জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠনের দীর্ঘ ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও কাঙ্ক্ষিত গতি পায়নি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিগুলো গঠনের প্রক্রিয়া। দেশের সংবিধান ও সংসদীয় কার্যপ্রণালি বিধির নিয়ম অনুযায়ী নতুন সংসদের প্রথম বা দ্বিতীয় অধিবেশনের মধ্যে এই গুরুত্বপূর্ণ কমিটিগুলো গঠনের সুযোগ থাকলেও বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে তা বেশ শ্লথ গতিতে চলছে। জাতীয় সংসদের মোট পঞ্চাশটি স্থায়ী কমিটির মধ্যে গত ছয় মাসের দীর্ঘ সময়ে গঠিত হয়েছে মাত্র পনেরোটি। এর মধ্যে মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি রয়েছে মাত্র নয়টি এবং বাকি ছয়টি বিষয়ভিত্তিক কমিটি। কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী প্রতি মাসে প্রতিটি সংসদীয় কমিটির ন্যূনতম একটি করে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার বিধান থাকলেও কমিটিগুলো গঠিত না হওয়ায় এবং নির্দিষ্ট সময়ে সভা না হওয়ায় নির্বাহী বিভাগের ওপর আইনসভার তদারকি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
সংসদীয় গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও নির্বাহী বিভাগের কার্যক্রমকে সংসদের জবাবদিহির আওতায় রাখা। মন্ত্রণালয়ভিত্তিক সংসদীয় কমিটিগুলোর প্রধান সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো সংশ্লিষ্ট খাতের বাজেট বাস্তবায়ন, নীতি পর্যালোচনা, অনিয়ম ও গুরুতর অভিযোগ তদন্ত করা এবং যেকোনো নতুন বিল গভীরভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মন্ত্রণালয়কে প্রয়োজনীয় পরামর্শ বা সুপারিশ প্রদান করা। কিন্তু পর্যাপ্ত সংখ্যক কমিটি গঠিত না হওয়ায় এবং যেসব কমিটি গঠিত হয়েছে সেগুলোরও নিয়মিত বৈঠক বা কার্যকর তদারকি না থাকায় মন্ত্রণালয়গুলোর কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির বড় ধরনের ফাঁক থেকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকদের মতে, কার্যপ্রণালি বিধির যথাযথ প্রয়োগ এবং কমিটির সুপারিশগুলো আমলে নেওয়ার ক্ষেত্রে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক বাধ্যবাধকতার ঘাটতি পুরো সংসদীয় ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তুলছে।
সংসদীয় কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কোনো কঠোর বাধ্যবাধকতা না থাকায় অতীতেও নানামুখী চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে—যেমন যুক্তরাজ্যে, অস্ট্রেলিয়ায় কিংবা ভারতে—সংসদীয় কমিটির রিপোর্টের ওপর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে জবাব দেওয়ার বা অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট পেশ করার সুনির্দিষ্ট বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের সংসদীয় কাঠামোয় এই ধরনের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকায় কমিটির সুপারিশগুলো অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত গুরুত্ব পায় না। তাছাড়া বিরোধী দলগুলোকে তাদের প্রাপ্ত আসনের অনুপাতে উপযুক্ত সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদ দেওয়ার যে প্রথা ও রাজনৈতিক সমঝোতা রয়েছে, তা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। জুলাই সনদের প্রস্তাব অনুযায়ী বিরোধী দলের উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব এবং নির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ কমিটিতে তাদের সভাপতিত্ব পাওয়ার কথা থাকলেও তা নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে।
সংসদীয় কমিটি গঠন ও এর কার্যকারিতা নিয়ে তৈরি হওয়া এই দীর্ঘসূত্রতা এবং জবাবদিহির সংকট নিরসনে দ্রুত সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় সংসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বাকি কমিটিগুলো গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তবে কেবল কমিটি গঠন করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং মন্ত্রণালয়গুলোর কার্যক্রমের ওপর নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি এবং কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল সংসদীয় গণতন্ত্র তার প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হবে।