বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সুদীর্ঘ সীমান্ত এলাকা বর্তমানে এক নজিরবিহীন উত্তেজনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক আইন, প্রতিষ্ঠিত মানবাধিকারের রীতিনীতি এবং দুই দেশের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক কনস্যুলার চুক্তিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ভারত সরকার বাংলাভাষী বিপুল সংখ্যক মানুষকে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে জোরপূর্বক সীমান্ত দিয়ে পুশইন বা ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ভারতের এই একতরফা ও আগ্রাসী পদক্ষেপের ফলে কয়েকশ মানুষ সীমান্তে চরম অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে অবর্ণনীয় মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। ঢাকার কূটনৈতিক মহল এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পরিষ্কার জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে অবৈধ অভিবাসীদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সবসময় ভিয়েনা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) নিয়ম মেনে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে থাকে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন পদ্ধতি অনুসরণ না করে মানুষদের রাতের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়, যা দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের পথে বড় অন্তরায় তৈরি করছে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই মূলত সীমান্ত দিয়ে এই পুশইনের প্রবণতা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে গত ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে নয়াদিল্লি এই একতরফা পুশইন প্রক্রিয়াকে আরও তীব্র করেছে। যদিও দুই দেশের নাগরিক, ভিসা এবং বন্দিবিনিময় সংক্রান্ত আইনি সমস্যা প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে সমাধানের জন্য ২০১৭ সাল থেকে নিয়মিত কনস্যুলার সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল, যার সর্বশেষ বৈঠকটি ২০২৪ সালের মে মাসে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান সংকট নিরসনে বাংলাদেশ সরকার ২০২৫ সালে ভারতকে জরুরি দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানালেও দিল্লির পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত কোনো ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনৈতিক সূত্র থেকে জানা গেছে, ভারত সরকার এ পর্যন্ত বাংলাদেশি হিসেবে চিহ্নিত করে মোট ২,৮০০ জন ব্যক্তির একটি নামের তালিকা বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করেছে। তবে এই তালিকার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঢাকার কর্মকর্তারা চরম বিভ্রান্তিকর ও ত্রুটিপূর্ণ তথ্যের সন্ধান পেয়েছেন। এনবিআরের হিসাবের মতো চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই তালিকার মধ্যে ২৫০ জনের নামের পুনরাবৃত্তি রয়েছে, অর্থাৎ একই ব্যক্তির নাম দুই থেকে তিনবার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৪০০ জনের তথ্য সম্পূর্ণ অসম্পূর্ণ, যেখানে ব্যক্তির গ্রাম, জেলা বা স্থায়ী ঠিকানার কোনো উল্লেখ ছাড়াই স্রেফ কিছু নাম পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। তথ্য ও প্রমাণের এমন চরম ঘাটতি থাকার কারণে মাত্র ৬০০ জনের নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই করা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের এই বিলম্ব নিয়ে ভারতের একটি কূটনৈতিক সূত্র উল্টো ঢাকাকে দায়ী করে দাবি করেছে যে, দীর্ঘদিন ধরে আটক থাকা ব্যক্তিদের দেখভালের পেছনে ভারতের বড় অঙ্কের আর্থিক ব্যয় হচ্ছে এবং ঢাকা এই প্রক্রিয়াটি ইচ্ছা করে দীর্ঘায়িত করছে। এই অজুহাতে এখন কোনো বাংলাভাষী মানুষ পেলেই ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) তাদের দেশের উগ্র রাজনৈতিক নির্দেশনা অনুযায়ী সরাসরি পুশইনের জন্য সীমান্তে নিয়ে আসছে। এর জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে সমকালকে বলেছেন, একটি দেশের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করতে হলে তার পৈতৃক ভিটা ও স্থায়ী ঠিকানার সত্যতা জানা জরুরি, যা ভারত সরবরাহ করছে না। সবচেয়ে বড় আইনি লঙ্ঘন হলো, জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী আটক ব্যক্তিদের আন্তর্জাতিক কনস্যুলার সেবা বা ‘কনস্যুলার অ্যাকসেস’ পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ভারত তাদের বিভিন্ন রাজ্যে আটকে রাখা ব্যক্তিদের কোনো ধরণের কনস্যুলার সুবিধা দিচ্ছে না, যার ফলে তাদের প্রকৃত জাতীয়তা নির্ধারণ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এই আইনি লুকোচুরির মাধ্যমে দিল্লি আন্তর্জাতিক মহলে ঢাকাকে দোষারোপ করার একটি সস্তা অজুহাত তৈরি করতে চাচ্ছে।
এই সীমান্ত উত্তেজনার মাঝেই পশ্চিমবঙ্গের প্রভাবশালী বিজেপি নেতা ও বিধানসভার বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক তথ্য দিয়ে পুরো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছেন। গত রবিবার (৭ই জুন) বিজেপির একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবিরের প্রস্তুতি সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টার থেকে ইতিমধ্যে প্রায় ৪,৮০০ জন ‘কথিত অবৈধ অভিবাসী’কে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এছাড়া বর্তমানে আরও ৮৩৬ জন মানুষ বাংলাদেশে জোরপূর্বক প্রত্যাবাসনের অপেক্ষায় লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। শুভেন্দু অধিকারী এই বিশাল সংখ্যার কথা ঘোষণা করলেও, ঠিক কবে, কোন সীমান্ত দিয়ে এবং কোন আন্তর্জাতিক আইনি বিধি মেনে এই ৪,৮০০ মানুষকে ঠেলে দেওয়া হলো—সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ দিতে পারেননি। ভারতের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) দোহাই দিয়ে তিনি বলেন, যারা এই আইনের আওতায় পড়বেন না, কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নির্দেশ অনুযায়ী তাদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দিয়ে পুশইন করা হচ্ছে।
শুভেন্দুর এই যুদ্ধংদেহী বক্তব্যের পর বাংলাদেশের সীমান্ত সুরক্ষায় অভূতপূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সোমবার (৮ই জুন) ঢাকায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম জানান, ভারতের এই অবৈধ পুশইন বন্ধ করতে এবং তীব্র প্রতিবাদ জানাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে নতুন দিল্লিকে ১২ থেকে ১৩টি আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক চিঠি বা প্রটেস্ট নোট পাঠানো হয়েছে। তিনি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম ও ফ্লডলাইটের চোখ ফাঁকি দিয়ে মানুষদের ঠেলে দেওয়ার এই চেষ্টা কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। ভারতের এই বেআইনি তৎপরতা রুখতে সম্প্রতি বাংলাদেশের ২৬টি সীমান্তবর্তী জেলায় বিপুল সংখ্যক বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে, যারা ২৪ ঘণ্টা সীমান্তে কঠোর পাহারার মাধ্যমে শক্ত হাতে পুশইন প্রতিহত করছেন। এমনকি সীমান্তের স্থানীয় সাধারণ জনতাও বিজিবিকে এই কাজে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পাহারা দিয়ে সাহায্য করছেন। এর একটি বড় প্রমাণ মেলে সোমবার রাতে, যখন পঞ্চগড়ের বড়বাড়ি সীমান্ত দিয়ে ১০ জন নারী, শিশু ও পুরুষকে পুশইনের চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বিজিবির তীব্র প্রতিরোধ এবং দীর্ঘ ৭০ ঘণ্টার অনড় অবস্থানের পর অবশেষে বিএসএফ সাময়িকভাবে সীমান্তের ফ্লাডলাইট বন্ধ করে তাদের নিজস্ব ভারতীয় ভূখণ্ডে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
সীমান্তের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে গত সপ্তাহে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঢাকার ভারতীয় হাইকমিশনে একটি অত্যন্ত কড়া ও আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদপত্র পাঠিয়েছে। এই চিঠিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে যে, যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যেভাবে অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে যথেচ্ছভাবে ঠেলে দেওয়ার বারবার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত দুঃখজনক ও অনভিপ্রেত। এটি দুই দেশের পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা নষ্ট করার পাশাপাশি পুরো সীমান্ত এলাকার স্থিতিশীলতাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলবে। বাংলাদেশ সরকার জোর দিয়ে বলেছে, যে কোনো ধরণের প্রত্যাবাসন অবশ্যই সম্পূর্ণ আইনসম্মত উপায়ে, সম্মত দ্বিপাক্ষিক প্রটোকল মেনে এবং কনস্যুলার নোটিশের মাধ্যমে হতে হবে। চিঠিতে দিল্লিকে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, তারা যেন এমন কোনো উগ্র জনমত বা রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডাকে প্রশ্রয় না দেয়, যা সীমান্তে সংঘাত ও জনবিদ্বেষকে উসকে দিয়ে সামগ্রিক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
এই তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই সোমবার থেকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বিজিবি এবং বিএসএফের মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক (ডিজি) পর্যায়ের চার দিনব্যাপী সীমান্ত সম্মেলন শুরু হয়েছে, যা আগামী ১১ই জুন পর্যন্ত চলবে। বিজিবি সদর দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এবারের এই শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের এই অবৈধ পুশইন নীতি, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিরীহ বাংলাদেশি নাগরিকদের নির্মম হত্যা, কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সামগ্রিক সীমান্ত ব্যবস্থাপনার মতো অতি সংবেদনশীল বিষয়গুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে টেবিল টক বা আলোচনার টেবিলে তোলা হবে। এর আগে ভারত সরকার যেভাবে আসাম সীমান্ত দিয়ে প্রায় ১০০ রোহিঙ্গাকে এবং আন্দামান সাগরে বিপুল সংখ্যক শরণার্থীকে পুশইন করার চেষ্টা করেছিল, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন সেটিকে ‘অমানবিক ও প্রাণঘাতী আচরণ’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছিল। বিশ্বমঞ্চের সেই নিন্দার ইতিহাস মনে করিয়ে দিয়ে ঢাকা এবার দিল্লিতে অত্যন্ত শক্ত অবস্থান নিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, বিজিবি-বিএসএফের এই অর্থপূর্ণ সংলাপে দিল্লি আন্তর্জাতিক আইন মেনে সুপথে ফিরে আসে নাকি তাদের একতরফা আগ্রাসী পুশইন নীতি বহাল রাখে।