যেকোনো দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এবং আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে স্থলবন্দরগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য। প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের গতিশীলতা বাড়াতে বাংলাদেশ সরকার সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের স্থলবন্দরগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিপুল অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করছে। বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) মতো আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার বিশাল ঋণ নিয়ে এসব মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বড় ধরনের ইতিবাচক পদক্ষেপ মনে হলেও, এর পেছনের পরিসংখ্যান এবং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রক্ষেপণ অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাংলাদেশ জাতীয় বন্দর কৌশলের স্থলবন্দর বিষয়ক একটি সাম্প্রতিক খসড়া প্রতিবেদনে এমন কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে, যা এই বিপুল বিনিয়োগের যৌক্তিকতা এবং ভবিষ্যৎ ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ শঙ্কার জায়গাটি হলো, আগামী ২০২৮ সালের পর যখন এসব মেগা প্রকল্পের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হবে, তখন সেই বার্ষিক কিস্তির পরিমাণ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের বর্তমান নিট আয়ের প্রায় পাঁচ গুণ গিয়ে দাঁড়াতে পারে। আয় ও ব্যয়ের এই বিশাল ফারাক দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বর্তমান পরিসংখ্যানের দিকে গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলে বন্দরগুলোর আয়ের এক চরম বৈষম্যমূলক চিত্র ফুটে ওঠে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সারা দেশে মোট ১৬টি স্থলবন্দর পুরোদমে পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো, এই ১৬টি বন্দরের মধ্যে রাজস্ব আয় বা ট্যারিফ আদায়ের প্রায় ৭৮ শতাংশই আসছে মাত্র চারটি নির্দিষ্ট বন্দর থেকে। এই বন্দরগুলো হলো—বেনাপোল, বুড়িমারী, ভোমরা এবং তামাবিল। শুধু রাজস্ব আয়েই নয়, পরিচালনাগত মোট মুনাফার ক্ষেত্রেও এই চার বন্দরের অবদান প্রায় ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ, বাকি ১২টি স্থলবন্দর দেশের রাজস্ব আয়ে বা মুনাফায় খুব একটা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারছে না। অথচ উন্নয়নের নামে প্রায় প্রতিটি বন্দরেই বিশাল অঙ্কের বিনিয়োগ করা হচ্ছে। বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সূত্রমতে, সংস্থাটির অধীনে বর্তমানে তিনটি প্রধান উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে, যার প্রাক্কলিত মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৬৭২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে চলমান একটি একক প্রকল্পেই বিনিয়োগ করা হচ্ছে ৩ হাজার ৪৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। খসড়া কৌশলের এক চমকপ্রদ বিশ্লেষণে দেখানো হয়েছে যে, এই একটিমাত্র প্রকল্পে যে পরিমাণ অর্থ ঢালা হচ্ছে, তা বেনাপোল, ভোমরা ও বুড়িমারী—এই শীর্ষ তিনটি আয়কারী বন্দরের বর্তমান বার্ষিক মোট মুনাফার প্রায় ৪৫ বছরের সমপরিমাণ। এই পরিসংখ্যান থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায় যে, আয়ের তুলনায় বিনিয়োগের পাল্লা কতটা ভারী এবং অপরিকল্পিত।
বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আমাদের স্থলবন্দরগুলো মূলত আমদানিনির্ভর। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের স্থলবন্দরগুলো ব্যবহার করে প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ টন পণ্য এবং ১৮ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী যাতায়াত করেছে। এই বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহনের প্রায় ৯২ শতাংশই হলো বিদেশি পণ্য আমদানি। অর্থাৎ, রপ্তানির তুলনায় আমদানি বাণিজ্যের একচেটিয়া আধিপত্য চলছে এই বন্দরগুলোতে। পণ্য পরিবহনের পরিমাণের দিক থেকে শীর্ষে অবস্থান করছে সোনামসজিদ বন্দর, এরপরই পর্যায়ক্রমে রয়েছে বুড়িমারী, বেনাপোল, ভোমরা ও বাংলাবান্ধা। অন্যদিকে যাত্রী পারাপারের ক্ষেত্রে বেনাপোল বন্দর সবার শীর্ষে অবস্থান করছে, যার পেছনে রয়েছে ভোমরা, আখাউড়া, হিলি ও বুড়িমারী। কিন্তু জাতীয় বন্দর কৌশলের খসড়ায় একটি অত্যন্ত গুরুতর ত্রুটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সেটি হলো, কোন বন্দর দিয়ে ঠিক কী ধরনের পণ্য কী পরিমাণে আমদানি বা রপ্তানি হচ্ছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত ডেটাবেস বা তথ্যভাণ্ডার কর্তৃপক্ষের কাছে নেই। সঠিক তথ্যের এই অভাবের কারণে ভবিষ্যতে কোন বন্দরে ঠিক কতটা বা কী ধরনের অবকাঠামো প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে প্রকল্পগুলোর অর্থনৈতিক মূল্যায়নে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
খসড়া কৌশলে এই অপরিকল্পিত বিনিয়োগের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্ট ভাষায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যে, ভবিষ্যতে দেশের সব স্থলবন্দরে ঢালাওভাবে একই ধরনের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণের কোনো যৌক্তিকতা নেই। এর পরিবর্তে পণ্য ও যাত্রী চলাচলের বাস্তব পরিসংখ্যান, প্রকৃত স্থানীয় চাহিদা এবং সর্বোপরি বন্দরের নিজস্ব আর্থিক সক্ষমতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে তবেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বড় কোনো মেগা প্রকল্প একবারে তড়িঘড়ি করে বাস্তবায়ন করার বদলে, ধাপে ধাপে ও পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কারণ, বাস্তব চাহিদা না থাকলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত শেড বা গুদামগুলো মাসের পর মাস অব্যবহৃত পড়ে থাকবে এবং শ্বেতহস্তীতে পরিণত হবে, অথচ বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধের চাপ ঠিকই কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে চেপে বসবে।
স্থলবন্দর ও স্থল কাস্টমস স্টেশনের (এলসিএস) মধ্যকার কাঠামোগত পার্থক্যের বিষয়টিও বন্দরের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। খসড়া কৌশলে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সীমান্ত এলাকায় অনেক সময় কোনো স্থায়ী অবকাঠামো বা গুদাম ছাড়াই দুই দেশের ট্রাকের মধ্যে সরাসরি পণ্য স্থানান্তর করা যায়। ফলে ব্যবসায়ীদের সব ক্ষেত্রে বন্দরের ব্যয়বহুল শেড, গুদাম বা আধুনিক যান্ত্রিক সুবিধার প্রয়োজন হয় না। বন্দরে এসব আধুনিক সুবিধা ব্যবহার করতে হলে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মাশুল বা ফি প্রদান করতে হয়। তাই খরচ বাঁচাতে অনেক ব্যবসায়ীই আশপাশের এলসিএস ব্যবহার করে নিজেদের কাজ সেরে ফেলতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ব্যবসায়ীদের এই প্রবণতার কারণে মূল বন্দরগুলোর আয় আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার এবং বিনিয়োগকৃত বিশাল অংকের অর্থ ফেরত পাওয়ার সক্ষমতা সংকুচিত হওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে।
অবকাঠামোগত সংকটের পাশাপাশি বন্দরগুলোতে ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার মারাত্মক ঘাটতিও অত্যন্ত প্রকট। দেশের সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ততম স্থলবন্দর বেনাপোলের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে খসড়া কৌশলে বলা হয়েছে যে, সেখানে পণ্যবাহী ট্রাকের চালক ও সাধারণ শ্রমিক ব্যবস্থাপনায় তীব্র জনবল সংকট রয়েছে। এই অব্যবস্থাপনার কারণে বন্দরে প্রতিনিয়ত নানা ধরনের বিরোধ, বিশৃঙ্খলা এবং চোরাচালানের মতো গুরুতর অপরাধের ঝুঁকি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় এবং সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যে বন্দর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন সিসিটিভি নজরদারি, আধুনিক কার্গো এক্স-রে স্ক্যানিং মেশিন স্থাপন এবং কঠোর পরিচয়পত্র বা আইডি ব্যবস্থাপনার সুপারিস করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিপজ্জনক রাসায়নিক বা দাহ্য পণ্য ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দ্রুততম সময়ে ছাড়পত্র প্রদান, কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষাসামগ্রীর ব্যবস্থা, শ্রমিকদের বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং যেকোনো আকস্মিক জরুরি পরিস্থিতি বা দুর্ঘটনা মোকাবিলার জন্য পূর্বপ্রস্তুতির ওপরও কৌশলপত্রে বিশেষভাবে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের ট্রাকের ধারণক্ষমতার মধ্যকার বিশাল পার্থক্য আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্যে একটি নতুন লজিস্টিক জটিলতার জন্ম দিচ্ছে। খসড়া কৌশলের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশি সাধারণ ট্রাকগুলোর পণ্য ধারণক্ষমতা সাধারণত ৬ থেকে ৩০ টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। অন্যদিকে ভারতীয় ভারী ট্রাকগুলো একাই ৬ থেকে ৮০ টন পর্যন্ত পণ্য অনায়াসে পরিবহন করতে পারে। এর ফলে একটি সম্পূর্ণ বোঝাই করা ভারতীয় ট্রাকের পণ্য খালাস করে বাংলাদেশে পরিবহন করতে গড়ে দুটিরও বেশি দেশীয় ট্রাকের প্রয়োজন হয়। এই অসমতার কারণে সীমান্তে পণ্য স্থানান্তরের কাজে যেমন অতিরিক্ত সময় অপচয় হয়, তেমনি ব্যবসায়ীদের অপেক্ষার প্রহর ও পরিবহন ব্যয়ও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন যে, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে প্রস্তাবিত বিবিআইএন (BBIN) মোটরযান চুক্তিটি যখন পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নের পর্যায়ে যাবে, তখন ট্রাকের ধারণক্ষমতার এই যোজন যোজন পার্থক্য চরম আইনি ও পদ্ধতিগত জটিলতা তৈরি করতে পারে।
স্থলবন্দরের এই সার্বিক পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ ঋণের বিশাল বোঝা এবং আনুষঙ্গিক সংকটগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নানের একটি ভিন্ন ও আশাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। গণমাধ্যমের প্রশ্নের জবাবে তিনি স্বীকার করেছেন যে, ২০২৮ সালের পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ঋণের কিস্তি পরিশোধের একটি বড় ধরনের আর্থিক চাপ তৈরি হবে। তবে তিনি অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জানিয়েছেন যে, এই সংকট মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। তাঁর মতে, কোনো কারণে যদি বন্দরের নিজস্ব আয় কমও হয়, তবে প্রথমে নিজস্ব তহবিল থেকেই ঋণের কিস্তি পরিশোধের চেষ্টা করা হবে, আর তাতে ঘাটতি দেখা দিলে প্রয়োজনে সরকারি কোষাগার থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যতে ভারতের পাশাপাশি নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত হবে, যার আলোচনা ইতোমধ্যে চলমান রয়েছে। এসব উদ্যোগ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে বন্দরগুলোর আমদানি-রপ্তানির পরিমাণ স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পাবে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে রাজস্ব আয়ের ওপর। জনবল সংকট এবং নিরাপত্তাব্যবস্থার বিদ্যমান ঘাটতির বিষয়টি অকপটে স্বীকার করে নিয়ে তিনি জানান যে, ইতোমধ্যেই নতুন জনবল নিয়োগের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। বন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমানে পুলিশ, আনসার বাহিনী এবং বেসরকারি নিরাপত্তাকর্মীরা অত্যন্ত সমন্বিতভাবে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, বন্দরের নিজস্ব আয় না বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের জন্য সরকারি কোষাগারের ওপর নির্ভরশীল হওয়াটা কোনোভাবেই একটি টেকসই অর্থনৈতিক মডেল হতে পারে না। তাই এখনই সঠিক কর্মপরিকল্পনা ও দূরদর্শিতার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল না দিলে এই বিপুল বিনিয়োগ একসময় গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা