বাংলাদেশে সরকারি চাকরির প্রতি শিক্ষিত তরুণ সমাজের আকর্ষণ বা উন্মাদনা কখনোই কম ছিল না, বরং দিন দিন তা যেন এক নতুন উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছাচ্ছে| অন্যদিকে দেশের বেসরকারি খাতে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া বলতে গেলে প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে| দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা বহুমুখী অর্থনৈতিক চাপের কারণে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো একদিকে যেমন নতুন নিয়োগ বন্ধ রেখেছে, তেমনি অনেক কোম্পানি কর্মী ছাঁটাই করছে অথবা শূন্য পদগুলো আর নতুন করে পূরণ করছে না| ঠিক এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশের চাকরিপ্রার্থীদের চরম হতাশা ও মরিয়া অবস্থার একটি নিখুঁত চিত্র ফুটে উঠেছে সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে| সরকারি ওই অধিদপ্তরের মাত্র ১ হাজার ৪৮৫টি পদের বিপরীতে আবেদন করেছেন ২১ লাখেরও বেশি চাকরিপ্রার্থী| পদের সংখ্যার তুলনায় প্রার্থীর এই গগনচুম্বী চাপ সামলাতে গিয়ে এখন খোদ নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষই রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে| এত বিশাল সংখ্যক প্রার্থীর জন্য কীভাবে পরীক্ষার আয়োজন করা হবে বা এত খাতা কীভাবে দেখা হবে, তা নিয়ে তারা রীতিমতো দিশেহারা হয়ে পড়েছে|
দেশের শ্রমবাজারের এই ভয়াবহ অবস্থাকে অর্থনীতিবিদরা ইতিমধ্যে ‘কর্মসংস্থানের জরুরি অবস্থা’ বা ‘এমপ্লয়মেন্ট ইমার্জেন্সি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন| গত বছরের আগস্ট মাসে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে এমন উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরা হয়েছিল| ওই প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে বেকারত্বের হার এখন একটি ‘মহামারি পর্যায়ে’ গিয়ে ঠেকেছে| এক বছর পার হয়ে গেলেও এই তীব্র সংকটের কোনো দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি| আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মাধ্যমিক-পরবর্তী শিক্ষাপ্রাপ্ত তরুণদের প্রায় ৩৬ শতাংশই বর্তমানে চরম বেকারত্বের শিকার| প্রতি বছর দেশে যেখানে নতুন করে প্রায় ২১ লাখ মানুষ কাজের বাজারে প্রবেশ করে, সেখানে সরকারিভাবে এই সামান্য সংখ্যক পদের বিপরীতে এত বিপুল আবেদন দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থান সংকটেরই এক জ্বলন্ত প্রমাণ|
সমাজসেবা অধিদপ্তর গত মে মাসে ১৩ থেকে ২০তম গ্রেডের ৫২টি ক্যাটাগরিতে স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৪৮৫টি পদের জন্য নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল| গত ২ জুন থেকে ২৩ জুন পর্যন্ত অনলাইনে এই আবেদন প্রক্রিয়া চলে, যেখানে চাকরিপ্রার্থীরা সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটকের মাধ্যমে ৫০ থেকে ১০০ টাকা ফি দিয়ে আবেদন সম্পন্ন করেন| আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, সর্বমোট ২১ লাখ ২৩ হাজার মানুষ এই পদগুলোর জন্য আবেদন করেছেন| সহজ গাণিতিক হিসাবে, এখানে প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে লড়ছেন প্রায় ১ হাজার ৪৩০ জন প্রার্থী| আবেদন প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কর্তৃপক্ষের কাছে এখন সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে এত বিশাল সংখ্যক প্রার্থীর জন্য পরীক্ষার আয়োজন করা| দেশজুড়ে এত বড় পরীক্ষার কেন্দ্র নির্ধারণ, প্রশ্নপত্র ছাপানো, লাখো পরিদর্শক নিয়োগ থেকে শুরু করে উত্তরপত্র মূল্যায়নের মতো লজিস্টিক ও আর্থিক বিষয়গুলো এক অভাবনীয় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে|
পরিস্থিতি এতটাই জটিল আকার ধারণ করেছে যে, এই বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর পরীক্ষা কীভাবে নেওয়া হবে বা প্রাথমিক বাছাই ঠিক কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিত নির্দেশনা চেয়েছে সমাজসেবা অধিদপ্তর| সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোহাম্মদ আবু ইউসুফ একটি জাতীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ২১ লাখ ২৩ হাজার প্রার্থীর এই নিয়োগ প্রক্রিয়া কীভাবে দ্রুততম সময়ে শেষ করা যায়, সে বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে এবং এখন তাদের অনুমোদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে| সমাজসেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শাহ মোহাম্মদ মাহবুবও জানিয়েছেন, তারা স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তবে এত বেশি আবেদন জমা পড়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণে মন্ত্রণালয়ের সরাসরি সহায়তা চাওয়া হয়েছে| নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক বাছাইয়ের পর লিখিত ও ব্যবহারিক এবং সর্বশেষে মৌখিক পরীক্ষার জন্য ঠিক কতজনকে ডাকা হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি|
সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে জমা পড়া আবেদনের সংখ্যা দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ নিয়োগ পরীক্ষা বিসিএসকেও বহুগুণে ছাড়িয়ে গেছে| সর্বশেষ পাঁচটি সাধারণ বিসিএস পরীক্ষার প্রতিটির চেয়ে এই অধিদপ্তরে আবেদনকারীর সংখ্যা বিস্ময়করভাবে অনেক বেশি| উদাহরণস্বরূপ, সর্বশেষ ৫০তম বিসিএসে ২ হাজার ১৫০টি পদের বিপরীতে আবেদন জমা পড়েছিল মাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার, যা বিগত পাঁচটি বিসিএসের মধ্যে সর্বনিম্ন| এর আগে ৪৯তম বিসিএসে ৩ লাখ ১২ হাজার, ৪৭তম-তে ৩ লাখ ৭৪ হাজার, ৪৬তম-তে ৩ লাখ ৩৭ হাজার এবং ৪৫তম বিসিএসে মাত্র ৩ লাখ ৪৬ হাজার আবেদন জমা পড়েছিল| শুধু তা-ই নয়, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় সারা দেশে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৫৭ হাজারের কিছুটা বেশি| অর্থাৎ, সমাজসেবা অধিদপ্তরের এই চাকরির জন্য জমা পড়া প্রার্থীর সংখ্যা গোটা দেশের মোট এসএসসি পরীক্ষার্থীর চেয়েও অনেক বেশি|
এই বিশাল সংখ্যক তরুণ ঠিক কোন পদগুলোর জন্য লড়াই করছেন, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এখানে মূলত এসএসসি থেকে শুরু করে স্নাতক পাস যোগ্যতার পদ রয়েছে| এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি শূন্য পদ রয়েছে ২০তম গ্রেডের অফিস সহকারী পদে, যার সংখ্যা ৪৭৮টি এবং এর জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা চাওয়া হয়েছে মাত্র এসএসসি পাস| এছাড়া ইউনিয়ন পর্যায়ে ৩১২ জন সমাজকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে, যাদের মূল কাজ হবে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর বিভিন্ন কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করা| এর মধ্যে বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, স্বামী নিগৃহীতা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা এবং অসচ্ছল প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির জন্য যোগ্য সুবিধাভোগীদের তালিকা প্রস্তুত ও যাচাই করার মতো কাজগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে| অন্যান্য পদের মধ্যে রয়েছে শিক্ষক, প্রধান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর, ট্রেড ইনস্ট্রাক্টর, সুপারভাইজার এবং কারিগরি প্রশিক্ষক|
বেসরকারি খাতের চরম দুর্বলতা ও স্থবিরতার কারণেই তরুণরা আজ সরকারি চাকরির দিকে এতটা মরিয়া হয়ে ঝুঁকেছেন বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ও কর্মসংস্থান বিশ্লেষকরা| সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক ডক্টর খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ যেখানে থমকে আছে, সেখানে সরকারি চাকরির আকর্ষণীয় বেতন, চাকরির শতভাগ নিরাপত্তা এবং সামাজিক মর্যাদাই প্রার্থীদের প্রবলভাবে সরকারি পদের দিকে ধাবিত করছে| তিনি বলেন, সীমিত পদে এত তীব্র প্রতিযোগিতা দেশের অর্থনীতির স্বাস্থ্য সম্পর্কে একটি বিভ্রান্তিকর ধারণা দেয়| সাধারণত করপোরেট খাত সম্প্রসারিত হলে তা সহজেই চাকরিপ্রার্থীদের বিশাল অংশকে শুষে নিতে পারে, কিন্তু দেশে এখন নতুন বিনিয়োগে খরা চলছে এবং বৈশ্বিক বাজারের অনিশ্চয়তা বেসরকারি খাতের নিয়োগ ও বেতন বৃদ্ধিকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করেছে| ডক্টর মোয়াজ্জেম সরকারকে এই ১ হাজার ৪৮৫টি পদের প্রকৃত প্রয়োজনীয়তা যাচাই করারও পরামর্শ দিয়েছেন| তিনি উল্লেখ করেন, উৎপাদনশীলতা না থাকলেও কেবল শূন্য পদ আছে বলেই অনেক সময় সরকারি চাকরিতে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক করপোরেট মানদণ্ডে অকল্পনীয়|
বেসরকারি খাতে নিয়োগের এই দুর্বলতা অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশে নতুন বিনিয়োগের সার্বিক চিত্রে| গত জুলাই মাসে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ, যা জুনে ছিল রেকর্ড সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ| তীব্র জ্বালানি সংকট ও ব্যবসার চাহিদা কমে যাওয়ার কারণে টানা পাঁচ মাস ধরে এই প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচেই অবস্থান করছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮০ শতাংশ| বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, বিগত দুই বছরে তাদের সদস্যভুক্ত কোম্পানিগুলোর কর্মী সংখ্যা অন্তত ৩ শতাংশ কমেছে, আর অস্থায়ী বা চুক্তিভিত্তিক কর্মীসহ হিসাব করলে এই সংকোচনের হার ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে| দেশের অন্যতম শীর্ষ জব পোর্টাল বিডিজবস ডটকমের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও সিইও এ কে এম ফাহিম মাশরুর জানিয়েছেন, ২০২৫ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে এর আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় তাদের প্ল্যাটফর্মে বেসরকারি চাকরির বিজ্ঞাপন প্রায় ১০ শতাংশ কমে গেছে| তিনি আরও জানান, বেশ কয়েক বছর ধরেই বেসরকারি চাকরিতে আবেদনের হার ধারাবাহিকভাবে কমছে এবং এর বিপরীতে সরকারি চাকরিতে আবেদন বাড়ছে| মূলত সরকারি চাকরিতে বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতে কর্মীর সুযোগ-সুবিধা স্থবির হয়ে পড়াই দেশের কর্মসংস্থান খাতের এই হতাশাজনক পরিবর্তনের প্রধান কারণ|
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড