অধিকৃত গাজা উপত্যকায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যায় ভারত ইসরায়েলের কাছে অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) এক প্রতিবেদনে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ কথা জানিয়েছে। সংস্থাটি বলছে, ইসরায়েলি বাহিনীর কাছে গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন সরঞ্জাম রপ্তানি করা হয়েছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরায়েলে অন্তত ২ হাজার ৫৯৬টি অস্ত্রের চালান পাঠানো হয়েছে। ভারত সরকারের সরাসরি মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নামও চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘মেড ইন ইন্ডিয়া: দ্য সাপ্লাই অব উইপনস অ্যান্ড অ্যামুনিশন টু ইসরায়েল’ শীর্ষক প্রতিবেনটিতে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে ভারত সরকার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা খাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও লাভজনক অংশীদারত্ব গড়ে তুলেছে এবং ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের জন্য প্রয়োজনীয় সরবরাহব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত হয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে ভারত ও ইসরায়েলের মধ্যে অস্ত্রবাণিজ্যের চালানভিত্তিক তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে, কীভাবে ভারতে তৈরি অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন উপাদান ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর সরবরাহকারী বড় বড় কোম্পানিগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছে।
প্রতিবেদনটির অনুসন্ধানে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, ইসরায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অস্ট্রেলিয়াও এমন দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে, যেগুলো ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও অস্ত্রশিল্প–সংশ্লিষ্ট সম্পর্ক বজায় রেখেছে। একই সঙ্গে এসব দেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদন ও সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলমান পরিস্থিতিতে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বহন করছে।
এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশের বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় অস্ট্রেলিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইসরায়েলি বাহিনী গাজায় ঘোষিত নিরাপদ এলাকাগুলোতে বিমান হামলার জন্য এই যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। এসব হামলায় কয়েক হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
এই যুদ্ধবিমানের যন্ত্রাংশ উৎপাদনে জড়িত অল্প কয়েকটি দেশের মধ্যে অস্ট্রেলিয়া একটি। ফলে এই কার্যক্রমে দেশটির অব্যাহত অংশগ্রহণ গাজায় সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অন্যান্য গুরুতর ঘটনার সঙ্গে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার দায়িত্ব হলো নিশ্চিত করা যে, অস্ট্রেলিয়ায় তৈরি অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ এমন কোনো স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে না, যেখানে সেগুলো আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বা মানবাধিকার আইন লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনায় ব্যবহৃত হওয়ার সুস্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে।
গাজায় ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যার প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়া, ভারত এবং অন্যান্য দেশকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে নিজেদের দায়বদ্ধতা পালন করতে হবে। এ জন্য এমন অস্ত্র ও যন্ত্রাংশ সরবরাহ বন্ধ করতে হবে, যেগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় অবদান রাখতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তদন্তকারীরা ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ভারত থেকে ইসরায়েলে পাঠানো অস্ত্র, গোলাবারুদ, যন্ত্রাংশ ও বিভিন্ন উপাদানের মোট ২ হাজার ৫৯৬টি চালান বিশ্লেষণ করেছেন।
নথিপত্র অনুযায়ী, ভারতীয় কোম্পানিগুলো ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সরাসরি সরবরাহকারী বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে অন্তত ৩ লাখ ৯০ হাজার ৫১৬টি ছোট আগ্নেয়াস্ত্রের যন্ত্রাংশ, ৫ লাখ ৬৪ হাজার ৯৭০টি বিস্ফোরক অস্ত্রের উপাদান (যেমন ড্রোনের ওয়ারহেড, কামানের গোলার খোলসসহ অন্যান্য সামগ্রী) এবং সামরিক যানবাহনের ২৯৮টি যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলছে, তারা এমন সব চালানের তথ্য পদ্ধতিগতভাবে বাদ দিয়েছে, যেগুলো বেসামরিক কাজে ব্যবহারের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।
সংস্থাটি এমন অস্ত্র, যন্ত্রাংশ ও গোলাবারুদও বাদ দিয়েছে, যেগুলো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, এসব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি অনেক ক্ষেত্রে নির্বিচার হামলা থেকে বেসামরিক মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়ে থাকে।