দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেকোনো নাগরিকের দেহ বা তার বহনকৃত মালামাল তল্লাশি করার একমাত্র আইনি ও সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে পোশাকধারী ও নির্দিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের। কিন্তু এই সুস্পষ্ট আইনি বিধানকে প্রতিনিয়ত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের অন্যতম ব্যস্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বর্তমানে একচ্ছত্র রাজত্ব কায়েম করেছে পুলিশের কথিত ‘সোর্স’ বা তথ্যদাতারা। পুলিশের সরাসরি ছত্রছায়ায় এবং অনেক ক্ষেত্রে খোদ পুলিশ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতেই এই সোর্সরা সাধারণ যাত্রীদের বাসে উঠে জোরপূর্বক তল্লাশি চালাচ্ছে। যাত্রীদের ব্যক্তিগত ব্যাগ থেকে শুরু করে তাদের শরীর পর্যন্ত চেক করা হচ্ছে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে। সাধারণ মানুষ যখন নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে এই অযৌক্তিক হয়রানির প্রতিবাদ করতে যান, তখন তাদের উল্টো অপদস্থ হতে হয় এবং নানা ধরনের হুমকি-ধমকির শিকার হতে হয়। মহাসড়কে চলাচলের সময় সাধারণ যাত্রীরা নিজেদের কতটা অসহায় ও নিরাপত্তাহীন মনে করেন, তা এই সোর্সদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ থেকেই স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের সামনে এমন বেআইনি কর্মকাণ্ড প্রকাশ্যে ঘটলেও তারা রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ থাকছেন, যা জনমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
পুলিশের সোর্সদের এই ভয়ংকর দৌরাত্ম্য ও যাত্রীদের চরম হয়রানির প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে একটি সাহসী ও গভীর অনুসন্ধানী দল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টানা দুই দিন ও দুই রাত ধরে কাজ করেছে। গণমাধ্যমের এই অনুসন্ধানী দলটিতে ছিলেন প্রতিবেদক আতাউর কাউসার এবং তার সঙ্গে ক্যামেরায় দৃশ্য ধারণের দায়িত্বে ছিলেন শাহজাহান খান। তারা মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর থেকে শুরু করে কুমিল্লার বিভিন্ন পয়েন্ট পর্যন্ত সরেজমিনে ঘুরে ঘুরে এই নৈরাজ্যের বাস্তব প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন। রাতের আঁধারে এবং দিনের আলোতে কীভাবে সাধারণ যাত্রীদের জিম্মি করে পুলিশের মদদপুষ্ট এই সোর্সরা ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে, তার প্রতিটি দৃশ্য ক্যামেরার লেন্সে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ধারণ করা হয়েছে। যাত্রীদের ক্ষোভ, তাদের অসহায়ত্ব এবং সোর্সদের পেশিশক্তির মহড়া—সবকিছুই এই অনুসন্ধানে স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকার একটি চেকপোস্টের ঘটনা এই বেপরোয়া আচরণের সবচেয়ে বড় ও নগ্ন প্রমাণ। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাসের ভেতরে উঠে যাত্রীদের লাগেজ, বসার সিট এবং শরীর তল্লাশি করছে সম্পূর্ণ সাধারণ পোশাকে থাকা এক ব্যক্তি, যে মূলত পুলিশের একজন নিজস্ব সোর্স। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পুরো বেআইনি তল্লাশি প্রক্রিয়াটি চলছিল বাসের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা দুজন পুলিশ কনস্টেবলের একেবারে চোখের সামনে। সোর্সের এমন অনধিকার চর্চায় যাত্রীরা চরম বিরক্ত ও মানসিকভাবে পর্যুদস্ত ছিলেন। একজন বয়স্ক ও ভুক্তভোগী যাত্রী আক্ষেপ করে জানান যে, তাকে সম্পূর্ণ অকারণে জেরা করা হচ্ছে এবং তিনি কোথা থেকে এসেছেন, তার বাড়ি কোথায়, তার পরিচয় কী—এসব অবান্তর ব্যক্তিগত প্রশ্ন করে তাকে নাজেহাল করা হচ্ছে। এমনকি সোর্স তাকে ‘বেয়াদব’ বলে প্রকাশ্যে গালিগালাজও করেছে। এই অসহায় যাত্রীরা ক্যামেরার সামনে আক্ষেপ করে বলছিলেন যে, আল্লাহ যেন তাদের এই অবর্ণনীয় হয়রানি থেকে দ্রুত উদ্ধার করেন। বাসের ভেতরে গণমাধ্যমের উপস্থিতি টের পেয়ে সেখানে থাকা পুলিশ কনস্টেবল এবং সেই সোর্স দ্রুত সটকে পড়ার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ওই সোর্স প্রতিবেদককে সজোরে আঘাত করে বাস থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। কিন্তু গণমাধ্যমকর্মীরা সাহসিকতার সাথে পিছু ধাওয়া করে তাকে আটকে ফেলতে সক্ষম হন। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং সাধারণ মানুষের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে সোনারগাঁও থানা পুলিশ শেষ পর্যন্ত সেই সোর্সকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
এই নৈরাজ্য কেবল সোনারগাঁওতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া থানা এলাকাতেও দেখা গেছে ঠিক একই চিত্র। সেখানে ঢাকাগামী যাত্রীবাহী বাসগুলোতে পুলিশের উপস্থিতিতেই লাগেজ বক্স খুলে সাধারণ যাত্রীদের মালামাল চেক করছিল পুলিশের আরেক কথিত সোর্স। যখন ওই সোর্সের কাছে তার পরিচয় জানতে চাওয়া হয় এবং পুলিশের দেওয়া কোনো বৈধ আইডি কার্ড আছে কিনা তা দেখতে চাওয়া হয়, তখন সে কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি। বরং পরিস্থিতি সামাল দিতে বাসের ভেতরে স্বয়ং গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উঠে আসেন। প্রচলিত আইনে কোনো সোর্স দিয়ে সাধারণ মানুষের মালামাল তল্লাশি করার বিন্দুমাত্র সুযোগ না থাকলেও, ওই পুলিশ কর্মকর্তা উল্টো গণমাধ্যমকর্মীদের সাথেই চরম বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তিনি নিজের ভুল স্বীকার না করে বা সোর্সকে নিবৃত্ত না করে উল্টো সোর্স দিয়ে তল্লাশি চালানোর এই বেআইনি কাজটিকে একপ্রকার বৈধতা দেওয়ার অপচেষ্টা করেন। পরবর্তীতে এই চরম বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিষয়টি নিয়ে মুন্সিগঞ্জের পুলিশ সুপারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রাথমিকভাবে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন যে, মহাসড়কে তল্লাশির কাজ মূলত হাইওয়ে পুলিশ করে থাকে। কিন্তু যখন তাকে সুনির্দিষ্টভাবে জানানো হয় যে, গজারিয়া থানার ওসি নিজেই সেখানে সশরীরে উপস্থিত থেকে এই কাজে মদদ দিয়েছেন, তখন তিনি বিষয়টি গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস প্রদান করেন।
কুমিল্লার চান্দিনা এলাকার মহাসড়কেও থানা পুলিশ এবং তাদের সোর্সদের একই ধরনের বেআইনি কর্মকাণ্ডের চিত্র ধরা পড়েছে। সেখানে গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে তল্লাশিরত এক সোর্স চলন্ত বাসের জানালা দিয়ে লাফিয়ে নিচে পড়ে দ্রুত পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে আরেক সোর্সকে একেবারে হাতেনাতে ধরে ফেলা সম্ভব হয়। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই হাতেনাতে আটক হওয়া সোর্সটি কোনো নতুন মুখ নয়। ঠিক তিন বছর আগে একই চেকপোস্টে একইভাবে সাধারণ যাত্রীদের তল্লাশি করার সময় গণমাধ্যমের ক্যামেরায় সে ধরা পড়েছিল। সেই সময় এই ঘটনার ওপর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন সম্প্রচারিত হওয়ার পর পুলিশ প্রশাসনের টনক নড়েছিল এবং দুটি থানার চারজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ তিন বছর পর দেখা গেল, সেই একই সোর্স এখনো মহাসড়কে বহাল তবিয়তে আগের মতোই পুলিশি ছত্রছায়ায় তল্লাশি বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় জনসাধারণ ও ভুক্তভোগী যাত্রীরা অভিযোগ করে বলেন যে, প্রতিদিন পুলিশ এই সোর্সদের সঙ্গে করে নিয়ে আসে এবং তাদের দিয়েই সাধারণ যাত্রীদের ব্যাগ ও শরীর তল্লাশি করায়। সাধারণ মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস, পুলিশের সাথে এই সোর্সদের নিয়মিত আর্থিক লেনদেন ও গভীর যোগসাজশ রয়েছে, যার কারণেই তারা বারবার এতটা বেপরোয়া হওয়ার সাহস পায়। ধরা পড়ার পর ওই সোর্স ক্যামেরার সামনে নিজের দোষ স্বীকার করে এবং ওয়াদা করে যে, সে আর কখনো এই বেআইনি কাজ করবে না। অন্যদিকে, চান্দিনা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে একটি হাস্যকর ও ভিত্তিহীন দাবি করা হয় যে, তাদের সম্পূর্ণ অগোচরেই ওই সোর্স বাসে উঠে তল্লাশি কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল, যা স্থানীয়দের প্রত্যক্ষদর্শী অভিযোগের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মহাসড়কে সোর্স দিয়ে তল্লাশি চালানোর এই ভয়াবহ নৈরাজ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম সম্পর্কে পুলিশের সদর দপ্তরের মুখপাত্রের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনিও অত্যন্ত সুকৌশলে দায় এড়ানোর চেষ্টা করেন। তিনি সুস্পষ্ট কোনো জবাব না দিয়ে বা নিজস্ব বাহিনীর সদস্যদের দায়বদ্ধতার কথা স্বীকার না করে পুরো বিষয়টি হাইওয়ে পুলিশের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন। অথচ মাঠপর্যায়ের থানা পুলিশ যে সরাসরি এই কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত এবং তাদের ইন্ধনেই যে সোর্সরা এতটা বেপরোয়া, তার অকাট্য প্রমাণ গণমাধ্যমের ক্যামেরায় বারবার উঠে এসেছে। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এই দায় এড়ানোর মানসিকতা থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, কেন দিনের পর দিন মহাসড়কে সাধারণ যাত্রীরা এমন চরম হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং এর কোনো স্থায়ী প্রতিকার পাচ্ছেন না।
তবে সাধারণ যাত্রীদের হয়রানি করার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় কেবল থানা পুলিশই নয়, কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরও। মেঘনা ব্রিজের ঢাকা প্রান্তে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশির নামে যাত্রীদের নাজেহাল করার এক অভূতপূর্ব চিত্র ধরা পড়েছে ক্যামেরায়। সেখানে দেখা যায়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হয়ে সাধারণ যাত্রীদের শরীর ও ব্যাগ তল্লাশি করছে এক কথিত সোর্স। সবচেয়ে ভয়ংকর ও প্রতারণামূলক বিষয় হলো, ওই সোর্সের পরিহিত পোশাকের রং এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিজস্ব দাপ্তরিক ইউনিফর্মের রং একেবারে হুবহু একই রকম। দূর থেকে বা হঠাৎ করে দেখে সাধারণ যাত্রীদের বোঝার কোনো উপায়ই নেই যে, সে কোনো বৈধ সরকারি কর্মকর্তা নাকি নিছক একজন তথ্যদাতা সোর্স। পোশাকের এই বিভ্রান্তি তৈরি করে সে যাত্রীদের ওপর মানসিক চাপ ও আধিপত্য বিস্তার করছিল। যখন গণমাধ্যমকর্মীরা তার কাছে গিয়ে তার প্রকৃত পরিচয় জানতে চান, তখন সে স্বীকার করতে বাধ্য হয় যে সে শুধুমাত্র একজন সোর্স। কিন্তু এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিষয়ে সেখানে উপস্থিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শকের কাছে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করেন। তার এই নিশ্চুপ অবস্থানই প্রমাণ করে যে, সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি ইন্ধন ও মদদেই এই সোর্সরা এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সাধারণ যাত্রীদের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে রক্ষকরাই যখন এমন নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন এবং আইন ভেঙে সোর্সদের দিয়ে হয়রানির রাজত্ব কায়েম করেন, তখন দেশের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা চাওয়ার আর কোনো জায়গাই অবশিষ্ট থাকে না। এই বেআইনি কর্মকাণ্ড চিরতরে বন্ধ করতে হলে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এখনই কঠোর, নিরপেক্ষ এবং দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: চ্যানেল২৪