শিরোনামঃ
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু বিরোধীদল প্রধানমন্ত্রীকে অশোভনভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছে: রিজভী বিএনপি জনগণের সরকার, জনগণের কল্যাণে সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সনদের পাশাপাশি বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করতে হবে : শ্রমমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমন্বিত উদ্যোগে নৌ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে: নৌপরিবহন মন্ত্রী বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর আত্মহত্যায় প্ররোচনা: এমপি গাজী নজরুলের ফের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর ৫২ সহকারী কমিশনারকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন

ভাড়ার চার্ট নেই, বাসে বাসে নৈরাজ্য

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১৫ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

 

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণার পর থেকেই দেশের পরিবহন খাতে এক নজিরবিহীন ও চরম অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে পরিবহন মালিকদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শেষে বাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ১৭ পয়সা হারে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই বিষয়ে সরকারের তরফ থেকে প্রজ্ঞাপনও জারি করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এখন পর্যন্ত রুটভিত্তিক নতুন ভাড়ার কোনো পূর্ণাঙ্গ তালিকা বা চার্ট প্রকাশ করতে পারেনি। আর ঠিক এই প্রশাসনিক দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতার সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা। গত রোববার মধ্যরাতে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ঘোষণা আসার পরদিন সকাল থেকেই দেশজুড়ে প্রায় প্রতিটি রুটে পরিবহন কোম্পানিগুলো নিজেদের খেয়ালখুশিমতো ভাড়া আদায় শুরু করে দিয়েছে। রাজধানী ঢাকার অভ্যন্তরীণ রুট থেকে শুরু করে দূরপাল্লার প্রতিটি বাসে যাত্রীদের পকেট কেটে অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এক মহোৎসব চলছে। বিআরটিএ-এর ভাড়ার তালিকা বা চার্ট বাসের ভেতরে দৃশ্যমান না থাকায় সাধারণ যাত্রীরা জানতে পারছেন না সরকার অনুমোদিত প্রকৃত ভাড়া আসলে কত। ফলে প্রতিটি বাসে, মোড়ে মোড়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের তীব্র বচসা, হাতাহাতি এবং চরম অপ্রীতিকর ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি হিসাব ও প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরে চলাচলকারী অভ্যন্তরীণ বাসগুলোর ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৫৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে আন্তজেলা ও দূরপাল্লার বাস এবং মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ২৩ পয়সা থেকে সামান্য বাড়িয়ে ২ টাকা ৪০ পয়সা করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকা ও চট্টগ্রাম মহানগরের মিনিবাস এবং ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) আওতাধীন পার্শ্ববর্তী জেলাগুলো যেমন—নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, নরসিংদী, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জের অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচলকারী বাস ও মিনিবাসের ভাড়া প্রতি কিলোমিটারে ২ টাকা ৪৩ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২ টাকা ৬০ পয়সা করা হয়েছে। মহানগরীতে বাস ও মিনিবাসের সর্বনিম্ন ভাড়া যথাক্রমে ১০ ও ৮ টাকা নির্ধারণ করা হলেও, রাজপথের নির্মম বাস্তবতা হলো এই সর্বনিম্ন ভাড়ার কোনো অস্তিত্বই এখন আর নেই। রাজধানীর বিভিন্ন চিরচেনা রুট ঘুরে দেখা গেছে, যে দূরত্বের জন্য আগে ১০ টাকা ভাড়া দেওয়া হতো, সেখানে এখন জোরপূর্বক ১৫ থেকে ২০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। আর ২০ টাকার ভাড়া একলাফে বাড়িয়ে ৩০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। অর্থাৎ, স্থান ও সুযোগ বুঝে পরিবহন শ্রমিকেরা ভাড়া ৫০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন। চালকেরা তেলের দাম বাড়ার ঠুনকো অজুহাত দেখালেও যাত্রীদের চাওয়ার বিপরীতে তারা অনুমোদিত ভাড়ার কোনো তালিকা প্রদর্শন করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছেন।
প্রতিদিনের যাতায়াতে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। সাভার থেকে রাজধানীর টেকনিক্যাল এলাকায় নিয়মিত যাতায়াতকারী এক ভুক্তভোগী যাত্রী ফারজানা আহমেদ তার তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন যে, মাত্র দুদিন আগেও তাকে এই নির্দিষ্ট দূরত্বের জন্য ২০ টাকা ভাড়া গুনতে হতো, কিন্তু এখন কোনো কারণ ছাড়াই তার কাছ থেকে ৩০ টাকা আদায় করা হচ্ছে। সোমবার সকাল থেকেই বাসের কন্ডাক্টররা এই বাড়তি ভাড়া নেওয়া শুরু করেছেন বলে তিনি জানান। ফারজানার মতে, দূরত্বের হিসাব কষলে ভাড়াবৃদ্ধির এই হার কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিকদেরও রয়েছে নিজস্ব সাফাই। ওয়েলকাম পরিবহনের চালক মো. তুহিন মিয়া এ বিষয়ে খোলামেলাভাবেই নিজের অসহায়ত্ব ও মালিকপক্ষের নির্দেশের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তেলের দাম বেড়েছে, তাই বাড়তি ভাড়া নেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো উপায় খোলা নেই। সরকার এখনো নতুন ভাড়ার চার্ট সরবরাহ করেনি বিধায় মালিকেরা যেভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা ঠিক সেভাবেই যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় করছেন।
নগর পরিবহনের চেয়ে দূরপাল্লার বাসগুলোতে ভাড়ার নৈরাজ্য আরও ভয়াবহ ও লুণ্ঠনমূলক রূপ ধারণ করেছে। গন্তব্য ও রুটভেদে দূরপাল্লার যাত্রীদের কাছ থেকে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২০০ টাকারও বেশি বাড়তি ভাড়া জোরপূর্বক আদায় করা হচ্ছে। সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে চুয়াডাঙ্গা রুটে চলাচলকারী রয়েল পরিবহনের নন-এসি বাসে আগের ৭০০ টাকার ভাড়া এখন ৮০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। একই রুটের এসি বাসের ভাড়া ৮০০ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করা হয়েছে। রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল থেকে কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর রুটে আগে যেখানে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা নেওয়া হতো, এখন বাস ও রুটভেদে সেই ভাড়া ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। সরকারি নিখুঁত হিসাব অনুযায়ী ঢাকা-রংপুর রুটের ভাড়া ৭১৫ টাকা থেকে বেড়ে ৭৬৭ টাকা হওয়ার কথা। অথচ বিভিন্ন পরিবহন কোম্পানি যাত্রীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। ঢাকা-খুলনা রুটেও সরকারি হিসাবে ৫৮২ টাকার ভাড়া বেড়ে ৬২১ টাকা হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নেওয়ার বিস্তর অভিযোগ পাওয়া গেছে। পর্যটন নগরী ঢাকা-কক্সবাজার রুটে আগে যেখানে ৯০০ টাকা নেওয়া হতো, এখন সেখানে বিভিন্ন বাসে ১ হাজার ১৫০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত গলাকাটা ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। চুয়াডাঙ্গা রুটের রয়েল পরিবহনের সায়েদাবাদ কাউন্টারের মাস্টার ইয়ারুল ইসলাম অকপটে স্বীকার করেছেন যে তেলের দাম বাড়ার কারণে বুধবার থেকেই তারা ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। নন-এসি বাসে আগের চেয়ে ১০০ টাকা এবং এসি বাসে ২০০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান। তবে এই বর্ধিত ভাড়া সরকার-নির্ধারিত হারের সঙ্গে আদৌ সংগতিপূর্ণ কি না বা এটি কোন গাণিতিক নিয়মে সমন্বয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি। এমনকি তাদের কাউন্টারে রুটভিত্তিক ভাড়ার কোনো সরকারি তালিকাও ঝোলানো ছিল না।
ঢাকার বাইরের অন্যান্য জেলা শহরগুলোতে খোঁজ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রায় অভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। ফরিদপুর থেকে ঢাকাগামী বিভিন্ন বাসে ৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। ঝিনাইদহ-ঢাকা রুটে ৫০ থেকে ১০০ টাকা এবং চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার রুটে ১০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম থেকে দক্ষিণাঞ্চলগামী বিভিন্ন দূরপাল্লার বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত ১০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যাত্রীদের পক্ষ থেকে, যদিও বাসের চালক ও সহকারীরা চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী তা অস্বীকার করেছেন। রাজশাহী-ঢাকা রুটের একটি লোকাল বাসে ৬০০ টাকার ভাড়া বাড়িয়ে ৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে, অথচ সরকারি হিসাবে এই রুটে ভাড়া বৃদ্ধির পরিমাণ সর্বোচ্চ ৫০ টাকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকার কথা। মৌলভীবাজার-ঢাকা রুটে ৫৮০ টাকার ভাড়া করা হয়েছে ৬৫০ টাকা। চা-বাগান অধ্যুষিত শ্রীমঙ্গল-সিলেট রুটেও নির্ধারিত হারের চেয়ে অনেক বেশি ভাড়া নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পটুয়াখালী থেকে ঢাকাগামী বাসে ৫০ টাকা বাড়িয়ে ভাড়া নেওয়ার কথা নির্দ্বিধায় জানিয়েছে পরিবহন কর্তৃপক্ষ। সাকুরা পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার রাতুল জানান, ঢাকা রুটের ভাড়া সমন্বয়ের নির্দেশনা পাওয়ার পর আগের ভাড়ার সঙ্গে ৫০ টাকা যোগ করে বর্তমানে যাত্রীপ্রতি ৭৫০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। তবে সাধারণ যাত্রীদের অভিযোগ, নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করে কোনো কোনো বাসের কাউন্টারে ১০০ টাকা পর্যন্ত বেশি নেওয়া হচ্ছে। শিহাব উদ্দিন নামের এক ক্ষুব্ধ যাত্রী জানান, সব কাউন্টারে এক নিয়ম মানা হচ্ছে না, যে যার মতো করে যাত্রীদের জিম্মি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
রাজশাহীতে অবশ্য সার্বিক নৈরাজ্যের মাঝেও কিছুটা মিশ্র ও ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। শিরোইল বাস টার্মিনালে ন্যাশনাল ট্রাভেলস, শ্যামলী পরিবহন, দেশ ট্রাভেলসসহ বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টারে নতুন ভাড়ার কোনো চার্ট পাওয়া যায়নি ঠিকই, তবে ন্যাশনাল ট্রাভেলসে রাজশাহী-ঢাকা রুটের নন-এসি বাসে আগের মতোই ৭৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছিল। তবে তাদের বিজনেস ক্লাস এসি বাসের ভাড়া ১০০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৪০০ টাকা করা হয়েছে। আবার ইকোনমিক ক্লাসের এসি বাসে আগের ৯৫০ টাকাই বহাল রাখা হয়েছে। শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার এনামূল হক জানান, নতুন চার্ট না আসায় তারা রাজশাহী-ঢাকা নন-এসি বাসে আগের ৭৩০ টাকা এবং বিজনেস ক্লাস এসি বাসে ১ হাজার ৩০০ টাকা নিচ্ছেন।
দূরপাল্লার যাতায়াতে এসি বাসের ভাড়ার ক্ষেত্রে এক চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। নিয়ম অনুযায়ী এসি বাসের ভাড়া সরকার সরাসরি নির্ধারণ করে দেয় না। বাসের ধরন, আসনসংখ্যা, সেবার মান ও পরিবহন কোম্পানির নিজস্ব নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে ভাড়ার তারতম্য হয়ে থাকে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার পর এই সুযোগটি পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে অনেক পরিবহন মালিক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত এসি বাসের ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছেন। যাত্রীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ হলো, এসি বাসের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে কোনো স্বচ্ছ ও সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো না থাকায় একই রুটে একই ধরনের বাসেও পরিবহনভেদে ভাড়ার বিশাল পার্থক্য পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুম নিজেদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, প্রতিটি এসি বাসের মান ও সুযোগ-সুবিধায় অনেক পার্থক্য থাকে, তাই সবার জন্য একই হারে নির্দিষ্ট ভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত বা ঠিক হবে না।
বাসের পাশাপাশি দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতেও ভাড়ার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। বাসভাড়া বৃদ্ধির পরপরই সরকারপক্ষ ও মালিকদের প্রতিনিধির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনার পর লঞ্চের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রথম ১০০ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত প্রতি কিলোমিটারে ২৩ পয়সা এবং ১০০ কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ২০ পয়সা হারে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি নৌপথে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে লঞ্চমালিকদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গণমাধ্যমের কাছে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, দেশের সাধারণ যাত্রীদের ওপর আর্থিক চাপ যথাসম্ভব কমাতে সর্বনিম্ন পর্যায়ে ভাড়া বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়েছে। মন্ত্রী বলেন, ভাড়া বাড়ানো কোনো পক্ষের জন্যই কাম্য নয়, তবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে এর একটি অনিবার্য প্রভাব কোনো না কোনোভাবে পরিবহন খাতের ওপর পড়বেই। লঞ্চমালিকদের নানাবিধ দাবিদাওয়া থাকলেও ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমেই ভাড়া বৃদ্ধির এই পরিমাণ সর্বনিম্ন পর্যায়ে রাখা সম্ভব হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। নৌপথে সাধারণত সর্বনিম্ন দূরত্ব ১০ কিলোমিটার ধরে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়, আর সেই হিসাব মতেই সর্বনিম্ন ভাড়া ৩৫ টাকা করা হয়েছে। তবে বাসের মতো লঞ্চেও যাত্রীদের সঙ্গে কর্মীদের বাগবিতণ্ডা চলছে।
এই সার্বিক পরিবহন সংকটের মধ্যে একমাত্র ব্যতিক্রম হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র পরিচালিত বাংলাদেশ রেলওয়ে। ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হতে পারে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম অত্যন্ত ইতিবাচক বার্তা দিয়ে বলেন যে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। বরং ভাড়া না বাড়িয়েই উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি মনে করিয়ে দেন যে গতবার যখন বিশ্ববাজারে ও দেশে ডিজেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল, তখনও সাধারণ মানুষের কথা ভেবে রেলের ভাড়া এক পয়সাও বাড়ানো হয়নি। প্রায় এক দশক ধরে দেশের রেলের ভাড়া অপরিবর্তিত রয়েছে। এবার জ্বালানির দাম আরও একদফা বাড়ায় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ওপর নিঃসন্দেহে একটি বিশাল আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে। তারপরও জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকার এখনো রেলের ভাড়া বাড়ানোর মতো কোনো কঠোর সিদ্ধান্তে উপনীত হয়নি। মন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন যেন তারা সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে হলেও বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। পরিবহন খাতের ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে যাত্রী ও পরিবহনমালিক উভয়ের স্বার্থ সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও তিনি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন এবং বলেন যে ন্যায্যতার জায়গা থেকে সবার অধিকার বিবেচনা করলে যেকোনো সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।
এদিকে বিআরটিএ-এর রুট পারমিট শাখার সহকারী পরিচালক মুহাম্মদ মোরশেদুল আলম ভাড়ার চার্ট প্রকাশের বিলম্ব নিয়ে আশ্বস্ত করে বলেছেন যে দ্রুতই বাসের ভাড়ার বিস্তারিত তালিকা ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে। মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কাজী মো. জোবায়ের মাসুমও স্বীকার করেছেন যে তালিকা প্রকাশে দেরি হলে যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক এবং এই সুযোগে কতিপয় অসাধু পরিবহনকর্মী বাড়তি ভাড়া নেওয়ার সুযোগ পেতে পারে। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই বিলম্বের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, রুটভিত্তিক ভাড়ার তালিকা প্রকাশে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত দেরির কারণেই প্রতিবছর মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং পরিবহনগুলো যে যার মতো বাড়তি ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সর্বস্বান্ত করে। হয়রানি বন্ধ করতে তিনি জ্বালানি তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভাড়া সংশোধনের একটি আধুনিক ও ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর জোর দাবি জানান। সবশেষে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে নির্ধারিত ভাড়া আদায় হচ্ছে কি না, তা সরকার কঠোর নজরদারিতে রেখেছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা


এ জাতীয় আরো খবর...