শিরোনামঃ
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু বিরোধীদল প্রধানমন্ত্রীকে অশোভনভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছে: রিজভী বিএনপি জনগণের সরকার, জনগণের কল্যাণে সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সনদের পাশাপাশি বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করতে হবে : শ্রমমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমন্বিত উদ্যোগে নৌ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে: নৌপরিবহন মন্ত্রী বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর আত্মহত্যায় প্ররোচনা: এমপি গাজী নজরুলের ফের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর ৫২ সহকারী কমিশনারকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৮ পূর্বাহ্ন

ডেন-৩ ভ্যারিয়েন্টের দাপট: দীর্ঘ হচ্ছে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর মিছিল

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু জ্বর| চলতি বছরে ডেঙ্গু পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ এবং নিয়ন্ত্রণহীন রূপ ধারণ করেছে, তা কেবল বিগত কয়েক মাসের পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে| বছরের প্রথম আট মাসে ডেঙ্গুতে যত মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, তার চেয়ে ঢের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে কেবল সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৩ দিনেই| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও ছয়জন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে| এই নতুন ছয়জনের মৃত্যুসহ ২০২৬ সালে ডেঙ্গুতে মোট প্রাণহানির সংখ্যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২০১ জনে| বিস্ময়কর এবং চরম উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত দীর্ঘ আট মাসে যেখানে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৯৭ জন, সেখানে সেপ্টেম্বরের মাত্র ২৩ দিনেই ডেঙ্গু কেড়ে নিয়েছে ১০৪ জনের অমূল্য প্রাণ| হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে যত মানুষ মারা গেছেন, তার ৫২ শতাংশেরও বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে শুধুমাত্র এই একটি মাসেই|
সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী ধারা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ডেঙ্গুর বিস্তার এখন আর কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আবদ্ধ নেই| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত দৈনিক ডেঙ্গু পরিস্থিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নতুন করে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী| প্রতিদিন এত বিপুলসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে ছুটে আসার ফলে চলতি বছরে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা একলাফে ৬৭ হাজার ৩৬৭ জনে গিয়ে পৌঁছেছে| মাসভিত্তিক সংক্রমণের দিকে দৃষ্টি দিলে পরিস্থিতি যে কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়| শুধুমাত্র সেপ্টেম্বরের এই ২৩ দিনেই হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ৩১ হাজার ৫২১ জন রোগী| এই সংখ্যাটি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত রোগীর প্রায় ৪৭ শতাংশ| এর আগে আগস্ট মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন ২০ হাজার ৫৩৬ জন, জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জন, জুনে ২ হাজার ৯০৭ জন এবং মে মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৭১৪ জন| পরিসংখ্যানের এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ আগস্ট মাসের তুলনায় প্রায় ১১ হাজার বেশি এবং জুলাই মাসের তুলনায় তা তিন গুণেরও বেশি আকার ধারণ করেছে|
বছরের প্রথম ছয় মাসের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, ডেঙ্গু পরিস্থিতি তখন অনেকটাই স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল| জানুয়ারি থেকে জুন মাস পর্যন্ত সারা দেশে মোট ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ১০৪ জনের কাছাকাছি| কিন্তু জুলাই মাস থেকে দেশে মৌসুমী বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বাড়তে থাকায় চারদিকে পানি জমতে শুরু করে, যা এডিস মশার প্রজননের জন্য এক আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে দেয়| আর এর ফলেই জুলাই মাস থেকে ডেঙ্গু সংক্রমণ জ্যামিতিক হারে বাড়তে শুরু করে| জুলাই মাসে ৯ হাজারের বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার পর আগস্ট মাসে তা এক ধাক্কায় দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে ২০ হাজারের ঘর ছাড়িয়ে যায়| তবে আগস্টের সেই ভয়াবহতাকেও হার মানিয়েছে সেপ্টেম্বর মাস| আগস্টে যেখানে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৪৩ জন, সেখানে সেপ্টেম্বরের ২৩ দিনেই সেই সংখ্যা ১০৪ জনে গিয়ে ঠেকেছে| অর্থাৎ, আগস্টের তুলনায় সেপ্টেম্বরে দ্বিগুণেরও বেশি মানুষ ডেঙ্গুর কাছে হার মেনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন| স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২৬ সালের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে আগস্ট মাসটি ছিল মূলত একটি বড় টার্নিং পয়েন্ট, যেখান থেকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে| আর এর ধারাবাহিকতায় সেপ্টেম্বর মাসটি বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী এবং ভয়ংকর মাস হিসেবে ইতিমধ্যে তার রেকর্ড গড়ে ফেলেছে, যদিও এই মাস শেষ হতে এখনো এক সপ্তাহের বেশি সময় বাকি রয়েছে|
মৃত্যু ও সংক্রমণের ভৌগোলিক বিস্তৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকা এখনো ডেঙ্গুর মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে অবস্থান করছে| তবে এর পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিভাগীয় শহর ও জেলাগুলোতেও ডেঙ্গুর প্রাণঘাতী প্রভাব চরম মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে| চলতি বছরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালগুলোতে| সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এ পর্যন্ত ৬১ জন রোগী মারা গেছেন| এরপরই রয়েছে খুলনা বিভাগ, যেখানে ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে| এছাড়া ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ২৪ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২১ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১৯ জন, বরিশাল বিভাগে ১৬ জন এবং রাজশাহী বিভাগে ১০ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে| এই মৃত্যুর পরিসংখ্যান থেকে একটি বিষয় অত্যন্ত পরিষ্কার যে, ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীর ভেতরেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোতেও এর বিস্তৃতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে|
গত ২৪ ঘণ্টার সংক্রমণের হিসাব ঘাঁটলে ঢাকার বাইরের এই ভয়াবহতার চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে| এই সময়ের মধ্যে ঢাকা বিভাগের বাইরে মোট ৪০৫ জন রোগী ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন| এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ৩১৭ জন, খুলনা বিভাগে ২৮০ জন, বরিশাল বিভাগে ১৭৮ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৫৬ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১১৩ জন, রংপুর বিভাগে ৫৯ জন এবং সিলেট বিভাগে আটজন নতুন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন| বছরের মোট হিসাব বিবেচনা করলেও রাজধানীর বাইরের বিভাগগুলোতে আক্রান্তের সংখ্যা রীতিমতো চমকে ওঠার মতো| এ পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ১১ হাজার ৬০ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ৯ হাজার ৭৫৩ জন, বরিশাল বিভাগে ৯ হাজার ২১১ জন এবং সিটি করপোরেশন এলাকার বাইরে ঢাকা বিভাগের অন্যান্য অঞ্চলগুলোতে ১১ হাজার ৪৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন|
ডেঙ্গু সংক্রমণের ক্ষেত্রে বয়সভিত্তিক বিশ্লেষণ আমাদের সামনে এক নতুন ও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে| পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীই এবারের ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত ও মৃত্যুর শিকার হচ্ছেন| সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছেন ২১ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণেরা, যাদের সংখ্যা ৯ হাজার ৭৪৯ জন| এর ঠিক পরেই রয়েছেন ২৬ থেকে ৩০ বছর বয়সীরা, যাদের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ৬৩২ জন| এছাড়া ১৬ থেকে ২০ বছর বয়সী রোগীদের মধ্যেও ৯ হাজার ১৬৬ জন আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে| সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, মৃত্যুর ক্ষেত্রেও ২৬ থেকে ৪০ বছর বয়সী কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি| পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিদের এই অকাল মৃত্যু শুধু একটি পরিবারকেই পথে বসাচ্ছে না, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও এক বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে|
সারা দেশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর দিকে তাকালে ডেঙ্গু রোগীদের উপচে পড়া ভিড় চোখে পড়ে| গত ২৪ ঘণ্টায় অবশ্য ১ হাজার ৫৫৭ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন| এ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৬২ হাজার ১১৭ জন মানুষ ডেঙ্গুকে জয় করে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন| তবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে এখনো ৫ হাজার ৪৯ জন ডেঙ্গু রোগী শয্যাশায়ী অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন| স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে প্রতিদিনই হাসপাতালে নতুন রোগীর চাপ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় ডেঙ্গু রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যাগুলোর ওপর এক নজিরবিহীন চাপ তৈরি হয়েছে|
এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতিতে রোগীদের শারীরিক জটিলতার ধরনও আগের বছরগুলোর তুলনায় কিছুটা ভিন্ন এবং মারাত্মক| সম্প্রতি ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাটি এর একটি বড় উদাহরণ| ওই কিশোরের প্রথম তিন দিন প্রচণ্ড জ্বর ছিল, যা ১০১ থেকে ১০৩ ডিগ্রির মধ্যে ওঠানামা করত| তিন দিন পর হঠাৎ করেই তার জ্বর সম্পূর্ণ কমে যায় এবং রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রাও বাড়তে শুরু করে| সাধারণত এই পর্যায়ে এসে রোগীরা স্বস্তি বোধ করেন, কিন্তু ওই কিশোরের ক্ষেত্রে দেখা দেয় ভিন্ন এক জটিলতা| পরীক্ষা করে চিকিৎসক জানান যে, ডেঙ্গুর প্রভাবে ছেলেটির পেটে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে গেছে| এরপর টানা সাত দিন শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করার পর অবশেষে ছেলেটি সুস্থ হয়ে ওঠে| ছেলেটির বাবার ভাষ্যমতে, ওই চিকিৎসকের কাছে আসা আরও বেশ কয়েকজন ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রেও পেটে পানি জমার এই একই ধরনের উপসর্গ দেখা গিয়েছিল, যা পরবর্তীতে সঠিক ওষুধের মাধ্যমে নিরাময় সম্ভব হয়|
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) এক নিবিড় গবেষণায় উঠে এসেছে ডেঙ্গুর ভ্যারিয়েন্ট বা ধরন পরিবর্তনের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য| প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সারা দেশে ডেঙ্গুর ‘ডেন-৩’ ধরনে সবচেয়ে বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন| ঢাকা এবং এর আশপাশের ১৭টি জেলায় আইইডিসিআর যে বিস্তারিত জরিপ চালিয়েছে, তাতে দেখা গেছে এই অঞ্চলগুলোর প্রায় ৯০ শতাংশ ডেঙ্গু রোগীই ডেন-৩ ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত| অন্যদিকে, ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলাগুলোতে যে জরিপ চালানো হয়েছে, সেখানে ডেঙ্গুর ডেন-২ এবং ডেন-৩ ধরন দুটির উপস্থিতি প্রায় সমান সমান পাওয়া গেছে|
আইইডিসিআর চলতি বছর দেশের চারটি ভিন্ন ভিন্ন জেলা—বান্দরবান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বরগুনা ও পিরোজপুরে একটি বিশেষ জরিপ পরিচালনা করে| এই জরিপের মূল উদ্দেশ্য ছিল ডেঙ্গুর স্থানীয় সংক্রমণ (লোকাল ট্রান্সমিশন) কীভাবে ঘটছে, স্থানভেদে সংক্রমণের কারণগুলো কী, ডেঙ্গুর সামগ্রিক প্রাদুর্ভাব কেমন এবং ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার মূল উৎপত্তিস্থল বা প্রজননক্ষেত্রগুলো ঠিক কোথায় গড়ে উঠছে, তা বিস্তারিতভাবে অনুসন্ধান করা| আইইডিসিআরের পরিচালক ডা. কাজী আহমেদ জাকী এই জরিপের ফলাফল তুলে ধরে জানান যে, তাদের কার্যক্রম এখনো চলমান রয়েছে এবং এই চার জেলায় তারা সম্পূর্ণ ভিন্ন চার ধরনের পরিস্থিতি লক্ষ করেছেন| স্থানভেদে এডিস মশার উৎপত্তিস্থলেও ব্যাপক বৈচিত্র্য দেখা গেছে| যেমন, পার্বত্য জেলা বান্দরবানে মানুষের বাসাবাড়ির নিচে ফেলে রাখা কৃত্রিম পানির পাত্র বা আর্টিফিশিয়াল ওয়াটার পটগুলোতে এডিস মশার লার্ভা সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে| অন্যদিকে, বরগুনা বা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলাগুলোতে ডেঙ্গুর অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে বিশাল আকারের সুপারি বাগানগুলো| সুপারি গাছের গোড়ায় বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে সেখানে ব্যাপক হারে এডিস মশা বংশবিস্তার করছে| আবার উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোতে বাসাবাড়ির গার্হস্থ্য বর্জ্য বা ডমেস্টিক ওয়েস্ট, বিশেষ করে ডাবের বা নারিকেলের ফেলে দেওয়া খোসায় জমে থাকা পানিতে মশার প্রজনন সবচেয়ে বেশি হচ্ছে| মশা নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন অঞ্চলে ঠিক কোন বিষয়টির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে, আইইডিসিআর তাদের জরিপের মাধ্যমে তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দিয়েছে|
ডা. কাজী আহমেদ জাকী আরও বিস্তারিত জানিয়ে বলেন, ডেঙ্গু রোগ সরাসরি একজন মানুষের শরীর থেকে অন্য মানুষের শরীরে ছড়ায় না| এটি ছড়ানোর একমাত্র মাধ্যম হলো এডিস মশা| তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র ও প্রধান উপায় হলো মশা নিয়ন্ত্রণ করা| মশা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হলে ডেঙ্গু প্রাকৃতিকভাবেই নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে| তিনি ডেঙ্গুর ভ্যারিয়েন্টগুলোর বিস্তৃতি সম্পর্কে জানান যে, দেশের পার্বত্য ও দক্ষিণাঞ্চলে ডেন-২ ভ্যারিয়েন্টের প্রাদুর্ভাব তুলনামূলকভাবে কিছুটা বেশি| অন্যদিকে ঢাকা শহরের ভেতরে এবং পিরোজপুর জেলার কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় ডেন-৩ ভ্যারিয়েন্টের আধিপত্য চলছে| বর্তমানে দেশজুড়ে ডেন-২ এবং ডেন-৩—এই দুটি ধরনই সক্রিয় রয়েছে, তবে সার্বিকভাবে ডেন-৩ ভ্যারিয়েন্টের দাপটই এবার সবচেয়ে বেশি|
ডেঙ্গু কাদের জন্য সবচেয়ে বেশি মৃত্যুঝুঁকি তৈরি করতে পারে, সে বিষয়ে ডা. জাকী এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা প্রদান করেন| তিনি বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি অতীতে ডেঙ্গুর একটি নির্দিষ্ট ধরনে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তবে পরবর্তী সময়ে অন্য কোনো ধরনে আক্রান্ত হলে তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ার শঙ্কা থাকে| উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি আগে ডেন-৩ তে আক্রান্ত হয়ে থাকেন এবং এবার যদি তাকে ডেন-২ আক্রমণ করে, তবে তার ডেঙ্গু শকে (Dengue Shock Syndrome) চলে যাওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে| এই ক্রস-ইনফেকশন বা ভিন্ন ভ্যারিয়েন্টের আক্রমণই এবারের ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে|
বিশেষজ্ঞরা গভীর উদ্বেগের সাথে লক্ষ করছেন যে, বর্তমান সময়ে জ্বর হলে অনেকেই এটিকে সাধারণ সিজনাল জ্বর ভেবে চরম অবহেলা করছেন এবং সময়মতো ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে চাইছেন না| ডেঙ্গুর গতিপ্রকৃতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনো অনেক ভুল ধারণা রয়ে গেছে| অনেকেই মনে করেন, জ্বর একবার কমে গেলেই হয়তো আর কোনো বিপদের আশঙ্কা নেই| অথচ চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, জ্বর ছেড়ে যাওয়ার পরবর্তী সময়টাই ডেঙ্গু রোগীর জন্য সবচেয়ে ক্রিটিক্যাল বা ঝুঁকিপূর্ণ| এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেকেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে দেরি করে ফেলেন| বিশেষজ্ঞরা জোরালোভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন যে, ডেঙ্গুর ধরন সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারলে এবং সেই অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা প্রটোকল অনুসরণ করতে পারলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ঝুঁকি বহুগুণ কমিয়ে আনা সম্ভব|
চিকিৎসকদের পক্ষ থেকে ডা. কাজী আহমেদ জাকী সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেন, জ্বর আসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই প্রত্যেককে বাধ্যতামূলকভাবে ডেঙ্গু টেস্ট করাতে হবে| ডেঙ্গু পজিটিভ হওয়ার সাথে সাথেই কোনো কালক্ষেপণ না করে রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা শুরু করতে হবে| তিনি কঠোরভাবে সতর্ক করে দেন যে, ডেঙ্গু হলে কোনো অবস্থাতেই টোটকা চিকিৎসা, হাতুড়ে বিদ্যা বা ঘরে বসে অপ্রচলিত কোনো চিকিৎসাপদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে না| সরকারের দেওয়া ন্যাশনাল ডেঙ্গু গাইডলাইন অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা নিলে ডেঙ্গু-পরবর্তী জটিলতাগুলো মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে না এবং রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যায়| সবশেষে, ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান কিছুটা আশার বাণী শুনিয়ে বলেন যে, এ বছর মোট আক্রান্ত রোগীর সংখ্যার তুলনায় মৃত্যুর শতকরা হার আগের বছরগুলোর চেয়ে কিছুটা কম| পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং দেশের প্রতিটি হাসপাতালে সরকারি গাইডলাইন অনুযায়ী ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসাসেবা প্রদান নিশ্চিত করা হচ্ছে|
তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর


এ জাতীয় আরো খবর...