শিরোনামঃ
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনে ৫ প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৮ জনের মৃত্যু বিরোধীদল প্রধানমন্ত্রীকে অশোভনভাবে আক্রমণ করে বক্তব্য দিচ্ছে: রিজভী বিএনপি জনগণের সরকার, জনগণের কল্যাণে সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে : স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের সনদের পাশাপাশি বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জন করতে হবে : শ্রমমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশন ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল প্রতিনিধি দলের সৌজন্য সাক্ষাৎ সমন্বিত উদ্যোগে নৌ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে: নৌপরিবহন মন্ত্রী বাংলাদেশ ও রাশিয়ার মধ্যে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর আত্মহত্যায় প্ররোচনা: এমপি গাজী নজরুলের ফের ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর ৫২ সহকারী কমিশনারকে ভূমি মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:৪৭ পূর্বাহ্ন

প্রশাসন বদলালেও বহাল তবিয়তে ঘুষের রাজত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৬ বার
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে সেবাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে অর্থ আদায়ের এক অলিখিত নিয়ম যেন বর্তমানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে | সরকার পরিবর্তন, প্রশাসনে সংস্কারের নানা প্রতিশ্রুতি এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বারবার বলা হলেও মাঠপর্যায়ের চিত্র একেবারেই ভিন্ন | ভূমি অফিস, পুলিশ, বিআরটিএ, হাসপাতাল থেকে শুরু করে সাব-রেজিস্ট্রি কিংবা কর অফিস—কোথাও অতিরিক্ত টাকা ছাড়া সেবামূলক কাজ এগোচ্ছে না | অনেক সময় সরকারি ফি এক হাজার টাকা হলেও সেবাপ্রার্থীর কাছ থেকে নির্লজ্জভাবে পঞ্চাশ থেকে সত্তর হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করা হচ্ছে | এই ভয়াবহ পরিস্থিতির বাস্তবতা খোদ রাষ্ট্রের শীর্ষ দুই অভিভাবকের বক্তব্যেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে | রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার কিছুদিন আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে ঘুষ ও দুর্নীতির কোনো পরিবর্তন হয়নি, সবকিছু আগের মতোই চলছে | অন্যদিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও একধাপ এগিয়ে মন্তব্য করেছেন যে সরকারি অধিকাংশ কর্মকর্তাই চোর | রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসা এমন অকাট্য ও বিস্ফোরক মন্তব্যের পর ঘুষ সংস্কৃতির শিকড় কতটা গভীরে পৌঁছেছে, তা নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকে না |
ঘুষ লেনদেনের সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেবা সংস্থাগুলোর নগ্ন চিত্র জনসমক্ষে উন্মোচিত হয় | গত ১৮ সেপ্টেম্বর শ্রম আপিল ট্রাইব্যুনালের একটি ভিডিওতে খোদ রেজিস্ট্রার, পিয়ন এবং নিরাপত্তাকর্মীকে প্রকাশ্যে ঘুষ নিতে দেখা যায় | এর ঠিক দুদিন আগে, ১৬ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীতে এক তহশিলদার একটি সাধারণ নামজারির জন্য ৭০ হাজার টাকা দাবি করেন, যেখানে সরকারি খরচ মাত্র ১ হাজার ১৫০ টাকা | একই দিনে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খবিরুল আলমের একটি ঘুষ গ্রহণের ভিডিও ভাইরাল হয় | ওই কর্মকর্তা নতুন ভোটার নিবন্ধনের কাজ করে দেওয়ার জন্য এক সেবাপ্রার্থীর কাছে পাঁচ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন | দরকষাকষির পর দুই হাজার টাকা নগদ দেওয়ার দৃশ্যটি ওই সেবাপ্রার্থী গোপনে ভিডিও করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেন | এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং প্রতিটি সরকারি দপ্তরের নিত্যদিনের স্বাভাবিক চিত্র হিসেবেই মানুষ এসব অনিয়মকে একপ্রকার বাধ্য হয়েই মেনে নিচ্ছে |
মানুষের এই অসহায়ত্ব ও হয়রানির বাস্তব চিত্র ফুটে উঠেছে ‘ঘুষ.সাইট’ নামক একটি নাগরিক অভিযোগের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে | এই ওয়েবসাইটটি তৈরির পেছনের গল্পটি আরও বেশি মর্মান্তিক ও দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার এক করুণ উদাহরণ | ময়মনসিংহের এক পরিবারের এক সদস্যের মৃত্যুর পর তার প্রভিডেন্ট ফান্ডের মাত্র ৭ লাখ টাকা তুলতে ট্রেজারি অফিস ও জেলা-উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে ধাপে ধাপে ৩৮ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয় | শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্য আরও ৮ লাখ টাকা তুলতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আবারও ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন | টাকা না দিলে ফাইলের কাজ এগোবে না বলে তাদের সরাসরি হুমকি দেওয়া হয় | পাওনা টাকা তুলতেও এই সীমাহীন হয়রানির শিকার হয়ে ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ মানুষের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার জন্য ‘ঘুষ.সাইট’ তৈরি করেন | ওয়েবসাইটটি চালুর পর থেকে মাত্র ৩৩ দিনে সেখানে ১৯ হাজার ১২৮টি অভিযোগ জমা পড়েছে | এসব অভিযোগে ভুক্তভোগীদের কাছে মোট ৫৫২ কোটি ৫৬ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করার তথ্য উঠে এসেছে | পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ঢাকা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি ৭ হাজার ৫০১টি অভিযোগ জমা পড়েছে, যেখানে সর্বোচ্চ ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ চাওয়ার রেকর্ড রয়েছে এবং গড় অঙ্ক প্রায় ২ লাখ ৮৯ হাজার টাকা | এছাড়া চট্টগ্রামে ৪ হাজার ৭০টি, রাজশাহীতে ১ হাজার ৬৫১টি, খুলনায় ১ হাজার ৫০৩টি, রংপুরে ১ হাজার ৩৪৩টি, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২০৮টি, বরিশালে ৯৯৪টি এবং সিলেট বিভাগে ৮৫৮টি অভিযোগ নথিবদ্ধ হয়েছে |
ঘুষ লেনদেনের এই লাগামহীন বিস্তারের চিত্র ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ‘সেবা খাতে দুর্নীতি : জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনেও বিশদভাবে উঠে এসেছে | গত জুনে প্রকাশিত এই জরিপটি দেশের আট বিভাগের শহর ও গ্রামের ১৫ হাজার ৭১৫টি পরিবারের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে | টিআইবির প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জাতীয় পর্যায়ে মোট ঘুষ লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা | এই অংক ২০২৩ সালের তুলনায় ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি এবং এটি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের সংশোধিত জাতীয় বাজেটের ১ দশমিক ৫৮ শতাংশের সমতুল্য | জরিপে অংশগ্রহণকারী ৮৫ শতাংশ ভুক্তভোগী মানুষ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ঘুষ না দিলে তারা কোনোভাবেই প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা পেতেন না | এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সাধারণ মানুষকে কার্যত জিম্মি করেই ঘুষ আদায় করা হচ্ছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর এর অর্থনৈতিক বোঝা সবচেয়ে বেশি চেপে বসছে |
সময়ের সাথে সাথে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান ও ডিজিটাল সেবার পরিধি বাড়লেও দুর্নীতিবাজ চক্রগুলো তাদের ঘুষ আদায়ের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে | আগে সরাসরি সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীর হাতে নগদ অর্থ লেনদেন হলেও এখন ঝুঁকি এড়াতে তারা বিভিন্ন অভিনব পন্থা অবলম্বন করছে | দালাল, মধ্যস্থতাকারী, আত্মীয়স্বজনের ব্যাংক হিসাব কিংবা বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে এখন ঘুষের টাকা হাতবদল হচ্ছে | এমনকি অনেক জায়গায় নির্দিষ্ট সার্ভিস চার্জের আড়ালে এই অবৈধ লেনদেনকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে | কর্মকর্তারা অনেক সময় সেবাপ্রার্থীর ফাইল আটকে রেখে অযথা কাগজপত্রের ঘাটতির কথা বলে সেবা প্রদানে বিলম্ব ঘটিয়ে মানুষকে ঘুষ দিতে বাধ্য করছেন | সরাসরি লেনদেনের প্রমাণ না রাখায় এসব দুর্নীতিবাজদের ধরাও কঠিন হয়ে পড়ছে, ফলে মূল সমস্যার কোনো দৃশ্যমান সমাধান হচ্ছে না |
এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি রোধে প্রশাসনিক ও আইনি সংস্কারের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা | সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার মনে করেন, প্রশাসনের শীর্ষ পদগুলোতে পরিবর্তন আনার মানসিকতা থাকতে হবে এবং সৎ ও সাহসী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে হবে | বড় চেয়ারে বসা কর্মকর্তারা যদি সাহসিকতার সাথে ঘুষখোরদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তবে নিচের স্তরের কর্মীদের মাঝে এমনিতেই ভয় কাজ করবে | অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও দুদকের প্যানেল আইনজীবী শাহীন আহমেদ জানান, দুর্নীতি দমনে শুধু দুদকের একার উদ্যোগ কখনোই যথেষ্ট হতে পারে না | এর জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জিরো টলারেন্স নীতির কঠোর বাস্তবায়ন প্রয়োজন | তিনি স্পষ্ট করে বলেন, শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে দিলেই দুর্নীতি কমবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই, বরং আইনের যথাযথ প্রয়োগ, জবাবদিহি ও শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে | দুদক কেবল তদন্ত করে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব আদালতের | তাই একটি সমন্বিত কাঠামোর মাধ্যমেই এই ব্যাধি দূর করা সম্ভব |
ঘুষ নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও জনমনে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে মনে করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান | তিনি সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে যারা এই অবৈধ লেনদেন বন্ধ করার দায়িত্বে থাকেন, তারাও পরোক্ষভাবে এই ঘুষের ভাগ পান কি না, তা নিয়ে ঘোরতর বিতর্ক রয়েছে | বিচারহীনতা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির অভাবেই সমাজে ঘুষ দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি একটি স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত হয়েছে | অতীতে দুর্নীতি দমন কমিশনের ফাঁদ মামলার মতো পদক্ষেপগুলো কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব ফেললেও বর্তমানে সে ধরনের দৃশ্যমান অভিযান একেবারেই নেই বললেই চলে | সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের দুর্নীতিবাজ কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না, যার ফলে অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় সম্পূর্ণ দূর হয়ে গেছে | টিআইবির পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল যে সরকারি কর্মচারীদের সম্পদের বিবরণী নিয়মিতভাবে প্রকাশ্যে দাখিল করা বাধ্যতামূলক করা উচিত এবং বর্ধিত বেতন-ভাতা পাওয়ার সাথে এই শর্তটি যুক্ত থাকা দরকার | জবাবদিহি ও সম্পদের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এবং দুর্নীতি দমনের আইনি সুযোগগুলো যথাযথভাবে প্রয়োগ না করলে ঘুষের এই ভয়াল থাবা থেকে দেশের সাধারণ মানুষের মুক্তির কোনো সম্ভাবনা নেই |
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন


এ জাতীয় আরো খবর...