বুধবার, ১০ জুন ২০২৬, ১২:১১ পূর্বাহ্ন

যুদ্ধের ধাক্কায় ৩ মাসে বিদেশগামী কর্মী কমছে ৪১%

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৪ বার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৯ জুন, ২০২৬

করোনা মহামারির বিধ্বংসী ধাক্কা কাটিয়ে যখন বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান খাতটি সবেমাত্র সোজা হয়ে দাঁড়াতে শুরু করেছিল, ঠিক তখনই নতুন করে মরণকামড় বসিয়েছে ভূ-রাজনীতি। সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র আকার ধারণ করা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ পরিস্থিতির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। এর ফলে সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো দেশগুলোয় বাংলাদেশি নতুন কর্মী পাঠানোর হার মারাত্মকভাবে মুখ থুবড়ে পড়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সর্বশেষ পরিসংখ্যান এই আশঙ্কাজনক ধসের চিত্রটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের গত মার্চ থেকে মে—এই তিন মাসে মাত্র ১ লাখ ৫৩ হাজার ৬৩৬ জন বাংলাদেশি কর্মী কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশে যেতে পেরেছেন। অথচ এর আগের বছর ঠিক একই সময়ে এই সংখ্যাটি ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার ৪৩৮ জন। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশ থেকে বিদেশগামী কর্মীর সংখ্যা এক লাফে প্রায় ৪১ শতাংশ কমে গেছে।

শ্রমবাজার বিশ্লেষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে আনুষ্ঠানিক সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই এই সংকটের সূত্রপাত। যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণ, পর্যটন, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সেবা খাতের ব্যবসাগুলো স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে সেখানকার কোম্পানিগুলো নতুন কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে চরম সতর্ক ও ধীরনীতি অবলম্বন করছে, যার কারণে নতুন ভিসার অনুমোদনের হার অনেক কমে গেছে। এর ওপর যুদ্ধাবস্থার কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী শত শত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট আকস্মিক বাতিল হওয়ায় নতুন কর্মীদের সময়মতো বিদেশযাত্রাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। আগে যেখানে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর ন্যূনতম বিমানভাড়া ছিল ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা, ফ্লাইট সংকটের কারণে তা এখন প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা ছাড়িয়েছে। ফলে অনেক দরিদ্র কর্মী ঋণের টাকা শোধ করেও ঢাকা বিমানবন্দর থেকে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

পরিসংখ্যানের আয়নায় মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি কর্মসংস্থানের চিত্র

বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের সিংহভাগই ঐতিহ্যগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর। এর মধ্যে সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), ওমান ও জর্ডান হলো প্রধান গন্তব্য। বিএমইটির তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিগত বছরগুলোয় এই দেশগুলোতেই সবচেয়ে বেশি জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে। যেমন, করোনার ধাক্কা সামলে ২০২২ সালে মোট ১১ লাখ ২৬ হাজার ৩৬৮ জন কর্মী বিদেশে যান, যার মধ্যে বড় অংশই ছিল সৌদি আরবের। এরপর ২০২৩ সালে বাংলাদেশ জনশক্তি রপ্তানিতে সর্বকালের রেকর্ড গড়ে; সে বছর মোট ১৩ লাখ ৫ হাজার ৪৫৩ জন কর্মী বিভিন্ন দেশে যান। ২০২৪ সালেও সেই ধারা বজায় রেখে ১০ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ জন শ্রমিক বিদেশে পাড়ি জমান, যার মধ্যে শুধু সৌদি আরবেই যান ৬ লাখ ২৭ হাজারের বেশি কর্মী।

তবে চলতি ২০২৬ সালের চিত্র বলছে যে, বছরের শুরু থেকে ৫ই জুন পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ১৪ হাজার ৩৬২ জন কর্মী বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সিংহভাগই গেছেন বছরের প্রথম দুই মাসে। সংঘাত শুরুর পর থেকে এই গতি থমকে গেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে রেস্তোরাঁ ব্যবসা চালানো শরিফুল হক নামের এক প্রবাসী কালের কণ্ঠকে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুবাইয়ে তাঁর ভালো ব্যবসা ছিল। কিন্তু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর দীর্ঘদিন তাঁর রেস্তোরাঁ বন্ধ রাখতে হয়। পরিস্থিতি এখন কিছুটা স্বাভাবিক হলেও পুরো আরব আমিরাত এখন পর্যটকশূন্য। ফলে দোকান খুললেও বিক্রি না থাকায় তিনি স্টাফদের বেতন ও দোকানের খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন এবং দেশে পরিবারকে কোনো টাকা পাঠাতে পারছেন না।

ওমরাহ ও ভিজিট ভিসা বন্ধ, এজেন্সির ব্যবসায় বড় ধস

ব্যবসায়িক খাতের এই স্থবিরতার কথা নিশ্চিত করে অ্যাসোসিয়েশন অব ট্রাভেল এজেন্টস অব বাংলাদেশের (আটাব) সেক্রেটারি মাজহারুল ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমাদের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক রুট সৌদি আরব এখন প্রায় বন্ধের মুখে। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে সেখানে গিয়ে কাজ করা নতুনদের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কুয়েতের ক্ষেত্রে নতুন কোনো ভিসা ইস্যু হচ্ছে না, যা হচ্ছে তা সবই পুরোনো ব্যাকলগ। এছাড়া ওমান ও দুবাইয়ের ভিজিট বা ভ্রমণ ভিসা অনেক দিন ধরেই পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।”

তিনি আরও যোগ করেন যে, বর্তমানে সৌদি আরবে ওমরাহ ভিসা ছাড়া অন্য সব কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যিক ভিসার ক্ষেত্রে এক ধরণের অঘোষিত স্থবিরতা চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত বড় কোম্পানিগুলো নতুন করে কোনো ঝুঁকি বা দায় নিতে চাচ্ছে না। এর ওপর বৈশ্বিক বাজারে বিমানের জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে, যার ফলে দেশের ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং ট্রেডের ওপর চারদিক থেকে এক বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে এসেছে।

বিকল্প শ্রমবাজারের অভাব ও রেমিট্যান্সের চোরাবালি থেকে মুক্তির উপায়

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীরের মতে, বাংলাদেশের শ্রমবাজার দীর্ঘকাল ধরে কেবল মধ্যপ্রাচ্য এবং এককভাবে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে রয়েছে। কিন্তু নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এই বাজারকে বৈচিত্র্যময় করা, ঝুঁকি কমানো বা দূরপ্রাচ্য ও ইউরোপের মতো বিকল্প শ্রমবাজার তৈরি করার কোনো সুদূরপ্রসারী ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। সরকারি স্তরে নানা আলোচনা হলেও এখনো দেশের ৯০ শতাংশ অভিবাসন প্রক্রিয়া চলছে কিছু প্রাইভেট এজেন্সি ও ব্যক্তিগত দালালি নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য কোনো ভূ-রাজনৈতিক সংকট এলেই বিকল্প কোনো পথ খোলা না থাকায় বাংলাদেশকে সরাসরি বড় ধরণের ধাক্কা খেতে হচ্ছে। চলমান যুদ্ধের কারণে প্রবাসীদের কাজের নিরাপত্তা ও নিয়মিত বেতন পাওয়া নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা দীর্ঘ মেয়াদে দেশের সার্বিক রেমিট্যান্স বা ডলার প্রবাহকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।

ব্র্যাক অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল ইসলাম এই সংকটের এক ভিন্ন ও গভীর সামাজিক দিক তুলে ধরে কালের কণ্ঠকে বলেন, “আমাদের এখন অদক্ষ শ্রমিক পাঠানোর এই অন্ধ মোহ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। গত ৫ বছরে শুধু সৌদি আরবেই ২০ থেকে ২৫ লাখ কর্মী যাওয়ার পরও আমাদের অফিশিয়াল রেমিট্যান্স উল্টো কমে মাত্র সাড়ে তিন থেকে চার বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। এর কারণ হলো অতিরিক্ত কোটা ও দালালি খরচের নামে দেশ থেকে হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রকৃতপক্ষে বিদেশে পাচার হয়ে গেছে।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, অতিরিক্ত বিদেশযাত্রার কারণে টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও মুন্সীরগঞ্জের মতো প্রবাসী-প্রধান জেলাগুলোয় এখন তীব্র কৃষি শ্রমিক সংকট দেখা দিচ্ছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। মাদারীপুরের মতো অঞ্চলের মানুষ লাখ লাখ টাকা খরচ করে সমুদ্রপথে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার আত্মঘাতী চেষ্টা করছে, অথচ শেষ পর্যন্ত সেই পরিবারগুলো নিঃস্বই থেকে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, বাংলাদেশের সামনে আগামী ২০ থেকে ২৫ বছর ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বা তরুণ জনশক্তির এক সুবর্ণ সময় রয়েছে, যার পর দেশের জনসংখ্যা প্রবীণ হতে শুরু করবে। তাই সরকার কত লাখ লোক পাঠাল, সেই সস্তা হিসাব বন্ধ করে তারা কতটুকু দক্ষ এবং কত ডলার দেশে পাঠাতে পারছে, সেই গুণগত হিসাব করা জরুরি। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষা ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি বর্তমান যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানের মতো দেশগুলোর পুনর্গঠন বাজারে দক্ষ কর্মী পাঠানোর জন্য এখনই বিশেষ কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু করতে হবে। কারণ ইতিমধ্যে সংঘাতের সরাসরি কবলে পড়ে ইরান থেকে ২০১ জন এবং বাহরাইন থেকে ২৮২ জন অদক্ষ বাংলাদেশি কর্মী সরকারি সহায়তায় সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন, যা আমাদের জন্য এক বড় সতর্কবার্তা।

তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ


এ জাতীয় আরো খবর...