দেশের বিচার ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ থানা ও আদালতের মালখানাগুলো এখন নজিরবিহীন অব্যবস্থাপনা, জায়গার তীব্র ঘাটতি এবং তদারকির অভাবে এক এক করে আলামতের ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কোনো ফৌজদারি অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত কিংবা বিচারের প্রামাণিক দলিল হিসেবে পুলিশ ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার জব্দ করা এসব মালামাল বছরের পর বছর ধরে পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের করা এক বিশেষ তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বর্তমানে দেশের ৯৬৭টি থানা ও আদালতের সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা মালখানাগুলোতে সাড়ে ১৪ লাখেরও বেশি সাধারণ আলামত আটকে রয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬৭ হাজারেরও বেশি আলামত কোনো প্রকার চূড়ান্ত সমাধান ছাড়াই ১০ বছরেরও বেশি সময় ধরে মানবেতর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। কেবল নথিপত্র বা ছোটখাটো জিনিসই নয়, রোদে পুড়ে ও বৃষ্টিতে ভিজে অবহেলায় ধ্বংস হচ্ছে প্রায় ৩৫ হাজার ৫৮৮টি মূল্যবান যানবাহন ও জলযান। দীর্ঘদিনের এই অবহেলার কারণে মামলার মূল তথ্য-প্রমাণ ও আলামতের কার্যকারিতা বিনষ্ট হচ্ছে, যা বিচার প্রক্রিয়াকেও দীর্ঘায়িত করছে।
সারা দেশে থাকা মোট ৯৬৭টি মালখানার ভৌত অবকাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বেশিরভাগ স্থানে আলামত সংরক্ষণের ন্যূনতম নিরাপদ পরিবেশ নেই। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা ৭ ৪০টি থানার মালখানার মধ্যে মাত্র ৩০১টি ব্যবহারের উপযুক্ত এবং সেগুলোতে প্রয়োজনীয় জায়গা রয়েছে। বাকি শত শত থানার মালখানা স্থান সংকটে জর্জরিত কিংবা পুরোপুরি ব্যবহারের অযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। অনেক থানাতেই পর্যাপ্ত জমি না থাকায় জব্দ করা গাড়ি, বড় সাইজের যন্ত্রপাতি কিংবা উদ্ধার করা অন্যান্য মালামাল থানা ভবনের সামনে, পেছনে, এমনকি পাশের মেঠো পথ ও মহাসড়কের ওপর ফেলে রাখা হচ্ছে। এতে করে একদিকে যেমন কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে থানার চারপাশের পরিবেশ ও রাস্তাঘাটের স্বাভাবিক চলাচল মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয় যে, ৭৪০টি থানার জন্য বর্তমানে যেখানে মাত্র ছয় একর ১১ শতাংশ জমি মালখানা হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে, সেখানে প্রকৃতপক্ষে জরুরি ভিত্তিতে অন্তত ১৫ একর ১৪ শতাংশ জমির প্রয়োজন রয়েছে।
একই ধরনের শোচনীয় চিত্র ফুটে উঠেছে দেশের বিভিন্ন জেলা আদালতের ২২৭টি মালখানায়। এর মধ্যে ৭১টি মালখানা পর্যাপ্ত স্থান ও ব্যবহার উপযোগী হলেও ৮৫টি স্থানে জায়গার চরম অভাব রয়েছে এবং ৪৯টি মালখানা কোনোভাবেই ব্যবহারের উপযুক্ত নয়। ৪২টি আদালত ভবনে আধুনিক ও মানসম্মত মালখানা গড়ে তোলার মতো প্রাথমিক জায়গা থাকা সত্ত্বেও অর্থ বা প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র বরাদ্দ না পাওয়ায় মানসম্মত অবকাঠামো স্থাপন সম্ভব হয়নি। বর্তমানে আদালতের মালখানার নিয়ন্ত্রণে সাড়ে পাঁচ একর জায়গা থাকলেও জরুরি ভিত্তিতে প্রায় ১২ একর জমির প্রয়োজন রয়েছে। যানবাহন ডাম্পিংয়ের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সারা দেশের মাত্র ৬টি থানা এবং ৪টি আদালতে সুরক্ষা শেডযুক্ত ডাম্পিং ইয়ার্ড রয়েছে। আর ১৮১টি থানা এবং ১৫টি আদালতে একেবারেই খোলা আকাশের নিচে কোনো প্রকার সুরক্ষা ছাড়াই যানবাহনগুলো স্তূপ করে ফেলে রাখা হয়েছে। সার্বিকভাবে থানাগুলোর ডাম্পিংয়ের জন্য অতিরিক্ত ১০২ একর এবং আদালতের জন্য প্রায় ১৮ একর জমির প্রয়োজন বলে চিহ্নিত করেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
এ বিপুল পরিমাণ আলামত জমা হওয়ার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার চিত্র উঠে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে অধস্তন আদালতে মামলার চূড়ান্ত রায় হয়ে গেলেও রায়ের সত্যায়িত কপি বা আদেশপত্র সময়মতো মালখানার কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছায় না। ফলে রায়ে আলামত ফেরত দেওয়া, নিলামে বিক্রি করা বা ধ্বংস করার স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলেও আইনি কপির অভাবে মালখানা কর্মকর্তা মালামাল ছাড় করতে পারেন না। এছাড়া দেশে থাকা মালখানাগুলোতে আধুনিক ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেশন, জনবল এবং প্রযুক্তিনির্ভর ডাটাবেজ না থাকায় কোন মামলায় কী আলামত জমা হয়েছে তার সঠিক তথ্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এতে বিচার প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পরও মালামাল মালখানায় বছরের পর বছর জমে থাকে।
এই জট ও অব্যবস্থাপনার নিরসনে এবং জব্দ মালামাল সুরক্ষিত রাখতে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচজন সচেতন আইনজীবীর দায়ের করা একটি রিট পিটিশনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বিভাগ তাৎপর্যপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছেন। বিচারপতিদের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই প্রতিবেদনটি আমোলে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে প্রধান করে ১২ সদস্যের একটি শক্তিশালী উচ্চপর্যায়ের জাতীয় কমিটি গঠনের আদেশ দিয়েছেন। এই বিশেষ কমিটিতে সুপ্রিম কোর্ট, পুলিশ, বাংলাদেশ ব্যাংক, এনবিআর, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং আইসিটি খাতের বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করে আগামী দুই মাসের মধ্যে মালখানা আধুনিকায়ন ও ব্যবস্থাপনার টেকসই রূপরেখা জমা দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, অধস্তন আদালতের বিচারকদের অবিলম্বে ফৌজদারি কার্যবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা অনুসরণ করে নিষ্পত্তিকৃত মামলার আলামত প্রকৃত মালিকদের কাছে দ্রুত ফেরত বা হস্তান্তরের প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে। ওসিদেরও আলামতের হালনাগাদ তথ্য নিয়মিতভাবে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রেরণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্টের এই সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা ও প্রস্তাবিত কমিটির সুপারিশ যদি দ্রুত বাস্তবায়িত হয়, তবে দেশের আদালত ও থানার মালখানার ওপর চেপে থাকা এই দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর হবে। এতে করে মামলার প্রামাণিক আলামত সুরক্ষার পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকের সম্পত্তি ও রাষ্ট্রের শত শত কোটি টাকার জাতীয় সম্পদ বিনষ্ট হওয়ার পথ বন্ধ হবে।
তথ্যসূত্র: কালের কন্ঠ