একটি শিশুর কাছে তার নিজ গৃহ, পরিবার এবং পরিচিত গণ্ডি পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ের কিছু রোমহর্ষক ও মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সমাজের সেই চিরচেনা নিরাপদ কাঠামোর ওপর এক ভয়ংকর প্রশ্নবোধক চিহ্ন এঁকে দিয়েছে। বর্তমানে দেশের শিশুরা সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হচ্ছে তাদের অত্যন্ত কাছের ও পরিচিত মানুষদের হাতে। নিজেদের ঘরের সুরক্ষিত চারদেয়ালের ভেতরেই হোক কিংবা নিখোঁজ হওয়ার পর নির্জন কোনো স্থানে—শিশুদের নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। আর এই প্রতিটি হত্যার ঘটনার পরতে পরতে লুকিয়ে থাকছে পরিচিত মানুষের নিষ্ঠুরতা, পূর্বশত্রুতা কিংবা বিকৃত মানসিকতার ছাপ। শিশু নিখোঁজ হওয়া এবং পরবর্তীতে তাদের মৃতদেহ উদ্ধারের এই ধারাবাহিক প্রবণতা আমাদের সমাজের প্রতিরোধ ব্যবস্থা, পুলিশের প্রাথমিক সাড়াদান এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার চরম দুর্বলতাগুলোকে অত্যন্ত নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে। পারিবারিক সহিংসতা, যৌন নির্যাতন এবং অপহরণের মতো ঘটনাগুলো একই সুতোয় গাঁথা হয়ে দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ভয়াবহ নিরাপত্তাহীনতার বলয় তৈরি করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, নিখোঁজ ও হত্যার শিকার হওয়া এই শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে একেবারে কম বয়সী শিশুরা। আর সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, এই জঘন্য অপরাধগুলোর সঙ্গে জড়িত হিসেবে যাদের নাম বারবার উঠে আসছে, তারা কেউ বাইরের বা অচেনা মানুষ নয়; তারা খোদ শিশুর জন্মদাতা পিতা-মাতা, আপন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী অথবা পরিচিত কোনো মুখ।
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী স্কুলছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনাটি শিশু নিখোঁজ হওয়া এবং পরিচিতদের মাধ্যমে হত্যার এই ভয়ংকর ঝুঁকিকে নতুন করে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে এসেছে। গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর বাবা-মায়ের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেয়ে মায়ের আইফোনটি নিয়ে ছবি তোলার কথা বলে হাসিমুখে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল অপ্রতিম। কিন্তু সেই যাওয়াই যে তার শেষ যাওয়া হবে, তা ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেনি তার পরিবার। প্রায় একুশ ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার পর বাড়ির খুব বেশি দূরে নয়, এমন একটি পাহাড়ি জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয় অপ্রতিমের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহ। তদন্ত সংশ্লিষ্ট ও স্থানীয়দের তথ্যানুযায়ী, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সন্দেহে যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা অপ্রতিমের পূর্বপরিচিত ছিল। একটি সামান্য ফোন বা অন্য কোনো স্বার্থের জন্য পরিচিত মানুষেরাই যে কতটা ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে পারে, অপ্রতিম হত্যাকাণ্ড তারই এক জলজ্যান্ত ও হিমশীতল দৃষ্টান্ত। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ঘরের বাইরের চেনা জগতেও শিশুরা আজ বিন্দুমাত্র নিরাপদ নয়।
মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্য আমাদের সামনে এক ভয়ংকর পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসেই সারা দেশে নিখোঁজ হওয়া ৩৬ জন শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে পুলিশ সদর দপ্তরের নিজস্ব পরিসংখ্যান পরিস্থিতিকে আরও বেশি ভয়াবহ হিসেবে চিত্রিত করেছে। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে সারা দেশে মোট ১৫ হাজার ৭১৭ জন শিশু নিখোঁজ হওয়ার আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক নিখোঁজ শিশুর মধ্যে ১৩ হাজার ৬৭৯ জনকে জীবিত উদ্ধার করে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও, ২ হাজার ৩৮ জন শিশুর আজও কোনো সন্ধান মেলাতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সন্ধান না পাওয়া এই শিশুদের মধ্যে ৬৮ জন শিশুর বয়স নয় বছরের নিচে এবং ১ হাজার ৯৭০ জন শিশুর বয়স দশ থেকে সতেরো বছরের মধ্যে। পুলিশ সদর দপ্তরের মতে, শিশুরা নানা কারণে বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় বা পালিয়ে যায়, এবং বর্তমানে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি বা জিডি করার সুযোগ তৈরি হওয়ায় নিখোঁজের অভিযোগ দায়েরের সংখ্যা আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
তবে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের কাছে মূল চিন্তার বিষয় শুধু নিখোঁজ শিশুর সংখ্যা বৃদ্ধি নয়, বরং নিখোঁজ হওয়ার পর শিশুদের জীবিত অবস্থায় পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্ষমতা ও আন্তরিকতা নিয়ে। আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, তারা শুধু নিখোঁজ শিশুর মৃতদেহ উদ্ধার বা সন্ধান চান না, বরং তারা চান প্রতিটি শিশুকে যেন জীবিত ও অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। যখন কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার পর তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়, তখন তদন্তকারী কর্মকর্তাদের অত্যন্ত গভীরভাবে খতিয়ে দেখা উচিত যে শিশুটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, তাকে উদ্ধারের জন্য প্রশাসন ঠিক কী কী পদক্ষেপ নিয়েছিল, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কোনো সমন্বয়ের অভাব ছিল কি না এবং এই অবহেলা বা অপরাধের সঙ্গে কারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। অপ্রতিমের ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি একটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন তুলেছেন যে, নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ পাওয়ার পরপরই মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের মতো সহজলভ্য ও আধুনিক প্রযুক্তিগুলো পুলিশ কেন তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হলো। সময়মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করা গেলে হয়তো অপ্রতিমকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো। আসকের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যেই সাম্প্রতিক সময়ে নিখোঁজ ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার হওয়া শিশুদের ঘটনাগুলোর দ্রুত, নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ তদন্তের জোর দাবি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নিখোঁজ শিশুদের উদ্ধারের ক্ষেত্রে যাদের গাফিলতি বা অবহেলা রয়েছে, তাদের কঠোর জবাবদিহির আওতায় আনারও দাবি তোলা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়া, উদ্ধার হওয়া এবং সন্ধান না পাওয়া শিশুদের সঠিক হিসাব রাখার জন্য একটি সমন্বিত এবং নিয়মিত হালনাগাদ করা জাতীয় তথ্যভাণ্ডার বা ডাটাবেজ তৈরির ওপরও জোর দিয়েছে সংস্থাটি। তাদের মতে, এ ধরনের একটি তথ্যভাণ্ডার থাকলে অপরাধের ধরন চিহ্নিত করা এবং তা প্রতিরোধের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অনেক বেশি সহজ হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি এই ক্রমবর্ধমান শিশু হত্যার বিষয়ে মুখ খুলেছেন। তিনি জানিয়েছেন যে, অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা বা শাস্তি দেওয়া আইনি প্রক্রিয়ার একটি অংশ মাত্র; কিন্তু আমাদের এখন গভীরভাবে ভাবতে হবে যে এই ধরনের অমানবিক অপরাধগুলো সমাজে কেন ঘটছে এবং কীভাবে এগুলোকে সমূলে উৎপাটন করে প্রতিরোধ করা যায়। তিনি সংবাদমাধ্যমকে আশ্বস্ত করেছেন যে, সরকার আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেওয়া পরিসংখ্যান, প্রতিটি ঘটনার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং আলাদা আলাদা মামলায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করে দেখবে। অপ্রতিম হত্যার বিষয়ে তিনি জানান যে, লাশের ময়নাতদন্তসহ অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই পুরোদমে চলছে এবং তিনি আশা প্রকাশ করেন যে এই বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুততম সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
তবে অপ্রতিমের মৃত্যুর দিন দেশজুড়ে আরও কিছু মর্মান্তিক শিশু মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের নিজেদেরই পরিবার। সুনামগঞ্জের একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনায় পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায় যে, এক বাবা তার তিন নিষ্পাপ সন্তানকে বিষ খাইয়ে হত্যা করার পর নিজে বিষপানে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এবং বর্তমানে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। অন্যদিকে মানিকগঞ্জে মা ও শিশুর মৃতদেহ উদ্ধারের ঘটনায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে যে, স্বামী তার স্ত্রী ও সন্তানকে নিজ হাতে খুন করার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন। এই ঘটনাগুলো আমাদের সামাজিক অবক্ষয় ও মানসিক স্বাস্থ্যের এক ভয়ংকর ও অন্ধকার দিককে উন্মোচন করে। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শিশুরা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি হত্যার শিকার হচ্ছে সেই জায়গাগুলোতে, যেখানে তাদের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকার কথা ছিল। জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র, টেলিভিশন এবং অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি করা সংগঠনটির জানুয়ারি থেকে জুন মাসের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, এই ছয় মাসে ৭৮টি পৃথক ঘটনায় মোট ৮৬ জন শিশুকে হত্যা করা হয়েছে।
সবচেয়ে শিউরে ওঠার মতো তথ্য হলো, নিহত এই ৮৬ জন শিশুর মধ্যে ৪৬ জনেরই বয়স ছিল ছয় বছর বা তার চেয়েও কম। অর্থাৎ, মাতৃক্রোড়ে থাকার বয়সেই এই শিশুদের অত্যন্ত নির্মমভাবে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, অর্ধেকেরও বেশি শিশু হত্যা, যার হার প্রায় ৫০ দশমিক ৫৯ শতাংশ, সংঘটিত হয়েছে সরাসরি পারিবারিক পরিবেশে—হতে পারে তা শিশুর নিজের বাড়ি অথবা কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের বাড়ি। এই হত্যাকাণ্ডগুলোর সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের তালিকায় সবচেয়ে বেশি যাদের নাম এসেছে, তারা সবাই শিশুর কাছের মানুষ। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭টি হত্যাকাণ্ডে সরাসরি পিতা-মাতা, ১১টি ঘটনায় আপন আত্মীয়স্বজন এবং ২২টি ঘটনায় প্রতিবেশী বা পরিচিত ব্যক্তিরা জড়িত ছিলেন। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি শিশু হত্যার ঘটনায় খুনিরা ছিল শিশুর পূর্বপরিচিত। সংবাদপত্রে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এই হত্যার পেছনের কারণগুলোও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ৮৬টি মৃত্যুর মধ্যে ১৯টি বা ২২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ হত্যার কারণ ছিল পারিবারিক ক্ষোভ বা ঝগড়া; ১৮টি বা ২০ দশমিক ৯ শতাংশ হত্যার সঙ্গে সরাসরি ধর্ষণের সম্পর্ক ছিল এবং ১৪টি বা ১৬ দশমিক ২৭ শতাংশ শিশু নির্মম নির্যাতনের কারণে মারা গেছে। বাকি ১৩টি বা ১৫ দশমিক ১১ শতাংশ ঘটনার ক্ষেত্রে হত্যার কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ প্রাথমিকভাবে জানা সম্ভব হয়নি।
সংগঠনটির ২০২৫ সালের বার্ষিক পরিসংখ্যানও ঠিক একই ধরনের এক ভীতিকর প্যাটার্ন বা ধরন আমাদের সামনে তুলে ধরে। ওই বছর নিহত ১২৪ জন শিশুর মধ্যে ৪৭ জনের মৃত্যু বা ৩৭ দশমিক ৯ শতাংশ ঘটনার নেপথ্যে ছিল পারিবারিক কলহ ও দ্বন্দ্ব। সে বছর ৩৮টি হত্যাকাণ্ডে পিতা-মাতা এবং ২৬টি ঘটনায় ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সরাসরি জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। শিশুর নিজের বা আত্মীয়ের বাড়িসহ সার্বিক পারিবারিক পরিবেশেই সংঘটিত হয়েছিল সে বছরের ৬৬ দশমিক ১২ শতাংশ হত্যাকাণ্ড। জন্মদাতা পিতা-মাতার হাতে নিজেদের সন্তানের এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের প্রবণতাকে একটি ভয়াবহ সামাজিক ব্যাধি হিসেবে আখ্যায়িত করে এর পেছনের মনস্তাত্ত্বিক ও আর্থসামাজিক কারণগুলো আরও গভীরভাবে খতিয়ে দেখার ওপর জোর দিয়েছে ‘শিশুরাই সব’ নামক সংগঠনটি।
শিশু হত্যার পর আমাদের বিচারিক ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়েও গভীর প্রশ্ন উঠেছে। ‘শিশুরাই সব’-এর তথ্যমতে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সংঘটিত ৭৮টি শিশু হত্যার ঘটনার মধ্যে মাত্র ৪৪টি ক্ষেত্রে অপরাধীদের গ্রেপ্তারের খবর সংবাদমাধ্যমে এসেছে। বাকি ১৪টি মামলার ক্ষেত্রে পরবর্তীতে কী ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তার কোনো তথ্যই আর জানা যায়নি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গাফিলতি, দুর্বল তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণেই মূলত শিশুদের প্রতি এই জঘন্য সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তিনি বলেন, যখন কোনো মর্মান্তিক ঘটনা সংবাদমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, তখন প্রশাসনকে বেশ নড়েচড়ে বসতে দেখা যায়; কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই আলোড়ন স্তিমিত হয়ে গেলে বিচার প্রক্রিয়া আর তার যৌক্তিক পরিণতি পর্যন্ত পৌঁছায় না। নতুন কোনো চাঞ্চল্যকর ঘটনা সামনে এলে পুরোনো ঘটনাগুলো বিচারিক দীর্ঘসূত্রতার অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। প্রতিটি শিশু হত্যার মামলাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে দ্রুততম সময়ে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে শিশুদের সুরক্ষায় সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে আরও বেশি জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে এবং পিতা-মাতাকে তাদের সন্তানদের ওপর আরও বেশি সতর্ক ও দায়িত্বশীল নজরদারি রাখতে হবে।
নিখোঁজ হওয়ার পর প্রথম কয়েকটি ঘণ্টা একটি শিশুর জীবন বাঁচানোর ক্ষেত্রে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা ব্যাখ্যা করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, একটি শিশু নিখোঁজ হওয়ার প্রথম ২৪ ঘণ্টার জন্য একটি বাধ্যতামূলক প্রটোকল বা নিয়মাবলি দেশজুড়ে চালু করা উচিত। এর পাশাপাশি নিখোঁজ শিশুদের একটি কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার বা ডাটাবেজ তৈরি এবং সমন্বিত জাতীয় সাড়াদান অত্যন্ত জরুরি। কোনো শিশু নিখোঁজ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট বা তথ্যপ্রযুক্তিগত প্রমাণাদি তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে। ফোন কল রেকর্ড, লোকেশন বা অবস্থানগত ডেটা, অনলাইন অ্যাকাউন্টের গতিবিধি এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে বিশ্লেষণ করে নিখোঁজ শিশুর অবস্থান এবং এর পেছনের কোনো অপরাধী চক্রকে চিহ্নিত করার কাজে জোর দিতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট, সাইবার ক্রাইম বিভাগ এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সংস্থাগুলোর মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় ও তাৎক্ষণিক সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনলাইনে শিশুদের বিক্রি বা অবৈধ দত্তক দেওয়ার যেসব চটকদার বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়, সেগুলোকে শুধু পেজ বন্ধ করে দিয়ে এড়িয়ে গেলে চলবে না। তদন্তকারীদের অবশ্যই এই পেজগুলোর নেপথ্যে থাকা ব্যক্তি, তাদের ব্যবহৃত ডিভাইস, অর্থের গতিবিধি এবং চক্রের শেকড় পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। শিশু নিখোঁজের অভিযোগ এবং অনলাইনে শিশু বিক্রির বিজ্ঞাপনকে কোনোভাবেই আলাদা চোখে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি বিজ্ঞাপনই শিশু পাচার, অপহরণ, জালিয়াতি বা অবৈধ দত্তক দেওয়ার একটি বিশাল বড় সূত্র হতে পারে। তাই অনলাইনে এমন প্রতিটি বিজ্ঞাপনকেই একটি সম্ভাব্য ‘ক্রাইম সিন’ বা অপরাধের ঘটনাস্থল হিসেবে বিবেচনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের ময়দানে নামতে হবে। তবেই হয়তো সমাজ থেকে এই ভয়ংকর ব্যাধি দূর করা সম্ভব হবে এবং শিশুরা তাদের নিজস্ব আঙিনায় নির্ভয়ে শ্বাস নিতে পারবে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার