আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের তীব্র অস্থিরতা, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে তৈরি হওয়া নজিরবিহীন সংকটের কারণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এক ভয়াবহ আর্থিক বিপর্যয়ের পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে| সম্প্রতি দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য লিটারপ্রতি ২০ টাকা হারে বৃদ্ধি করা হলেও, উদ্ভূত এই বিশাল অর্থনৈতিক সংকটের কোনো দৃশ্যমান বা টেকসই সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে| বৈশ্বিক বাজারের চড়া মূল্যের কারণে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোকে বাধ্য হয়ে অনেক বেশি দামে জ্বালানি আমদানি করতে হচ্ছে| অথচ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা এবং শিল্পের স্বার্থ বিবেচনা করে তুলনামূলক কম দামে সেই জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিক্রি করতে গিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর লোকসান এবং ভর্তুকির বোঝা জ্যামিতিক হারে বেড়েই চলেছে| বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি), পেট্রোবাংলা এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মতো রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাগুলো এখন বিশাল আর্থিক ঘাটতির মুখে পড়ে রীতিমতো ধুঁকছে| পরিস্থিতি এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শুধুমাত্র জ্বালানি খাতের এই ভর্তুকি সামাল দিতে গিয়েই সরকারের সার্বিক সামষ্টিক অর্থনীতিতে এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার উপক্রম হয়েছে|
জ্বালানি তেলের বাজার বিশ্লেষণ করলে এই লোকসানের এক ভয়াবহ চিত্র স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে| সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত মাত্র সাড়ে ছয় মাসের ব্যবধানে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির সর্বমোট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকা| দেশে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি ২০ টাকা বাড়ানোর মতো একটি অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সংস্থাটির আর্থিক রক্তক্ষরণ থামানো যায়নি| সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, বর্ধিত মূল্যের পরও বর্তমানে শুধুমাত্র ডিজেলেই প্রতি লিটারে প্রায় ৭০ টাকা করে বিশাল অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে| এ বিষয়ে বিপিসির বর্তমান চেয়ারম্যান ড. মো. রফিকুল ইসলাম অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি তথ্য তুলে ধরেছেন| তিনি জানান, গত সাড়ে ছয় মাস ধরে সংস্থাটিকে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকা করে লোকসান দিতে হচ্ছে| বাজারে জ্বালানি তেলের দাম যদি লিটারে ২০ টাকা না বাড়ানো হতো, তবে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী ডিসেম্বর মাস নাগাদ বিপিসির মোট লোকসানের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকত| তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমান সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত তেলের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি কার্গো বা জাহাজের ভাড়া, ইনস্যুরেন্স প্রিমিয়াম এবং অন্যান্য আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়ে গেছে| এমনকি চড়া দাম দেওয়ার পরও বৈশ্বিক সংকটের কারণে সময়মতো জ্বালানির সরবরাহ পেতে আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ও কাঠখড় পোড়াতে হচ্ছে| চেয়ারম্যানের মতে, লিটারে ২০ টাকা দাম বাড়ানোর ফলে বিপিসির বর্তমান লোকসানের মাত্র এক-চতুর্থাংশ বা পঁচিশ শতাংশ কভার করা সম্ভব হবে, বাকি পঁচাত্তর শতাংশ ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে|
জ্বালানি তেলের পাশাপাশি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানি করতে গিয়েও সরকারের আর্থিক চাপের মাত্রা রীতিমতো আকাশ ছুঁয়েছে| এলএনজি খাতের বিপুল ব্যয় সামাল দিতে গিয়ে পেট্রোবাংলার অবস্থাও এখন অত্যন্ত নাজুক| পরিসংখ্যান বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাত্র আড়াই মাসেই দেশে আমদানিকৃত এলএনজিতে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি প্রদান করতে হয়েছে| অথচ সবচেয়ে বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, পুরো অর্থবছরের জন্য এই খাতে সরকারের মোট ভর্তুকির বরাদ্দ ছিল মাত্র সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা| অর্থাৎ বছরের প্রথম প্রান্তিকেই পুরো বছরের বরাদ্দের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ খরচ হয়ে গেছে| এর বাইরেও গত সাড়ে ছয় মাসে পেট্রোবাংলার পূর্বনির্ধারিত ভর্তুকির বাইরে গিয়ে অতিরিক্ত আরও ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে, যা অর্থনীতির জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত| মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় মারাত্মক বিঘ্ন ঘটা এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার থেকে এলএনজি সরবরাহ হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশকে বাধ্য হয়ে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভর করতে হচ্ছে| এর ফলশ্রুতিতে চলতি বছরের শুরুর দিকে যেখানে প্রতি এমএমবিটিইউ (MMBTU) এলএনজি কেনা হতো মাত্র ১০ থেকে ১২ ডলারে, সেখানে চলতি সেপ্টেম্বরে সেই দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে প্রায় ৩০ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে| অর্থাৎ মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম বেড়ে প্রায় তিনগুণ হয়ে গেছে| বাজার বিশ্লেষকরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন, বর্তমান এই অস্থির বাজার পরিস্থিতি যদি আগামী মাসগুলোতেও অব্যাহত থাকে, তবে চলতি অর্থবছরে এলএনজি আমদানি ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাকে কল্পনাতীত পর্যায়ে নিয়ে যাবে| পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমানও এই বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি স্বীকার করে জানিয়েছেন যে, যুদ্ধের প্রত্যক্ষ প্রভাবে তাদের নির্ধারিত বাজেটের বাইরে বিপুল অঙ্কের অর্থ ইতিমধ্যে ব্যয় হয়ে গেছে|
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত দেশের এই সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে জানান যে, বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর প্রায় ৭০ লাখ মেট্রিক টন জ্বালানি তেল আমদানি করতে হয়, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ অর্থাৎ ৪৫ লাখ মেট্রিক টনই হলো ডিজেল| আন্তর্জাতিক বাজারে বর্তমানে প্রতি লিটার ডিজেল কিনতে গড়ে প্রায় ২০৫ টাকা করে ব্যয় হচ্ছে| দেশে মূল্য সমন্বয়ের আগে এই ডিজেলের খুচরা দাম ছিল মাত্র ১১৫ টাকা, যার ফলে তখন প্রতি লিটারে সরকারের প্রায় ৯০ টাকা করে লোকসান হচ্ছিল| তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, গত মার্চ মাস থেকে আগস্ট পর্যন্ত সময়কালে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় না করার কারণেই বিপিসিকে এই ২২ হাজার ৮৭৫ কোটি টাকার বিশাল লোকসান হজম করতে হয়েছে| স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি কেনার বিষয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীরা বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে ‘ফোর্স মেজর’ বা অনিবার্য কারণ ঘোষণা করায় সরকার অনেকটা বাধ্য হয়েই চড়া দামে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনছে| এতে রাষ্ট্রের বিপুল বাড়তি খরচ হলেও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন দুর্ভোগ লাঘব করা এবং দেশের শিল্পকারখানাগুলোকে উৎপাদনের চাকা সচল রাখার স্বার্থেই সরকার এই বিশাল আর্থিক ঝুঁকি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে|
গ্যাস ও জ্বালানি তেলের এই তীব্র সংকটের সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব গিয়ে পড়েছে দেশের বিদ্যুৎ খাতের ওপর| অভ্যন্তরীণ খনিতে গ্যাসের তীব্র সংকট থাকায় বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ফার্নেস অয়েলের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো হয়েছে| সম্প্রতি পরিস্থিতি সামাল দিতে ফার্নেস অয়েলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ চার হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে| পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম ও পরিবহন ব্যয়ও অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে| এর ফলে চলতি অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪৫ হাজার কোটি টাকা লোকসানের যে প্রাথমিক প্রাক্কলন বা হিসাব ধরা হয়েছিল, বর্তমান বাস্তবতায় তা একলাফে বেড়ে ৬০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) গভীরভাবে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে|
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতিতে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলছেন যে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ও বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি যদি খুব দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না আসে, তবে সরকারের ভর্তুকির চাপ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর লোকসানের পাহাড় একসময় দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে ধসিয়ে দিতে পারে| এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে গিয়ে ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) প্রধান বিশ্লেষক শফিকুল আলম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু পর্যবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের রূপরেখা তুলে ধরেছেন| তিনি বলেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় অন্যান্য আমদানিনির্ভর দেশের মতো বাংলাদেশেও বিপিসির লোকসানের চাপ তীব্রভাবে বেড়েছে এবং সরকার বাধ্য হয়েই দাম বাড়িয়েছে| তবে পরিস্থিতি যদি দীর্ঘমেয়াদি রূপ নেয়, তবে সরকারকে অত্যন্ত সুকৌশলে একদিকে যেমন ভর্তুকি ব্যবস্থাপনা করতে হবে, অন্যদিকে প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানির দাম ধাপে ধাপে সমন্বয় করতে হবে| তিনি স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিয়ে বলেন, দেশের আমদানি করা জ্বালানি তেলের প্রায় ৬০ শতাংশই ব্যবহৃত হয় পরিবহন খাতে| তাই দীর্ঘপথের পরিবহনে যদি সৌরবিদ্যুৎচালিত চার্জিং স্টেশনের মাধ্যমে বৈদ্যুতিক বা ইলেকট্রিক যানবাহনের (ইভি) ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ানো যায়, তবে দেশে ডিজেলের ব্যবহার জাদুকরিভাবে কমানো সম্ভব| ঠিক একইভাবে কৃষিখাতে সৌরচালিত সেচব্যবস্থা বা সোলার ইরিগেশন পাম্পের ব্যবহার বাড়িয়েও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বহুলাংশে কমানো যেতে পারে| এলএনজির ভর্তুকি প্রসঙ্গে এই বিশেষজ্ঞ জানান, বর্তমানে প্রতি এমএমবিটিইউ এলএনজি ২৮ ডলারে আমদানি করার অর্থ হলো, দেশের বাজারে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসে সরকারকে প্রায় ৯০ টাকার বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে| শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে গিয়ে তেলের ব্যবহার আরও বাড়লে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারের সামগ্রিক আর্থিক চাপ আগামী দিনগুলোতে আরও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে, যা মোকাবিলা করতে এখন থেকেই নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে জোরেশোরে পা বাড়াতে হবে|