শিরোনামঃ
এমপি নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর আত্মহত্যা, সেই মামা ওবায়দুর কারাগারে সাবেক ৭ এমপির বিরুদ্ধে দুদকের মামলা, ৩ জনকে সম্পদ বিবরণীর নোটিশ মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর প্রাতরাশ বৈঠক পোশাক খাতের সমস্যা সমাধানে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান রাষ্ট্রপতির জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে ট্রাম্পের সঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কুশল বিনিময় তুরস্কের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক আরও জোরদারের প্রত্যয় মার্কিন প্রেসিডেন্টের নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ রাষ্ট্রপতির সঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমুদ্রের তলদেশে আটকা ১,৫০০ কোটি টাকার বিনিয়োগ মবের শিকার হাজার শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না
বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৫৩ পূর্বাহ্ন

মবের শিকার হাজার শিক্ষক কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চব্বিশের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের শিক্ষাঙ্গনে যে অরাজক পরিস্থিতি ও ‘মব জাস্টিস’-এর জঘন্য সংস্কৃতি শুরু হয়েছিল, দুই বছর পার হলেও তার বিষাক্ত রেশ আজও কাটেনি | রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল, কতিপয় উচ্ছৃঙ্খল শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের উসকে দিয়ে সারা দেশের অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যে নারকীয় তাণ্ডব চালিয়েছিল, তার শিকার হয়ে আজও নিজ কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি হাজারেরও বেশি শিক্ষক | শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) অথবা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ কোনো তালিকা না থাকলেও ভুক্তভোগীদের সংগঠনগুলো বলছে, অপমান আর লাঞ্ছনার শিকার হয়ে আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষক আজ মানবেতর জীবনযাপন করছেন | সরকারি কর্মকর্তাদের বিভিন্ন সময়ের বক্তব্যেও উঠে এসেছে যে, বিগত দুই বছরে দুই হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষককে জোরপূর্বক সরিয়ে দেওয়া হয়েছে |

 

বরিশালের গৌরনদী উপজেলার শরিকল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক কণিকা মুখার্জীর কথাই ধরা যাক | ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তিনি যখন শ্রেণিকক্ষে মনোযোগ দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ একদল উচ্ছৃঙ্খল মব সেখানে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে | সাধারণ শিক্ষার্থীদের বের করে দিয়ে তারা এই জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের ওপর চরম মানসিক নির্যাতন চালায় এবং অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে পদত্যাগে বাধ্য করার চেষ্টা করে | সেদিন স্থানীয় এক ব্যক্তির সহায়তায় কোনোমতে প্রাণ নিয়ে ফিরলেও পরবর্তীতে তিনি আর নিজের প্রিয় কর্মস্থলে শান্তিতে কাজ করতে পারেননি | রাজধানীর সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজেও ঘটেছিল ঠিক একই ধরনের ন্যাক্কারজনক ঘটনা | ২০২৪ সালের ১১ আগস্ট প্রতিষ্ঠানটির সাবেক কিছু শিক্ষার্থী ও কতিপয় স্বার্থান্বেষী শিক্ষকের ইন্ধনে অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী এবং সহকারী অধ্যাপক ডক্টর ফারহানা খানমকে দীর্ঘ সময় অবরুদ্ধ রেখে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা হয় | পরবর্তীতে তারা নিজেদের সম্মান ফিরে পেতে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হলেও, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের করা আপিলের কারণে আজও নিজেদের আইনসঙ্গত পদে ফিরতে পারেননি |

 

ঢাকার ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার ২০২৩ সালে শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানপ্রধান হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন | অথচ ৫ আগস্টের পর প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ফেরাতে গিয়ে তিনি কতিপয় প্রাইভেট-কোচিংনির্ভর শিক্ষকের রোষানলে পড়েন | এর জের ধরে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ১৫ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল মিরপুরে তার নিজ বাসভবনে গিয়ে রীতিমতো জিম্মি করে তার পদত্যাগপত্রে জোরপূর্বক স্বাক্ষর আদায় করে নেয় | রাজধানীর কাফরুল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাম্মী আক্তার এবং বাড্ডার আব্দুল খালেক মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আয়শা আক্তারের ক্ষেত্রেও জোরজবরদস্তি ও চরম হেনস্তার মাধ্যমে পদত্যাগ করানোর অভিযোগ রয়েছে | এমনকি চট্টগ্রামের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি শিক্ষা বোর্ডের বৈধ চিঠি নিয়ে নিজ কর্মস্থলে যোগ দিতে গেলেও তাকে শারীরিকভাবে ধাক্কাধাক্কি করে বের করে দেওয়া হয়, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল |

 

‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশের প্রায় দুই হাজার স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান নানাভাবে হেনস্তা, শারীরিক লাঞ্ছনা এবং জোরপূর্বক পদত্যাগের শিকার হয়েছেন | এই অমানবিক নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচ শতাধিক শিক্ষক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন | সবচেয়ে মর্মান্তিক ও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, শারীরিক ও মানসিক এই চরম আঘাত সইতে না পেরে অন্তত চারজন শিক্ষকের অকাল মৃত্যু হয়েছে | তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রামের হাজেরা তজু ডিগ্রি কলেজের উপাধ্যক্ষ এসএম আইয়ুব, দোহারের জয়পাড়া সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক এএসএম আব্দুল খালেক, বগুড়ার সারিয়াাকান্দির দুর্গাহাটা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম শফিক এবং ফেনীর সাউথ ইস্ট কলেজের অধ্যক্ষ পরমেশ চন্দ্র | জয়পাড়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক স্কুল থেকে বিতাড়িত হওয়ার পর চরম হতাশায় ভুগে ২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন |

 

চাকরি হারিয়ে এই শিক্ষকরা শুধু সামাজিক সম্মানই হারাননি, চরম অর্থনৈতিক সংকটের মুখেও নিপতিত হয়েছেন | এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বেতন ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের (ইএফটি) মাধ্যমে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে যায় | কিন্তু জোরপূর্বক পদত্যাগের পর স্থানীয় চক্রগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাদের অনুপস্থিত দেখিয়ে রিপোর্ট পাঠানোয় একসময় তাদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় | পুরান ঢাকার এক ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক আক্ষেপ করে জানান, অর্থের অভাবে তিনি নিজের মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠান পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন | নিজের হাতে তিল তিল করে গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠান থেকে অপমানিত হয়ে বের হয়ে আসার কষ্ট আর অর্থনৈতিক দৈন্যদশা মিলে অনেক শিক্ষক আজ বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্বলটুকুও হারিয়ে ফেলেছেন | অন্যদিকে, তাদের সরিয়ে দিয়ে সেই জায়গাগুলোতে দখলদার চক্র নিজেদের পছন্দের লোকদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে বসিয়ে আর্থিকভাবে ব্যাপক লাভবান হচ্ছে |

 

শিক্ষা মন্ত্রণালয় গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল | সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করতে হবে এবং সেই তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বন্ধ করা যাবে না | অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাদের সসম্মানে চাকরিতে পুনর্বহাল করতে হবে | কিন্তু চরম সত্য হলো, মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনার সামান্যতম তোয়াক্কা করছে না তৃণমূলের দখলদার চক্রগুলো | মাউশির মহাপরিচালক অধ্যাপক ডক্টর খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেলও স্বীকার করেছেন যে, জোরপূর্বক পদত্যাগ কোনোভাবেই আইনি বৈধতা পায় না | এরই মধ্যে গত ১৩ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, ভয়ভীতি দেখিয়ে বা জোর করে নেওয়া পদত্যাগপত্রের কোনো আইনি ভিত্তি নেই | আদালত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের স্বপদে পুনর্বহালের নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি, এই নির্দেশ অমান্য করলে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়াসহ কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেছেন |

 

আদালত ও মন্ত্রণালয়ের কড়া নির্দেশনার পরও মাঠপর্যায়ের চিত্র বদলায়নি | সমকালের এক নিবিড় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, শুধু ঢাকা জেলাতেই দুই শতাধিক শিক্ষক এ ধরনের মব জাস্টিসের শিকার হয়েছেন | বগুড়া জেলায় ২৭ জন প্রতিষ্ঠানপ্রধান হেনস্তার শিকার হন, যার মধ্যে ১১ জন আজও ফিরতে পারেননি | সিরাজগঞ্জে আদালতের নির্দেশ থাকার পরও লুৎফর রহমানের মতো অধ্যক্ষরা গত দুই বছর ধরে ক্যাম্পাসে ঢুকতে পারছেন না | টাঙ্গাইল, নারায়ণগঞ্জ, নাটোর, মৌলভীবাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় একই নৈরাজ্যকর চিত্র বিরাজ করছে | সাতটি জেলার ৬৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৬৬ জন ভুক্তভোগী শিক্ষকের মধ্যে ৪৫ জন আজও তাদের প্রিয় কর্মস্থলের বাইরে অবস্থান করতে বাধ্য হচ্ছেন |

 

শিক্ষকদের ওপর এই ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত নিপীড়ন সমগ্র জাতির জন্য চরম লজ্জাজনক বলে মনে করছেন দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা | ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, একজন শিক্ষককে প্রকাশ্যে অপমান করার অর্থ হলো পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে চরমভাবে অপমান করা | যদি কারও বিরুদ্ধে কোনো সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ থাকে, তবে তা রাষ্ট্রীয় প্রচলিত আইনে বিচার হতে পারে, কিন্তু উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে লেলিয়ে দিয়ে অপমান করা কোনো সভ্য সমাজের লক্ষণ হতে পারে না | শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরীর মতে, এই নজিরবিহীন ঘটনাগুলোর কারণে শিক্ষক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে যে গভীর আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে, তা সহজে দূর হওয়ার নয় | পেশাগত মর্যাদা, নিরাপত্তা ও আর্থিক নিশ্চয়তা ফিরে পেতে শিক্ষকদের আজ যে রাস্তায় নামতে হচ্ছে, তা স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এক বড় কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবেই বিবেচিত হবে | অবিলম্বে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর ও দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ না করলে শিক্ষাঙ্গনের এই দগদগে ক্ষত কোনোদিনই শুকাবে না |

 

তথ্যসূত্র: সমকাল


এ জাতীয় আরো খবর...