বঙ্গোপসাগরের সুনীল ও বিস্তীর্ণ জলরাশি বাংলাদেশের অর্থনীতির এক অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি এবং নীল অর্থনীতি বা ব্লু ইকোনমির এক বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার| দীর্ঘকাল ধরেই এই সুবিশাল সমুদ্রসীমার ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে আসছেন লাখো প্রান্তিক জেলে| কিন্তু প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষের যুগেও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া এই অগণিত জেলে এবং তাদের নৌযানগুলো এখনো রয়ে গেছে আধুনিক ডিজিটাল নজরদারির সম্পূর্ণ বাইরে| এবার সেই আদ্যিকালের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার চিরস্থায়ী অবসান ঘটাতে এক যুগান্তকারী ও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার| বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী সকল প্রকার নৌযানকে একটি সার্বক্ষণিক ও নিশ্ছিদ্র স্যাটেলাইট নজরদারির আওতায় নিয়ে আসার এক বিশাল মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে| এই আধুনিক ব্যবস্থাপনার মূলে রয়েছে নৌযানগুলোতে ‘অটোমেটিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা এআইএস (AIS) স্থাপন করা, যা সরাসরি মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র মেরিটাইম এআইএস অবকাঠামো তৈরি করবে| এই মেগা প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে গভীর সমুদ্রে থাকা যেকোনো নৌযানের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, বর্তমান অবস্থান, চলাচলের রিয়েল-টাইম গতি এবং গতিপথের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য সরাসরি উপকূলে স্থাপিত সেন্ট্রাল কমান্ড সেন্টারে বসে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে| শুধু উপকূলীয় এলাকায় নয়, রাজধানী ঢাকার সুরক্ষিত ডেটা সেন্টারে বসেও দেশের নীতিনির্ধারক ও উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো সমুদ্রের প্রতি মুহূর্তের চিত্র লাইভ মনিটর করতে পারবেন|
মূলত গভীর সমুদ্রে প্রবেশ করার পর স্থলের সঙ্গে নৌযানগুলোর যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার যে ভয়াবহ সংকট রয়েছে, তা নিরসন করতেই এমন একটি অত্যাধুনিক উদ্যোগের তীব্র প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে| বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি পেরিয়ে মাছ ধরার ট্রলার ও ছোট ছোট নৌকাগুলো যখনই উপকূল থেকে ধীরে ধীরে দূরে যেতে থাকে, মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যালও ততই দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে শুরু করে| একটি সাধারণ ও স্বাভাবিক অবস্থায় দেশের যেকোনো উপকূল বা নিকটবর্তী দ্বীপ থেকে খুব জোর ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার পর্যন্ত গভীর সমুদ্রে কোনো বিশেষ যন্ত্রপাতির সহায়তা ছাড়াই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায়| এরপর যদি কোনো নৌযানে বিশেষ ধরনের হাই-গেইন কোস্টাল অ্যান্টেনা এবং শক্তিশালী সিগন্যাল বুস্টার লাগানো থাকে, তবে এই নেটওয়ার্কের পরিসর সর্বোচ্চ ৩৮ থেকে ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত টেনেটুনে বাড়ানো সম্ভব হয়| কিন্তু এরপর বিশাল সমুদ্রের বাকি অংশটি একটি গভীর ‘কমিউনিকেশন ব্ল্যাকহোল’ বা সম্পূর্ণ নেটওয়ার্কবিহীন এলাকায় পরিণত হয়| নৌযানগুলো এই সীমানা পার হওয়ার পর সেগুলো সম্পূর্ণভাবে আধুনিক যোগাযোগের আওতার বাইরে চলে যায়| ফলস্বরূপ, ওই নৌযানগুলোর তাৎক্ষণিক অবস্থান, গন্তব্যস্থল কিংবা বর্তমান গতি সম্পর্কে জানার আর কোনো বিজ্ঞানসম্মত উপায় বা সুযোগ স্থলভাগে থাকা কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে না|
এই চরম যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে গভীর সমুদ্রে অবস্থানকালে কোনো মাছ ধরার নৌযান যদি হঠাৎ করে সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক যান্ত্রিক ত্রুটি কিংবা অন্য কোনো নৌযানের সঙ্গে সংঘর্ষের মতো ভয়াবহ দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, তবে সেগুলোর সুনির্দিষ্ট অবস্থান শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়| নৌযানটি সবশেষ কোন অক্ষাংশ বা দ্রাঘিমাংশে ছিল, কিংবা বিপদের সময় তারা ঠিক কোন দিকে অগ্রসর হচ্ছিল— এমন ন্যূনতম তথ্যও উদ্ধারকারীদের কাছে না থাকায় অনুসন্ধান কাজ চরমভাবে ব্যাহত হয়| ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটারের বিশাল ও ভয়ংকর সমুদ্র এলাকায় একটি ছোট্ট নিখোঁজ নৌযান খুঁজে বের করা যেমন অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ব্যাপার, তেমনি তা উদ্ধারকারী বাহিনীর জন্য শারীরিকভাবেও মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ| সঠিক সময়ে সঠিক অবস্থানের তথ্য না পাওয়ার কারণে দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করা সম্ভব হয় না, যার নির্মম পরিণতিতে প্রতি বছরই অসংখ্য জেলের সলিল সমাধি ঘটে এবং অনেককে আর কখনোই উদ্ধার করা সম্ভব হয় না|
কিন্তু প্রস্তাবিত এই অত্যাধুনিক স্যাটেলাইটভিত্তিক এআইএস ব্যবস্থা পুরোদমে চালু হলে সমুদ্রবক্ষের এই চিরচেনা অন্ধকার চিত্রটি জাদুর মতো বদলে যাবে| প্রতিটি নৌযানে বসানো এআইএস ডিভাইসের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাপ্ত পরিচয়, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমাংশ ভিত্তিক অবস্থান, সামুদ্রিক গতি এবং গতিপথের এনক্রিপ্টেড তথ্য মহাকাশে থাকা স্যাটেলাইটের সাহায্যে সোজা পৌঁছে যাবে সেন্ট্রাল ডেটা সিস্টেমে| ফলে প্রচলিত মোবাইল নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা আর কোনো বাধাই তৈরি করতে পারবে না| মোবাইল টাওয়ারের আওতার বাইরে থাকা নৌযানগুলোও তাদের নির্দিষ্ট ডিজিটাল পরিচয়ের মাধ্যমে প্রতি মুহূর্তে কর্তৃপক্ষের সার্বক্ষণিক ও নিশ্ছিদ্র নজরদারির আওতায় সুরক্ষিত থাকবে|
দেশের একমাত্র স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী সরকারি মেগা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা যায়, এই স্বতন্ত্র ও সম্পূর্ণ ডেডিকেটেড মেরিটাইম এআইএস ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য মহাকাশে চারটি লো আর্থ অরবিট বা এলইও (LEO) স্যাটেলাইট নিয়ে একটি সমন্বিত ‘স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন’ বা স্যাটেলাইটের ঝাঁক গড়ে তোলার বিশাল পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে| বঙ্গোপসাগরে চলাচলকারী দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার নৌযানকে সার্বক্ষণিক নজরদারিতে আনতে এই এআইএস স্যাটেলাইট প্রযুক্তি হবে গেম চেঞ্জার| তবে এত বড় একটি উদ্যোগ রাতারাতি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়, এটি বর্তমানে একদম প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে| কারিগরি নকশা প্রণয়ন, অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতা যাচাই, বিপুল পরিমাণ অর্থায়ন নিশ্চিতকরণ এবং আন্তর্জাতিক দরপত্র বা টেন্ডার প্রক্রিয়াসহ বিভিন্ন জটিল বিষয়ে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা চলছে| ফলে শেষ পর্যন্ত ঠিক কতটি স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হবে এবং পুরো সিস্টেমটি কীভাবে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হবে, তা পরবর্তী ধাপের কারিগরি মূল্যায়নের পর চূড়ান্ত করা হবে|
এই বিশাল পরিকল্পনার বিষয়টি নিশ্চিত করে মৎস্য অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম জানান যে, মাছ ধরার নৌযানগুলোকে একটি শক্তিশালী স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারির আওতায় আনার বিষয়ে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা চলছে| এ বিষয়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে এবং কেন্দ্রীয়ভাবেও বেশ কয়েকটি সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে| তবে এত বিশাল একটি কর্মযজ্ঞ ঠিক কীভাবে এবং কোন পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো রূপরেখা এখনও পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়নি| তিনি আরও পরিষ্কার করেন যে, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে একটি ব্যাপকভিত্তিক পরিকল্পনা ও আলোচনা চলছে এবং বিএসসিএলের সঙ্গে কীভাবে সবচেয়ে সাশ্রয়ী ও কার্যকর উপায়ে কাজটি সম্পন্ন করা যায়, তার একটি বৈজ্ঞানিক যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে|
সরকারি পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার সর্বমোট আয়তন প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার| এই বিশাল ও বিস্তৃত জলসীমায় জীবন-জীবিকার তাগিদে প্রতিনিয়ত মাছ ধরতে যায় প্রায় ৩০ হাজার ছোট-বড় নৌযান| এত বিপুল সংখ্যক নৌযানের মধ্যে কোনটি আসলেই মাছ ধরছে, আর কোনটি মাছ ধরার আড়ালে অন্য কোনো অবৈধ কাজে লিপ্ত আছে বা চোরাচালানের উদ্দেশ্যে অন্য দেশের গন্তব্যে যাচ্ছে, তা বর্তমান ব্যবস্থায় আলাদাভাবে শনাক্ত করে সার্বক্ষণিক নজরে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়| এর বাইরেও আমাদের সমুদ্রসীমায় প্রতিদিন অসংখ্য বাণিজ্যিক জাহাজ এবং অন্যান্য দেশি-বিদেশি নৌযান চলাচল করে| ফলে এত বিস্তৃত ও কোলাহলপূর্ণ জলসীমায় প্রতিটি নৌযানের অবস্থান ও গতিবিধি নিয়মিতভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তিতে পর্যবেক্ষণ করা সরকারের জন্য একটি অতিকায় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে|
মৎস্য অধিদপ্তরের কাছে থাকা তথ্য ও হিসাব অনুযায়ী, সামুদ্রিক মৎস্য আহরণ খাতে সরাসরি যুক্ত নিবন্ধিত নৌযানের সংখ্যা বর্তমানে ২৮ হাজার ৮১২টি| এর মধ্যে বড় আকারের আধুনিক শিল্প ট্রলার রয়েছে ২৩৭টি এবং যান্ত্রিক ও সনাতনী আর্টিজানাল নৌযান রয়েছে ২৮ হাজার ৫৭৫টি| তবে সমুদ্রে একটি বড় ধরনের সার্বিক জরিপ এবং তথ্য হালনাগাদ কার্যক্রম সম্পন্ন করার পর এই পরিসংখ্যানে কিছুটা পরিবর্তন আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে| কারণ এর বাইরেও অনেক অনিবন্ধিত নৌযান রয়েছে| ছোট-বড় এবং নিবন্ধিত-অনিবন্ধিত মিলিয়ে প্রায় ৩০ হাজার নৌযানের এই বিশাল ও অগোছালো বহরকে একটি সুশৃঙ্খল নিয়মিত ডিজিটাল নজরদারির আওতায় আনা সত্যিই একটি যুগান্তকারী কাজ হবে|
অবশ্য সমুদ্রে এই নজরদারি ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা যে অতীতে হয়নি, তা নয়| চট্টগ্রাম সামুদ্রিক মৎস্য দপ্তরের উপপরিচালক শওকত কবির চৌধুরী এ প্রসঙ্গে জানান, বিশ্বব্যাংকের বিপুল অর্থায়নে বাস্তবায়িত ‘সাসটেইনেবল কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন ফিশারিজ’ নামক একটি মেগা প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে এই নৌযানগুলোর ওপর একটি বিস্তৃত সমীক্ষা চালানো হয়েছিল| সেই সমীক্ষার একেবারে শুরুর দিকে প্রায় ২৯ হাজার নৌযানের অস্তিত্বের তথ্য মিললেও পরবর্তীতে ফিল্ড লেভেলে কাজ করে তা আরও নিখুঁতভাবে হালনাগাদ করা হয়| একই প্রকল্পের আওতায় সমুদ্রগামী ছোট নৌযানগুলোতে ট্রায়াল হিসেবে প্রায় ১০ হাজার ট্র্যাকিং ডিভাইস বিনা মূল্যে প্রদান করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ওই নৌযানগুলোর অবস্থান ও গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতো| পাশাপাশি পাঁচটি অত্যন্ত বড় শিল্প ট্রলারে ‘ভেসেল মনিটরিং ডিভাইস’ বসিয়ে একটি সফল পাইলটিং কার্যক্রমও পরিচালিত হয়| কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ওই প্রকল্পের নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন বিদেশি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যায়, তখন সেই অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ডিজিটাল তদারকি কার্যক্রমটিও টাকার অভাবে আপাতত মুখ থুবড়ে পড়ে|
বর্তমান পরিস্থিতির ভয়াবহতা উল্লেখ করে শওকত কবির চৌধুরী জানান, মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বর্তমানে সমুদ্রে থাকা নৌযানগুলোকে আগের মতো ডিজিটাল ব্যবস্থায় নিয়মিত তদারকি করা কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না| পূর্বের প্রকল্পের আওতায় স্যাটেলাইট ও বিদ্যমান মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে যে চমৎকার কার্যক্রমটি চালানো হয়েছিল, নতুন করে অর্থায়ন না থাকায় সেটি এখন পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে| তবে ডিজিটাল নজরদারি না থাকলেও নৌযানের শারীরিক নজরদারি ব্যবস্থা একেবারে বন্ধ নেই| বর্তমানে একটি সার্ভিলেন্স চেকপোস্টের মাধ্যমে ম্যানুয়ালি নৌযানের যাতায়াত পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা বিভিন্ন শিফটে কর্মকর্তা ও পরিদর্শকরা তাদের দায়িত্ব পালন করে থাকেন| পাশাপাশি প্রচলিত সামুদ্রিক আইন অনুযায়ী সমুদ্রে রুটিন টহলের সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনী এবং কোস্টগার্ড মাছ ধরার নৌযানগুলো মাঝেমধ্যেই পরিদর্শন করে থাকে| কিন্তু এই বিশাল সমুদ্রে ম্যানুয়াল চেকিং যে কতটা অপ্রতুল, তা সহজেই অনুমেয়|
এই বিশাল সীমাবদ্ধতার মাঝেই সমুদ্রে নৌযানের ডিজিটাল নজরদারি ব্যবস্থা ফের চালু করতে নতুন এই স্যাটেলাইটভিত্তিক উদ্যোগের কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড এখন মাছ ধরার নৌযানের জন্য এআইএস ডিভাইস চালুর একটি যুগান্তকারী প্রকল্প নিয়ে জোরেশোরে কাজ করছে| এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড এবং অন্যান্য অংশীজনদের মধ্যে অত্যন্ত নিবিড় আলোচনা চলছে| প্রস্তাবিত এই নতুন ব্যবস্থায় প্রতিটি নৌযানের জন্য একটি করে স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয়ের ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা অনেকটা মহাসড়কে চলা যানবাহনের নম্বরপ্লেটের মতো জাদুকরী কাজ করবে| এই ডিজিটাল নামফলকের মাধ্যমে সমুদ্রে থাকা প্রতিটি নৌযানকে আলাদাভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে| নৌযানে থাকা আধুনিক এআইএস ডিভাইস থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেটির নাম, ডিজিটাল পরিচয়, তাৎক্ষণিক জিপিএস অবস্থান, নটিক্যাল মাইল হিসেবে গতি এবং চলাচলের নির্দিষ্ট দিকের ডেটা পাওয়া যাবে| এই অমূল্য ডেটাগুলো স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যেই সরাসরি পৌঁছে যাবে ঢাকার কেন্দ্রীয় ডেটা সিস্টেমে|
কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় এসব ডেটা জমা হলে কমান্ড সেন্টারে থাকা বিশাল স্ক্রিনে একপলকেই দেখে নেওয়া সম্ভব হবে যে, একটি নির্দিষ্ট নৌযান ঠিক কোন অক্ষাংশ ও দ্রাঘিমাংশে অবস্থান করছে, সেটির মুখ কোন দিকে এবং এর চলাচলের ধরন সন্দেহজনক কি না| কোনো নৌযানের স্বাভাবিক গতিপথে যদি হঠাৎ কোনো অস্বাভাবিকতা বা দিক পরিবর্তনের অনিশ্চয়তা দেখা যায়, তবে সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম দেবে এবং সেটিকে আলাদাভাবে নজরদারিতে আনার সুযোগ তৈরি হবে| এছাড়াও প্রস্তাবিত এই ব্যবস্থায় নৌযান থেকে সরাসরি জরুরি সংকেত বা ‘এসওএস’ (SOS) পাঠানোর একটি লাইফ-সেভিং সুবিধা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে| কোনো নৌযান গভীর সমুদ্রে যদি ডাকাতদের কবলে পড়ে, ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায় বা ঝড়ে বিপদে পড়ে, তবে সেখান থেকে একটি বাটন চেপে সংকেত পাঠানোমাত্রই তা স্যাটেলাইট হয়ে সোজা কেন্দ্রীয় কমান্ড সেন্টারে পৌঁছে যাবে| এতে নৌবাহিনী বা কোস্টগার্ডের মতো উদ্ধারকারী সংস্থাগুলো কোনো রকম সময়ক্ষেপণ ছাড়াই দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট স্থানে নিখুঁত উদ্ধার অভিযান চালাতে পারবে, যা জেলেদের মৃত্যুর হার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনবে|
সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও মৎস্য কর্মকর্তারা বলছেন, এই অত্যাধুনিক প্রযুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে এর প্রাপ্ত তথ্যের ব্যবহার কেবল জাতীয় নিরাপত্তা বা ট্র্যাকিংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি ব্লু ইকোনমি বা সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ উন্নয়নেও অভাবনীয় এক ভূমিকা রাখবে| কারণ, বঙ্গোপসাগরের বিপুল ও বৈচিত্র্যময় মৎস্যসম্পদের একটি অনেক বড় অংশ এখনও আমাদের ধরাছোঁয়ার ও ব্যবহারের বাইরে রয়ে গেছে| বিশেষ করে গভীর সমুদ্রের বা পেলাজিক জোনের মৎস্যসম্পদ বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে আহরণ ও ব্যবস্থাপনায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের বিশাল অভাব রয়েছে দেশে| মৎস্য অধিদপ্তরের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের সামুদ্রিক উৎস থেকে মোট ৬ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত ও আহরিত হয়েছে, যেখানে ওই একই বছর সারা দেশের অভ্যন্তরীণ ও সামুদ্রিক মিলিয়ে সর্বমোট মাছের উৎপাদন ছিল ৫০ দশমিক ১৮ লাখ মেট্রিক টন| তবে, সামুদ্রিক মাছের উৎপাদনে প্রতি বছরই বেশ ওঠানামা দেখা যায়, যা বিজ্ঞানসম্মত ব্যবস্থাপনার অভাবকেই নির্দেশ করে| যেমন— ২০১৯-২০ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৬ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন, ২০২০-২১ অর্থবছরে সামান্য বেড়ে ৬ দশমিক ৮১ লাখ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে তা বেশ কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ দশমিক ৬ লাখ মেট্রিক টনে| কিন্তু পরবর্তী সময়ে এই ধারা ধরে রাখা যায়নি, ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন কমে ৬ দশমিক ৭৯ লাখ এবং সবশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা আরও কমে ৬ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে নেমে আসে|
বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতি ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ জাতীয় মাছ ইলিশের সঙ্গে এই সমুদ্রের সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও গভীর| ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিশাল সামুদ্রিক উৎস থেকে ২ দশমিক ৮১ লাখ মেট্রিক টন রূপালি ইলিশ আহরিত হয়েছে, আর নদীর মতো অভ্যন্তরীণ জলাশয় থেকে এসেছে ২ দশমিক ৪৮ লাখ টন| সবমিলিয়ে ওই অর্থবছর ইলিশের মোট উৎপাদন দাঁড়ায় ৫ দশমিক ২৯ লাখ মেট্রিক টনে| ফলে সমুদ্রে কোন নৌযান ঠিক কোন মৌসুমে কোথায় যাচ্ছে, কোথায় কতক্ষণ ধরে মাছ ধরছে এবং কখন কতটুকু মাছ নিয়ে উপকূলে ফিরছে— এসব ডেটা যদি নিয়মিত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া যায়, তবে মাছ আহরণের ধরন ও পরিধি নিয়ে সরকারের হাতে একটি অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও বিশাল ডেটাভান্ডার তৈরি হবে| এই বিগ ডেটা বিশ্লেষণ করে অতিরিক্ত মৎস্য আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা, বিপন্ন প্রজাতি সংরক্ষণ করা এবং সমুদ্র সুরক্ষায় টেকসই নীতি নির্ধারণে ব্যাপকভাবে সফলতা আসবে|
তবে এই প্রযুক্তিটি নিয়ে একটি বিষয় মনে রাখা অত্যন্ত প্রয়োজন, এআইএসের মূল কাজ কিন্তু সমুদ্রের নিচে মাছের অবস্থান চিহ্নিত করা নয়; এর প্রধান ও একমাত্র কাজ হলো পানির ওপরে ভাসা নৌযানের ডিজিটাল পরিচয় ও গতিবিধি কঠোর নজরদারিতে রাখা| সমুদ্রে ঠিক কোন পয়েন্টে মাছের ঝাঁকের উপস্থিতি বেশি, তা সঠিকভাবে জানতে হলে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রযুক্তির আশ্রয় নিতে হবে| সমুদ্রের পানির লেভেলের তাপমাত্রা, পানির রঙ, ক্লোরোফিলের মাত্রা, ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের উপস্থিতি ও সমুদ্রস্রোতের গতিপথের মতো জটিল তথ্য স্যাটেলাইট রিমোট সেন্সিংয়ের মাধ্যমে জানা যায়| আবার সরাসরি মাছের ঝাঁক শনাক্ত করতে নৌযানের নিচে ব্যবহৃত হয় সোনার (SONAR) ও ইকো-সাউন্ডার-এর মতো শব্দতরঙ্গভিত্তিক ডিভাইস| সহজ কথায় বললে, এআইএস প্রযুক্তি কর্তৃপক্ষকে জানাবে ‘নৌযানটি ঠিক এখন কোথায় আছে’, আর সমুদ্রবিজ্ঞানভিত্তিক অন্যান্য সেন্সরগুলো জেলেদের জানাবে ‘সমুদ্রের ঠিক কোথায় মাছ পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি’| এই দুই ধরনের সম্পূর্ণ ভিন্ন ডেটার যখন সমন্বিত বিশ্লেষণ করা হবে, তখন ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগরে তথ্যভিত্তিক ও আধুনিক মৎস্য ব্যবস্থাপনার এক নতুন ও সোনালী দিগন্ত উন্মোচিত হবে, যা ভবিষ্যতের ব্লু-ইকোনমিকে নেতৃত্ব দেবে|
এই মেগা মেরিটাইম এআইএস ব্যবস্থাটি বাস্তবায়নে যে ৪টি লো আর্থ অরবিট বা লিও স্যাটেলাইট ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার বৈজ্ঞানিক কারণও রয়েছে| পৃথিবীর খুব কাছাকাছি কক্ষপথে অবস্থানকারী এই স্যাটেলাইটগুলো যখন প্রচণ্ড গতিতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে অতিক্রম করবে, তখন তারা সেকেন্ডের ভগ্নাংশে নৌযানগুলোর এআইএস সংকেত গ্রহণ করবে এবং তা তাৎক্ষণিকভাবে রিলে করে কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টারে পাঠিয়ে দেবে| যেহেতু এই স্যাটেলাইটগুলো খুব দ্রুত স্থান পরিবর্তন করে, তাই একটি স্যাটেলাইটের কাভারেজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অন্য একটি স্যাটেলাইটের কাভারেজ শুরু হবে| এই ধারাবাহিক ‘হ্যান্ডওভার’ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সমুদ্রে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন নজরদারির একটি সমন্বিত ও স্বয়ংক্রিয় কাঠামো তৈরি করা হবে| তবে, একটি স্যাটেলাইট নির্দিষ্ট জলসীমার ওপর ঠিক কতক্ষণ অবস্থান করবে, একবার চলে যাওয়ার কত সময় পর পুনরায় একই এলাকায় ফিরে আসবে এবং ডেটা আদান-প্রদান কতটা নিরবচ্ছিন্ন ও দ্রুত হবে— তা নির্ভর করবে স্যাটেলাইটের চূড়ান্ত অর্বিটাল কক্ষপথ, ট্রান্সপন্ডারের কার্যক্ষমতা এবং পুরো ব্যবস্থার নিখুঁত কারিগরি নকশার ওপর|
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, বর্তমানে মহাকাশে থাকা আমাদের নিজস্ব স্যাটেলাইট ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ (বিএস-১) কি এই নজরদারির কাজে ব্যবহার করা যাবে না? এই প্রশ্নের সুস্পষ্ট জবাবে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি কর্মকর্তারা জানান, বিএস-১ মূলত একটি জিওস্টেশনারি কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট, যা টেলিভিশন সম্প্রচার ও সাধারণ টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য নির্দিষ্টভাবে তৈরি| সমুদ্রে হাজার হাজার নৌযানের ডিজিটাল পরিচয় ও গতিবিধি স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক তদারকি করতে হলে সম্পূর্ণ আলাদা রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবং ডেডিকেটেড মেরিটাইম এআইএস অবকাঠামো প্রয়োজন, যা বিএস-১ এ নেই| আর ঠিক সেই কারিগরি প্রয়োজনীয়তা থেকেই চারটি এলইও স্যাটেলাইটের সমন্বয়ে একটি সম্পূর্ণ নতুন ‘স্যাটেলাইট কনস্টেলেশন’ গড়ে তোলার এই যুগান্তকারী পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে|
বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলসীমায় এই স্যাটেলাইটভিত্তিক নৌযান ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করতে উন্নত প্রযুক্তি ও বিশাল অর্থায়ন— উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের সামনে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে| এই মহাপরিকল্পনা সফল করতে হলে ৩০ হাজার নৌযানে এআইএস ডিভাইস স্থাপন, মহাকাশে স্যাটেলাইট ও মাটিতে গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি, সার্ভারে ডেটা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ এবং নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, মৎস্য অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের একটি রিয়েল-টাইম সমন্বিত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে| পাশাপাশি স্বল্পশিক্ষিত নৌযান চালক ও সাধারণ জেলেদের এই উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে অভ্যস্ত করতে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশিক্ষণের বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় রাখতে হবে|
এমন একটি বিশাল কর্মযজ্ঞকে বাস্তব ও টেকসই রূপ দিতে সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে পুরো প্রযুক্তির ব্লু-প্রিন্ট, প্রয়োজনীয় স্যাটেলাইটের সংখ্যা, গ্রাউন্ড অবকাঠামো, সম্ভাব্য ব্যয় ও রাজস্ব আয়ের মডেল যাচাইয়ের নিবিড় পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের| বিশাল অর্থ ব্যয়ে নিজস্ব স্যাটেলাইট তৈরি ও উৎক্ষেপণ করা পর্যন্ত বসে না থেকে, প্রাথমিক পর্যায়ে বন্ধুপ্রতিম বিদেশি কোনো দেশের স্যাটেলাইট সেবা ভাড়া করে সীমিত পরিসরে একটি পাইলট প্রকল্প চালুর বাস্তবমুখী পরিকল্পনাও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে| এই পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক নৌযান থেকে ডেটা সংগ্রহ, গ্রাউন্ড স্টেশনে তা সফলভাবে গ্রহণ, কেন্দ্রীয় ডেটা সিস্টেমে তা সংরক্ষণ এবং বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ড্যাশবোর্ডে সেই তথ্য পৌঁছানোর পুরো সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার প্রক্রিয়াটি রিয়েল-টাইম পরীক্ষা করা সম্ভব হবে|
পুরো বিষয়টির সারসংক্ষেপ টেনে বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. ইমাদুর রহমান বলেন, বঙ্গোপসাগরের বুকে চলাচলকারী দেশের একটি নৌযানও যেন কখনো রাষ্ট্রের নজরদারির বাইরে হারিয়ে না যায়, ঠিক সেই মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখেই এই মেগা মহাপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে| প্রতিটি নৌযানের সুনির্দিষ্ট পরিচয়, সমুদ্রের বুকে বর্তমান অবস্থান, চলাচলের গতি ও গতিপথ নিখুঁতভাবে জানার পাশাপাশি কোনো নৌযান প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা যান্ত্রিক ত্রুটিতে বিপদে পড়লে দ্রুততম সময়ে তার অবস্থান শনাক্ত করে সফল উদ্ধারকাজ চালানোই এই পুরো প্রজেক্টের প্রধান উদ্দেশ্য| তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানান যে, এটি শুধু মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠানো বা সাময়িক কোনো পাইলট উদ্যোগ নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা| এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নৌযানের ছোট ডিভাইস থেকে শুরু করে গ্রাউন্ড স্টেশন, বিশালাকার ডেটা সেন্টার ও সব সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাকে একই ছাতার নিচে এনে একটি সমন্বিত কাঠামোর আওতায় যুক্ত করতে হবে| দেশের নৌবাহিনী, কোস্টগার্ড, মৎস্য অধিদপ্তর, সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর এবং বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সব সংস্থার নিজস্ব প্রয়োজন অনুযায়ী এই ডেটা ব্যবহারের এক্সেস বা সুযোগ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে| এই মহাপরিকল্পনা সফল হলে ২০২৮ সাল নাগাদ বঙ্গোপসাগরের বুকে নজরদারির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এক অভাবনীয় উচ্চতায় পৌঁছাবে, যা দেশের নীল অর্থনীতিকে এক নতুন দিগন্তের সন্ধান দেবে|
তথ্যসূত্র: ঢাকাপোস্ট