সন্তান যখন চোখের আড়াল হয়, তখন প্রতিটি মুহূর্ত পরিবারের কাছে এক একটি যুগের মতো মনে হয়। আদরের সন্তানটি হয়তো পথ হারিয়েছে, কিন্তু ঠিকই কোনো না কোনোভাবে মায়ের কোলে নিরাপদে ফিরে আসবে—এমন বুকভরা আশা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন পথ চেয়ে বসে থাকেন পরিবারের সদস্যরা। কিন্তু দিন শেষে সেই আশা অনেক ক্ষেত্রেই রূপ নিচ্ছে চরম হতাশায় এবং এক বুক আর্তনাদে, যখন নিখোঁজ সন্তানের জীবিত হাসিমুখের বদলে উদ্ধার হচ্ছে ক্ষতবিক্ষত বা পচনশীল লাশ। কখনো বাড়ির পাশের পুকুর থেকে, কখনো নদী বা খাল থেকে, আবার কখনো নির্জন জঙ্গল কিংবা মাটির নিচ থেকে উদ্ধার করা হচ্ছে নিখোঁজ শিশুদের নিথর দেহ। দেশে নিখোঁজ শিশুদের মৃতদেহ উদ্ধারের এই ভয়াবহ ও অমানবিক প্রবণতা এখন জনমনে চরম আতঙ্ক এবং শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংকলিত একটি পরিসংখ্যান আমাদের সমাজের এই ভয়ংকর বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলে দেখিয়েছে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের ভিত্তিতে তৈরি করা ওই পরিসংখ্যান বলছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত—অর্থাৎ মাত্র পাঁচ বছরের কিছু বেশি সময়ের ব্যবধানে—নিখোঁজ হওয়া অন্তত ২২০ জন শিশুর মৃতদেহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।
দেশে শিশু নিখোঁজের ঘটনা এখন কতটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান দেখলেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেই নিখোঁজ শিশুদের নিয়ে দেশজুড়ে মোট ১৫ হাজার ৭১৭টি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে। এর চেয়েও বড় আতঙ্কের বিষয় হলো, এই বিপুল সংখ্যক নিখোঁজ হওয়া শিশুর মধ্যে ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর আজও পর্যন্ত কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এই সংখ্যাটি মোট দায়ের করা জিডির প্রায় ১৩ শতাংশ। নিখোঁজ হওয়ার পর কতজন শিশু উদ্ধার হয়েছে বা কতজনের পরিণতি কী হয়েছে, তার কোনো পূর্ণাঙ্গ ও সুনির্দিষ্ট তথ্য অনেক সময় সামনে আসে না। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের বছরভিত্তিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নিখোঁজ হওয়ার পর ২০২১ সালে ৩৮ জন শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর ২০২২ সালে ১৬ জন, ২০২৩ সালে ৩৯ জন, ২০২৪ সালে ৪৩ জন এবং ২০২৫ সালে ৪৮ জন শিশুর লাশ পাওয়া গেছে। আর চলতি ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ৩৬ জন শিশুর মৃতদেহ উদ্ধারের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা একটি স্বাধীন দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য চরম অশনিসংকেত।
শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর আমাদের চারপাশের চিত্রটা এখন অত্যন্ত করুণ ও পরিচিত এক দৃশ্যে পরিণত হয়েছে। পাড়া-মহল্লা বা আবাসিক এলাকাগুলোতে প্রায়ই দেখা যায়, রিকশায় মাইক লাগিয়ে কোনো এক নিখোঁজ শিশুর গায়ের রং, উচ্চতা, হারিয়ে যাওয়ার সময়ের পোশাকের বর্ণনা এবং শারীরিক গঠন উল্লেখ করে সন্ধান চাওয়া হচ্ছে। কখনো কখনো এলাকার দেয়ালে দেয়ালে বা বিদ্যুতের খুঁটিতে নিখোঁজ শিশুর সাদাকালো বা রঙিন ছবি সংবলিত পোস্টার সেঁটে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আধুনিক যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুকেও সন্তানের সন্ধান চেয়ে স্বজনদের গগনবিদারী আকুতি ও কান্নায় ভেঙে পড়ার ভিডিও প্রতিনিয়ত আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠছে। প্রতিটি পোস্ট বা মাইকিংয়ের পেছনে লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্প এবং সন্তানকে ফিরে পাওয়ার একবুক অসহায় প্রতিক্ষা।
নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম ৪৮ ঘণ্টা যেকোনো শিশুকে জীবিত উদ্ধারের জন্য সারা বিশ্বেই ‘গোল্ডেন আওয়ার’ বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই সময়ের মধ্যে সঠিক ও দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারলে শিশুটিকে জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধারের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। কিন্তু মানবাধিকারকর্মী ও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর সবচেয়ে বড় অভিযোগ হলো, এই মহামূল্যবান সময়ে আমাদের পুলিশ প্রশাসন প্রয়োজনীয় ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবীর অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, পুলিশের কাছে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর কোনো মেকানিজম বা পদ্ধতি আদৌ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ ও প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই পুলিশ তাৎক্ষণিক তল্লাশি শুরু না করে পরিবারগুলোকে ধৈর্য ধরতে বলে এবং সান্ত্বনা দেয় যে সন্তান হয়তো অভিমান করে পালিয়েছে এবং নিজে থেকেই ফিরে আসবে। পুলিশের এমন পরামর্শে পরিবারগুলো সন্তান ফিরে আসার মিথ্যা আশায় মূল্যবান সময় নষ্ট করে ফেলে, আর সেই সুযোগে পাচারকারী বা হত্যাকারীরা তাদের কাজ সম্পন্ন করে।
পুলিশের এই ধীরগতির সাড়াদান এবং গাফিলতির সর্বশেষ ও অত্যন্ত মর্মান্তিক শিকার হয়েছে কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের আদরের সন্তান ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্র অপ্রতিম শুক্রবার বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলার কথা বলে কোটবাড়ীর বাসা থেকে বের হয়েছিল। এরপর সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামলেও সে আর ঘরে ফিরে আসেনি। উৎকণ্ঠিত বাবা বাধ্য হয়ে থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। কিন্তু পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর কোনো অভিযানে নামতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শনিবার দুপুর একটার দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের রক্তাক্ত ও নিথর লাশ উদ্ধার হয়। এই ঘটনার পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দ্রুত আলামত সংগ্রহ ও সন্দেহভাজন আসামি গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের প্রশংসা করে দ্রুত বিচারের আশ্বাস দিলেও, আসকের ফয়জুল কবীর পুলিশের সামগ্রিক ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একটি নিখোঁজ শিশুকে জীবিত ও নিরাপদে উদ্ধার করাই সবার প্রত্যাশা ছিল, কিন্তু ২২ ঘণ্টা পর লাশ উদ্ধার হওয়াটা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্র নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আরও একবার চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের মাত্র তিন দিন আগে পাবনায় উদ্ধার হয় ১০ বছর বয়সী শিশু কামরুন্নাহার কলির অর্ধগলিত লাশ। নিখোঁজ হওয়ার দীর্ঘ সাত দিন পর বাড়ির পাশের একটি পুকুর থেকে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। পাবনার ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রশিদুল ইসলাম জানান, শিশুটিকে পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে বলে তারা প্রাথমিকভাবে সন্দেহ করছেন এবং এ ঘটনায় তিনজনকে ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিশু কলির বাবা কামাল প্রামাণিক অত্যন্ত ভগ্ন হৃদয়ে সংবাদমাধ্যমকে জানান, একদম ছোটবেলায় দত্তক নিয়ে কলিকে তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে নিজেদের ঔরসজাত সন্তানের মতোই আদর-স্নেহ দিয়ে বড় করেছিলেন। মেয়ে একদিন ঠিকই তাদের বুকে ফিরে আসবে—এই আশায় বুক বেঁধে দীর্ঘ সাতটি দিন তারা অপেক্ষায় ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই অপেক্ষা চরম দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। এই মর্মান্তিক ঘটনার পর তিনি এখন তার নয় মাস বয়সী ছোট ছেলের নিরাপত্তা নিয়েও চরম শঙ্কা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন।
শিশু সুরক্ষার এমন নাজুক ও ভয়ংকর পরিস্থিতিতে গত ৬ সেপ্টেম্বর জিরো মিসিং চিলড্রেন ফাউন্ডেশন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অত্যন্ত গুরুতর কিছু অভিযোগ সামনে এনেছে। তারা দাবি করেছে, সন্তান নিখোঁজ হওয়ার পর থানায় গেলে অনেক সময় পুলিশ অভিযোগ বা মামলা নিতে অস্বীকৃতি জানায়, এমনকি নিখোঁজের ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তারা টালবাহানা করতে থাকে। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মুহাম্মদ নুরুল হুদা মনে করেন, দীর্ঘ ও জটিল বিচার প্রক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চরম দুর্বলতার কারণেই সমাজে অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে এবং এমন মর্মান্তিক ঘটনা বারবার ঘটছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলাম এই সামগ্রিক পরিস্থিতির জন্য সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং বিচারহীনতার অপসংস্কৃতিকে সরাসরি দায়ী করেছেন। তিনি শিশু সুরক্ষায় কেবল পুলিশের ওপর নির্ভর না করে পরিবার, সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক মেকানিজম আরও শক্তিশালী করার তাগিদ দিয়েছেন।
অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শিশু নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে কোনোভাবেই একটি সাধারণ জিডি বা রুটিন কাজ হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং একে তাৎক্ষণিক জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পুলিশের সাড়াদানের গতি বৃদ্ধি, পাড়া-মহল্লায় সিসিটিভি ক্যামেরার ব্যাপক ও কার্যকর ব্যবহার, ডিজিটাল ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে মোবাইল বা লোকেশন শনাক্তকরণ এবং পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের মধ্যে দ্রুত সমন্বয় বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তবে পুলিশ সদর দপ্তরের সহকারী মহাপরিদর্শক (মিডিয়া ও জনসংযোগ) এএইচএম সাহাদাত হোসাইন দাবি করেছেন যে, অভিযোগ পাওয়ার পরপরই পুলিশ তা যাচাই করে শিশুর ছবি সংগ্রহ করে, সম্ভাব্য স্থানগুলোতে তল্লাশি চালায় এবং প্রযুক্তির সহায়তায় কাজ শুরু করে। দীর্ঘ সময় পার হলেও নিখোঁজ শিশুর তদন্ত পুলিশ কখনো বন্ধ করে দেয় না বলে তিনি দাবি করেন। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি ঘটনাই অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হয় এবং পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গাফিলতি প্রমাণিত হলে অবশ্যই কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। তবে পুলিশের এই দাবি ও আশ্বাসের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার বিস্তর ফারাক রয়েছে। বাস্তবতা হলো, রাষ্ট্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং নাগরিক সমাজের সম্মিলিত, সৎ ও দ্রুত উদ্যোগ ছাড়া আমাদের শিশুদের জন্য এই অনিরাপদ পরিবেশ কোনোভাবেই দূর করা সম্ভব নয়। আজকের শিশুরা যদি বাড়ির বাইরে নিরাপদ না থাকে, তবে একটি জাতি হিসেবে আমাদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিতভাবেই এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।