দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেল বা নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করেছে সরকার। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতির প্রবল চাপ এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এই নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে বহুল প্রতীক্ষিত এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে অতীতের মতো একবারে সম্পূর্ণ কাঠামো চাপিয়ে দিয়ে অর্থনীতিতে আকস্মিক কোনো ধাক্কা বা চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে না সরকার। বরং অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে চলতি এবং আগামী অর্থবছর মিলিয়ে মোট চারটি ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো পর্যায়ক্রমে কার্যকর করার একটি যুগান্তকারী কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের অর্থ বিভাগের প্রাথমিক প্রাক্কলন ও হিসাব অনুযায়ী, নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরিজীবীদের শুধুমাত্র মূল বেতন দুই ধাপে বাড়াতেই রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অতিরিক্ত ৩৭ হাজার ৩৭২ কোটি টাকা ব্যয় করতে হবে। বিশাল এই আর্থিক কর্মযজ্ঞের আওতায় রয়েছেন দেশের সামরিক ও বেসামরিক খাতের বিপুল সংখ্যক কর্মী, বিচার বিভাগের সম্মানিত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং দীর্ঘকাল রাষ্ট্রকে সেবা দিয়ে অবসরে যাওয়া লাখ লাখ পেনশনভোগী।
অর্থ বিভাগের প্রস্তুতকৃত এই বিশাল ব্যয়ের বিস্তারিত হিসাব ও খাতভিত্তিক বিভাজন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, দেশের বেসামরিক এবং প্রতিরক্ষা খাতে বর্তমানে কর্মরত কর্মীদের বর্ধিত বেতনের জোগান দিতেই প্রয়োজন হবে ২৩ হাজার ৩১১ কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক। অন্যদিকে, যারা সারা জীবন রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে সেবা প্রদান করে বর্তমানে অবসরে আছেন, সেই পেনশনভোগীদের জন্য এবং আনুষঙ্গিক আনুতোষিক বা গ্র্যাচুইটি ও এককালীন অনুদান প্রদানের জন্য সরকারের প্রয়োজন হবে ১৪ হাজার ৬১ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরে ঠিক কত টাকা এই খাতে ব্যয় হবে, তার চূড়ান্ত এবং সুনির্দিষ্ট হিসাব এখনো সম্পন্ন হয়নি। অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, সরকারের বিভিন্ন গ্রেডের বেতন চূড়ান্ত হওয়ার পর এবং ধাপগুলো কার্যকর হতে শুরু করলে চলতি অর্থবছরের প্রকৃত খরচের হিসাবটি সম্পূর্ণভাবে স্পষ্ট হবে। বিশাল এই ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে সরকার ইতিমধ্যে বেশ কিছু আগাম প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। নবম পে-স্কেল সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে আগে থেকেই ৪৪ হাজার কোটি টাকার একটি বড় ব্লক বরাদ্দ বা থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যাতে বেতন বৃদ্ধির কারণে সরকারের নিয়মিত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বা অন্যান্য খাতে কোনো ধরনের আর্থিক স্থবিরতা তৈরি না হয়।
সামগ্রিকভাবে বেতন ও ভাতার পুরো কাঠামো যখন চূড়ান্তভাবে পুনর্গঠন করা হবে এবং সবগুলো ধাপ বাস্তবায়িত হবে, তখন সরকারের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে। এই বিশাল অঙ্কের বর্ধিত ব্যয় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ও বাজেটের বিস্তৃতির একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের মতো অপরিহার্য খাতগুলোর জন্য সর্বমোট ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকার বিশাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই বিপুল বরাদ্দের মধ্যে শুধুমাত্র কর্মরত কর্মীদের বেতনের জন্যই নির্ধারিত রয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাত মিলিয়ে কর্মরত সরকারি কর্মীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। এর পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত কর্মী বা পেনশনভোগীর সংখ্যা রয়েছে প্রায় ৯ লাখ ২৫ হাজার। অর্থাৎ, দেশের প্রায় ৩৩ লাখের বেশি পরিবার সরাসরি এই নতুন পে-স্কেলের সুফল ভোগ করতে যাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি ও ভোগব্যয়ে একটি বড় ধরনের ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন।
নতুন বেতন কাঠামোতে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের আর্থিক বৈষম্য দূর করতে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে নিচের দিকের গ্রেডগুলোতে অভাবনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে। নতুন কাঠামো অনুযায়ী, সরকারি চাকরির সবচেয়ে নিচের স্তর অর্থাৎ গ্রেড-২০ এর কর্মীদের মূল বেতন বা বেসিক স্যালারি আগের ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। একইভাবে শীর্ষ গ্রেডের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে বিশাল পরিবর্তন। সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন আগের ৭৮ হাজার টাকা থেকে প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বৃদ্ধি সর্বস্তরের সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে একটি নতুন কর্মোদ্দীপনা ও স্বস্তি ফিরিয়ে আনবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবচেয়ে উপরের দিকের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জন্য নতুন পে-স্কেলে একটি বিশেষ গ্রেড এবং আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা। অন্যদিকে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবেরা প্রতি মাসে মূল বেতন হিসেবে পাবেন ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও মুখ্য সচিবের বেতনের সঙ্গে যুক্ত হবে আকর্ষণীয় সব ভাতা। তারা বাড়িভাড়া বাবদ প্রতি মাসে পাবেন ৪০ হাজার টাকা, চিকিৎসা ভাতা হিসেবে পাবেন ৪ হাজার টাকা, বিনোদন ভাতা হিসেবে পাবেন ২ হাজার টাকা, মোবাইল ভাতা হিসেবে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা বা ওয়াশিং অ্যালাউন্স হিসেবে পাবেন ৩০০ টাকা। মূল বেতন এবং এসব আনুষঙ্গিক ভাতা মিলিয়ে তাদের মাসিক মোট প্রাপ্য বা গ্রস স্যালারি গিয়ে দাঁড়াবে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৬০০ টাকায়। এর বাইরেও তারা পদমর্যাদা অনুযায়ী সার্বক্ষণিক সরকারি গাড়ি ব্যবহার এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন, যা রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায়ে প্রশাসনিক দক্ষতা ও আন্তরিকতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
বিশেষ গ্রেডের পাশাপাশি নিয়মিত প্রথম গ্রেড বা গ্রেড-১ ভুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তাদের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা। সব ধরনের ভাতা ও সুবিধা মিলিয়ে গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের মাসিক মোট বেতন বা টেক-হোম পে দাঁড়াবে প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার টাকার কাছাকাছি। অন্যদিকে তরুণ ও মেধাবী প্রজন্মকে সিভিল সার্ভিসের দিকে আকৃষ্ট করতে প্রবেশপথে বা এন্ট্রি লেভেলে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস বা বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ হয়ে গ্রেড-৯ এ সরকারি চাকরিতে নতুন যোগ দেওয়া একজন নবীন কর্মকর্তার মাসিক মোট বেতন হবে ৬৬ হাজার ৮০০ টাকা। আগের বা বর্তমান বেতন কাঠামোতে এই গ্রেডের একজন কর্মকর্তা সব মিলিয়ে পেতেন ৩৬ হাজার ৮০০ টাকা। অর্থাৎ, চাকরিতে প্রবেশের শুরুতেই একজন মেধাবী কর্মকর্তা এখন আগের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ বেতন পাবেন, যা তাকে দুর্নীতিমুক্ত থাকতে এবং নিষ্ঠার সঙ্গে দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করতে উৎসাহিত করবে।
উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পাশাপাশি নিচের দিকের কর্মচারীদের দিকেও সরকার এবার বিশেষ নজর দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রাজধানী ঢাকায় কর্মরত গ্রেড-২০ এর একজন সাধারণ কর্মীর মাসিক মোট বেতন বেড়ে দাঁড়াবে ৩৫ হাজার ৫০০ টাকায়। পূর্বের বেতন কাঠামোতে এই গ্রেডের একজন কর্মী সর্বসাকুল্যে পেতেন মাত্র ১৫ হাজার ১১২ টাকা। বর্তমান অগ্নিমূল্যের বাজারে ১৫ হাজার টাকা দিয়ে ঢাকায় একটি পরিবারের ন্যূনতম জীবনধারণ যেখানে একপ্রকার অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সেখানে নতুন পে-স্কেলে এই বেতন ৩৫ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত হওয়াটা নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের জন্য এক বিশাল স্বস্তির সংবাদ। এটি তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিতে বড় ধরনের ভূমিকা পালন করবে।
বেতন বৃদ্ধির এই বিশাল চাপ দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে যেন বিরূপ প্রভাব বা মূল্যস্ফীতির হঠাৎ উল্লম্ফন ঘটাতে না পারে, সেজন্য সরকার অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে পর্যায়ক্রমিক বা ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির একটি চমৎকার কৌশল নিয়েছে। গ্রেড-১০ থেকে গ্রেড-২০ পর্যন্ত অর্থাৎ নিচের দিকের ১১টি গ্রেডের কর্মীদের মূল বেতন প্রথম ধাপে একযোগে ৫০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এই প্রথম ধাপটি আগামী ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে তাদের মূল বেতন আরও ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে। আর তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জুলাই মাস থেকে বাকি ২৫ শতাংশ বেতন বাড়ানো হবে। এভাবেই মূলত নিচের দিকের কর্মচারীদের শতভাগ বর্ধিত মূল বেতন তিন ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে।
অন্যদিকে শীর্ষ ও মধ্যম সারির কর্মকর্তা অর্থাৎ গ্রেড-১ থেকে গ্রেড-৯ পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্ন শতাংশের কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। এই গ্রেডগুলোর কর্মকর্তাদের মূল বেতন প্রথম ধাপে অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে আরও ৩০ শতাংশ এবং তৃতীয় ধাপে ২০২৭ সালের জুলাই মাস থেকে শেষ ৩০ শতাংশ বাড়ানো হবে। এর ফলে শীর্ষ ও মধ্যম স্তরের কর্মকর্তাদের বর্ধিত মূল বেতনও তিনটি ধাপে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হবে। সরকারের এই ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির নীতির ফলে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর যেমন হঠাৎ করে কোনো বিশাল চাপ পড়বে না, তেমনি বাজারেও রাতারাতি মুদ্রাস্ফীতি ঘটার শঙ্কা অনেকাংশে কমে যাবে।
মূল বেতনের এই বিশাল সমন্বয়ের পর আসবে অন্যান্য ভাতার বিষয়। নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের চতুর্থ এবং একেবারে শেষ ধাপটি শুরু হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। এই চূড়ান্ত ধাপে প্রজাতন্ত্রের ২০টি গ্রেডের সব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা যেমন—বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা, টিফিন ভাতা ইত্যাদি বর্তমান বাজারদর ও বাস্তবতার নিরিখে পুনর্নির্ধারণ করা হবে। ভাতা পুনর্নির্ধারণের এই কাজটি সম্পন্ন হলে নবম পে-স্কেলের সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া শেষ হবে। মূলত চার ধাপের এই দীর্ঘমেয়াদি ও সুপরিকল্পিত রূপরেখার মাধ্যমেই সরকার তার ২৪ লাখ কর্মরত এবং ৯ লাখ ২৫ হাজার অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীর ভাগ্যোন্নয়নে এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, যা জনপ্রশাসনে গতিশীলতা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা বৃদ্ধিতে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তথ্যসূত্র: ডেইলি স্টার