আগামী অর্থবছরের দেশের সার্বিক অর্থনীতির গতিপ্রকৃতি ও রূপরেখা কেমন হওয়া উচিত, তার একটি নিজস্ব পরিকল্পনা তুলে ধরেছে বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে ৮ লাখ ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকার একটি বিস্তারিত ‘ছায়া বাজেট প্রস্তাবনা’ দেশবাসীর সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই বিশাল বাজেটে আয়ের বিপরীতে সামগ্রিক ঘাটতির পরিমাণ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। মঙ্গলবার (৬ জুন) রাজধানীর মগবাজারে আয়োজিত এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনে এই বাজেট প্রস্তাবনা ও অর্থনৈতিক দিকনির্দেশনা তুলে ধরেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বাজেট পেশ করার সময় তিনি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতির কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অতীত নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তারা নির্বাচনের ফলাফল মেনেই সংসদে গিয়েছিলেন। সেই সময় দুটি ভোট একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হলেও তারা একটি শপথ গ্রহণ করেছিলেন এবং অপরটি গ্রহণ করেননি। গণভোটের রায়কে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। ডা. শফিকুর রহমান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যদি এভাবে সাধারণ জনগণকে দিনের পর দিন ধোঁকা দিতে থাকেন, তাহলে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা কীভাবে বজায় থাকবে? জনগণের রায়কে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বর্তমান সরকার বিরোধী দলের যৌক্তিক দাবিগুলো অগ্রাহ্য করে মূলত দেশের জনগণকেই অপমানিত করেছে।
জামায়াতের আমির আরও বলেন, গণভোটের রায় ব্যর্থ হওয়ার এমন নজির বা দলিল অতীতে কোথাও ছিল না। এবারই প্রথম এমন নজিরবিহীন বিপত্তি ঘটল। তারা আগে থেকে যে আশঙ্কা করেছিলেন, বর্তমান সমাজের প্রতিটি স্তরে এখন তা একদম স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশের আর্থিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং সাংবাদিকতাসহ সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় আজ নগ্ন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সমাজের চিহ্নিত অপরাধী ও দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ কাঠামোর জন্য এক অশনিসংকেত।
নিজেদের প্রস্তাবিত বাজেটের দর্শন সম্পর্কে কথা বলতে গিয়ে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, এই ছায়া বাজেট তারা নির্দিষ্ট কোনো একক রাজনৈতিক দলের স্বার্থে দিচ্ছেন না। বরং এই বাজেট দেশের ১৮ থেকে ২০ কোটি সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের কল্যাণের জন্য তৈরি করা হয়েছে। তবে এই প্রস্তাবনা বা যেকোনো বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তিনি একটি বড় শর্ত জুড়ে দিয়েছেন। তার মতে, রাষ্ট্র পরিচালনায় সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা থাকলে যে কোনো ভালো অর্জনই সম্ভব। কিন্তু যদি সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা বা অ্যাকাউন্টিবিলিটি নিশ্চিত করা না যায়, তবে সরকার যে বাজেটই ঘোষণা করুক না কেন, তা বাস্তবে কখনোই সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না।
বাজেট বাস্তবায়নের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করতে ডা. শফিকুর রহমান দেশের বর্তমান অর্থবছরের সময়কাল পরিবর্তনের এক যুগান্তকারী প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, বর্তমানে আমাদের ফিসক্যাল ইয়ার বা অর্থবছর হলো জুলাই থেকে জুন পর্যন্ত। কিন্তু জুন ও জুলাই মাসে সাধারণত দেশ বর্ষা, অতিবৃষ্টি, খরা বা সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত থাকে। এর ফলে আমরা প্রতি বছরই লক্ষ্য করি যে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাজেটের একটি বিশাল অংশ অর্থবছরের শেষের দিকে, বিশেষ করে শেষ দুই মাসে তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়। জামায়াতের আমিরের মতে, এটি কোনো প্রকৃত উন্নয়ন বা বাস্তবায়ন নয়, এটি মূলত গণলুটপাটের একটি সুকৌশলী উপায়। তাড়াহুড়ো করে করা এসব কাজের কোনো সুফল সাধারণ জনগণ পায় না। তাই তারা সংসদে প্রস্তাব দেবেন যেন ফিসক্যাল ইয়ার বা অর্থবছরকে ইংরেজি ক্যালেন্ডার ইয়ার অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। এতে করে অন্তত বর্ষার পানিতে জনগণের ট্যাক্সের টাকা ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে না এবং বাজেটের প্রকৃত অর্থ সুষম উন্নয়নের কাজে লাগানো সম্ভব হবে।