বিএনপির নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর এরই মধ্যে প্রায় আটটি মাস অতিক্রান্ত হয়েছে| কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতির আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে পরিচিত ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নের বিষয়টি এখনো এক গভীর আইনি ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিপাকে আটকে আছে| এই সনদটি কীভাবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন দল এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর মধ্যে এক চরম পরস্পরবিরোধী ও সাংঘর্ষিক অবস্থান তৈরি হয়েছে| বিশেষ করে সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বা বিএনপির দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের ওপর ভিত্তি করে সরকার যেভাবে এগোতে চাইছে, তার তীব্র বিরোধিতা করে রাজপথে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের সমমনা মিত্র দলগুলো| তাদের দাবি, জনগণের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে কোনোভাবেই সংবিধান সংশোধন করা যাবে না|
এই রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের অন্তর্ভুক্ত ৮৪টি সুনির্দিষ্ট সংস্কার প্রস্তাব, যার মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সরাসরি দেশের সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত| এই প্রস্তাবগুলোর বেশ কয়েকটির বিষয়ে বিএনপি শুরু থেকেই নীতিগত আপত্তি বা নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে আসছিল| বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারের সুস্পষ্ট অবস্থান হলো, যেসব বিষয়ে বিএনপি ভিন্নমত পোষণ করেছিল, তা সেই নোট অব ডিসেন্টসহ যেভাবে সনদে স্বাক্ষরিত হয়েছিল, ঠিক সেভাবেই এখন সংসদে বাস্তবায়িত করা হবে| সরকারের এই অবস্থানের কথা সম্প্রতি সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ সংসদীয় কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে কমিটির সভাপতি এবং বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ গণমাধ্যমের সামনে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন| তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রয়োজনীয় আলাপ-আলোচনা সম্পন্ন করার পরই সংবিধান সংশোধনী বিলটি জাতীয় সংসদে চূড়ান্তভাবে উত্থাপন করা হবে| এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সরকার ইতিমধ্যেই ১৭ সদস্যের একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করেছে| কিন্তু রাজনৈতিক ঐকমত্যের অভাবে বিরোধী দলের জন্য এই কমিটিতে নির্ধারিত পাঁচটি আসনে তারা এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিনিধি প্রেরণ করেনি, যা এই প্রক্রিয়াটিকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে|
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং তাদের অন্যান্য রাজনৈতিক মিত্ররা সরকারের এই সংসদীয় প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ বাইরে গিয়ে গণভোটের প্রত্যক্ষ রায়ের ভিত্তিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবিতে অনড় রয়েছে| তাদের অকাট্য যুক্তি হলো, একটি আনুষ্ঠানিক গণভোটের মাধ্যমে এ দেশের আপামর জনগণ যে সংস্কার প্রক্রিয়ায় তাদের স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতি প্রদান করেছে, তার বাইরে গিয়ে সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বা নোট অব ডিসেন্টের ভিত্তিতে সংবিধানের মৌলিক কোনো পরিবর্তন আনা যাবে না| এই কঠোর ও অনড় অবস্থানের কারণেই তারা সরকারের গঠন করা ১৭ সদস্যের বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে নিজেদের কোনো প্রতিনিধি না দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে| গত ২০ সেপ্টেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবে ১১ দলীয় ঐক্যের ব্যানারে আয়োজিত এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিরোধী শিবিরের এই অভিন্ন অবস্থানের কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন| তিনি সেখানে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে জানান যে, গণভোটের মাধ্যমে জনগণ যে সংস্কার প্রক্রিয়া একবাক্যে অনুমোদন করেছে, কেবল সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই দেশের সাংবিধানিক পরিবর্তন আনতে হবে এবং এর বাইরে কোনো কিছুই তারা মেনে নেবেন না|
এই সংকটের পেছনের ইতিহাস ও আইনি দিকগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, গত ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হয়েছিল| এর ধারাবাহিকতায় পরবর্তী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি যেদিন দেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, ঠিক সেই একই দিনে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রশ্নে দেশব্যাপী একটি ঐতিহাসিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়েছিল| নির্বাচন কমিশনের দেওয়া সরকারি ও চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেই গণভোটে সারা দেশে ভোট পড়ার হার ছিল আশাব্যঞ্জকভাবে ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ| সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, এই সনদের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছিল প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি, যা এই সংস্কারের প্রতি জনগণের বিপুল সমর্থনের এক অকাট্য প্রমাণ| সনদ বাস্তবায়নের আইনি আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশের মাত্র ৩০ দিনের মধ্যে একটি বিশেষ ‘সংস্কার পরিষদ’-এর অধিবেশন আহ্বান করার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ছিল| এই বাধ্যবাধকতার কারণে পরবর্তীতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের পাশাপাশি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নতুন করে শপথ নেওয়ার আইনি প্রশ্নটিও রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় হয়ে দেখা দেয়| সেই সময় জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ তাদের মিত্ররা সেই প্রক্রিয়ায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিলেও বিএনপি সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান গ্রহণ করে|
বিএনপি শুরু থেকেই সংস্কার পরিষদের বদলে সংবিধান সংশোধনের জন্য সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এগোতে চেয়েছে এবং সরকার গঠনের পর তারা সেই পথেই হাঁটছে| বিএনপির শীর্ষ নেতারা বারবার দাবি করছেন যে, জুলাই সনদে তাদের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট অত্যন্ত স্পষ্টভাবেই সনদের নথিতে লিপিবদ্ধ রয়েছে| গত ১৭ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য নজরুল ইসলাম খান অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেন যে, জুলাই সনদের যেসব প্রস্তাবে বিএনপির আপত্তি ছিল, তা নির্বাচনের আগেই দেশের জনগণকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল| যেহেতু জনগণ সব জেনেশুনেই তাদের ভোট দিয়েছে, তাই সরকার গঠনের পর এখন দলটি নিজেদের সেই পূর্বঘোষিত অবস্থান অনুযায়ী সংসদে সংবিধান সংশোধনের অধিকার রাখে| দলটির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সেলিমা রহমানও একই সুরে কথা বলেছেন| তিনি জানান, জুলাই সনদের প্রতিটি পর্ব বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন এবং সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ীই সংবিধান সংশোধনের এই আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে| এমনকি বিরোধী দলকে এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে কমিটিতে প্রতিনিধি দেওয়ারও আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করা হয়েছিল বলে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন|
তবে সরকারের এই আইনি ব্যাখ্যা মানতে নারাজ বিরোধী রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা| রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি ও বিশিষ্ট বিশ্লেষক হাসনাত আবদুল কাইয়ূম সরকারের এই পদক্ষেপের আইনি বৈধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন| তিনি মনে করেন, একটি দেশের সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয় যদি শুধুমাত্র সংসদীয় সংশোধনীর মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে ভবিষ্যতে তা সর্বোচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ হওয়ার প্রবল আইনি ঝুঁকি রয়েছে| তিনি অত্যন্ত যুক্তিসংগতভাবে উল্লেখ করেন যে, জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেটের ভিত্তিতে সংবিধান সংস্কার করতে হলে পূর্বঘোষিত সেই সংস্কার পরিষদ গঠন করা অপরিহার্য| সরকার যদি সত্যিই একটি টেকসই সমাধান চায়, তবে তারা অংশীজনদের সঙ্গে নতুন করে আলোচনা করে এখনো বিষয়টির একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করতে পারে| তিনি আরও দাবি করেন যে, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রাথমিক আলোচনায় সংস্কার বাস্তবায়নের মূল পদ্ধতি নিয়ে কোনো দলের মধ্যেই কোনো ধরনের ভিন্নমত বা নোট অব ডিসেন্ট ছিল না, ফলে এখন পদ্ধতিগত পরিবর্তন আনাটা অনৈতিক|
এদিকে জুলাই সনদ হুবহু বাস্তবায়ন এবং অবিলম্বে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বানের দাবিতে সংসদীয় রাজনীতির পাশাপাশি রাজপথের আন্দোলনকেও তীব্র করার ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত ও এনসিপি| সরকারের ওপর ত্রিমুখী চাপ সৃষ্টি করার জন্য জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় পর্যায়ে বিশাল সব জনসমাবেশ অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সম্পন্ন করেছে| এর পাশাপাশি তারা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত জনমত গঠনের লক্ষ্যে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এবং ঢাকা থেকে রংপুর পর্যন্ত বিশাল লংমার্চ কর্মসূচিও পালন করেছে| নিজেদের একদফা দাবি আদায়ে আগামী ১৪ নভেম্বর রাজধানী ঢাকায় এক মহাসমাবেশের কর্মসূচিও তারা ঘোষণা করেছে, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে| এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক ও রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার তাদের দলের অবস্থান পরিষ্কার করে জানিয়েছেন যে, তারা কোনো আপস করবেন না| তিনি বলেন, জনগণের রায়কে সর্বোচ্চ সম্মান জানিয়েই তারা বিশেষ সংসদীয় কমিটিতে যোগ দেননি| দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ও রাজপথ—এই দুই জায়গাতেই তাদের কঠোর ও নিরবচ্ছিন্ন আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে তিনি সরকারকে চূড়ান্ত হুঁশিয়ারি দিয়েছেন| সব মিলিয়ে জুলাই সনদের এই বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন সংঘাত ও মেরুকরণের জন্ম দিতে যাচ্ছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য এক বড় ধরনের অগ্নিপরীক্ষা|
তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন