বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন, জীবিকা ও বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন তিস্তা নদী আজ চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে| শুষ্ক মৌসুমে পানির তীব্র হাহাকার আর বর্ষা মৌসুমে কূলভাঙা বিধ্বংসী বন্যা—এই দুই চরম বাস্তবতার মাঝে পিষ্ট হয়ে চলেছে উত্তরের পাঁচ জেলার সাধারণ মানুষ| এই অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করে তিস্তা অববাহিকার সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘তিস্তা নদী অববাহিকা ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ বা বহুল আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এক দশকেরও বেশি সময় আগে| কিন্তু বছরের পর বছর ধরে একাধিকবার পরিকল্পনায় রদবদল এবং অর্থায়নের প্রস্তাবে নানা কাটছাঁট ও পরিবর্তনের পর এই মেগা প্রকল্পটি এখন আবারও এক নতুন অনিশ্চয়তার আবর্তে নিক্ষিপ্ত হয়েছে| সর্বশেষ সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই বিশাল কর্মযজ্ঞের মূল নির্মাণকাজে হাত দেওয়ার আগে সম্পূর্ণ নতুন করে আরও একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা বা ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে| সরকারের সংশোধিত নতুন সময়সূচি অনুযায়ী, এই নতুন সমীক্ষাটি শেষ হতে ২০২৮ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাবে| যার অনিবার্য পরিণতি হিসেবে দেশের অন্যতম আলোচিত ও কাঙ্ক্ষিত এই মেগা প্রকল্পের মূল ভৌত নির্মাণকাজ মাঠে গড়াতে অন্তত ২০২৯ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে|
প্রকল্প বাস্তবায়নের এই নতুন ও দীর্ঘায়িত সময়সূচি সরকারের পূর্ববর্তী নানা প্রতিশ্রুতি ও ঘোষণার তুলনায় এক বিশাল ও হতাশাজনক পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে| কারণ খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, মাত্র কয়েক মাস আগেও খোদ পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায় থেকে অত্যন্ত জোর দিয়ে দেশবাসীকে জানানো হয়েছিল যে, চলতি বছরের মধ্যেই এই মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্ত সরকারি অনুমোদন লাভ করবে| এমনকি ২০২৭ সালের মধ্যেই এই প্রকল্পের মূল নির্মাণকাজের আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছিল| পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকেও এই একই কর্মপরিকল্পনা ও রূপরেখা অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছিল| কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতির রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বিডব্লিউডিবি) পক্ষ থেকে দেওয়া নতুন এক প্রস্তাবে এই প্রকল্পের চাকা আবারও পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে| পানি উন্নয়ন বোর্ডের ওই নতুন প্রস্তাবে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, প্রকল্পের কাজ শুরু করার আগে ২৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের একটি নতুন ও অন্তর্বর্তীকালীন কারিগরি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হবে| সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বহিরাগত কোনো দাতা সংস্থার ওপর নির্ভর না করে সরকার সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে স্বাধীনভাবে এই সমীক্ষাটি পরিচালনা করবে| এই নতুন সমীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদন সরকারের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে জমা হওয়ার পরই কেবল তিস্তা মহাপরিকল্পনার মূল কাজের জন্য সম্পূর্ণ নতুন করে একটি প্রকল্প প্রস্তাব বা ডিপিপি তৈরি করা হবে, যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও কয়েক বছর পিছিয়ে দিল|
‘তিস্তা নদী অববাহিকার সমন্বিত ও টেকসই ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক এই যুগান্তকারী প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য এক দশকেরও বেশি সময় ধরে নানামুখী সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও, মূলত দুটি প্রধান কারণে বারবার এর অগ্রগতি থমকে গেছে| এর প্রথমটি হলো এই ভূখণ্ডের অত্যন্ত জটিল ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতা এবং দ্বিতীয়টি হলো বিশাল অঙ্কের এই প্রকল্পের অর্থায়ন সংক্রান্ত নানাবিধ আন্তর্জাতিক জটিলতা| প্রকল্পটির পেছনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সর্বপ্রথম এই প্রকল্পের বিষয়ে চীনের অন্যতম বৃহৎ রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান ‘পাওয়ারচায়না’-এর সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষর করেছিল| ওই চুক্তির ধারাবাহিকতায় পাওয়ারচায়না তাদের নিজস্ব বিশেষজ্ঞ দল দিয়ে একটি বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করে এবং ২০২০ সালের দিকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে তাদের তৈরি করা সেই সমীক্ষা প্রতিবেদনটি আনুষ্ঠানিকভাবে জমা দেয়| চীনের এই ব্যাপক আগ্রহ ও প্রস্তুতির মাঝেই ২০২৪ সালে হঠাৎ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতও অত্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তিস্তা প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যাপারে তাদের গভীর আগ্রহ প্রকাশ করে বসে| ভারত ও চীনের মতো এশিয়ার দুই বৃহৎ পরাশক্তির একই প্রকল্পে এমন প্রকাশ্য আগ্রহ ও প্রতিযোগিতার কারণে তিস্তা মহাপরিকল্পনাটি আক্ষরিক অর্থেই এক চরম ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হয় এবং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে|
পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে ভূরাজনৈতিক দোলাচলের কারণে প্রকল্পটির দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি না হলেও, গণঅভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব গ্রহণ করা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তিস্তা নিয়ে নতুন করে ছক কষতে শুরু করে| এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ৩০ জুন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পরিকল্পনা কমিশন বহু প্রতীক্ষিত ‘তিস্তা নদীর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্প’-এর প্রথম পর্যায়ের কাজের নীতিগত অনুমোদন প্রদান করে| পরিকল্পনা কমিশনের এই যুগান্তকারী অনুমোদনের ধারাবাহিকতায় সরকারের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডি প্রকল্পটিতে অর্থায়নের জন্য চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের কাছে একটি বিস্তারিত ও প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব (পিডিপিপি) প্রেরণ করে| ওই প্রাথমিক প্রস্তাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম পর্যায়ের বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য সর্বমোট প্রায় ৭৪৭ দশমিক ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল| এই বিশাল অঙ্কের অর্থের মধ্যে ৫৫০ দশমিক ৬২ মিলিয়ন ডলার সরাসরি চীন সরকারের কাছ থেকে সহজ শর্তের ঋণ হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব করা হয়েছিল| আর প্রস্তাবিত ব্যয়ের বাকি অর্থ বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব সরকারি তহবিল থেকে জোগান দেওয়ার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা ওই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল|
বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় স্বার্থে তিস্তা মহাপরিকল্পনা এবং পদ্মা ব্যারাজ—দেশের এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্প নিয়েই সমানতালে সামনে এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ও নীতিগত অবস্থান বারবার পুনর্ব্যক্ত করেছে| কিন্তু সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সরকারি কাজে আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং বেশ কিছু আনুষ্ঠানিক ও প্রক্রিয়াগত আইনি ধাপ এখনো বাকি থাকায় পুরো প্রক্রিয়াটি বিলম্বিত হচ্ছে| পরিকল্পনা কমিশনের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন যে, নতুন করে যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষাটি পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার আগে একটি নির্দিষ্ট আমলাতান্ত্রিক ধাপ অতিক্রম করতে হবে| নিয়ম অনুযায়ী, সর্বপ্রথম এই সমীক্ষা প্রকল্পটিকে চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) অননুমোদিত প্রকল্পের তালিকায় বা ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে| চলতি অর্থবছরের এডিপির সবুজ পাতায় নতুন অননুমোদিত প্রকল্পের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল, দুর্ভাগ্যবশত সেখানে তিস্তা প্রকল্পের এই নতুন সমীক্ষার নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল না| এই আমলাতান্ত্রিক ত্রুটি দূর করার জন্য গত সপ্তাহে সরকারের বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মধ্যে একটি বিশেষ আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে প্রকল্পটিকে এডিপিতে অন্তর্ভুক্তির কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে| এই প্রাথমিক ধাপটি সম্পন্ন হওয়ার পর সমীক্ষা প্রকল্পের মূল প্রস্তাব অনুমোদন প্রক্রিয়া শুরু হবে| সরকারের নীতিনির্ধারকদের প্রত্যাশা, এই সমস্ত দাপ্তরিক ও আমলাতান্ত্রিক অনুমোদনের বাধা সাফল্যের সঙ্গে পার হয়ে নতুন সমীক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাঠপর্যায়ের কাজ চলতি বছরের শেষ নাগাদ শুরু করা সম্ভব হবে| অন্যদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডির অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে যে, তিস্তা প্রকল্প নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের এই নতুন করে স্বাধীন সমীক্ষা পরিচালনার উদ্যোগকে চীন অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে এবং স্বাগত জানিয়েছে| শুধু স্বাগত জানিয়েই তারা ক্ষান্ত হয়নি, বরং বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে পরিচালিতব্য এই নতুন ও আধুনিক সমীক্ষায় যেকোনো ধরনের উন্নত কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদানেরও স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ প্রকাশ করেছে দেশটি|
নতুন করে প্রস্তাবিত এই আধুনিক সমীক্ষার আওতা ও পরিধি হবে অত্যন্ত বিস্তৃত এবং বিজ্ঞানভিত্তিক| এই সমীক্ষার অধীনে তিস্তা নদীর বহুমুখী চরিত্র যেমন—নদীর হাইড্রোলজিক্যাল বা পানিতাত্ত্বিক গতিপ্রকৃতি, হাইড্রোলিক বা জলপ্রবাহের গতিবিদ্যা, মরফোলজিক্যাল বা নদীর তলদেশ ও পারের গঠনগত পরিবর্তন, অববাহিকার সার্বিক পরিবেশগত ভারসাম্য এবং ওই অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক বিভিন্ন গতিশীলতা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা হবে| এই সুবিশাল বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার মূল ও প্রধান উদ্দেশ্য হলো তিস্তা নদীকে সুসংহত করা বা রিভার স্ট্যাবিলাইজেশন, বর্ষা মৌসুমে উত্তরের সর্বনাশা নদীভাঙন চিরতরে রোধ করা এবং নদীর তলদেশে বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা পলি ব্যবস্থাপনার জন্য একটি বিজ্ঞানসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি কার্যকর কৌশল নির্ধারণ করা| দুটি মূল পর্যায় বা কম্পোনেন্টে বিভক্ত করে এই বিশাল সমীক্ষা উদ্যোগটি পরিচালনা করা হবে| এর ব্যাপ্তি হবে তিস্তা নদীর সম্পূর্ণ বাংলাদেশ অংশে—অর্থাৎ উজানে নীলফামারী থেকে শুরু করে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম হয়ে ভাটিতে গাইবান্ধা জেলা পর্যন্ত| মূল নদীর পাশাপাশি এই পাঁচ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত শাখা ও উপশাখা নদীর ওপরও মৌলিক বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা এবং অত্যাধুনিক ফিজিক্যাল মডেলিংয়ের এক অনন্য সমন্বয় ঘটানো হবে এই সমীক্ষায়|
এই যুগান্তকারী সমীক্ষার প্রথম অংশ বা কম্পোনেন্টের অধীনে মূলত বিস্তৃত বিশ্লেষণাত্মক গবেষণা বা অ্যানালিটিক্যাল রিসার্চ পরিচালনা করা হবে| এই অংশের অধীনে তিস্তা অববাহিকার প্রধান ও জ্বলন্ত সমস্যাগুলো—যথা প্রলয়ংকরী নদীভাঙন, বর্ষার আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি, নদীর তলদেশে পলির গতিপ্রকৃতি ও জমা হওয়ার হার এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির চরম সংকট ও খরা পরিস্থিতি অত্যন্ত বৈজ্ঞানিক উপায়ে চিহ্নিত ও মূল্যায়ন করা হবে| এর পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে সেচকাজ নির্বিঘ্ন রাখতে ভূ-উপরিস্থ নদীর পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানি সম্পদের টেকসই ও সুষম ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে—কীভাবে পানি সংরক্ষণ করা যায়, বৃষ্টির পানি ধারণের আধুনিক পদ্ধতি এবং উন্নত ও আধুনিক সেচ পরিকল্পনার বিভিন্ন বিকল্প ও সম্ভাব্যতাও গভীরভাবে খুঁজে দেখা হবে|
সমীক্ষার দ্বিতীয় অংশটি আরও বেশি কারিগরি ও প্রযুক্তিগত, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিজিক্যাল মডেলিং’| এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপের অধীনে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় তিস্তা নদীর একটি স্কেলভিত্তিক হাইড্রোলিক মডেল ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা হবে| এই বৈজ্ঞানিক মডেলের মাধ্যমে শুষ্ক ও বর্ষা মৌসুমের বিভিন্ন প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে নদীর পানির প্রবাহ ও আচরণ কেমন হতে পারে, বন্যার সময় নদীর স্রোত কীভাবে পলি বহন করে এবং এর ফলে নদীর তলদেশ ও পারের গঠনগত কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে, তা কৃত্রিমভাবে পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে| শুধু তাই নয়, এই ফিজিক্যাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে নদীর শাসনব্যবস্থা বা রিভার ট্রেইনিং স্ট্রাকচার কেমন হওয়া উচিত, বিজ্ঞানসম্মত ড্রেজিং বা খননপ্রক্রিয়া কীভাবে পরিচালিত হবে, ক্যানেলাইজেশন বা খাল খননের মাধ্যমে পানিপ্রবাহ কীভাবে বাড়ানো যায় এবং সার্বিক প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা হবে| এর পাশাপাশি এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ওই অঞ্চলের সার্বিক বন্যার ঝুঁকি কতটা কমবে, স্থানীয় কৃষিব্যবস্থায় এর কী সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে, নতুন নির্মিতব্য অবকাঠামোগুলো কতটা টেকসই হবে এবং সর্বোপরি বিদ্যমান তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের ওপর এর কী ধরনের ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, তা অত্যন্ত বিশদ ও সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করা হবে|
পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অত্যন্ত দৃঢ় আশা, বিজ্ঞানভিত্তিক ও কারিগরি এই নীলকশাটি একবার চূড়ান্ত হয়ে গেলে তা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং ওই অঞ্চলের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল ভিত্তি বা গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে| এই মহাপরিকল্পনার চূড়ান্ত ও পবিত্র লক্ষ্য হলো শুষ্ক মৌসুমে উত্তরের কৃষকদের জন্য পানির সার্বক্ষণিক প্রাপ্যতা নিশ্চিত করে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর আবাদি জমিতে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ করা এবং প্রতি বছরের বর্ষা মৌসুমে সর্বনাশা ও ভয়ংকর বন্যার হাত থেকে উত্তরের ৫ জেলার ১ কোটিরও বেশি অসহায় ও নিরীহ মানুষকে একটি স্থায়ী ও টেকসই সুরক্ষা প্রদান করা| এই লক্ষ্য অর্জিত হলেই কেবল দুই যুগ ধরে লালন করা তিস্তাপাড়ের কোটি মানুষের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ লাভ করবে|