মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমানের পরীক্ষায় সাফল্যের হাসি হাসলেও পরবর্তী ধাপে পা বাড়ানোর আগেই থমকে গেছে দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন| চলতি বছর এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও একাদশ শ্রেণিতে কলেজ বা মাদ্রাসায় ভর্তির কোনো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই যুক্ত নেই সোয়া দুই লাখের বেশি শিক্ষার্থী| শিক্ষাঙ্গনের পরিসংখ্যান বলছে, গত চার বছরের মধ্যে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চসংখ্যক শিক্ষার্থীর ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে থাকার ঘটনা| সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে থাকা এই বিশাল অংশের মধ্যে পৌনে ২ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য ন্যূনতম আবেদনটুকুও করেনি| সাফল্যের সঙ্গে মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনো মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ২১ শতাংশ এবার কলেজজীবনের শুরুতেই ছিটকে পড়েছে| সহজ অঙ্কে হিসাব করলে দেখা যায়, এ বছর এসএসসি পাস করা প্রতি পাঁচজন শিক্ষার্থীর মধ্যে একজন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির দৌড় থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রয়েছে| ঝরে পড়ার এই প্রবল শঙ্কাকে কিছুটা হলেও প্রশমিত করতে এবং বাদ পড়া শিক্ষার্থীদের আরও একটি সুযোগ দিতে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের তরফ থেকে দ্বিতীয় দফায় অনলাইনে আবেদন গ্রহণের বিশেষ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে| তবে দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা মনে করছেন, শুধু সুযোগ দিলেই হবে না, বরং এই বিশালসংখ্যক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে চিরতরে ঝরে পড়ার যে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তার মূল কারণগুলো অনুসন্ধান করা জরুরি|
এবারের একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সার্বিক চিত্র ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে| দেশের হাতে গোনা কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেমন রাজধানীর নটর ডেম কলেজ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ভর্তি পরীক্ষা নিলেও, বাকি সব কলেজ ও মাদ্রাসার ভর্তি কার্যক্রম ঢাকা বোর্ডের অধীনে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কারিগরি সহায়তায় কেন্দ্রীয়ভাবে অনলাইনে সম্পন্ন হয়| কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের ভর্তি প্রক্রিয়া এর বাইরে থাকে| এ বছর ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ড এবং মাদ্রাসা ও কারিগরি বোর্ড মিলিয়ে মোট ১১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৯৫ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে| কিন্তু এদের মধ্যে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কেন্দ্রীয় অনলাইন প্রক্রিয়ায় আবেদন করেছে মাত্র ৮ লাখ ৩৪ হাজার ৭১৮ জন শিক্ষার্থী| পাস করা অথচ আবেদন না করা ৩ লাখ ৯ হাজার ৯৭৭ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরি বোর্ডের অধীনে থাকা ৭৪ হাজার ৪৭০ জন শিক্ষার্থীকে বাদ দিলে, সাধারণ কলেজ ও মাদ্রাসায় ভর্তির প্রক্রিয়ার বাইরে থাকা শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যা দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭০ জনে| এদের মধ্যে ১ লাখ ৮৮ হাজার ১১৬ জন শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য কোনো আবেদনই করেনি, আর ৪৭ হাজার ৪৫৪ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের ভর্তি নিশ্চয়ন করেনি|
এই পরিসংখ্যানের সবচেয়ে হতাশার দিকটি হলো মেধাবী শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া| সাধারণ ধারণায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তির বিষয়ে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবতা ভিন্ন| ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সব মিলিয়ে মোট ১ লাখ ১৯ হাজার ৪৬৩ জন মেধাবী শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ অর্জন করেছে| অথচ চরম বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এই সর্বোচ্চ ফলাফলধারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১১ হাজার ৫৩৫ জন একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য কোনো আবেদনই করেনি| এর বাইরে আরও ২ হাজার ২০৫ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ভর্তির আবেদন করেও তাদের পছন্দের কোনো কলেজে সুযোগ পায়নি| এত ভালো ফলাফল করার পরও শিক্ষাজীবনের এই গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে এসে তাদের এই অনুপস্থিতি দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়|
একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির প্রক্রিয়ার বাইরে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর এই অবস্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং বিগত বছরগুলোর পরিসংখ্যান ঘাঁটলে এটি একটি ধারাবাহিক চিত্র হিসেবেই ধরা দেয়| গত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছরই পাস করা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে| গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড থেকে মোট ১৩ লাখ ৮ হাজার ২১৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করেছিল, যার মধ্যে কারিগরির ১ লাখ ১ হাজার ৭৫৭ জনকে বাদ দিলে সাধারণ ধারায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২৫ জন শিক্ষার্থী ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে ছিল| ২০২৪ সালে এই সংখ্যাটি ছিল রীতিমতো ভয়াবহ, সে বছর ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন পাস করা শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরির অংশ বাদ দিয়ে মোট ২ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৪ জন ভর্তিপ্রক্রিয়ার বাইরে থেকে যায়, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ| এর আগে ২০২৩ সালেও ১৬ লাখ ৪১ হাজার ১৪০ জন পাস করা শিক্ষার্থীর মধ্যে কারিগরির অংশ বাদে ২ লাখ ২৮ হাজার ৪৫২ জন একাদশে ভর্তির কোনো প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়নি|
তবে ভর্তিপ্রক্রিয়ায় অংশ না নেওয়া মানেই যে সব শিক্ষার্থী পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, এমনটা মানতে নারাজ শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তারা| ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান এই বিষয়ে নিজের একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন| তিনি মনে করেন, নানা পারিপার্শ্বিক ও পদ্ধতিগত কারণে শিক্ষার্থীদের এই বিশাল অংশটি ভর্তির আবেদন করেনি| তার ধারণা অনুযায়ী, এদের একটি বড় অংশ হয়তো ডিপ্লোমা, নার্সিং বা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটগুলোতে নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজবে| বোর্ড সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কর্মকর্তারাও বলছেন যে, এদের একটি অংশ কারিগরি বা বিশেষায়িত মাদ্রাসাশিক্ষায় যুক্ত হতে পারে| এছাড়া আর্থিক সচ্ছলতা থাকা অনেক পরিবারের সন্তান বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়া, ইংরেজি মাধ্যমে যুক্ত হওয়া বা অন্য কোনো বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে পারে| তবে তারা এ কথাও স্বীকার করেন যে, চরম আর্থিক অনটন এবং পারিবারিক সংকটের কারণে অসংখ্য শিক্ষার্থী এই পর্যায়ে এসে চিরতরে পড়াশোনা বন্ধ করে দিতেও বাধ্য হয়|
শিক্ষার্থীদের এই নীরব ঝরে পড়া নিয়ে দেশের শিক্ষাবিদরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক মোহাম্মদ মজিবুর রহমান এই পরিস্থিতিকে দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় অশনিসংকেত বলে মনে করেন| তিনি মনে করেন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর মাধ্যমিক পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া কিংবা পাস করার পরও কলেজে ভর্তি হতে না পারাটা অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি বিষয়| এই সমস্যার গভীরতা উপলব্ধি করে সরকারের উচিত অবিলম্বে দেশব্যাপী বিস্তারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা এবং এই ঝরে পড়া রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা| অন্যদিকে, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ এই ঝরে পড়ার পেছনের আর্থসামাজিক কারণগুলোর ওপর বেশি আলোকপাত করেছেন| তার সুচিন্তিত মত অনুযায়ী, আমাদের সমাজব্যবস্থায় বাল্যবিবাহ, চরম দারিদ্র্য, পরিবারের উপার্জনমুখী হওয়ার চাপ এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে কাজ করে| একাদশে ভর্তির প্রক্রিয়ায় না থাকার পেছনেও এই কারণগুলোই সবচেয়ে বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন|
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আসন সংকট যে এই ঝরে পড়ার কারণ নয়, তা আসনসংখ্যার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায়| বর্তমানে দেশের ৮ হাজার ১৮১টি কলেজ ও মাদ্রাসায় একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির জন্য মোট আসন রয়েছে ২৬ লাখ ১ হাজার ৭৭৯টি| এই বিপুলসংখ্যক আসনের বিপরীতে প্রথম ও দ্বিতীয় ধাপ মিলিয়ে এ পর্যন্ত মাত্র ৮ লাখ ৫৩ হাজার ৪৪১ জন শিক্ষার্থীর ভর্তি চূড়ান্ত বা নিশ্চয়ন হয়েছে| অর্থাৎ, বিপুলসংখ্যক আসন ফাঁকা পড়ে থাকলেও শিক্ষার্থীরা সেই সুযোগ গ্রহণ করতে পারছে না বা করছে না| ইতিমধ্যে একাদশ শ্রেণিতে নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের মূল ভর্তি কার্যক্রম গত রোববার থেকে শুরু হয়ে মঙ্গলবার পর্যন্ত চলেছে এবং আগামীকাল ২৪ সেপ্টেম্বর থেকে একাদশ শ্রেণির আনুষ্ঠানিক ক্লাস শুরু হতে যাচ্ছে|
এমতাবস্থায়, যেসব শিক্ষার্থী এখনো একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির সুযোগ পায়নি বা আবেদন করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাদের শিক্ষাজীবন রক্ষার্থে বাংলাদেশ আন্তশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটি দ্বিতীয় দফায় অনলাইন আবেদনের একটি জরুরি সুযোগ প্রদান করেছে| গত সোমবার প্রকাশিত এক জরুরি বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে যে, আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই দ্বিতীয় দফার আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে এবং তা ২৮ সেপ্টেম্বর রাত ৮টা পর্যন্ত চলমান থাকবে| এই দফায় আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের ফলাফল প্রকাশ করা হবে আগামী ১ অক্টোবর রাত ৮টায়| ফলাফল প্রকাশের পর নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের ৩ অক্টোবর রাত ৮টার মধ্যে তাদের ভর্তি নিশ্চয়ন করতে হবে| নির্ধারিত এই সময়ের মধ্যে কোনো শিক্ষার্থী ভর্তি নিশ্চয়ন করতে ব্যর্থ হলে তার আবেদন ও নির্বাচন চূড়ান্তভাবে বাতিল বলে গণ্য হবে| শিক্ষাবিদদের মতে, এই দ্বিতীয় দফার সুযোগটি কিছু শিক্ষার্থীর জন্য আশীর্বাদ হলেও, যারা আর্থিক বা সামাজিক কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে, তাদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনতে হলে রাষ্ট্রকে আরও অনেক বেশি উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে|