সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মোটা অঙ্কের বেতনের চাকরির লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে প্রলুব্ধ হচ্ছেন হাজার হাজার উচ্চাকাঙ্ক্ষী তরুণ। কম্পিউটার অপারেটর, কাস্টমার কেয়ার কিংবা ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো সহজ কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে কম্বোডিয়া, লাওস ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে তাদের। তবে বিদেশি মাটিতে পা রাখার পরপরই বদলে যায় সব বাস্তবতার হিসাব। সঙ্গে থাকা পাসপোর্ট ও মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে তাদের বন্দি করা হয় উচ্চ প্রাচীরঘেরা এক একটি ‘স্ক্যাম কম্পাউন্ডে’। জাতিসংঘের পরিভাষায় আন্তর্জাতিক এই সংঘবদ্ধ অপরাধকে বলা হচ্ছে ‘ফোর্সড অনলাইন স্ক্যামিং’, যা মূলত একুশ শতকের আধুনিক ডিজিটাল দাসত্বেরই একটি বীভৎস রূপ।
বিশ্বজুড়ে ৩০ জুলাই পালিত মানব পাচারবিরোধী দিবসে উঠে আসা তথ্যে দেখা যায়, এই অপরাধের ধরন বিশ্বজুড়ে দ্রুত বদলে গেছে। আগে যেখানে শুধু জোরপূর্বক শ্রম, অঙ্গ পাচার কিংবা যৌন শোষণের জন্য মানুষ পাচার করা হতো, এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মানুষকে সাইবার জালিয়াতিতে বাধ্য করা হচ্ছে। জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, কেবল মিয়ানমার ও কম্বোডিয়াতেই প্রায় দুই লাখ ২০ হাজার মানুষকে বন্দি রেখে প্রতারণার কাজ করানো হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে সিরাজগঞ্জ, শরীয়তপুর ও ফরিদপুরের মতো এলাকার অসংখ্য শিক্ষিত তরুণ মোটা অঙ্কের টাকা খরচ করে গিয়ে এই আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের কবলে পড়ে চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
এই অপরাধ চক্রের মূল কৌশল হলো বন্দিদের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে আর্থিক জালিয়াতি চালানো। কোনো কোনো ভুক্তভোগীকে ভুয়া নারী পরিচয়ে বিদেশি নাগরিকদের সাথে অনলাইনে সম্পর্কের অভিনয় করতে বাধ্য করা হয়, আবার কাউকেই ফিশিং লিংকের মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খালি করার কাজে ব্যবহার করা হয়। দিনে নির্দিষ্ট পরিমাণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে না পারলে চালানো হয় ইলেকট্রিক শক, শারীরিক নির্যাতন এবং বন্ধ করে দেওয়া হয় খাবার। এমনকি দেশে থাকা পরিবারগুলোর কাছে ফোন করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনাও অহরহ ঘটছে। সম্প্রতি কম্বোডিয়া থেকে ৩৭ জন তরুণকে উদ্ধার করে দেশে আনা হলেও অসংখ্য তরুণ এখনও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই গোপন ঘাঁটিগুলোতে বন্দি রয়েছেন।
প্রযুক্তি নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের জালিয়াতি বর্তমানে অপরাধীদের জন্য বিলিয়ন ডলারের লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। অপরাধীরা এখন ডিপফেক ভিডিও, কৃত্রিম কণ্ঠস্বর এবং স্বয়ংক্রিয় চ্যাটবট ব্যবহার করে অনলাইন প্রতারণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলছে। শুধু গত বছরেই এই ধরনের অনলাইন স্ক্যামের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি ক্ষতি হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ পরবর্তীতে অস্ত্র চোরাচালান ও নতুন মানব পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর ফলে ভুক্তভোগীরা কেবল শারীরিকভাবে বন্দি হচ্ছেন না, বরং তারা না চাইতেও এক বিশাল আন্তর্জাতিক অপরাধের অংশাদারে পরিণত হচ্ছেন।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এই ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি ও সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া নিয়োগ বিজ্ঞাপনের ভূমিকা রয়েছে। দালালরা সাধারণ ট্যুরিস্ট ভিসায় বিদেশে পাঠিয়ে তরুণদের এই চক্রগুলোর কাছে বিক্রি করে দেয়। সাইবার অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের অপরাধ দমনে কেবল কেন্দ্রীয় পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়; বরং স্থানীয় থানা পুলিশকে প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত ও তথ্য বিশ্লেষণে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক তথ্য আদান-প্রদান এবং এনক্রিপ্টেড প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি ছাড়া এই নেটওয়ার্ক ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব।
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া এই ডিজিটাল দাসত্ব বন্ধে এখন একটি দেশের একক চেষ্টার চেয়ে বৈশ্বিক সমন্বয় অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি জাতিসংঘ প্রস্তাবিত সাইবার অপরাধবিরোধী কনভেনশন দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশকেও তাদের ট্রানজিট ও অভিবাসন চ্যানেলগুলোতে সতর্ক নজরদারি বাড়াতে হবে, যেন তরুণরা বিজ্ঞাপনের ফাঁদে পড়ে আর জিম্মি না হন। একই সঙ্গে বন্দিদশা থেকে ফেরত আসা ভুক্তভোগীদের মানসিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের নিশ্চিত উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর