একটি শিশুর জন্য পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ স্থান হওয়ার কথা তার নিজের বাড়ি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান | কিন্তু বর্তমান সমাজের এক ভয়ংকর ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, যেসব মানুষের কাছে শিশুদের সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত থাকার কথা, তাদের হাতেই চরম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে অবুঝ শিশুরা | লালমনিরহাট সদর উপজেলার কালমাটি গ্রামের ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর করুণ পরিণতি সমাজের এই পচনশীল রূপটিকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় | সংসারের তীব্র অভাব ঘোচাতে ওই শিশুর মা রাজধানী ঢাকায় গৃহকর্মীর কাজ করেন | আর সেই সুযোগে বাড়িতে সৎবাবার কাছেই দিনের পর দিন পাশবিক যৌন নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে ওই শিশুটিকে | যে বয়সে মায়ের হাত ধরে তার স্কুলে যাওয়ার কথা কিংবা বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার মাঠে মেতে ওঠার কথা, সেই বয়সেই তাকে সহ্য করতে হয়েছে অকল্পনীয় ট্রমা | সম্প্রতি ফোনে মায়ের কাছে নিজের এই নিদারুণ যন্ত্রণার কথা প্রকাশ করে মেয়েটি | দূর শহরে বসে যে মা প্রতিদিন সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবে উদ্বিগ্ন থাকতেন, তার কাছে এই খবর ছিল বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো | তিনি বুঝতে পারেন, যে ঘরটিকে তিনি মেয়ের জন্য নিরাপদ দুর্গ ভেবেছিলেন, সেখানেই তার আদরের সন্তান সবচেয়ে বেশি অনিরাপদ ছিল |
ঘরের চারদেয়ালের ভেতরের এই ভয়ংকর চিত্র শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং এটি সমাজের একটি বিস্তৃত ও নীরব মহামারির ক্ষুদ্র অংশ মাত্র | শিশু নির্যাতনের বড় একটি অংশ ঘটে ঘরের ভেতরেই, যেখানে অপরাধী কোনো অপরিচিত ব্যক্তি নয়, বরং পরিবারের আপন সদস্য, নিকটাত্মীয় কিংবা বিশ্বস্ত কোনো প্রতিবেশী | তবে এর চেয়েও ভয়ংকর বিষয় হলো, যেসব শিক্ষকের হাতে একটি শিশুর প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার কথা, তাদের কাছেও আজ শিশুরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে | পবিত্র শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষকদের হাতে বাজে স্পর্শ, ধর্ষণ এবং বলাৎকারের মতো ঘৃণ্য ঘটনার শিকার হচ্ছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা | খোদ রাজধানীর বুকে স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলিক্রস কলেজের এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ পুরো সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে | অনিমেষ সাহা নামের ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাদশ শ্রেণির এক ছাত্রীর সঙ্গে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং পরবর্তীতে তাকে দিয়ে গর্ভপাত করানোর মতো অত্যন্ত গুরুতর ও ভয়ংকর অভিযোগ উঠেছে | এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আরও অন্তত ২০ জন শিক্ষার্থী ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রলোভন দেখিয়ে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে বাধ্য করার অভিযোগ এনেছেন | এ বিষয়ে অভিযুক্ত শিক্ষকের কোনো বক্তব্য পাওয়া না গেলেও, হলিক্রস কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার শিখা লায়েতিসিয়া গোমেজ জানিয়েছেন যে ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং প্রতিবেদন পাওয়ার পর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে |
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বিকৃতির চিত্র শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও তা ছড়িয়ে পড়েছে | সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নতুনবাজার বহুমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক কামাল উদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও ছাত্রীদের শারীরিকভাবে হেনস্তা করার অভিযোগ সামনে এসেছে | বিদ্যালয়টির অন্তত ২০ জন সাবেক নারী শিক্ষার্থী অভিযোগ করেছেন যে, ক্লাসে পড়া ধরার অজুহাতে ওই শিক্ষক ছাত্রীদের শরীরে আপত্তিকরভাবে হাত দিতেন | শুধু তা-ই নয়, প্রাইভেট পড়ার জন্য ছাত্রীদের ওপর তিনি প্রচণ্ড মানসিক চাপ প্রয়োগ করতেন | প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া, বিনা পারিশ্রমিকে পড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া এবং অভিভাবকদের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করার মতো কাজও তিনি অবলীলায় করেছেন | এক ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী জানান, স্কুল ছুটির পর বান্ধবীদের সঙ্গে প্রাইভেট পড়ার অপেক্ষায় থাকার সময় ওই শিক্ষক তার স্পর্শকাতর স্থানে হাত দেন, যার ট্রমা থেকে বাঁচতে তিনি টানা এক সপ্তাহ স্কুলে যেতে পারেননি | ২০২৪ সালে অবসরে যাওয়া এই শিক্ষক অবশ্য নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে নিজেকে সৎ বলে দাবি করেছেন |
সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও আজ শিশুরা নিরাপদ নয় | লালমনিরহাটের কালমাটি গ্রামের আরেক শিশু মক্তবে পড়তে গিয়ে এক হুজুরের লালসার শিকার হয়েছে | একদিন দুপুরে মসজিদে ওই হুজুরের খাবার নিয়ে গেলে তাকে ভেতরের একটি কক্ষে আটকে যৌন নির্যাতন করা হয় | সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসাতেও শিশু বলাৎকার ও যৌন সহিংসতার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে | গত ৩ আগস্ট চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার দারুসসুন্নাহ খাইরিয়া মাদ্রাসার প্রধান শিক্ষক মুহাম্মদ রমিজ উদ্দীনকে আট বছর বয়সী এক শিশুছাত্রকে একাধিকবার বলাৎকারের অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ | নাজেরা বিভাগের ওই শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে মাদ্রাসার ওয়াশরুমে এবং এতিমখানার হেফজ বিভাগের শ্রেণিকক্ষে নিয়ে বারবার এই ঘৃণ্য কাজ করা হতো | চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাভারের একটি মাদ্রাসার ঘটনা তো রীতিমতো শিউরে ওঠার মতো | সেখানে সাত বছরের এক শিশুকে প্রথমে এক সিনিয়র শিক্ষার্থী এবং পরবর্তীতে আরও তিন শিক্ষার্থী মিলে ধর্ষণ করে | সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, সহপাঠীদের কাছে নির্যাতনের শিকার হয়ে শিশুটি যখন এক শিক্ষকের কাছে আশ্রয় ও নিরাপত্তা চাইতে যায়, তখন সেই শিক্ষকও সুযোগ বুঝে তাকে ধর্ষণ করেন | গত জুনে গোপালগঞ্জেও ছয় বছর বয়সী এক শিশুকে নুরানি বিভাগের শিক্ষকের দ্বারা কয়েক মাস ধরে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে মামলা ও গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া গেছে |
শিশু সুরক্ষার এই চরম বিপর্যয়ের চিত্র বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার পরিসংখ্যানেও স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে | আইন ও সালিশ কেন্দ্রের গবেষণায় দেখা যায়, ২০২০ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে শুধু শিক্ষকদের হাতেই শিক্ষার্থী নির্যাতনের ৯৪৮টি ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ২১১টি ছিল যৌন হয়রানির ঘটনা | অন্যদিকে চাইল্ড রাইটস অ্যাডভোকেসির তথ্যমতে, ২০২০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ১৮ বছরের কম বয়সী শিক্ষার্থীদের ওপর শিক্ষকদের নির্যাতনের ৫৪২টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে, যার মধ্যে ৬৮টি ছিল নারী শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন হয়রানি | এছাড়া ২০২৬ সালের মে মাসে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন এবং ২০২৫ সালের মার্চে খোদ ইউনিসেফ বাংলাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের ওপর বাড়তে থাকা যৌন সহিংসতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল | ভয়, লোকলজ্জা, সামাজিক সম্মানহানি, শিক্ষকের অপরিসীম প্রভাব এবং অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে বেশির ভাগ ভুক্তভোগী শিশুই এসব ঘটনার পর মুখ খুলতে পারে না | অনেক সময় পরিবার সব জেনেও শুধু ‘মান-সম্মানের’ ভয়ে চুপ থাকে, যা শিশুটির জন্য দ্বিতীয়বারের মতো ভয়ংকর মানসিক নির্যাতন হয়ে দাঁড়ায় |
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য শিশু সুরক্ষার ব্যবস্থা শুধু কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না | প্রতিটি শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের জন্য কার্যকর সেল গঠন, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ও গোপনীয় ব্যবস্থা এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি | গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ডক্টর আনিসুর রহমান এ বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন | তিনি মনে করেন, কোনো শিশু অস্বাভাবিক আচরণ করলে তাকে বকাঝকা না করে তার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে | বাবা-মায়েদের উচিত সন্তানদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা এবং তাদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে সচেতন করা | পরিবারের সদস্য হোক বা শিক্ষক, কারোরই যে শিশুর শরীরে আপত্তিকর স্পর্শ করার অধিকার নেই, তা শিশুকে খুব স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে | পাশাপাশি শিক্ষা সচিব আব্দুল খালেক কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি সেল গঠন করা এখন বাধ্যতামূলক | যেসব প্রতিষ্ঠান এই নিয়ম মানবে না এবং যেসব শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন জঘন্য অভিযোগ প্রমাণিত হবে, তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র অত্যন্ত কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে |