শিরোনামঃ
সরকারের বড় সাফল্য স্বাস্থ্য খাতের ওপর নির্ভর করছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী ৮১তম জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী উচ্চশিক্ষার আড়ালে নীরব মেধাপাচার: বিদেশ গিয়ে আর ফেরেন না শিক্ষকরা জ্বালানির দাম বাড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না: জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী তৃণমূলের আধিপত্য বিস্তারে মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত হাসপাতাল ঘুরতে ঘুরতে চলেই গেল ছোট্ট তনুশ্রী বেরিয়ে এলো অপ্রতিম হত্যার আসল কারণ আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা: এমপি নজরুল ৪ ও প্রথম স্ত্রী ১ দিনের রিমান্ডে ইট’স অ্যান অর্ডার ‘নিজেকে শেষ করার’ আগে চিরকুটে কষ্টের কথা লিখে গেছেন মরিয়ম
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:০১ পূর্বাহ্ন

তৃণমূলের আধিপত্য বিস্তারে মুখোমুখি বিএনপি ও জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন একটি নতুন এবং অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনীতির মাঠ পুনরায় সরগরম হয়ে উঠেছে। আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচনগুলোতে মূলত লড়াইটা হতে যাচ্ছে ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বর্তমান সময়ের প্রধান বিরোধী শক্তি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। নির্বাচনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীকের বাইরে অর্থাৎ নির্দলীয় কাঠামোর অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘোষণা দেওয়া হলেও, বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একে কোনোভাবেই রাজনীতিমুক্ত বা প্রভাবমুক্ত বলার সুযোগ নেই। কারণ, এই নির্বাচনে যারা প্রার্থী হচ্ছেন বা হবেন, তারা সবাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমর্থনপুষ্ট স্থানীয় নেতা। ফলে এবারের স্থানীয় নির্বাচন নিছক কোনো জনপ্রতিনিধি বাছাইয়ের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকছে না; বরং এটি হয়ে উঠছে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক সক্ষমতা, তৃণমূলের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণের এক অলিখিত ও চূড়ান্ত পরীক্ষা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দলীয় প্রতীক না থাকলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের সরাসরি হস্তক্ষেপ ও কৌশলগত পরিচালনা অত্যন্ত দৃশ্যমান। উভয় দলই নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিটি পদে দলের পক্ষ থেকে একজন মাত্র একক প্রার্থী দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই একক প্রার্থীর বিজয় নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে মূলত দলগুলো প্রমাণ করতে চায় যে, প্রান্তিক পর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক চেইন অব কমান্ড কতটা শক্তিশালী। বর্তমান ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপির সামনে এই নির্বাচনটি একাধারে একটি বড় সুযোগ এবং অন্যদিকে একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ। সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করলেও, দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকারকে বেশ কিছু কাঠামোগত ও প্রশাসনিক চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে গ্যাস, বিদ্যুৎ, সারের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় উপাদানগুলোর সরবরাহ সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন না হওয়ার মতো বিষয়গুলো সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি করেছে। বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী স্বাভাবিকভাবেই ক্ষমতাসীনদের এই দুর্বল দিকগুলোকে কাজে লাগিয়ে জনমত নিজেদের পক্ষে টেনে আনার সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাবে। এমন একটি অস্থিতিশীল ও চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় ধরনের জয় তুলে আনতে না পারলে তা ক্ষমতাসীন বিএনপির জন্য কেবল অস্বস্তিকরই হবে না, বরং দীর্ঘমেয়াদে তা তাদের রাজনৈতিক সুনামের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই উপলব্ধি থেকেই বিএনপি অনেক আগেভাগেই মাঠের রাজনীতি গুছিয়ে আনতে এবং নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণ করতে সর্বাত্মক প্রস্তুতি শুরু করেছে।
বিএনপির জন্য এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজ দলের ভেতরের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের ছড়াছড়ি। দীর্ঘদিন পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়ায় প্রায় প্রতিটি ইউনিয়ন ও উপজেলাতেই বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য ও শক্তিশালী প্রার্থী মাঠে নেমে পড়েছেন। নির্বাচন নিয়ে স্থানীয় নেতাদের এই ব্যাপক আগ্রহ দলের জন্য ইতিবাচক হলেও, তা সামলাতে গিয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ একাধিক দলীয় প্রার্থী একই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে দলের নিজস্ব ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি থাকে, যার সরাসরি সুবিধা পাবে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। শুধু তাই নয়, ভোটের মাঠে নিজ দলের নেতাদের এই রেষারেষি নির্বাচনের পরেও স্থানীয় সংগঠনে দীর্ঘস্থায়ী বিভক্তি ও তিক্ততা তৈরি করতে পারে। তৃণমূল পর্যায়ের এই বিভাজন সামগ্রিকভাবে ক্ষমতাসীন দলের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে দলের নীতিনির্ধারকরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
এই চরম বাস্তবতাকে সামনে রেখে দলের ঐক্য ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায় থেকে অত্যন্ত কঠোর বার্তা দেওয়া হচ্ছে। দলের চেয়ারম্যান এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে এই স্থানীয় নির্বাচনের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে তদারকি করছেন। একক ও সর্বসম্মত প্রার্থী চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে তিনি দফায় দফায় তৃণমূলের নেতাদের সঙ্গে সরাসরি ধারাবাহিক বৈঠক করে চলেছেন। এসব বৈঠকে দলের হাইকমান্ড থেকে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে যে, তৃণমূলের সাধারণ নেতাকর্মীদের মতামত, প্রার্থীর অতীত রাজনৈতিক ত্যাগ এবং স্থানীয় পর্যায়ে তার ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করেই দলের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত সমর্থন দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিটি বৈঠকে এই মর্মে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছেন যে, দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অমান্য করে কেউ যদি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেন, তবে তার বিরুদ্ধে আজীবনের জন্য বহিষ্কারের মতো চরম সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও গণমাধ্যমের কাছে এই একই কঠোর অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলের সমর্থন কেবল একজনের প্রতিই থাকবে এবং শৃঙ্খলা ভঙ্গকারীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না। এর পাশাপাশি, ক্ষমতাসীন দল হিসেবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজন করাও বিএনপির জন্য সুশাসনের একটি বড় অগ্নিপরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং সুশৃঙ্খলভাবে তাদের নির্বাচনি প্রস্তুতি এগিয়ে নিচ্ছে। ক্ষমতাসীন বিএনপির তুলনায় তারা অনেক আগেভাগেই তাদের প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শুরু করে দিয়েছে এবং সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করছে। জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের সাম্প্রতিক বক্তব্য থেকে দলটির এই নিবিড় প্রস্তুতির বিষয়টি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। তিনি জানিয়েছেন যে, ইউনিয়ন পর্যায় থেকে শুরু করে জেলা, উপজেলা এবং সিটি করপোরেশন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরেই তাদের দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। জামায়াতের জন্য এবারের স্থানীয় নির্বাচনটি কেবল কয়েকটি পদ দখলের লড়াই নয়; বরং এটি দীর্ঘ বৈরী পরিস্থিতি পার করে তৃণমূলে নিজেদের একটি শক্তিশালী, বিকল্প ও নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করার এক সুবর্ণ সুযোগ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে নিজেদের যে রাজনৈতিক ওজন তৈরি হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে তারা সেটিরই একটি শক্ত ভিত্তি বা বৈধতা দাঁড় করাতে চাইছে।
এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর কৌশলগত একটি বড় দিক হলো, তারা কোনো জোট বা অন্য কোনো দলের ওপর নির্ভর না করে সম্পূর্ণ নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে নির্বাচনি বৈতরণী পার হতে চাইছে। নিজেদের প্রকৃত শক্তি যাচাই করার জন্য এটি তাদের একটি অত্যন্ত সাহসী ও সময়োপযোগী পদক্ষেপ। দলটির আরেকটি উল্লেখযোগ্য কৌশল হলো তরুণ ও নতুন নেতৃত্বকে সামনে নিয়ে আসা। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন এবং গুরুত্বপূর্ণ উপজেলাগুলোতে তারা নবীন, শিক্ষিত এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির তরুণ প্রার্থীদের ওপর বেশি আস্থা রাখছে। জামায়াতের সাংগঠনিক কাঠামো এমনিতেই অত্যন্ত সুশৃঙ্খল এবং ক্যাডারভিত্তিক। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা থাকার পর তারা এখন নতুন উদ্যমে কর্মীদের প্রশিক্ষণ, দেশব্যাপী সাংগঠনিক সফর এবং নিবিড় জনসংযোগের মাধ্যমে নিজেদের নতুন করে গুছিয়ে নিয়েছে। তাদের এই নীরব কিন্তু শক্তিশালী প্রস্তুতি ক্ষমতাসীনদের জন্য ভোটের মাঠে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে বলে মনে করা হচ্ছে।
সার্বিক বিশ্লেষণে এটি অত্যন্ত স্পষ্ট যে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনটি কেবল কে কতগুলো পদ পেল বা কে চেয়ারম্যান কিংবা মেয়র নির্বাচিত হলো, তার হিসাব-নিকাশের মধ্যে একেবারেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি আসলে একটি আদর্শিক এবং কাঠামোগত লড়াই। এই নির্বাচনে প্রমাণিত হবে কোন দল তাদের তৃণমূলের নেতাদের সবচেয়ে বেশি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়েছে। প্রমাণিত হবে বিদ্রোহী প্রার্থীদের সামলে নিয়ে কারা দলীয় শৃঙ্খলা অটুট রাখতে পেরেছে। একই সঙ্গে সাধারণ ভোটারদের মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের সঙ্গে কারা সবচেয়ে বেশি নিবিড় ও কার্যকর যোগাযোগ স্থাপন করতে পেরেছে, তারও চূড়ান্ত রায় পাওয়া যাবে এই নির্বাচনের মাধ্যমে। বিএনপির জন্য এটি যেমন ক্ষমতা সুসংহত করার এবং সুশাসন প্রমাণের লড়াই, তেমনি জামায়াতের জন্য এটি তৃণমূল থেকে উঠে এসে নিজেদের একচ্ছত্র বিরোধী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আগামী দিনের জাতীয় রাজনীতির গতিপথ, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক রূপরেখা কেমন হবে, তার একটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও অকাট্য পূর্বাভাস পাওয়া যাবে আসন্ন এই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফলাফলের মধ্য দিয়ে।


এ জাতীয় আরো খবর...