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতিবছর বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সারে ভুগে ১ লাখ ১৬ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন আরও ১ লাখ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ। তবে চিকিৎসকদের মতে, প্রকৃত সংখ্যাটি এর চেয়েও অনেক বেশি; কারণ আক্রান্তদের একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত হাসপাতালের রেকর্ডে আসেন না। শুধু ঢাকার জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালেই গত বছর সাড়ে ৪২ হাজারের মতো রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন, যার মধ্যে ৩১ হাজারই সম্পূর্ণ নতুন। বর্তমানে দেশে মোট ক্যান্সার আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ৩ লাখ ৪৬ হাজার, যা গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ বেশি। প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি শিশুদের মধ্যেও এই মরণব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ২.৪ শতাংশই শিশু এবং দেশের মানুষ বর্তমানে অন্তত ৩৮ ধরনের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশি নাগরিকদের মধ্যে মূলত ৫ ধরনের ক্যান্সারের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে। নিচে এর বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো:
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মানুষ বর্তমানে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে খাদ্যনালির ক্যান্সারে। দেশে এই মুহূর্তে এই রোগে ভুগছেন ৪২ হাজারেরও বেশি মানুষ। প্রতিবছর নতুন করে আরও ২৫ হাজার মানুষ এতে আক্রান্ত হচ্ছেন, যা মোট ক্যান্সার রোগীর প্রায় ১৫.১ শতাংশ। নারীদের তুলনায় পুরুষদের মধ্যে এই ক্যান্সারের হার অনেক বেশি। আক্রান্তের মতো এই খাতে মৃত্যুর সংখ্যাও সর্বোচ্চ—প্রতিবছর প্রায় ২৪ হাজার মানুষ খাদ্যনালির ক্যান্সারে মারা যান, যা মোট ক্যান্সার মৃত্যুর ২০.৯ শতাংশ।
আক্রান্তের দিক থেকে বাংলাদেশে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সার। বর্তমানে দেশে এই রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪০ হাজারের কিছু বেশি। প্রতিবছর নতুন করে ১৬ হাজার মানুষ এই ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যার মধ্যে পুরুষের সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার এবং নারী ৫ হাজার। এই রোগে ভুগে প্রতিবছর প্রায় সাড়ে ৯ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্যমতে, হাসপাতালে আসা মোট রোগীর ৮.৭১ শতাংশই মুখ ও ঠোঁটের ক্যান্সারের।
মৃত্যুহার বিবেচনায় খাদ্যনালির পরেই সবচেয়ে মারাত্মক অবস্থানে রয়েছে ফুসফুসের ক্যান্সার। বর্তমানে দেশে আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার হলেও প্রতিবছর নতুন করে আরও ১৩ হাজার মানুষ ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন, যার মধ্যে ১০ হাজারই পুরুষ। এই রোগে ভুগে প্রতিবছর বাংলাদেশে ১২ হাজারের বেশি মানুষ মারা যান। হাসপাতালগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মোট ক্যান্সার রোগীদের প্রায় ১৮ শতাংশই ফুসফুসের ক্যান্সারে আক্রান্ত।
বাংলাদেশের নারীরা যেসব ক্যান্সারে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন, তার শীর্ষে রয়েছে স্তন বা ব্রেস্ট ক্যান্সার। গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের মোট নারী ক্যান্সার রোগীদের ৩৬.৪ শতাংশই এই রোগে ভুগছেন। বর্তমানে দেশে ৩৫ হাজারেরও বেশি নারী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত এবং প্রতিবছর নতুন করে আরও ১৩ হাজার নারী এতে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই ক্যান্সারের কারণে প্রতিবছর ৬ হাজারের বেশি নারীর মৃত্যু হচ্ছে।
স্তন ক্যান্সারের পর নারীদের মধ্যে মৃত্যুর দ্বিতীয় প্রধান কারণ জরায়ুমুখের ক্যান্সার। নারী রোগীদের প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ক্যান্সারের হার ১৯ শতাংশ, যার মধ্যে ১১ শতাংশই জরায়ুমুখের ক্যান্সারে ভুগছেন। বর্তমানে দেশে সাড়ে ২৬ হাজারের বেশি নারী এই রোগে আক্রান্ত এবং প্রতিবছর নতুন করে সাড়ে ৯ হাজার নারী আক্রান্ত হচ্ছেন। এই মরণব্যাধিতে প্রতিবছর ৫ হাজার ৮০০ জনেরও বেশি নারী প্রাণ হারাচ্ছেন।
জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমনের মতে, বাংলাদেশে ক্যান্সার দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট এবং পরিবেশগত কারণ দায়ী:
ভয়াবহ পরিবেশ ও বায়ু দূষণ: বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বর্তমান অনিয়ন্ত্রিত বায়ু দূষণের সাথে ফুসফুসের ক্যান্সারের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বাতাসের ক্ষতিকর উপাদান ফুসফুসকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যার ফলে সুস্থ থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।
ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস ও ভেজাল: বাজারে থাকা বিভিন্ন খাবারে ভেজাল, রাসায়নিকের ব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ খাদ্যনালির ক্যান্সার বৃদ্ধির প্রধান কারণ।
ধূমপান ও তামাকের ব্যবহার: পুরুষদের মধ্যে ফুসফুস, মুখ, ঠোঁট ও খাদ্যনালির ক্যান্সার বাড়ার পেছনে প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে অনিয়ন্ত্রিত ধূমপান, জর্দা, গুল এবং তামাকপাতা সেবনের অভ্যাস।
কম বয়সে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা: বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সাধারণত বয়স্ক নারীদের স্তন ক্যান্সার বেশি হলেও বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানে ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী নারীরা আশঙ্কাজনক হারে স্তন ও জরায়ুর ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছেন।
চিকিৎসকদের মতে, সচেতনতা এবং সঠিক সময়ে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই মৃত্যুর হার অনেকটাই কমিয়ে আনা সম্ভব। বিশেষ করে জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সরকারিভাবে টিকাদান (HPV Vaccine) কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে এর কাভারেজ বা আওতা এখনও অনেক কম। যদি দেশের সকল প্রান্তের নারীদের এই টিকার আওতায় আনা যায় এবং স্তন ক্যান্সারের প্রাথমিক লক্ষণগুলো নিয়ে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো যায়, তবে নারীদের মধ্যে এই দুটি ক্যান্সারে আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার দুই-ই নাটকীয়ভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা