দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটানো এবং শিল্প খাতের প্রসার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার যখন বহুমুখী বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছে, ঠিক তখনই এক বিশাল অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে পটুয়াখালীর পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় ইউনিটের ভবিষ্যৎ। চীনের পরিবর্তিত পরিবেশবান্ধব বৈশ্বিক জ্বালানি নীতি এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট দীর্ঘমেয়াদি স্থবিরতার কারণে এই মেগা প্রকল্পটির বাস্তবায়ন এখন রীতিমতো প্রশ্নের মুখে। সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রায় দেড় বছরের নিষ্ক্রিয়তা এবং চীনের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতে অর্থায়ন বন্ধের কঠোর ঘোষণার ফলে পায়রার এই দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য চীনা এক্সিম ব্যাংকের (সি এক্সিম ব্যাংক) প্রতিশ্রুত প্রায় দেড় বিলিয়ন বা ১৫০ কোটি মার্কিন ডলারের বিশাল ঋণ প্রাপ্তি এক গভীর সংকটে পড়েছে। বর্তমান নির্বাচিত সরকার এই কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির নির্মাণকাজ দ্রুত শুরু করতে অত্যন্ত আগ্রহী হলেও, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের কার্যকর ঐকমত্য ছাড়া এই জটিল জট খোলা কার্যত অসম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
পায়রাতে বর্তমানে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। দেশের বিদ্যুতের বেইজ লোড সামলাতে এই কেন্দ্রটি একটি বড় ভূমিকা পালন করে আসছে। এই সাফল্যের ধারাবাহিকতাতেই সেখানে ঠিক একই উৎপাদন ক্ষমতার (১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট) আরও একটি দ্বিতীয় ইউনিট নির্মাণের বিশদ মহাপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল। এই মেগা প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় জমি অধিগ্রহণ, ভূমি উন্নয়ন, প্রাথমিক অবকাঠামো নির্মাণসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করে রাখা হয়েছে। এমনকি কেন্দ্রটির দরপত্র বা টেন্ডার আহ্বান করে ইপিসি (ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন) ঠিকাদার নিয়োগের বিষয়টিও একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নের জন্য চীনা এক্সিম ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ অনুমোদনের চূড়ান্ত আলোচনাও প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই সন্ধিক্ষণেই ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে এক অভূতপূর্ব ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক সরকারের আকস্মিক পতন ঘটে। এরপর থেকেই মূলত প্রকল্পটির চাকা পুরোপুরি থমকে যায়। আগে যেখানে যতটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছিল, গত দীর্ঘ সময়ে তা ঠিক সেখানেই নিশ্চল অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
রাজনৈতিক এই আকস্মিক পটপরিবর্তনের পর দেশের শাসনভার গ্রহণ করা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দীর্ঘ আঠারো মাসের শাসনামলে বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এক ধরনের চরম স্থবিরতা ও অনাস্থা পরিলক্ষিত হয়। সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো একটি অরাজনৈতিক কাঠামোর অধীনে চীনের বড় বড় সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলো কোনো ধরনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ না করার বিষয়ে একটি অনানুষ্ঠানিক কিন্তু কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল। শুধু চীনই নয়, বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সেই দেড় বছর মেয়াদে বিশ্বের অন্য কোনো দেশের বিনিয়োগ বা মেগা প্রজেক্টের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো জোরালো বা দৃশ্যমান কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘ এই স্থবিরতার পর অবশেষে জাতীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে সরকার গঠনের পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনতে প্রথমেই চীন সফরে যান। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং সে দেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের পর, একটি বিশাল ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগকারী বন্ধু রাষ্ট্র হিসেবে চীনকে আবারও বাংলাদেশের পাশে পেতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ আগ্রহ দেখাচ্ছে।
চীন সফর শেষে দেশে ফেরার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আটকে থাকা সব কটি চীনা মেগা প্রকল্প নতুন উদ্যমে ফের এগিয়ে নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন। প্রধানমন্ত্রীর এই সুস্পষ্ট নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডকে (বিসিপিসিএল) পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটটি দ্রুত বাস্তবায়ন করার জন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ জানানো হয়। শুধু তাই নয়, ভবিষ্যতে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের জন্য পায়রা থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত একটি ডেডিকেটেড উচ্চ ক্ষমতার সঞ্চালন লাইন নির্মাণের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিও এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত করা হয়েছে।
বর্তমান সরকারের এই অগ্রাধিকারের পেছনে রয়েছে এক গভীর সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমীকরণ। দেশে তীব্র মাত্রার যে গ্যাস ও জ্বালানি সংকট শুরু হয়েছে, তা মোকাবিলা করতে সরকার এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে জ্বালানি বহুমুখীকরণের পথে হাঁটছে। মূলত আগের সরকারের নেওয়া নীতি অনুসরণ করেই বিদ্যুৎ বিভাগ মহেশখালীর মাতারবাড়ী এবং পটুয়াখালীর পায়রাতে আটকে থাকা কয়লাভিত্তিক মেগা প্রকল্প দুটি দ্রুত বাস্তবায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুটি বিশাল প্রকল্প সফলভাবে আলোর মুখ দেখলে প্রতিদিন জাতীয় গ্রিডে অন্ততপক্ষে আরও ২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি সাশ্রয়ী কয়লাচালিত বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এর সবচেয়ে বড় ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক গ্যাসের মজুতের ওপর। বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে সেই বেঁচে যাওয়া গ্যাস দেশের বিপুল সংখ্যক তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পেলে কারখানার চাকা পুরোদমে ঘুরবে, যার ফলে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে বলে নীতিনির্ধারকরা জোরালো আশা পোষণ করছেন।
কিন্তু বাংলাদেশ সরকার যতই আগ্রহী হোক না কেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে চীনের পরিবর্তিত বৈশ্বিক পরিবেশ নীতিই এই প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় ও দুর্লঙ্ঘ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারির চরম সংকটের সময়, ২০২১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চীনের প্রতাপশালী প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বেইজিং থেকে ভিডিও লিংকের মাধ্যমে সরাসরি জাতিসংঘের ৭৬তম সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে অংশ নিয়েছিলেন। সেখানে ‘আত্মবিশ্বাস জোরদার করা এবং যৌথভাবে সংকট মোকাবিলা করে আরও সুন্দর একটি বিশ্ব গড়ে তোলা’ শিরোনামের এক ঐতিহাসিক বক্তব্যে তিনি বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে চীনের নতুন ও কঠোর অবস্থান ঘোষণা করেন। ওই ভাষণে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং স্পষ্ট করে বলেছিলেন যে, ২০৩০ সালের আগেই চীন তাদের কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাবে এবং ২০৬০ সালের আগেই কার্বন নিরপেক্ষতা বা নেট-জিরো লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে। সবচেয়ে বড় যে ঘোষণাটি তিনি দিয়েছিলেন তা হলো, চীন এখন থেকে বিশ্বের অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে সবুজ ও নিম্ন-কার্বন জ্বালানি উৎপাদনে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা ব্যাপকভাবে বাড়াবে এবং দেশের সীমানার বাইরে বিদেশে নতুন করে আর কোনো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে বা অর্থায়নে অংশ নেবে না।
চীনা প্রেসিডেন্টের এই যুগান্তকারী ও কঠোর ঘোষণার পরপরই চীন সরকার তাদের দেশের বাইরে বিদেশে নতুন যেকোনো কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে সব ধরনের আর্থিক সহায়তা ও ঋণ প্রদান সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেয়। এরপর থেকে চীনের কোনো সরকারি বা বেসরকারি কোম্পানি বিশ্বের কোনো দেশের নতুন কয়লাচালিত কেন্দ্র নির্মাণে ইপিসি ঠিকাদার হিসেবেও দরপত্র জমা দিচ্ছে না। বিসিপিসিএলের একটি অত্যন্ত দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, চীনের এই নীতি ঘোষণার পর যখন সি এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ঋণ নিয়ে আলোচনা চলছিল, তখন কৌশলে এই পায়রা দ্বিতীয় ইউনিট প্রকল্পটিকে সম্পূর্ণ ‘নতুন’ প্রকল্প হিসেবে না দেখিয়ে একটি ‘চলমান’ বা ‘অনগোয়িং’ প্রকল্পের সম্প্রসারণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। এই আইনি ও কারিগরি ব্যাখ্যার কারণে সে সময় এক্সিম ব্যাংক প্রকল্পটিতে দেড় বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণ দিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ২০২৪ সালের আগস্টের সরকার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো পক্ষের থেকেই আর নতুন করে কোনো আলোচনা বা কূটনৈতিক যোগাযোগ করা হয়নি। সূত্রটির মতে, সেই পুরোনো আলোচনার প্রায় তিন বছর পর আজ নতুন করে সি এক্সিম ব্যাংকের কাছে পুনরায় ওই বিপুল পরিমাণ ঋণ চাইতে গেলে আইনিভাবে এই প্রকল্পটিকে আর ‘চলমান’ দেখানো অত্যন্ত কঠিন ও অতিরঞ্জিত মনে হবে। এই বিশাল জটিলতা নিরসনের জন্য এখন দুই দেশের একেবারে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে একটি গভীর ও কার্যকর সমাধান প্রয়োজন। দুই দেশের সরকারপ্রধানদের প্রত্যক্ষ ঐকমত্য ছাড়া এই সমস্যার সমাধান কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যে বিশাল ঋণটি দেওয়ার বিষয়ে একসময় সি এক্সিম ব্যাংক অত্যন্ত সম্মত অবস্থায় ছিল, দীর্ঘসূত্রতা ও নীতির পরিবর্তনের কারণে আজ তা অনেক দূরে সরে গেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শুধু চীনা নীতিই নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি খাতে সাম্প্রতিক কিছু রদবদল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনে চরম আস্থার সংকট ও গভীর অনাস্থা তৈরি করেছে। বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি বিশেষ আইন ২০১০’-এর ব্যাপক অপব্যবহার রোধ করার নামে একেবারে ঢালাওভাবে ৩৪টি সৌরবিদ্যুৎ বা সোলার পাওয়ার কেন্দ্রের সরকারি অনুমোদন বাতিল করা হয়েছিল। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার পুরোনো অনেক বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি (পিপিএ) জোরপূর্বক সংশোধনের যে বিতর্কিত উদ্যোগ নিয়েছিল, বর্তমান নির্বাচিত সরকারও সেই একই ধারা অব্যাহত রেখেছে। এর পাশাপাশি অর্থাভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাওনা বিলও দিনের পর দিন আটকে পড়ছে। এ ধরনের নীতিগত অস্থিরতা ও চুক্তির খেলাপ হওয়ার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে চরম মাত্রায় স্নায়বিক টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক বিদ্যুৎ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে স্বীকার করেছেন যে, সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গেই পূর্ববর্তী সরকারের করা চুক্তি বাতিলের এই সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি অত্যন্ত নেতিবাচক ও ভীতিকর বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। একটি রাষ্ট্রের নীতিতে ধারাবাহিকতা না থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা কখনোই কোটি কোটি ডলারের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না বলে তিনি সতর্ক করে দেন।
বিনিয়োগকারীদের এই আস্থার সংকটের পাশাপাশি আমলাতান্ত্রিক জটিলতাও চরমে পৌঁছেছে। বিসিপিসিএলের অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র জানিয়েছে, তাদের অত্যন্ত সফল পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রটি টানা ছয় বছর নিরবচ্ছিন্নভাবে চলার পর, সপ্তম বছরে এসে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) এক অদ্ভুত কারসাজির আশ্রয় নেয়। ১ হাজার ২৪০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতায় অত্যন্ত চমৎকারভাবে চলা এই বিশাল কেন্দ্রটিকে একটি আকস্মিক ক্যাপাসিটি টেস্ট বা সক্ষমতা পরীক্ষার নামে জোর করে ১ হাজার ৮৫ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতায় নামিয়ে আনার অযৌক্তিক চেষ্টা চালায় পিডিবি। পরবর্তীতে বিসিপিসিএল এর বিরুদ্ধে তীব্র ও আনুষ্ঠানিক আপত্তি জানালে তা সামান্য বাড়িয়ে ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট করা হয়। অথচ গত গ্রীষ্মের চরম লোডশেডিংয়ের সময়ও এই একই কেন্দ্রটি কোনো ধরনের ত্রুটি ছাড়াই অনায়াসে ১ হাজার ২৫০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সফলভাবে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করেছে। দুই পক্ষের মধ্যে স্বাক্ষরিত পিপিএ বা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে এই ধরনের একতরফা সক্ষমতা কমানোর কোনো সংশোধনী বা সুযোগ না থাকায় বিসিপিসিএল ইতোমধ্যে তাদের জোরালো আপত্তি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে রেখেছে।
এই চলমান বহুমুখী সংকটের বিষয়ে জানতে চাইলে বিসিপিসিএলের প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) মো. মাসুদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন যে, সংকট কাটাতে সম্প্রতি চীন থেকে একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল সরাসরি বাংলাদেশে এসে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করে গেছেন। তবে দীর্ঘ আলোচনা শেষেও তারা চূড়ান্ত বা আশাব্যঞ্জক কোনো কিছু নিশ্চিত করে জানিয়ে যাননি। সিএফও বলেন, যদিও চীনের বাইরে নতুন করে কয়লায় বিনিয়োগ না করার বিষয়ে তাদের রাষ্ট্রীয় ঘোষণা রয়েছে, তবে পায়রার এই দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ যেহেতু ওই ঘোষণার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে এবং এটি একটি চলমান কাজ, তাই তারা এখানে একটি বিশেষ ছাড় দিলেও দিতে পারে বলে তিনি প্রবল আশাবাদী। তিনি আরও নিশ্চিত করেন যে, এই মেগা বিদ্যুৎকেন্দ্রটিতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের বিশাল দেড় বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করার কথা একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুৎ ঢাকায় আনার জন্য সঞ্চালন লাইন নির্মাণের বিষয়েও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে তাদের অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা চলমান রয়েছে।
এর আগে আটকে থাকা চীনা বিনিয়োগের এই বিশাল জট ও সংকট কাটাতে ইনভেস্ট বাংলাদেশের বর্তমান চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী গত ১৩ সেপ্টেম্বর একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। ওই বৈঠকের বিস্তারিত ফলাফল ও অগ্রগতি সম্পর্কে জানার জন্য গত সোমবার ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরীর নিজস্ব জনসংযোগ কর্মকর্তা আবু হানিফ সাগরের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু আশিক চৌধুরী এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের কাছে কোনো ধরনের মন্তব্য করতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তার জনসংযোগ কর্মকর্তা শুধু এটুকু জানিয়েছেন যে, বিষয়টি বর্তমানে রাষ্ট্রের একেবারে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে অত্যন্ত সংবেদনশীল অবস্থায় রয়েছে, তাই এ বিষয়ে এখনই খোলাখুলি কোনো মন্তব্য করা বা তথ্য প্রকাশ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। সবকিছু মিলিয়ে পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দ্বিতীয় ইউনিটের এই মেগা প্রকল্পটি এখন দেশীয় রাজনীতি, আন্তর্জাতিক পরিবেশ কূটনীতি এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার এক বিশাল ঘূর্ণিপাকে আটকা পড়ে আছে, যার দ্রুত সমাধান দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যই অত্যন্ত জরুরি।