সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে ইদানীং অনেক দৃশ্যই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, যার কিছু কিছু দৃশ্য মস্তিষ্কের কোষে গভীর এক বেদনার দাগ কেটে যায়। সম্প্রতি এমনই একটি স্থিরচিত্র ও ছোট ভিডিও ক্লিপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে এক আবেগময় ও সমালোচনামুখর আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ছবিটিতে দেখা যায়, একজন প্রবীণ মানুষ, যাঁর পরনে একটি কালো রঙের পাঞ্জাবি, চোখে চশমা এবং চেহারায় বয়সের স্পষ্ট ছাপ। তাঁর চারপাশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পুলিশ সদস্য এবং সংবাদকর্মীদের ভিড়, মুখের সামনে এগিয়ে দেওয়া হয়েছে অসংখ্য মাইক্রোফোন। মানুষটির চোখেমুখে কোনো ক্ষোভ বা হুংকার নেই, বরং সেখানে খেলা করছে একরাশ সীমাহীন ক্লান্তি, বিষাদ এবং চরম অপমানের এক অব্যক্ত যন্ত্রণা। মাথা নিচু করে থাকা এই প্রবীণ রাজনীতিবিদের নাম ওবায়দুর রহমান চুন্নু। তিনি জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং একসময়কার ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা জাসদ ছাত্রলীগের দাপুটে সভাপতি ছিলেন। গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পুলিশের এক বড় মাপের অভিযানের সময় তাকে আটক করা হয়। তবে আটকের চেয়েও বেশি যে বিষয়টি মানুষকে মর্মাহত করেছে, তা হলো পুলিশের উপস্থিতিতেই তাকে প্রকাশ্যে হেনস্তা করা এবং এক তরুণের দ্বারা তাঁর পেটে সজোরে ঘুষি মারার দৃশ্যটি। একজন প্রবীণ রাজনীতিবিদের এমন অসহায়ত্ব শুধু একটি দলের অবমাননা নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চরম অবক্ষয়ের চিত্র।
এই অভাবনীয় ও হৃদয়বিদারক ঘটনার একটি অদৃশ্য সুতো গিয়ে যুক্ত হয়েছে বর্তমান বাংলাদেশের ক্ষমতার অন্যতম শীর্ষ কেন্দ্রবিন্দুতে। সুতোটি গিয়ে ঠেকেছে খোদ বাংলাদেশের বর্তমান আইনমন্ত্রীর কাছে। কারণ, ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, একটা সময় ছিল যখন রাজপথে লাঞ্ছিত হওয়া এই ওবায়দুর রহমান চুন্নুই ছিলেন বর্তমান আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামানের রাজনীতির হাতেখড়ির প্রধান গুরু। নিয়তির কী নির্মম পরিহাস, আজ যখন গুরু পুলিশের হাতে আটক হয়ে অপমানের শিকার হয়ে মাথা নিচু করে হাঁটছেন, শিষ্য তখন রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম শীর্ষ মসনদে বসে আছেন। এই গুরু-শিষ্যের সম্পর্কের শেকড় খুঁজতে আমাদের ফিরে যেতে হবে আজ থেকে অন্তত তিন দশক আগের এক পুরনো অতীতে।
গল্পের শুরুটা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণের স্পন্দন মধুর ক্যান্টিনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার ঠিক পরের দিন এক আনকোরা তরুণ ছাত্র রাজনীতি নামক অচেনা জগতের আড্ডায় অংশ নিতে মধুর ক্যান্টিনে গিয়েছিলেন। সেখানে চারপাশের হইচই আর স্লোগানের ভিড়ে ঠিক সেদিনই সেই তরুণের ওপর নজর পড়েছিল জাসদ ছাত্রলীগের এক উদীয়মান নেতার। সেই নেতার নাম ওবায়দুর রহমান চুন্নু। আর সেই দিন মধুর ক্যান্টিনের আড্ডায় আসা সেই তরুণ ছাত্রটির নাম আসাদুজ্জামান, যিনি আজ বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী হিসেবে দেশ পরিচালনা করছেন। এটি কোনো বানানো গল্প নয়, খোদ আসাদুজ্জামানের নিজের সরকারি জীবনবৃত্তান্তেই এই ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ করা আছে। ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু করে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত টানা পাঁচ বছর তিনি জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯৩ সালে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন, তখন তাঁর সভাপতি ছিলেন এই চুন্নু। এরপর ১৯৯৪ সালে তিনি যখন কেন্দ্রীয় কমিটির প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব পান, তখন সেই কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে আসীন ছিলেন ওবায়দুর রহমান চুন্নু।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টের দাবি অনুযায়ী, আসাদুজ্জামান নিজেই কোনো একসময় স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছিলেন যে, চুন্নুর সেই সামান্য আন্তরিকতা, স্নেহ এবং বড় ভাইয়ের মতো বুক আগলে রাখা ভালোবাসা তাঁর হৃদয়কে সম্পূর্ণরূপে জয় করে নিয়েছিল। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকেই তিনি জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের নাম লেখান এবং বামপন্থি ছাত্র রাজনীতির কণ্টকাকীর্ণ পথে পা বাড়ান। এরপর বহু বছর তারা একসঙ্গে রাজপথে রাজনীতি করেছেন, একই স্লোগান দিয়েছেন, একই মিছিলে হেঁটেছেন। এক হাত ধরে রাজনীতি শেখা, এক ছাতার নিচে বছরের পর বছর কাজ করা এবং একই আদর্শের স্বপ্ন দেখার এক চমৎকার অধ্যায় ছিল সেটি। কিন্তু সময়ের নিজস্ব এক অদ্ভুত গতি আছে, আর রাজনীতির সমীকরণ তার চেয়েও বেশি রহস্যময়। সময় যত গড়িয়েছে, তাদের দুজনের পথের দূরত্বও ততটাই বৃদ্ধি পেয়েছে।
ছাত্রজীবনের পাঠ চুকিয়ে আসাদুজ্জামান আইন পেশায় যুক্ত হন এবং একজন সফল আইনজীবী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এরপর তিনি নিজের রাজনৈতিক আদর্শের পথ পরিবর্তন করেন। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগান ছেড়ে তিনি যোগ দেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি)। মেধা, প্রজ্ঞা ও রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে তিনি বিএনপিতে দ্রুত নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন এবং তারই ধারাবাহিকতায় আজ তিনি বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী। অন্যদিকে, ওবায়দুর রহমান চুন্নু তাঁর পুরনো ঠিকানাতেই রয়ে যান। তিনি জাসদেই থেকে যান, সেই একই রাজনীতির আবর্তে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেন। ক্ষমতার স্বাদ থেকে দূরে থেকে দলের দুঃসময়ে হাল ধরে পড়ে থাকেন পুরনো আদর্শের এক কোণে।
এরপর আসে ২০২৬ সালের সেই অভিশপ্ত দিন—২৬ সেপ্টেম্বর। সেদিন রাজধানীর গুলিস্তানে অবস্থিত জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি সভা চলছিল। জাসদের নিজস্ব দাবি অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রায় ৫০০ তৃণমূল নেতা সেদিন সেখানে সমবেত হয়েছিলেন দলের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করার জন্য। কিন্তু হঠাৎ করেই দুপুর আড়াইটার দিকে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। যুবদল, ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী জাসদ কার্যালয়টি চারপাশ থেকে ঘেরাও করে ফেলেন। তাদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, কার্যালয়ের ভেতরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা গোপন বৈঠক করছেন এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছেন। এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই বিকেল তিনটার দিকে পুলিশ সেখানে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করে। সন্ধ্যা নাগাদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার মোহাম্মদ হারুনুর রশীদ গণমাধ্যমকে জানান যে, ওই অভিযান থেকে অন্তত ২৮০ থেকে ৩০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই বিপুলসংখ্যক আটকদের প্রথম সারিতেই ছিলেন প্রবীণ রাজনীতিক ওবায়দুর রহমান চুন্নু। ঠিক এই জায়গাতেই সেই ভাইরাল হওয়া ছবি ও ভিডিওর দৃশ্যপট সামনে আসে। কালো পাঞ্জাবি পরা, ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত একজন বয়স্ক মানুষ পুলিশের পাহারায় কার্যালয় থেকে বের হয়ে আসছেন। তিনি যখন পুলিশের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা যুবদলের এক অতি-উৎসাহী কর্মী প্রকাশ্যেই তার পেটে সজোরে এক ঘুষি মেরে বসে। এই অপ্রত্যাশিত ও কাপুরুষোচিত হামলায় ওবায়দুর রহমান চুন্নু রীতিমতো হতবাক হয়ে যান। তিনি যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। অপমানে, লজ্জায় এবং বেদনায় তিনি শুধু মাথা নিচু করে নীরব পদক্ষেপে হেঁটে পুলিশের গাড়ির দিকে এগিয়ে যান। এই দৃশ্য কেবল একজন ব্যক্তির অপমান নয়, এটি আমাদের রাজনৈতিক শিষ্টাচারের কফিনে ঠুকে দেওয়া শেষ পেরেক।
যে মানুষটা একসময় আসাদুজ্জামানকে রাজনীতির অ আ ক খ শিখিয়েছিলেন, পরম মমতায় যার হাত ধরে ছাত্র রাজনীতির উত্তাল দিনগুলো পার করেছিলেন, সেই মানুষটি যখন আজ প্রকাশ্যে এমন নগ্ন হেনস্তার শিকার হচ্ছেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্ন জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে—আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান এখন কী করছেন? তাঁর মনের ভেতরে কি অনুশোচনা বা কষ্টের কোনো মেঘ জমেছে? এর উত্তরটা আসলে খুব সহজ নয়। কারণ, এখন পর্যন্ত এই অভাবনীয় ঘটনাটির বিষয়ে আসাদুজ্জামানের পক্ষ থেকে কোনো প্রকাশ্য বক্তব্য, কোনো বিবৃতি বা কোনো সাধারণ মন্তব্যও পাওয়া যায়নি। তিনি কেন সম্পূর্ণ নিশ্চুপ রয়েছেন, সে প্রশ্নের উত্তর তার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান না জেনে নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। হতে পারে রাষ্ট্রের এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল পদে আসীন থেকে তিনি ব্যক্তিগত আবেগতাড়িত হয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করাটা সমীচীন বা প্রটোকলসম্মত বলে মনে করছেন না। আবার এমনও হতে পারে, রাষ্ট্রীয় শত ব্যস্ততার মাঝে তিনি হয়তো বিষয়টি সেভাবে জানতেই পারেননি। কিন্তু এসব যুক্তির বাইরেও একটি চরম সত্য হলো, একজন মন্ত্রী যাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রথম ও প্রধান পাঠ এই মানুষটার হাতেই সম্পন্ন হয়েছিল, এমন দুঃসময়ে তাঁর এই রহস্যময় নীরবতা সাধারণ মানুষের চোখে খুব বেশি করে দৃষ্টিকটু লাগছে।
এই গুরু-শিষ্যের গল্পটা আসলে নির্দিষ্ট করে শুধু ওবায়দুর রহমান চুন্নু আর আসাদুজ্জামানের ব্যক্তিগত গল্প নয়। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি চিরচেনা, পুরনো এবং অত্যন্ত নির্মম প্যাটার্নেরই প্রতিচ্ছবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ ক্যাম্পাসে যারা একসময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে একসঙ্গে মিছিল করেছেন, পুলিশের লাঠিপেটা খেয়েছেন, একসঙ্গে ছাত্র রাজনীতির প্রথম পাঠ নিয়ে দেশ বদলের স্বপ্ন দেখেছেন, ক্ষমতার পালাবদলের নির্মম বাস্তবতায় তারা প্রায়ই সম্পূর্ণ আলাদা ও বিপরীত রাস্তায় হেঁটে যান। সময়ের পরিক্রমায় কেউ ক্ষমতার একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে পৌঁছে যান, আর কেউ থেকে যান পুরনো সেই আদর্শিক দলে, যে দলের হয়তো আগের মতো কোনো জৌলুস বা রাজনৈতিক প্রভাব আর অবশিষ্ট নেই। আর যখন সেই পুরনো সহযোদ্ধা বা রাজনৈতিক গুরু বিপদে পড়েন, রাজপথে লাঞ্ছিত হন, তখন ক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে বসে থাকা মানুষটির কাছ থেকে সাধারণ মানুষ একটি ন্যূনতম মানবিক প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাশা করে। সেই প্রত্যাশা পূরণ হয় কি না, সেটাই আসলে প্রমাণ করে দেয় রাজনীতির মাঠে তৈরি হওয়া সম্পর্কগুলো কতটা সত্যিকারের বন্ধুত্ব বা শ্রদ্ধার ছিল, আর কতটা ছিল কেবলই ক্ষমতার সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার এক একটি স্বার্থপর ধাপ।
এখানে আদর্শিক স্খলনের প্রশ্নটিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিকভাবেই চলে আসে। দীর্ঘ একটি সময় ধরে যে বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আসাদুজ্জামান লড়াই করেছিলেন, কেন তিনি শেষ পর্যন্ত সেই পথ পরিহার করে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ছায়াতলে আশ্রয় নিলেন, তা নিয়ে যেমন বিশ্লেষণের সুযোগ রয়েছে, ঠিক একইভাবে চুন্নুর মতো একজন আপসহীন ও ঋজু নেতা কেন শেষ বয়সে এসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটে গিয়ে ভিড়লেন, তা নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। অথচ এই আওয়ামী লীগের চরম বিরোধিতা এবং তাদের নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেই একসময় জাসদের জন্ম হয়েছিল। এই আদর্শিক ডিগবাজিগুলোই প্রমাণ করে যে আমাদের দেশের রাজনীতিতে নীতি বা আদর্শের চেয়ে ক্ষমতাই শেষ কথা। চুন্নু এবং আসাদ আজ বাংলাদেশের রাজনীতির এই চরম বৈপরীত্য ও আদর্শিক দেউলিয়াত্বের একটি জলজ্যান্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তবে মুদ্রার অপর পিঠের প্রশ্নটিও এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অনেকেই আজ পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন যে, যখন বিগত বছরগুলোতে চুন্নুর দল জাসদ আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে সরকারে ছিল, তখন তিনি আসাদুজ্জামানের জন্য বা তাঁর দলের জন্য ঠিক কী করেছিলেন? যখন দেশব্যাপী বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর ওপর অবর্ণনীয় নিপীড়ন, নির্যাতন ও মামলা-হামলার স্টিমরোলার চালানো হচ্ছিল, তখন কি গুরু চুন্নু তাঁর পুরনো শিষ্য আসাদুজ্জামানের জন্য কোনো প্রতিবাদ করেছিলেন? নাকি ক্ষমতার মোহে তিনিও তখন নীরবতার সংস্কৃতিই পালন করেছিলেন? এই প্রশ্নগুলো ইতিহাসের পাতায় অমীমাংসিতই থেকে যাবে। রাজনীতিতে কেউ ধোয়া তুলসীপাতা নয়। ভবিষ্যৎ রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণেও এই তর্কবিতর্ক সহজে শেষ হবে না।
কারণ, রাজনীতির পথ পরিক্রমা এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা। এই পরিক্রমায় আসাদুজ্জামান আজ দেশের প্রতাপশালী মন্ত্রী, আর চুন্নুর হাতে শোভা পাচ্ছে হাতকড়া। কিন্তু এই চাকা চিরস্থায়ী নয়। ভবিষ্যতে সময়ের পরিক্রমায় এই দৃশ্যপট আবারও সম্পূর্ণ উল্টে যেতে পারে। রাজনীতিতে ক্ষমতার রদবদল হয়, মসনদ বদলায়, মানুষের অবস্থান বদলায়। কিন্তু এতসব বদলের মাঝেও একটি শাশ্বত নৈতিক প্রশ্ন আমাদের মানবিক সত্তাকে তাড়া করে ফেরে—যে হাতটি একদিন পরম মমতায় অচেনা পথ চিনিয়েছিল, যে হাতটি বিপদে কাঁধে ভরসা রেখেছিল, সময়ের ব্যবধানে সেই হাতের প্রতি আমাদের নৈতিক দায়বদ্ধতা বা ঋণটুকু কি সত্যিই বদলে যায়? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো কোনো রাজনৈতিক ইশতেহারে লেখা নেই, এর উত্তর লুকিয়ে আছে কেবলই মানুষের বিবেকের আদালতে।