সরকারি কেনাকাটা এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো নির্মাণকাজের দরপত্রে অংশগ্রহণ করার বিদ্যমান নিয়মনীতিতে এক যুগান্তকারী ও কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন, ২০০৬’ (পিপিএ)-এর গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু ধারা সংশোধনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। মূলত সরকারি কাজের দরপত্র বা টেন্ডারে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ববর্তী কাজের অভিজ্ঞতা এবং উচ্চ বার্ষিক আর্থিক লেনদেন বা টার্নওভারের যে কঠোর ও বাধ্যতামূলক শর্ত এতদিন বহাল ছিল, তা ব্যাপকভাবে শিথিল করার প্রস্তাব আনা হয়েছে এই নতুন সংশোধনীতে। এর ফলে নতুন ও তরুণ উদ্যোক্তা, উদ্ভাবনী স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান এবং বিগত দুই দশকে রাজনৈতিক ও অন্যান্য নানা কারণে সরকারি কাজের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত হওয়া ব্যবসায়ীদের জন্য সরকারি কেনাকাটার বিশাল বাজারে যুক্ত হওয়ার পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি সুগম ও উন্মুক্ত হবে। প্রস্তাবকারী সংস্থা বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (পিপিএ) দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো দরপত্র প্রক্রিয়ায় একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি করা। তবে বিশেষায়িত এবং অত্যন্ত জটিল প্রকৃতির কাজের ক্ষেত্রে কার্যাদেশের ঝুঁকি বিবেচনা করে সরকার চাইলে আলাদাভাবে বিশেষ শর্ত আরোপ করার ক্ষমতাও নিজের হাতে সংরক্ষিত রাখবে।
এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের বিষয়টি এরই মধ্যে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামে নীতিগতভাবে অনুমোদিত হয়েছে। গতকাল রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বর্তমান সরকারের মন্ত্রিসভার ২১তম নিয়মিত বৈঠকে লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের চূড়ান্ত ভেটিং বা আইনি পর্যালোচনার সাপেক্ষে ‘পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ এর নীতিগত এবং চূড়ান্ত অনুমোদন প্রদান করা হয়েছে। যেহেতু বর্তমানে জাতীয় সংসদের কোনো অধিবেশন চলমান নেই, তাই সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী জরুরিভিত্তিতে এটি আপাতত একটি অধ্যাদেশ আকারে রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে জারি করা হবে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদের নতুন অধিবেশন শুরু হলে নিয়ম অনুযায়ী অধ্যাদেশটিকে বিল আকারে সংসদে উত্থাপন করে চূড়ান্তভাবে আইনে পরিণত করা হবে বলে মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থিত থাকা একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছে। এই দ্রুত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরকার মূলত স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে চাইছে।
প্রস্তাবিত এই সংশোধন অধ্যাদেশে দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ সুরক্ষায় বেশ কিছু নতুন ও যুগান্তকারী নিয়ম যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বাধ্যবাধকতা আরোপ করা। এখন থেকে যেকোনো আন্তর্জাতিক দরপত্রে অংশ নিতে হলে বিদেশি ঠিকাদারি বা পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দেশের স্থানীয় বা দেশীয় কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাধ্যতামূলকভাবে যৌথ উদ্যোগ বা জয়েন্ট ভেঞ্চার গঠন করতে হবে। এর ফলে দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি বড় কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং কারিগরি জ্ঞান বিনিময়ের এক অনন্য সুযোগ পাবে। অন্যদিকে, সরকারি কাজে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির অভিযোগে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত বা ব্ল্যাকলিস্ট করার ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রস্তাব আনা হয়েছে বর্তমান সংশোধনীতে। বিদ্যমান আইনে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ কম থাকলেও, নতুন প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে কাউকে কালো তালিকাভুক্ত করার আগে অবশ্যই তাকে সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে লিখিত কারণ দর্শানো নোটিশ প্রদান করতে হবে এবং তার আত্মপক্ষ সমর্থনের যৌক্তিক আইনি সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, প্রস্তাবিত এসব আইনি সংশোধন কার্যকর হলে সরকারি কেনাকাটায় দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বহুল সমালোচিত সিন্ডিকেট প্রথা বা গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের একচেটিয়া আধিপত্য সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে। এর ফলে দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি ঠিকাদারদের মধ্যে একটি সুস্থ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে। মন্ত্রিসভার ওই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতির কার্যপ্রণালিকে আরও আধুনিকীকরণ এবং টেকসই ক্রয় ব্যবস্থার অধিকতর সংস্থানের লক্ষ্যেই এই যুগোপযোগী পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে সরকারি পণ্য, কার্য ও ভৌতসেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে নির্ণায়কের অনুপাতভিত্তিক মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে, যা আন্তর্জাতিকভাবে বহুল চর্চিত ‘রেটেড ক্রাইটেরিয়া’ ধারণার সম্পূর্ণ সমার্থক একটি বিষয়। এছাড়াও রাষ্ট্রের সম্পদের সুষম বণ্টন ও বিস্তারের লক্ষ্যে সীমিত দরপত্র পদ্ধতির যৌক্তিক প্রয়োগ, পেশাগত অসদাচরণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো আরও বেশি স্পষ্টীকরণ এবং রাষ্ট্রীয় কোনো জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প ক্রয় ব্যবস্থা বা অলটারনেটিভ প্রকিউরমেন্ট অ্যারেঞ্জমেন্টের সুস্পষ্ট সংস্থান রাখার উদ্দেশ্যে মূলত এই আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে।
তবে এই বিপুল পরিবর্তনের নেপথ্যে কেবল অর্থনৈতিক যুক্তির পাশাপাশি গভীর রাজনৈতিক বাস্তবতার বিষয়টিও অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। আইএমইডির উচ্চ পর্যায়ের সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, বিদ্যমান টেন্ডারিং প্রক্রিয়ায় বড় অঙ্কের কোনো দরপত্রে অংশ নিতে গেলে অতীতে সরকারি কাজের বিশাল অভিজ্ঞতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অনেক বড় অঙ্কের বার্ষিক আর্থিক লেনদেনের রেকর্ড থাকার কঠিন আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে যে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান একচেটিয়াভাবে বড় বড় সব কাজ পেয়েছে, স্বাভাবিকভাবেই তাদের প্রোফাইল এখন অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি ভারী এবং অভিজ্ঞতাপূর্ণ। ফলে বর্তমান ই-জিপি বা ইলেকট্রনিক দরপত্র ব্যবস্থায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানগুলোই বারবার কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পেয়ে যাচ্ছে। গত দুই দশকে যারা রাজনৈতিক কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন বা নতুন যারা সৎভাবে ব্যবসা শুরু করেছেন, তারা বিদ্যমান আইনের এই কঠিন শর্তের বেড়াজালে পড়ে কোনোভাবেই অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছেন না। মূলত বিগত সরকারের সুবিধাভোগী ঠিকাদারদের এই একচেটিয়া আধিপত্যের পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতেই বর্তমান সরকার পিপিএ আইন সংশোধনের এই চূড়ান্ত ও সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে।
আইন পরিবর্তনের এই প্রেক্ষাপটটি হঠাৎ করেই তৈরি হয়নি, বরং বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে তৃণমূল পর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্র পর্যন্ত দলীয় নেতাকর্মী ও বঞ্চিত ঠিকাদাররা বিদ্যমান টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার খোলনলচে বদলে ফেলার জন্য সরকারের উচ্চ মহলে জোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন। এই দাবির সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছিল গত ৮ জুন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে। ওই দিন নরসিংদী-৫ আসনের সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিন জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত জোরালো ভাষায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন সংশোধনের প্রকাশ্য দাবি উত্থাপন করেছিলেন। সংসদে তিনি সুস্পষ্টভাবে অভিযোগ করে বলেছিলেন যে, ই-জিপি সিস্টেমে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে টেন্ডার আহ্বান করা হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ে কাজ পেয়ে যাচ্ছেন বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর হিসেবে পরিচিত আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী লোকজন। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, তারা অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে একচেটিয়াভাবে বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা অর্জনের কারণে তাদের কোম্পানির প্রাতিষ্ঠানিক প্রোফাইল অত্যন্ত শক্তিশালী হয়ে আছে। অন্যদিকে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সমর্থক বা গত পনেরো-কুড়ি বছর ধরে যারা সরকারি কাজ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত ছিলেন, তারা শত চেষ্টা করেও প্রোফাইলের এই অসম প্রতিযোগিতায় তাদের সঙ্গে বিন্দুমাত্র পেরে উঠছেন না। সংসদ সদস্য আশরাফ উদ্দিনের এই বক্তব্যের সময় সংসদে উপস্থিত অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও একযোগে টেবিল চাপড়ে তাকে ব্যাপক সমর্থন জানিয়েছিলেন।
সংসদ সদস্যের সেই জোরালো দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ওই দিনই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিষয়টির যৌক্তিকতা সম্পূর্ণভাবে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে সংসদকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন যে, দরপত্র প্রক্রিয়ার এই কাঠামোগত অসমতা এবং বঞ্চনার বিষয়টি সম্পর্কে সরকার সম্পূর্ণভাবে অবগত আছে। তিনি আরও জানিয়েছিলেন যে, এই জটিলতা নিরসনে তিনি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পিপিএ আইনটিকে কীভাবে রিভিউ বা পর্যালোচনা করে পরিবর্তন করা যায় এবং দরপত্রে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সঠিক ও বঞ্চিত ব্যক্তিরা যেন কাজের ন্যায্য সুযোগ পান, সেটি সরকার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে বলে তিনি তখন জোরালো প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সেই সুস্পষ্ট আশ্বাসের পর সংসদে উপস্থিত সরকারি এবং বিরোধী দলের প্রায় সব সদস্য বিপুল উৎসাহে টেবিল চাপড়ে বিষয়টিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। সেই সংসদীয় প্রতিশ্রুতিরই চূড়ান্ত আইনি প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে বর্তমান সংশোধনী অধ্যাদেশের বিধানাবলির মাধ্যমে।
তবে সরকারের এই উদ্যোগ নিয়ে সুধীসমাজ ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাগুলোর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এবং কিছু সুস্পষ্ট শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। অনেকেই সমালোচনা করে বলছেন যে, কেবল বিএনপি সরকারের সমর্থক ও দলীয় ঠিকাদাররা যেন কোনো ধরনের আইনি বাধা ছাড়াই খুব সহজে সরকারি কেনাকাটা এবং বিশাল অঙ্কের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন, মূলত তা নিশ্চিত করতেই একপ্রকার তড়িঘড়ি করে এমন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এই আইনি পরিবর্তনের সামগ্রিক বিষয়ের ওপর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। তিনি মনে করেন, সংশ্লিষ্ট কাজের ক্ষেত্রে যদি নতুন কোনো দরদাতার প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা এবং ন্যূনতম অভিজ্ঞতা থাকে এবং তিনি যদি নির্ধারিত কারিগরি শর্তাবলি যথাযথভাবে পূরণ করতে পারেন, তবে অভিজ্ঞতা ও টার্নওভারের শর্ত শিথিলের এই বিধানটিকে অবশ্যই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা যেতে পারে। নতুনরা সুযোগ পেলে বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের মনোপলি বা একচেটিয়া ব্যবসার অবসান ঘটবে।
কিন্তু মুদ্রার উল্টো পিঠের ভয়ংকর বিপদের কথাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে সতর্ক করে বলেছেন যে, যদি পর্যাপ্ত ও প্রাসঙ্গিক কারিগরি জ্ঞান এবং ন্যূনতম অভিজ্ঞতা নিশ্চিত না করেই কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করে কাউকে বড় কোনো কাজ দেওয়া হয়, তবে তা রাষ্ট্রের জন্য বুমেরাং হতে পারে। অপর্যাপ্ত জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার একটি বিশাল ঝুঁকি এই নতুন সংশোধনীতে থেকে যায় বলে তিনি গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। এর ফলে সরকারি অর্থের বিশাল অপচয়, প্রকল্পের কাজে নিম্নমান এবং দীর্ঘসূত্রতার মতো ভয়াবহ সমস্যাগুলো জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কার্যাদেশের জটিলতা বিবেচনা করে ক্রয়কারী সংস্থাকে যে ‘বিশেষ শর্ত’ আরোপ করার একচেটিয়া ক্ষমতা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, সে বিষয়ে চরম সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। কারণ, এই বিশেষ শর্তের ধারাটিকে সুকৌশলে ব্যবহার করে ক্রয়কারী কর্মকর্তারা তাদের পছন্দের বা রাজনৈতিকভাবে আশীর্বাদপুষ্ট নির্দিষ্ট কোনো ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য একই ধরনের পক্ষপাতিত্বের সুযোগ তৈরি করতে পারেন, যা উন্মুক্ত দরপত্রের মূল উদ্দেশ্যকেই মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে।
আইনের এই মৌলিক ও ব্যাপক সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকার যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে, তার স্বচ্ছতা নিয়েও গভীর উদ্বেগ ও হতাশা প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। ড. ইফতেখারুজ্জামান সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পিপিএ আইনের বিভিন্ন অসংগতি দূর করার জন্য সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনেরা বা স্টেকহোল্ডাররা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন যৌক্তিক সুপারিশ করে আসছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত বিস্ময়ের বিষয় হলো, আইনটি চূড়ান্তভাবে সংশোধনের আগে সরকার কোনো ধরনের উন্মুক্ত আলোচনা বা সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের এই প্রক্রিয়ায় বিন্দুমাত্র যুক্ত করেনি। সম্পূর্ণ একতরফাভাবে এবং একপ্রকার তড়িঘড়ি করে এই সংশোধনী অধ্যাদেশটি পাস করা হচ্ছে বলে টিআইবি মনে করছে। একটি রাষ্ট্রের কেনাকাটার মতো এত বড় ও সংবেদনশীল খাতের আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় এমন গোপনীয়তা ও তাড়াহুড়ো স্বাভাবিকভাবেই এই আইনি উদ্যোগের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন ও গভীর উদ্বেগের জন্ম দেয়।
পরিশেষে এটি নিঃসন্দেহে বলা যায় যে, সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনয়ন এবং গতানুগতিক সিন্ডিকেট প্রথা ভাঙার যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার পিপিএ আইনে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, তার প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে এর মাঠপর্যায়ের সৎ ও নিরপেক্ষ প্রয়োগের ওপর। অভিজ্ঞতা ও মূলধনের শর্ত শিথিল করার মাধ্যমে নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য যে অবারিত সুযোগ তৈরি হচ্ছে, তা নিঃসন্দেহে দেশের অর্থনৈতিক প্রসারে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক পদক্ষেপ। কিন্তু এই সুযোগ যেন কেবল রাজনৈতিক পরিচয়ধারীদের পকেট ভারী করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়, সেদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সার্বক্ষণিক ও কড়া নজর রাখতে হবে। কাজের গুণগত মান ঠিক রেখে, প্রকৃত মেধা ও কারিগরি যোগ্যতার ভিত্তিতে যদি নতুন ঠিকাদারদের কাজের সমান সুযোগ দেওয়া যায়, তবেই কেবল আইন সংশোধনের এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটি একটি সফল ও জনকল্যাণমুখী পদক্ষেপ হিসেবে ইতিহাসে মূল্যায়িত হবে। অন্যথায়, এক সিন্ডিকেটের পতন ঘটিয়ে শুধু ভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের নতুন কোনো সিন্ডিকেটের উত্থান ঘটলে রাষ্ট্রের সীমিত সম্পদের অপচয় বন্ধ করা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।