ঢাকায় অবস্থিত কয়েকটি দেশের দূতাবাস ও সরকারি দপ্তরে ই-মেইল পাঠিয়ে চাঁদা দাবি এবং বোমা হামলার হুমকির ঘটনাকে ‘ভুয়া গ্রুপের’ কাজ বলে জানিয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পুলিশের ধারণা, দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও সরকারকে বিব্রত করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে এসব ই-মেইল পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংকে কর্মরত সমসাময়িক ভূরাজনীতি গবেষক ও লেখক শিয়ামক আলী হুমকিমূলক দুটি ই-মেইল বিশ্লেষণ করে বলেছেন, প্রথম দৃষ্টিতে এগুলো নিরাপত্তাহুমকির মতো মনে হলেও নিবিড়ভাবে পড়লে এমন বহু অসংগতি পাওয়া যায়, যা এটিকে একটি অপরিণত কিন্তু সমন্বিত চাঁদাবাজিচেষ্টার ইঙ্গিত হিসেবে প্রমাণ করে।
শিয়ামক আলীর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রথম ই-মেইলটি ১৭ আগস্ট ‘Yusuf Khan’ নামের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিএসএটি (পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত অনলাইন সত্যায়ন ব্যবস্থাপনা) ই-মেইল ঠিকানায় পাঠানো হয়। এর ঠিক দুই দিন পর, অর্থাৎ ১৯ আগস্ট ভিন্ন নাম ও ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করে আরও একটি বার্তা পাঠানো হয়, যার বিষয় ছিল—‘2nd reminder, soon action’।
দ্বিতীয় ই-মেইলে রাশিয়ার দূতাবাস, তাদের কনস্যুলার শাখা ও চীনা দূতাবাসের সাংস্কৃতিক শাখাকেও পাঠানো হয়।
প্রেরকের পরিচয় আলাদা হলেও দুই ই-মেইলের মধ্যে মিল এতটাই বেশি যে, সেগুলোকে একই উৎসের বলে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। উভয় প্রেরকই লাটভিয়ার ওয়েবমেইল সেবা Inbox.lv ব্যবহার করেছেন এবং দুটি ই-মেইল ঠিকানাতেই ‘noones’ শব্দটি রয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, হুমকির ভাষা, চাঁদা দাবির ধরন, বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্ট নম্বর, এমনকি ক্রিপ্টোকারেন্সির পেমেন্ট তথ্যও প্রায় হুবহু একই। দ্বিতীয় বার্তায় কেবল আগের তালিকার সঙ্গে আরও দুটি বিকাশ-নগদ অ্যাকাউন্ট যুক্ত করা হয়েছে।
ইনবক্স.এলভি থেকে কি হুমকিদাতাদের পরিচয় পাওয়া সম্ভব
বিশ্লেষণে শিয়ামক আলী একটি প্রযুক্তিগত দিকও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, Inbox.lv-এর বর্তমান নিবন্ধনপ্রক্রিয়ায় শুরুতেই বাধ্যতামূলকভাবে মোবাইল নম্বর দিতে হয় না। ফলে, কেবল ই-মেইল আইডি দেখে ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
তবে এই সেবার প্রিমিয়াম সংস্করণ ব্যবহার করতে ব্যাংক কার্ড প্রয়োজন হয়। সে ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের একটি ডিজিটাল রেকর্ড তৈরি হয়, যা তদন্তকারীদের প্রকৃত ব্যবহারকারী শনাক্তে সহায়ক হতে পারে।
পাকিস্তানি রুপি থেকে বাংলাদেশি টাকা
দুটি ই-মেইলের সবচেয়ে বড় অসংগতি দেখা গেছে চাঁদার অঙ্কে।
১৭ আগস্টের প্রথম বার্তায় দাবি করা হয় ১০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি। অথচ মাত্র দুই দিন পর একই ধরনের দ্বিতীয় ই-মেইলে সেই দাবি বদলে হয়ে যায় ১০ বিলিয়ন বাংলাদেশি টাকা।
অদ্ভুত বিষয় হলো, মুদ্রা বদলালেও বিকাশ, নগদ ও ক্রিপ্টোকারেন্সির একই পেমেন্ট তথ্য অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কেন পাকিস্তানি রুপি থেকে হঠাৎ বাংলাদেশি টাকায় দাবি পরিবর্তন করা হলো, তার কোনো ব্যাখ্যা ই-মেইলে নেই।
শিয়ামক আলী বলেন, মুদ্রা বদলে গেলেও অর্থ গ্রহণের প্রায় সব তথ্য একই থাকায় বার্তাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা আরও দুর্বল হয়ে পড়েছে।
১০ বিলিয়ন তুলতে লাগবে ১৫ বছর
অর্থ আদায়ের প্রস্তাবিত পদ্ধতিতেও রয়েছে বড় ধরনের গাণিতিক অসংগতি।
প্রথম ই-মেইলে ১২টি বিকাশ ও নগদ অ্যাকাউন্টে প্রতিদিন ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা করে জমা দিতে বলা হয়েছে। সেই হিসাবে প্রতিদিন সর্বোচ্চ আদায় হবে ১৮ লাখ টাকা। আর ১০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করতে এভাবে সময় লাগবে ১৫ বছরের বেশি।
দ্বিতীয় ই-মেইলে অ্যাকাউন্টের সংখ্যা ১৪ করা হয়েছে। এতে দৈনিক আদায় বেড়ে দাঁড়ায় ২১ লাখ টাকা। তবু ১০ বিলিয়ন টাকা তুলতে প্রায় ১৩ বছর লেগে যাবে।
এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। কারণ, একই বার্তায় হুমকি দেওয়া হয়েছে, ‘এই সপ্তাহের মধ্যেই ভবনে বোমা হামলা করা হবে।’ অর্থাৎ, কয়েক দিনের মধ্যে হামলার হুমকি, কিন্তু অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা ১৩-১৫ বছরের!
শিয়ামক আলী বলেন, এই গাণিতিক অসংগতি পুরো দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
‘We are crypto kings’
দুই ই-মেইলেই বিকল্প হিসেবে পুরো অর্থ ক্রিপ্টোকারেন্সিতে পাঠানোর আহ্বান জানানো হয়েছে। সেখানে একই Binance অ্যাকাউন্ট ও একই Bitcoin ওয়ালেট ঠিকানা দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে কৌতূহলোদ্দীপক অংশটি ছিল শেষের বাক্যটি—‘We are crypto kings, prefer money in crypto.’
শিয়ামক আলীর মতে, প্রেরকের নাম ও ই-মেইল বদলালেও একই ক্রিপ্টো পেমেন্ট চ্যানেল ব্যবহার করাই দুটি বার্তার সবচেয়ে শক্তিশালী সংযোগ।
‘আপনার ভবন’—কিন্তু ই-মেইল গেছে অনেকের কাছে
শিয়ামক আলী আরও কয়েকটি ভাষাগত অসংগতি চিহ্নিত করেছেন।
দ্বিতীয় ই-মেইলটি একাধিক দূতাবাস ও প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হলেও সেখানে বারবার ‘your building’—অর্থাৎ একবচনে ‘আপনার ভবন’ বলা হয়েছে। যদি সত্যিই এটি একাধিক প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশে পাঠানো হয়, তাহলে এমন ভাষা অস্বাভাবিক।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো ই-মেইলেই কোনো উগ্রবাদী সংগঠনের পরিচয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, ধর্মীয় মতাদর্শ কিংবা কোনো আদর্শিক দাবি নেই। যা স্পষ্টভাবে রয়েছে, তা হলো সহিংসতার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের চেষ্টা।
শিয়ামক আলী বলেন, কর্তৃপক্ষের তদন্তে এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। এটি আদর্শিক সন্ত্রাসবাদের চেয়ে চাঁদাবাজির প্রচেষ্টার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শিয়ামক আলী উল্লেখ করেন, দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, চীনা দূতাবাসের বিরুদ্ধে পাঠানো হুমকি একটি উগ্রবাদী সংগঠনের নামে দেওয়া হয়েছিল। তবে পুলিশ এখনো এর উৎস যাচাই করছে এবং এটিকে ভুয়া হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।
অন্যদিকে আজকের পত্রিকা জানিয়েছে, একাধিক দূতাবাস একই ধরনের ‘স্ক্রিপ্টেড’ ই-মেইল পেয়েছে। সিটিটিসির কর্মকর্তারাও প্রাথমিকভাবে এগুলোকে প্রতারণামূলক বার্তা বলে মনে করছেন।
ডিবির ধারণা সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের চেষ্টা
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, একই ধাঁচের বার্তা বিভিন্ন দূতাবাস ও সরকারি প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছে। এতে পরিকল্পিতভাবে আতঙ্ক সৃষ্টি, বিদেশি কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
তদন্তকারীরা এখন ই-মেইলের ডিজিটাল উৎস, ব্যবহৃত আর্থিক অ্যাকাউন্ট, ক্রিপ্টো ওয়ালেট ও সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক সংযোগ খতিয়ে দেখছেন।
শিয়ামক আলী বলেন, হুমকিটিকে শুধু গাণিতিক অসংগতির কারণে উড়িয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। তবে মুদ্রা বদল, অর্থ সংগ্রহের সময়সূচি, একই ভাষার পুনরাবৃত্তি ও ভিন্ন ভিন্ন ছদ্মনাম ব্যবহার—সব মিলিয়ে এটি একটি অপরিণত কিন্তু সমন্বিত চাঁদাবাজিচেষ্টার ইঙ্গিত দেয়। এর আড়ালে আরও গুরুতর কিছু রয়েছে কি না, সেটিই এখন তদন্তকারীদের বের করতে হবে।