দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)-এর বাজার বর্তমানে এক ভয়াবহ অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামের কোনো অস্তিত্ব নেই বাজারে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) চলতি মাসে ১২ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু বাস্তবে এই নির্ধারিত মূল্যে দেশের কোনো প্রান্তেই এলপিজি সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। সাধারণ ভোক্তাদের এই অত্যাবশ্যকীয় পণ্যটি কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ১০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকা পর্যন্ত দিয়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বাড়তি দাম দিয়েও অনেক সময় চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। এই অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং সরবরাহ সংকট সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। বাজার ঘুরে দেখা যায়, এই সংকটের দায় কেউ নিজের কাঁধে নিতে রাজি নয়। খুচরা বিক্রেতা ও পরিবেশকরা এই পরিস্থিতির জন্য সরবরাহ সংকটকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, অপারেটরদের কাছ থেকে তারা চাহিদামতো এলপিজি সরবরাহ পাচ্ছেন না বলেই বাজারে এই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, এলপিজি সরবরাহকারী মূল অপারেটররা দাবি করছেন, বাজারে এলপি গ্যাসের কোনো প্রকৃত সংকট নেই এবং তাদের সরবরাহ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে দেখা যায়, এলপিজি আমদানিতে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। গত আগস্ট মাসে দেশে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৭৬০ টন এলপিজি আমদানি করা হয়েছিল। কিন্তু চলতি মাসের ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমদানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টনে। অর্থাৎ, গত মাসের তুলনায় চলতি মাসের ২২ দিনেই প্রায় ৪০ হাজার টন এলপিজি কম আমদানি হয়েছে। শীর্ষ স্থানীয় দুটি এলপিজি অপারেটরের মতে, আগস্ট মাসের তুলনায় চলতি মাসে সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। এই আমদানি হ্রাসের পেছনে মূল কারণ হিসেবে তারা বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটকে দায়ী করেছেন। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজমান অস্থিরতার কারণে লোহিত সাগর এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথগুলো পণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই ঝুঁকির কারণে প্রয়োজনীয় সংখ্যক কার্গো জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না, আর পাওয়া গেলেও তার পরিবহন খরচ বহুগুণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশের ব্যবহৃত এলপিজির একটি বিশাল অংশ আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। অপারেটররা জানিয়েছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থাকা সত্ত্বেও অনেক আন্তর্জাতিক সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এই ঝুঁকির অজুহাতে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে।
বাজারের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সম্প্রতি এলপিজি অপারেটরদের সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা করেছেন। সেই সভায় অন্তত ৮-১০টি শীর্ষ এলপিজি কোম্পানির মালিক এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, ওই সভায় অপারেটররা মন্ত্রীকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দেশের বাজারে এলপিজির কোনো সংকট নেই এবং তাদের মজুদ ও সরবরাহ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অপারেটর, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে বাজারে এক ধরনের বিভ্রান্তি ও কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর মতে, দেশে এলপিজির কোনো প্রকৃত আমদানি সংকট না থাকলেও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। বিশ্ববাজারে পণ্যটির দাম বাড়ার খবর পেলেই স্থানীয় বাজারে এলপিজি মজুদের একটি অশুভ প্রবণতা তৈরি হয়। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য বিইআরসি এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে, নতুবা এই পণ্যটির দাম সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের বাইরে চলে যাবে।
ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকার এলপিজি বাজার ঘুরে এই কৃত্রিম সংকটের বাস্তব চিত্র দেখা গেছে। মোহাম্মদপুর ঢাকা উদ্যান এলাকার ‘রাব্বি ইলেকট্রিক অ্যান্ড হার্ডওয়্যার’-এর স্বত্বাধিকারী মিজানুর রহমান মিজান জানান, বাজারে সাপ্লাই কম থাকার সুযোগ নিয়ে ডিলাররা বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছেন। ফলে বাধ্য হয়েই তাদের বেশি দামে কিনে বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তিনি আরও জানান, মাত্র কয়েকদিন আগে ২৩ ও ২৪ সেপ্টেম্বর তিনি ১২ কেজির সিলিন্ডার ১ হাজার ৮৫০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকায় বিক্রি করেছেন, কিন্তু এখন সেটিই ২ হাজার ১০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। মিরপুর এলাকার আরেকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন যে, মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে।
বিস্ফোরক পরিদপ্তরের তথ্যমতে, গত মাসে ১৪টি অপারেটরের বিপরীতে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার টন এলপিজি আমদানির অনুমোদন ছিল। কিন্তু জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাব বলছে, আগস্ট মাসে দেশে এলপিজি আমদানি হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, যা চাহিদার চেয়েও অনেক বেশি। চলতি মাসেও ১ লাখ ৪০ হাজার টন এলপিজি আমদানির অনুমোদন রয়েছে এবং ২২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৭৪২ টন দেশে পৌঁছেছে। অপারেটররা বলছেন, চলতি মাসে আরও বেশ কয়েকটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে, যদিও সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ আগের মাসের তুলনায় কম হতে পারে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে দেশে মোট ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৬৯৪ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে।
উল্লেখ্য, দেশের বাজারে ব্যবহৃত এলপিজির ৯৮ শতাংশই বেসরকারি অপারেটররা আমদানি করে থাকে। এই আমদানিকৃত এলপিজির ৮০ শতাংশ বাসাবাড়িতে গৃহস্থালির কাজে, ১২ শতাংশ শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে, ৫ শতাংশ যানবাহনে (অটোগ্যাস) এবং বাকি ৩ শতাংশ অন্যান্য খাতে ব্যবহৃত হয়। সরেজমিন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, খুচরা বিক্রেতারা সংকটের অজুহাত দেখিয়ে ভোক্তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। তারা এই দাম বাড়ার জন্য পরিবেশক ও ডিলারদের দুষছেন। অন্যদিকে, পরিবেশক ও ডিলাররা অভিযোগ করছেন যে তারা অপারেটরদের কাছ থেকে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছেন না এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধির প্রভাবও দামের ওপর পড়ছে।
অপারেটরদের একাংশ নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি এলপিজির ‘সিপি প্রাইস’ (সৌদি ঘোষিত মাসিক মূল্য) এবং পরিবহন খরচ ব্যাপক হারে বেড়ে গেছে। স্পট মার্কেটেও কার্গোর দাম আকাশছোঁয়া। উচ্চ মূল্যে পণ্য আমদানি করে লোকসানের ঝুঁকি থাকায় অনেক অপারেটর আমদানি কিছুটা কমিয়ে দিয়েছেন। বর্তমানে দেশে এলপিজি আমদানিতে বিইআরসি নির্ধারিত প্রিমিয়ামের পরিমাণ টনপ্রতি ১৬০ ডলার। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জাহাজ ভাড়া ও ট্রেডেড প্রিমিয়াম ২৫০ ডলার থেকে বেড়ে ৪৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিইআরসি প্রিমিয়াম না বাড়ালে এলপিজি আমদানিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে বলে অপারেটররা আশঙ্কা করছেন।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে অটোগ্যাস খাতেও। দেশে এলপিজির ৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় অটোগ্যাস হিসেবে, যার পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার টন। সারা দেশে থাকা প্রায় ১ হাজার ১০০টি অটোগ্যাস স্টেশনের মধ্যে বর্তমানে প্রায় ৭০ শতাংশই বন্ধ রয়েছে। যেগুলো চালু আছে সেগুলোও নামমাত্র সরবরাহ নিয়ে ধুঁকছে। বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি প্রকৌশলী সিরাজুল মাওলা জানিয়েছেন, তারা অপারেটরদের কাছ থেকে সরবরাহ চেয়েও পাচ্ছেন না এবং এ বিষয়ে বিইআরসিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছেন।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বাজারে এলপিজির সংকট ও বাড়তি দামের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে তিনি দাবি করেছেন যে, আমদানিতে কোনো ঘাটতি দেখা যাচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে পরিবহন খরচ বাড়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন এবং অভ্যন্তরীণ কারণেও সরবরাহ সংকট হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন।
ইস্ট কোস্ট গ্রুপের সাবসিডিয়ারি ওমেরা পেট্রোলিয়াম লিমিটেডের চেয়ারম্যান আজম জে চৌধুরী মনে করেন, দেশে এলপিজির কোনো প্রকৃত আমদানি সংকট নেই। বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার সম্ভাবনা থাকলে অনেকেই মজুদ করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বলে তিনি মনে করেন। এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকও একই সুরে কথা বলেছেন। তাঁর মতে, অপারেটর পর্যায়ে কোনো সংকট নেই, বরং পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। এই কৃত্রিম সংকট দূর করতে মাঠ পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং বিইআরসির কঠোর তদারকির ওপর তিনি জোর দিয়েছেন।