যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া বিদেশী শিক্ষার্থী, গবেষক এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের জন্য দীর্ঘ প্রায় সাতচল্লিশ বছর ধরে চলমান ভিসার অনির্দিষ্ট মেয়াদের যে চিরাচরিত সুবিধা ছিল, তা সম্পূর্ণ বাতিল করে একটি চূড়ান্ত ও কঠোর রক্ষণশীল নীতিমালা জারি করেছে দেশটির প্রশাসন। দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এই নতুন নিয়ম কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে, যার ফলে এখন থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য সেখানে থাকার সময়সীমা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও সংকুচিত করে আনা হয়েছে। এই আকস্মিক নীতিগত পরিবর্তন উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে সেখানে পাড়ি জমানো এবং ইতিমধ্যে অবস্থানরত বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাকে এক গভীর ও নজিরবিহীন অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রতি বছর এদেশের হাজার হাজার মেধাবী তরুণ বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে পাড়ি জমান, যার মধ্যে অনেকেরই মূল লক্ষ্য থাকে আন্তর্জাতিক মানের ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানে ভালো চাকরি নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করা। এই স্বপ্নের তালিকায় বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের প্রথম পছন্দ সবসময়ই ওই দেশ। তবে নতুন এই নীতিমালার কারণে সেখানে অবস্থানরত এবং নতুন করে যেতে ইচ্ছুক শিক্ষার্থীরা নানামুখী মনস্তাত্ত্বিক ও প্রশাসনিক চাপে পড়েছেন। উনিশশো আটাত্তর সালের পর থেকে চলা নিয়মের আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন এই বিধিনিষেধে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ চার বছরের জন্য সেখানে থাকার অনুমোদন দেওয়া হবে। যদি কোনো শিক্ষার্থীর তার নির্দিষ্ট শিক্ষাবর্ষ বা গবেষণা সম্পন্ন করতে চার বছরের বেশি অতিরিক্ত সময়ের প্রয়োজন হয়, তবে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভর না করে সরাসরি নাগরিকত্ব ও অভিবাসন সেবা দপ্তরের কাছে থাকার মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত জটিল ও আনুষ্ঠানিক আবেদন করতে হবে। এর সরাসরি অর্থ হলো, মেয়াদের তদারকি ক্ষমতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদের হাত থেকে কেড়ে নিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের কঠোর নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। একই সাথে মেয়াদ বাড়াতে চাওয়া আবেদনকারীদের অত্যন্ত কড়া শারীরিক ছাপ পরীক্ষা, পটভূমি যাচাই এবং তথ্য জালিয়াতি অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
এই কঠোর নীতিমালার সবচেয়ে বড় ও নির্মম আঘাতটি আসতে চলেছে উচ্চতর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি গবেষণার সাথে যুক্ত শিক্ষার্থীদের ওপর। আমরা জানি, সেখানে একটি মানসম্মত উচ্চতর গবেষণা বা ডক্টরেট সম্পন্ন করতে সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর পর্যন্ত দীর্ঘ সময় লেগে যায়। আগে যেখানে অতিরিক্ত কোনো কাগজের ঝামেলা বা কেন্দ্রীয় অনুমতি ছাড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা ও গবেষণাগারের কাজ চালিয়ে যাওয়া যেত, সেখানে এখন প্রায় প্রত্যেক গবেষককে কোর্সের মাঝপথেই মেয়াদ বৃদ্ধির জন্য আবেদন করে দাপ্তরিক অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে হবে। শুধু তাই নয়, নতুন নিয়মে শিক্ষার্থীদের হুটহাট প্রধান পাঠ্যসূচি বা শিক্ষাক্রম পরিবর্তনের সুযোগ সম্পূর্ণ সংকুচিত করে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। একই সাথে ডিগ্রি অর্জনের পর শিক্ষার্থীদের দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন কিংবা অনুমোদনের ধরন পরিবর্তনের জন্য আগে যেখানে ষাট দিনের একটি স্বস্তিদায়ক অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ ছিল, তা এক ধাক্কায় অর্ধেকে নামিয়ে মাত্র ত্রিশ দিন করা হয়েছে। এই ত্রিশ দিনের সংকীর্ণ সময়ের মধ্যে ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ ও কাজের অনুমোদন না মিললে কিংবা পরবর্তী উচ্চতর ডিগ্রিতে ভর্তি নিশ্চিত করতে না পারলে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলকভাবে দেশ ছাড়তে হবে, যা দীর্ঘমেয়াদি জীবিকার পরিকল্পনাকে এক চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
দেশটির দাপ্তরিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চব্বিশ সালে সেখানে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মোট অনুমোদনের সংখ্যা ছিল আঠারো লাখেরও বেশি, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় এগারো শতাংশেরও বেশি। এছাড়া ওই একই অর্থবছর শেষে তারা পাঁচ লাখের বেশি পরিদর্শক এবং প্রায় সাঁইত্রিশ হাজার তিনশো জন বিদেশী সাংবাদিককে অনুমতি প্রদান করেছিল। সেখানে যাওয়ার সুযোগ তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠলেও, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা কিন্তু জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। পঁচিশ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষা বিনিময় বিষয়ক প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চব্বিশ-পঁচিশ শিক্ষাবর্ষে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় সতেরো দশমিক নয় শতাংশ বেড়ে বিশ হাজার একশো ছাপান্ন জনে দাঁড়িয়েছে, যা তার আগের তেইশ-চব্বিশ শিক্ষাবর্ষে ছিল সতেরো হাজার নিরানব্বই জন। আরও আশ্চর্যের বিষয় হলো, গত ছয় শিক্ষাবর্ষের তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই সময়ে সেখানে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা এক লাফে একশত আঠাশ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে পূর্বে এই সংখ্যা ছিল মাত্র আট হাজার আটশত আটত্রিশ জন। এই বিপুল পরিমাণ প্রবৃদ্ধি এটাই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশী মেধার এক বিশাল অংশ সেখানকার উচ্চশিক্ষার ওপর কতটা নির্ভরশীল।
এই নজিরবিহীন নীতিগত পরিবর্তনের ফলে সেখানে গবেষণারত শিক্ষার্থীরা তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, এই নতুন নিয়মটি আসলে অবৈধ অবস্থান নিয়ন্ত্রণের নামে বৈধ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর এক ধরণের কৃত্রিম প্রশাসনিক জটিলতা ও মানসিক চাপ তৈরি করবে। এটি সরাসরি থাকার মেয়াদ না কমালেও, সেখানে বৈধভাবে থাকার অনুমোদিত সময়সীমাকে এক সংকীর্ণ সীমানায় বেঁধে দিচ্ছে। সাধারণ ডিগ্রি বা স্নাতকের পর শিক্ষার্থীরা সাধারণত এক বছর এবং বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ের শিক্ষার্থীরা তিন বছর পর্যন্ত ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের অধীনে কাজ করার সুযোগ পান। কিন্তু বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোর্স শেষ হওয়ার পর অবস্থা পরিবর্তনের জন্য মাত্র ত্রিশ দিন সময় পাওয়া যাবে, যা কাজের চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য একেবারেই অপর্যাপ্ত। আমাদের দেশের এই হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর হঠাৎ আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়ে স্বপ্নের পথ থেকে ছিটকে পড়ার নির্মম বাস্তবতার বিষয়ে এখন থেকেই গভীরভাবে ভাবা এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। সময় থাকতে এই বৈশ্বিক নীতিগত পরিবর্তনের লাল বাতির সংকেতকে গুরুত্ব দিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের আগাম সতর্ক ও বিকল্প পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় খাদের কিনারা থেকে এই তরুণ গবেষকদের স্বপ্নভঙ্গ ঠেকানো আর কারও পক্ষেই সম্ভব হবে না।
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা