রোগ নিরাময়ের শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত দেশের হাসপাতালগুলো এখন মারাত্মক ও সংক্রামক ব্যাধির কেন্দ্রস্থলে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী বিভিন্ন ভয়াবহ মাইক্রোঅর্গানিজম বা জীবাণুর মুক্ত বিচরণক্ষেত্র হয়ে উঠেছে এসব চিকিৎসাকেন্দ্র। এর ফলে একদিকে যেমন প্রতিদিন বহু রোগীর করুণ মৃত্যু ঘটছে, অন্যদিকে চিকিৎসা খরচ চালাতে গিয়ে সাধারণ পরিবারগুলো পড়ছে চরম অর্থনৈতিক দেউলিয়াত্বের মুখে। শুধু রোগীই নন, হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী ও রোগীর স্বজনরাও প্রতিনিয়ত এই মারাত্মক জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকিতে পড়ছেন। দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি পালন এবং আধুনিক ইনফেকশন কন্ট্রোল বা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চরম ব্যর্থতার ফলেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) দুটি পৃথক গবেষণার তথ্য প্রকাশ করে এই বিষয়ে তীব্র উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে। ঢাকার একটি শীর্ষস্থানীয় সরকারি টারশিয়ারি হাসপাতালের আইসিইউ ও নিওনেটাল আইসিইউতে ভর্তি হওয়া রোগীদের ওপর গবেষণা দুটি পরিচালিত হয়। তাতে দেখা গেছে, নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি রোগী হাসপাতাল থেকে এমন সব ওষুধ প্রতিরোধী জীবাণুতে আক্রান্ত হয়েছেন, যা নিরাময় করা অত্যন্ত কঠিন। ভর্তি হওয়ার সময় যেসব রোগীর শরীরে বা অন্ত্রে কোনো ক্ষতিকর সুপারবাগ ছিল না, আইসিইউতে অবস্থানের সময়ই তারা মূলত হাসপাতাল থেকে এই সংক্রমণ লাভ করেছেন। গবেষক ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব, স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ বজায় না রাখা, মাত্রাতিরিক্ত ভিড় এবং কোনো ধরনের নিয়মনীতির পরোয়া না করে যথেচ্ছ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের কারণেই এই সুপারবাগের ভয়াবহ বিস্তার ঘটছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিসট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত ওই গবেষণার ফলাফলে স্পষ্ট বলা হয়েছে, হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ইউনিটের অভাব, পর্যাপ্ত হাত ধোয়ার ব্যবস্থার ঘাটতি এবং নোংরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণেই মূলত এসব জীবাণু ছড়াচ্ছে। পাশাপাশি চিকিৎসায় অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ, অপরিষ্কার চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী কর্মকর্তা ও স্বজনদের হাত মারফত এই ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিক্স অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিবছর সরাসরি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে প্রায় ২৩ হাজার ৫০০ মানুষ মারা যান। এ ছাড়া পরোক্ষভাবে এই সুপারবাগের সংক্রমণে প্রাণ হারান প্রায় ৯৭ হাজার মানুষ, যা দেশে একটি বড় স্বাস্থ্য সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে।
আইসিডিডিআর,বি-র গবেষণায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন প্রাপ্তবয়স্ক ও নবজাতকদের ওপর নিবিড় পর্যবেক্ষণ চালানো হয়। ঢাকার সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভর্তি হওয়া রোগীদের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভর্তি হওয়ার সময়ই ৪৮.৫ শতাংশ রোগীর অন্ত্রে ক্ষতিকর ‘গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া’ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু সবচেয়ে মারাত্মক বিষয় হলো, যেসব রোগী সম্পূর্ণ রোগমুক্ত অবস্থায় আইসিইউতে প্রবেশ করেছিলেন, তাদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ রোগী আইসিইউতে থাকাকালীন এই মারাত্মক ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, যেসব রোগীর শরীরে এই ব্যাকটেরিয়ার মাধ্যমে রক্ত বা অন্যান্য অঙ্গের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের ৯০ শতাংশেরই মৃত্যু হয়েছে। সীমিত চিকিৎসাসম্পন্ন ও সম্পদসীমিত অবকাঠামোতে এই উচ্চ মৃত্যুহার চিকিৎসা ব্যবস্থার এক করুণ চিত্র তুলে ধরে।
গবেষণায় মূলত চার ধরনের ক্ষতিকর ‘গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া’ চিহ্নিত করা হয়েছে, যেগুলো যেকোনো সময় রোগীর প্রাণ কেড়ে নিতে সক্ষম। ব্যাকটেরিয়াগুলোর জিনোম সিকোয়েন্সিং করে দেখা গেছে, শুরুতে কোনো লক্ষণ প্রকাশ না করলেও পরবর্তীতে এগুলোই জীবনঘাতী সংক্রমণের রূপ নেয়। তবে আশার কথা হলো, সঠিক স্বাস্থ্যবিধি ও সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এই ভয়াবহ মৃত্যুহার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) টানা সাত মাস স্বাস্থ্যকর্মীদের হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা ও বর্জ্য অপসারণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর দেখা গেছে রক্তে ব্যাকটেরিয়া জনিত সংক্রমণ ৮৬ শতাংশ কমে গেছে। পাশাপাশি নবজাতকদের মৃত্যুহার প্রতি ১০০ জনে ২৬ জন থেকে মাত্র ৪ জনে নেমে এসেছে, যা সঠিক ব্যবস্থাপনার ইতিবাচক সম্ভাবনা তুলে ধরে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) বৈশ্বিক অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স রিপোর্ট অনুসারে, বাংলাদেশে বহুল ব্যবহৃত কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে, যা ক্ষেত্রবিশেষে ৯৭ শতাংশ পর্যন্ত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। চিকিৎসকদের অপ্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন, সাধারণ মানুষের নিজের সিদ্ধান্তে ওষুধ সেবন এবং কোর্ট বা সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে ফার্মেসি থেকে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই ওষুধ কেনার ফলেই রোগীরা ওষুধ প্রতিরোধী হয়ে উঠছেন। একই সাথে হাসপাতালে অনুমোদিত দূরত্বের চেয়ে অতিরিক্ত কম দূরত্বে বেড রাখা এবং মেঝেতে ফেলে চিকিৎসা দেওয়ার কারণেও সংক্রমণ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ভয়াবহ স্বাস্থ্য ঝুঁকি এড়াতে সরকারি পর্যায়ে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি আরোপ এবং হাসপাতালে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিতের তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: নিউ এজ