শিরোনামঃ
বাণিজ্যিক সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করলো সরকার মরক্কোর প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ফাতিমা জাহরা এল নিনোর ঝুঁকিতে লাতিন আমেরিকার লাখ লাখ শিশু : ইউনিসেফ জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা: এক বিপজ্জনক খাদের কিনারে অর্থনীতি ও জনজীবন দাদা-দাদি, নানা-নানিদের প্রতি গর্ভবতী অবস্থায় মায়েদের কোমর ব্যথায় করণীয় অক্টোবর-নভেম্বরে এলএনজির ঘাটতি নেই, আসছে ১৯ কার্গো: পেট্রোবাংলা প্রধানমন্ত্রীর জাতিসংঘ সফরে বাংলাদেশের স্বার্থ ও বৈশ্বিক সম্ভাবনার বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে: মাহদী আমিন উন্নয়ন প্রকল্পে পরামর্শক ব্যয় কমানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ
বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫৫ পূর্বাহ্ন

বাজেটের অর্ধেক ভর্তুকি শেষ তিন মাসেই

নিজস্ব প্রতিবেদক / ৯ বার
প্রকাশ: বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা বর্তমানে এক চরম ও নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের মাত্র শুরু, কিন্তু এরই মধ্যে বিদ্যুৎ ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি খাতে সরকারের ভর্তুকির পাহাড়প্রমাণ চাপ আর্থিক খাতকে রীতিমতো দিশেহারা করে তুলেছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন মাস পার না হতেই এই দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের অর্থ সরকার ইতোমধ্যে ছাড় করতে বাধ্য হয়েছে। পুরো অর্থবছরের জন্য সরকার এই দুই খাতে মোট ৪২ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি নির্ধারণ করে রেখেছিল। কিন্তু বছরের এক-চতুর্থাংশ বা মাত্র তিন মাসের মাথাতেই সেই নির্ধারিত বিশাল বাজেটের প্রায় ৪৫ শতাংশ অর্থ পুরোপুরি ব্যয় হয়ে গেছে। এই অভূতপূর্ব ব্যয়ের ধারা অব্যাহত থাকলে অর্থবছর শেষে তা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া হিসাব ও সূত্র থেকে জানা যায়, সম্প্রতি গত ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে আগস্ট মাসের বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি মেটানোর জন্য ৪ হাজার ৯৫২ কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। একই সাথে সেপ্টেম্বর মাসের এলএনজি আমদানির ভর্তুকি বাবদ আরও ৩ হাজার কোটি টাকা প্রদান করা হয়েছে। অর্থাৎ, শুধুমাত্র এক দফাতেই এই দুই খাতে একসঙ্গে ছাড় করা হয়েছে মোট ৭ হাজার ৯৫২ কোটি টাকার বিশাল অঙ্ক। এর আগে অর্থবছরের শুরুর দিকে, অর্থাৎ জুলাই মাসেই বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকি এবং জুলাই-আগস্ট মাসের এলএনজি খাতের ভর্তুকি মেটানোর জন্য সরকারকে ১১ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ ছাড় করতে হয়েছিল। এই দুই দফার হিসাব যোগ করলে দেখা যায়, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই সরকারের মোট ভর্তুকি ছাড়ের পরিমাণ প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। বাজেটে প্রতি মাসের গড় ব্যয়ের যে লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল, তার সাথে এই বাস্তব ব্যয়ের তুলনা করলে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। বাজেটের হিসাব অনুযায়ী এই দুই খাতে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রাক্কলন বা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এক দফাতেই সেই মাসিক গড়ের দ্বিগুণেরও বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১২৭ শতাংশ বেশি অর্থ ছাড় করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জন্য এই পরিস্থিতির তাৎপর্য অত্যন্ত গভীর ও সুদূরপ্রসারী। বাজেটে নির্ধারিত অর্থের সাথে বাস্তব ব্যয়ের এই ব্যবধান যত দ্রুত বাড়ছে, তা মেটাতে গিয়ে সরকারকে ভবিষ্যতে সংশোধিত বাজেটে বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হবে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে বাধ্য হয়ে সরকারের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতের ব্যয় কঠোরভাবে সঙ্কোচন করতে হবে।
বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির দিকে তাকালে দেখা যায়, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে শুধুমাত্র বিদ্যুতের জন্যই ৩৬ হাজার কোটি টাকার একটি বিশাল বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। এই হিসাব অনুযায়ী প্রতি মাসে বিদ্যুৎ খাতে গড় ব্যয় হওয়ার কথা ছিল প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভাগের নিজস্ব হিসাব ও বর্তমান বাস্তবতা বলছে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা; বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা করে ভর্তুকির প্রয়োজন হচ্ছে। এই বিপুল মাসিক চাহিদার ওপর ভিত্তি করে হিসাব করলে বছর শেষে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ খাতেই মোট প্রয়োজন দাঁড়াবে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি। তবে সংশ্লিষ্ট বিভাগের বর্তমান প্রাক্কলন ও হিসাব অনুযায়ী, বছর শেষে এই ভর্তুকির পরিমাণ অনায়াসেই ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে প্রবল আশঙ্কা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, বিদায়ী গত অর্থবছরেও বিদ্যুৎ খাতে সরকারকে প্রায় ৪৩ হাজার ১০০ কোটি টাকার বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি প্রদান করতে হয়েছিল। অর্থাৎ, গত বছরের সেই পাহাড়সম ব্যয়ের তুলনায় চলতি অর্থবছরে এই ব্যয় আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পাওয়ার একটি সুস্পষ্ট ও ভীতিকর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির আকাশছোঁয়া ব্যয়। আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বা ফ্রেইট চার্জ বেড়ে যাওয়া, আমদানি করা অন্যান্য জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং সর্বোপরি ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে ডলারভিত্তিক ক্রয়মূল্য বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত ব্যয়কে বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, বিদ্যুতের খুচরা মূল্য বা গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম যদি পুরোপুরিভাবে এই বর্ধিত উৎপাদন ব্যয়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমন্বয় করা না হয়, তবে উৎপাদন ও বিক্রির সেই বিশাল আর্থিক ব্যবধান শেষ পর্যন্ত সরকারের কাঁধেই ভর্তুকি হিসেবে এসে চাপে। অর্থাৎ, এই ভর্তুকি কেবল সরকারের একটি সাধারণ বাজেটীয় ব্যয় নয়; বরং এটি মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং দেশের সাধারণ গ্রাহকের কাছ থেকে আদায়কৃত মূল্যের মধ্যকার এক বিশাল আর্থিক শূন্যতারই সরাসরি প্রতিফলন।
বিদ্যুৎ খাতের এই বিশাল ব্যয়ের তুলনায় আরও অনেক বড় ও ভয়াবহ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি আমদানির ক্ষেত্রে। চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটে এলএনজি খাতের ভর্তুকির জন্য মাত্র ৬ হাজার থেকে শুরু করে সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকার মতো একটি অত্যন্ত সীমিত বরাদ্দ রাখা হয়েছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বর্তমান যে উত্তপ্ত পরিস্থিতি, তাতে সরকারের সেই প্রাথমিক বরাদ্দ ইতোমধ্যেই সম্পূর্ণ অপ্রতুল ও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের হিসাব অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম মাত্র আড়াই মাসেই এলএনজি খাতে সরকারকে প্রায় ১০ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকি হিসেবে প্রদান করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পেট্রোবাংলার নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী, বাজেটে নির্ধারিত মূল বরাদ্দের বাইরেও এই খাতে ইতোমধ্যে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১৭ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এক বিশাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি যদি আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকে, তবে পুরো অর্থবছর শেষে এলএনজি আমদানির মোট ব্যয় এক লাফে ৯০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা গভীর আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বিশ্ববাজারে এলএনজি কার্গোর মূল্যে এক অবিশ্বাস্য ও অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতির আগে একটি এলএনজি কার্গো আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কিনতে যেখানে সরকারের প্রায় ৬০০ কোটি টাকার মতো লাগত, সেখানে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই একই কার্গো কিনতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ, হিসাব করলে দেখা যায় যে, শুধুমাত্র একটি একক কার্গো আমদানিতেই সরকারের ব্যয় প্রায় আড়াই গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশের এলএনজি আমদানির একটি বিশাল অংশ সরাসরি আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথের ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সঙ্ঘাত ও অস্থিরতা তীব্রতর হওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে শুধু যে জ্বালানির উৎপাদন বা মূল সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে তা নয়, বরং এর সাথে যুক্ত পরিবহন বা ফ্রেইট ব্যয় এবং সমুদ্রপথে জাহাজের বীমা ব্যয়ও চরমভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে যখনই কোনো নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়, তখনই আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজি সরবরাহের ওপর ঝুঁকির প্রিমিয়াম বা রিস্ক প্রিমিয়ামও এক লাফে অনেকখানি বেড়ে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট থেকে যখন বাংলাদেশকে তাৎক্ষণিক প্রয়োজনে অনেক বেশি দামে কার্গো কিনতে হয়, তখন তার একটি সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়ে পেট্রোবাংলার সামগ্রিক আমদানি ব্যয়ের ওপর। আর এই বর্ধিত বিপুল ব্যয়ের একটি বড় অংশ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারকেই ভর্তুকি হিসেবে নিজের কাঁধে বহন করতে হয়। এখানে সামষ্টিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে আরও একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম যখন বাড়ে, তখন কেবল এলএনজি আমদানির সরাসরি ব্যয়ই বৃদ্ধি পায় না; বরং দেশে যে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো রয়েছে, সেগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয়ও সমানতালে বেড়ে যায়। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের একটি মাত্র মূল্য-ধাক্কা দেশের ভেতরে দ্বিমুখী বা দ্বৈত চাপের সৃষ্টি করে—একদিকে এলএনজি আমদানির জন্য ভর্তুকি বাড়ে এবং অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়ায় বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকিও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রাকৃতিক গ্যাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম ভূমিকা রয়েছে। ফলে গ্যাসের আমদানি ব্যয় বাড়ার সাথে সাথে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বাড়াও একটি অবধারিত প্রক্রিয়া। অন্যদিকে, বিদ্যুৎকেন্দ্রের এই বর্ধিত উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনা করে সেই একই অনুপাতে যদি গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য দ্রুত সমন্বয় করা না হয়, তবে অনিবার্যভাবেই সরকারের ভর্তুকির প্রয়োজন বহুগুণে বেড়ে যায়। এ কারণেই আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজারের বর্তমান এই চরম অস্থিরতা এখন আর শুধু জ্বালানি খাতের একটি বিচ্ছিন্ন সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি এখন দেশের বিদ্যুৎ খাত, জাতীয় বাজেট ব্যবস্থাপনা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং সর্বোপরি সামগ্রিক অর্থনীতির সাথে অত্যন্ত ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে এক বিশাল সঙ্কটে পরিণত হয়েছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে এলএনজি আমদানির জন্য সরকারকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বা ডলারের সংস্থান করতে হয়। এলএনজির আমদানি ব্যয় যখনই বাড়ে, তখন দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর একটি বিশাল ও অনাকাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি হয়। আবার এই বর্ধিত ভর্তুকির অর্থ মেটাতে সরকারকে যখন জাতীয় বাজেট থেকে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ করতে হয়, তখন স্বভাবতই দেশের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এবং অন্যান্য জরুরি সরকারি ব্যয়ের ওপর একটি মারাত্মক সঙ্কোচনমূলক চাপ সৃষ্টি হতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের এই বহুমুখী চাপ কঠোরভাবে মোকাবেলা করার লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি গত ২১ সেপ্টেম্বর তারিখে দেশের অভ্যন্তরে জ্বালানি তেলের দাম লিটারপ্রতি একলাফে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি করেছে। এই নতুন মূল্যবৃদ্ধির পর বর্তমানে দেশের বাজারে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম দাঁড়িয়েছে ১৩৫ টাকা, কেরোসিনের দাম ১৫৫ টাকা, পেট্রলের দাম ১৬০ টাকা এবং অকটেনের দাম ১৬৫ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। জ্বালানি তেলের এই ব্যাপক দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সরকার মূলত আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সাথে দেশের অভ্যন্তরীণ দামের যে বিশাল ব্যবধান ছিল, তা কিছুটা হলেও কমানোর একটি মরিয়া চেষ্টা করেছে। কিন্তু তেলের দাম বাড়ানো হলেও, বিদ্যুৎ ও এলএনজির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে একই সাথে অব্যাহতভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটতে থাকায় দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যয়ের যে বিশাল চাপ, তা পুরোপুরিভাবে কোনোভাবেই কমছে না। এই পরিস্থিতির ফলে দেশের সাধারণ ও খেটে খাওয়া মানুষের ওপরও এক বিশাল দ্বিমুখী অর্থনৈতিক প্রভাব তৈরি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম যখন বাড়ে, তখন স্বাভাবিকভাবেই গণপরিবহন এবং পণ্য পরিবহনের ব্যয় লাগামহীনভাবে বেড়ে যায়। আর এর সাথে যুক্ত হয়ে যখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের উৎপাদন বা সরবরাহ ব্যয় বৃদ্ধি পায়, তখন দেশের সার্বিক শিল্প ও ব্যবসার উৎপাদন ব্যয়ও ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়, যার চূড়ান্ত দায়ভার সাধারণ ভোক্তাকেই বহন করতে হয়।
চলতি অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় সরকারের নীতিনির্ধারকদের একটি প্রত্যাশা ছিল যে, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জ্বালানি বাজার তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকবে। মূলত সেই আশাবাদের ওপর ভিত্তি করেই বাজেটের অঙ্কগুলো কষা হয়েছিল। কিন্তু বাজেট ঘোষণার পরপরই মধ্যপ্রাচ্যের নতুন সঙ্ঘাতময় পরিস্থিতি সমস্ত হিসাব-নিকাশ সম্পূর্ণভাবে বদলে দেয়। জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের সময় মাননীয় অর্থমন্ত্রীও এই আকস্মিক আন্তর্জাতিক ঝুঁকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করেছিলেন। তিনি সংসদকে জানিয়েছিলেন যে, নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ১০ দিনের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে এক নতুন ও অনাকাঙ্ক্ষিত সঙ্কট তৈরি হয় এবং এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হিসেবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও কৃষিকাজে ব্যবহৃত সারের আন্তর্জাতিক দাম বড় ধরনের এক ঊর্ধ্বমুখী চাপের মুখে এসে পড়ে। এই রূঢ় বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাজেটের প্রণীত প্রাথমিক হিসাবগুলো এখন অত্যন্ত দ্রুত অচল ও অবাস্তব হয়ে পড়ছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জন্য সব মিলিয়ে মোট ১৭ হাজার ৩৪৫ কোটি টাকার একটি বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে শুধুমাত্র বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন উন্নয়ন ব্যয় মেটানোর বাবদ প্রস্তাব করা হয়েছে ১৪ হাজার ৯৯৬ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে ভর্তুকির প্রয়োজন যদি মূল বাজেটের তুলনায় আরও কয়েক হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পায়, তাহলে অবশ্যম্ভাবীভাবেই এই উন্নয়ন ব্যয়ের জন্য নির্ধারিত অর্থের ওপরও একটি বিশাল পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সামনে এখন মূলত তিনটি অত্যন্ত বড় ও ভয়াবহ ঝুঁকি বিরাজ করছে। প্রথমত, মধ্যপ্রাচ্যের এই সঙ্ঘাত যদি আরও দীর্ঘায়িত হয়, তবে এলএনজির আন্তর্জাতিক মূল্য এবং এর পরিবহন ব্যয় ভবিষ্যতে আরও অনেক বেশি বাড়তে পারে। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত কয়লা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও অন্যান্য আমদানি করা জ্বালানির ব্যয় যদি ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তবে বিদ্যুৎ খাতের ভর্তুকির প্রয়োজনীয়তাও সমান্তরালভাবে আরও বৃদ্ধি পাবে। তৃতীয়ত, সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা যদি প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্জিত না হয়, তবে এই বিপুল পরিমাণ বাড়িত ভর্তুকির অর্থ সরকারি কোষাগার থেকে জোগাড় করা সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। বিদ্যুৎ খাতে যদি শেষ পর্যন্ত ৫০ হাজার কোটি টাকা এবং এলএনজি খাতে যদি ৪০ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়, তবে এই দুই খাতেই সরকারের মোট ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়ার এক ভয়াবহ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই অঙ্কটি বাজেটে নির্ধারিত মূল ৪২ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের তুলনায় দ্বিগুণেরও অনেক বেশি। দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মতে, সাময়িকভাবে কোষাগার থেকে এই বাড়িত ভর্তুকি দিয়ে পরিস্থিতি কোনোমতে সামাল দেওয়া গেলেও, এটি কখনোই কোনো দীর্ঘমেয়াদি বা টেকসই সমাধান হতে পারে না। কারণ আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিতিশীল দামের ওপর নির্ভরশীল এই আমদানি ব্যবস্থা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলনামূলক অনেক কম মূল্যে জ্বালানি সরবরাহ করা—এই দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান যত বৃদ্ধি পাবে, সরকারের কাঁধে আর্থিক দায়ও তত বেশি পাহাড়সম হতে থাকবে। তাই এই বিশাল সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হলো জ্বালানি আমদানির উৎসগুলোর বহুমুখীকরণ, আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কার্যকর ও সময়োপযোগী ব্যবহার, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর সার্বিক দক্ষতা বৃদ্ধি, সঞ্চালন ও বিতরণে সিস্টেম লস বা অপচয় কঠোরভাবে কমানো এবং সর্বোপরি জ্বালানি ব্যবহারে সর্বস্তরে অপচয় সম্পূর্ণভাবে রোধ করা। একই সাথে, এই ভর্তুকি ঠিক কোন পর্যায়ে এবং দেশের কোন নির্দিষ্ট আয়ের গ্রাহক শ্রেণির জন্য আসলেই প্রয়োজন—সেটিও নতুন করে অত্যন্ত গভীরভাবে মূল্যায়নের একটি বড় প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বর্তমান এই রূঢ় পরিস্থিতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের একটি মাত্র বড় ধাক্কা বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জাতীয় বাজেটকে কত দ্রুত ও কত গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই যদি ভর্তুকির জন্য নির্ধারিত বিশাল বরাদ্দের প্রায় অর্ধেকই পুরোপুরি ব্যয় হয়ে যায়, তাহলে সামনের বাকি দীর্ঘ ৯ মাসের আর্থিক হিসাব মেলানোই এখন সরকারের নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড়, কঠিন ও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...