সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৩:২৬ পূর্বাহ্ন

কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধারে ৮৭০ কোটি টাকার প্রকল্প

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১১ বার
প্রকাশ: রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎকেন্দ্র কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের হারানো ২০ থেকে ৩০ মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করতে প্রায় ৮৬৯ দশমিক ৯৭ কোটি টাকার একটি বৃহৎ প্রকল্প প্রস্তাব করেছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা বিপিডিবি| এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অর্থায়নের প্রধান উৎস হিসেবে জাপান আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা বা জাইকার কাছ থেকে ঋণ নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে| প্রস্তাবিত এই মেগা প্রকল্পে ৬৫৬ দশমিক ৯৮ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে নেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে, যার পাশাপাশি ২০০ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা সরকারি তহবিল এবং ১২ দশমিক ৪০ কোটি টাকা বিপিডিবির নিজস্ব তহবিল থেকে ব্যয় করা হবে| এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে একটি প্রাথমিক উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব বা পিডিপিপি নীতিগত অনুমোদনের জন্য ইতিমধ্যেই পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে| একই সঙ্গে জাইকার কাছ থেকে এই বিশাল অঙ্কের অর্থায়ন নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ বা ইআরডিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ|

তবে এই প্রকল্পে জাইকার ঋণ গ্রহণ নিয়ে বেশ কিছু আর্থিক চ্যালেঞ্জ ও উচ্চ সুদের ঝুঁকি রয়েছে| ইআরডির সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, আগামী অক্টোবর মাস থেকে জাইকার ঋণের সুদের হার একলাফে বেড়ে ৩ দশমিক ৫৫ শতাংশে গিয়ে দাঁড়াবে এবং এর সঙ্গে আরও শূন্য দশমিক ২০ শতাংশ ‘ফ্রন্ট-এন্ড ফি’ বা প্রাথমিক মাশুল প্রদান করতে হবে| এই বর্ধিত সুদের হার বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক বা এডিবি এবং অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগীদের দেওয়া ঋণের সুদের হারের তুলনায় অনেক বেশি| ইআরডির কর্মকর্তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, মাত্র দুই বছর আগেও জাপানের ঋণের সুদের হার ১ শতাংশের অনেক নিচে ছিল, কিন্তু এরপর থেকে প্রতি ছয় মাস পরপর এই সুদের হার সংশোধন করে বাড়ানো হয়েছে এবং ভবিষ্যতে তা আরও বেড়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে| জাপান সাধারণত একটি মাত্র চুক্তির মাধ্যমে পুরো প্রকল্পের অর্থায়ন না করে কয়েকটি ধাপে বা কিস্তিতে অর্থায়ন করে থাকে, ফলে প্রতিটি ঋণচুক্তির সময়কার প্রযোজ্য সুদের হারই ওই নির্দিষ্ট চুক্তিতে কার্যকর হয়, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় আর্থিক ঝুঁকি তৈরি করে| অবশ্য বিপিডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পটি নিয়ে জাপানের সঙ্গে ইতিমধ্যে কয়েক দফা ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে এবং জাইকা ঋণ দিতে প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তবে সরকার চাইলে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির কাছ থেকেও অর্থায়ন নেওয়ার বিকল্প খোলা রেখেছে|

কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের বর্তমান কারিগরি অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে| কাগজে-কলমে এই ইউনিট দুটির প্রতিটির উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট হলেও, বর্তমানে প্রতিটি ইউনিট থেকে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে| ১৯৮৮ সালে স্থাপন করা এই ইউনিট দুটি প্রায় ৩৭ বছর ধরে একটানা পরিচালিত হয়ে আসছে| প্রকল্পের নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ইউনিট দুটি যথাক্রমে ১ লাখ ৬৬ হাজার ও ১ লাখ ৫০ হাজার ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চালু ছিল এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এরা সম্মিলিতভাবে ১২ হাজার ৫০০ গিগাবাইট-ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছে| কিন্তু দীর্ঘদিন একটানা চলার কারণে পুরোনো ভিত্তি এবং সেকেলে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দরুন বর্তমানে উভয় ইউনিটেই অত্যন্ত গুরুতর ও ঝুঁকিপূর্ণ কারিগরি সমস্যা দেখা দিয়েছে|

এই কারিগরি ত্রুটিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক হলো কাঠামোগত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়া এবং ‘রোটর রিম সাপোর্টিং লেজ’ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া| প্রাপ্ত তথ্যমতে, ৫ নম্বর ইউনিটে ১০টি এবং ৪ নম্বর ইউনিটে ৬টি রোটর রিম সাপোর্টিং লেজ সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে| এছাড়া পুরোনো ও নড়বড়ে ভিত্তির কারণে স্টেটরেও বিকৃতি দেখা দিয়েছে, যা জেনারেটরের ভেতরে একটি অসম চৌম্বকীয় বল বা ম্যাগনেটিক ইমব্যালান্স তৈরি করছে| ইউনিট দুটির নিয়ন্ত্রণ ও সার্বিক সুরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি সেকেলে হয়ে গেছে এবং প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশ বাজার থেকে সংগ্রহ করাও এখন অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে| বিপিডিবির প্রকৌশলীরা জানান, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোতে বারবার ওয়েল্ডিং করে জোড়াতালি দেওয়ার ফলে মূল কাঠামোগুলো আরও বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে, যা বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে| পিডিপিপিতে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলা হয়েছে যে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে ভবিষ্যতে এখানে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ও অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি হতে পারে|

তোশিবা করপোরেশনের তৈরি জেনারেটর এবং হিটাচি লিমিটেডের টারবাইনগুলোর সমন্বয়ে গঠিত এই ইউনিটগুলোতে বছরের পর বছর ধরে বেশ কয়েক দফা জোড়াতালির রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারকাজ করা হয়েছে| ২০০০ সালে সর্বপ্রথম রোটরের স্পোকে চুলের মতো অতি সূক্ষ্ম ফাটল শনাক্ত হওয়ার পর ২০০৬-০৭ সালে তোশিবা কোম্পানি সেগুলো মেরামত করেছিল| পরবর্তীতে মূল সরঞ্জাম প্রস্তুতকারকের সুপারিশ করা রক্ষণাবেক্ষণের সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পর ২০১০-১১ সালে ইউনিট দুটিতে বড় ধরনের ওভারহলিং করা হয়| কিন্তু এত কিছুর পরও মূল কারিগরি সমস্যার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি| ২০১৭ সালে ৪ নম্বর ইউনিটটি পূর্ণগতিতে চালু থাকা অবস্থায় হঠাৎ করে একটি রোটর রিম সাপোর্টিং লেজ ভেঙে যায়, যার ফলে স্টেটরের উইন্ডিং মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শর্ট সার্কিট হয়| এই দুর্ঘটনার পর ৫ নম্বর ইউনিটেও ঠিক একই ধরনের ফাটল শনাক্ত করা হয় এবং তোশিবা কোম্পানি ইউনিট দুটি পুরোপুরি সংস্কারের জরুরি সুপারিশ করে| কিন্তু সে সময় আর্থিক ও লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই কাজ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি, বরং কয়েল পরিবর্তন এবং ফাটল ধরা অংশে ওয়েল্ডিংসহ আংশিক মেরামতের মাধ্যমেই ইউনিট দুটিকে কোনোমতে সচল রাখা হয়| ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে এই মেরামতকাজ ও গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য কয়েক দফা আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের চেষ্টা করা হলেও প্রতিযোগিতার অভাব ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সেগুলো বারবার বাতিল হয়ে যায়|

প্রস্তাবিত নতুন এই ব্যাপক সংস্কারকাজের মাধ্যমে ইউনিট দুটির মোট ১০০ মেগাওয়াট পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, সার্বিক নিরাপত্তা বাড়ানো এবং দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরযোগ্য পরিচালনা নিশ্চিত করার এক সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে| ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত কারণ নিখুঁতভাবে শনাক্ত করে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বের করতে বিস্তারিত কারিগরি সমীক্ষা পরিচালনারও পরিকল্পনা রয়েছে এই প্রকল্পে| পিডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পটি ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাস থেকে শুরু হয়ে ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে, যেখানে বিদ্যমান বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থাই মূলত ব্যবহার করা হবে| এই বিশাল সংস্কারকাজের আওতায় স্টেটর কয়েল, রোটর পোল, ওয়েজ ও ইনসুলেশনসহ জেনারেটরের গুরুত্বপূর্ণ সব যন্ত্রাংশ সংস্কার বা পরিবর্তন করা হবে| একই সঙ্গে টারবাইনের রানার, শ্যাফট সিল, কুলিং ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা এবং বিয়ারিংয়ের আমূল সংস্কার করা হবে| এই প্রকল্পের আওতায় গভর্নর, অটোমেশন, বৈদ্যুতিক, এক্সাইটেশন ও অন্যান্য সহায়ক ব্যবস্থারও আধুনিকায়ন করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে| বিপিডিবির কর্মকর্তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, দেশে বিদ্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে তাল মেলাতে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি এই ধরনের পুরোনো কেন্দ্রগুলোর সময়োপযোগী সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি| সময়মতো এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে কাপ্তাই বিদ্যুৎকেন্দ্রটির আরও অবনতি ঠেকানো সম্ভব হবে এবং জাতীয় সম্পদ হিসেবে এটিকে আগামী প্রজন্মের জন্য সগৌরবে সংরক্ষণ করা যাবে|

তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড


এ জাতীয় আরো খবর...