বিশ্বজুড়ে একসময় হৃদরোগকে মূলত বয়স্ক বা বিত্তবান মানুষের রোগ হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানও সাধারণত একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর মানুষকে হৃদযন্ত্রের বিষয়ে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিত। কিন্তু সময়ের আবর্তনে এবং আধুনিক জীবনযাত্রার নেতিবাচক প্রভাবে এই পুরনো ধারণা এখন সম্পূর্ণ বদলে গেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে এই নীরব ঘাতক ব্যাধিটি বয়সের কোনো গণ্ডি মানছে না। একসময় যে রোগটি কেবল জীবনের শেষভাগে এসে মানুষকে ভাবিয়ে তুলত, সেই রোগটি আজ কেড়ে নিচ্ছে টগবগে তরুণদের প্রাণ। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস এবং দৈনন্দিন জীবনযাপনের ধরনে যে এক বিশাল পরিবর্তন এসেছে, তার চরম মূল্য চোকাচ্ছে আজকের যুবসমাজ। তরতাজা প্রাণগুলো কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই হঠাৎ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে। পরিবারের সদস্যরা কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই হারিয়ে ফেলছেন তাদের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও প্রাণবন্ত মানুষটিকে। আধুনিকায়নের এই যুগে এসে হৃদরোগ এখন বাংলাদেশের জাতীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম প্রধান এক হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
হৃদরোগ যে এখন আর বয়সের তোয়াক্কা করে না, তার সবচেয়ে বড় ও মর্মান্তিক উদাহরণ হলো ২২ বছর বয়সী তরুণ শামীম আহসানের অকাল প্রয়াণ। চলতি বছরের মার্চ মাসের এক সাধারণ দিনে রাজধানীর উত্তরার রাস্তায় চলন্ত বাসে হঠাৎ করেই তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। একটি তরতাজা প্রাণ, যে কি না পুরো জীবনটা সামনে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, সে বাসের সিটেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করতে বাধ্য হন। শামীমের এই আকস্মিক মৃত্যুতে তার পরিবার যেন আকাশ থেকে পড়েছে। তার ভাই মো. জুয়েল রানার আক্ষেপভরা কণ্ঠস্বরই বলে দেয় পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ। জুয়েল রানা জানান যে, তার ভাই শামীম সবসময় খেলাধুলা করত, সে ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত, সাহসী ও শক্তিতে ভরপুর একজন মানুষ। তাদের পরিবারের কেউ ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে এমন একজন স্বাস্থ্যবান তরুণের হৃদযন্ত্রে কোনো ধরনের জটিলতা থাকতে পারে। সবচেয়ে বড় আক্ষেপের বিষয় হলো, শামীমের পরিবার তাকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা দেওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি, তার আগেই ঘাতক ব্যাধি তাকে চিরতরে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।
শামীমের মতো তরুণের মৃত্যু যেখানে বিনা চিকিৎসায় হয়েছে, সেখানে চিকিৎসকদের নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতাও খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। ৪২ বছর বয়সী একজন পেশাদার চিকিৎসক আবু মো. সায়েমের জীবনের একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় যে, এই রোগটি কতটা অপ্রত্যাশিতভাবে হানা দিতে পারে। গত বছরের এক সকালে সায়েম যখন তার নিজের হাসপাতালেই পেশাগত দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন, তখন হঠাৎ করেই তার বুকে তীব্র ও অসহ্য ব্যথা শুরু হয়। মুহূর্তের মধ্যেই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। এরপর যখন তার জ্ঞান ফেরে, তখন তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন হাসপাতালের বিছানায় একজন মুমূর্ষু রোগী হিসেবে। সায়েম জানান যে, এর আগে তার জীবনে কখনো হৃদযন্ত্রের কোনো সমস্যা বা লক্ষণ দেখা যায়নি এবং তিনি নিজেই জানেন না কীভাবে তার শরীরে এই মরণব্যাধি বাসা বেঁধেছিল। বর্তমানে বেঁচে থাকার জন্য তার হৃদযন্ত্রে দুটি রিং বা স্টেন্ট পরানো রয়েছে। পেশায় চিকিৎসক হওয়ায় এবং ঘটনার সময় হাসপাতালেই উপস্থিত থাকার কারণে তিনি তাৎক্ষণিক চিকিৎসা পেয়েছিলেন বলে আজ সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে আছেন। কিন্তু দেশের লাখ লাখ তরুণের ক্ষেত্রে এই সৌভাগ্য জুটছে না।
দেশের খ্যাতনামা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ, শিক্ষাবিদ এবং গবেষকরা তরুণদের মধ্যে হৃদরোগের এই উদ্বেগজনক বৃদ্ধির পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করেছেন। তাদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ও অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই এর প্রধান কারণ। দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসে যে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, বিশেষ করে অতিরিক্ত তেল, মাত্রাতিরিক্ত লবণ, প্রক্রিয়াজাত খাবার ও চিনিযুক্ত খাবারের প্রতি তরুণ প্রজন্মের যে তীব্র আসক্তি, তা তাদের হৃদযন্ত্রকে তিলে তিলে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এর পাশাপাশি খাবারে বিষাক্ত রাসায়নিকের ভেজাল, মাত্রাতিরিক্ত ধূমপানের অভ্যাস, অ্যালকোহল গ্রহণ এবং শহরের বিষাক্ত বায়ুদূষণ তরুণদের হৃদযন্ত্রের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিভিডি) কার্ডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক এম এ হাসনাত এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করে জানান যে, কিছু হৃদরোগ মানুষ জন্মগতভাবেই বহন করে, তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা জীবনের পরবর্তী পর্যায়ে গিয়ে বিভিন্ন কারণে বিকশিত হয়। তিনি আরও জানান যে, শরীরে বিভিন্ন ধরনের সংক্রমণ, উচ্চ রক্তচাপ, বাতজ্বর বা রিউম্যাটিক ফিভার, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, যক্ষ্মা এবং কিছু ক্ষেত্রে বংশগত বা জেনেটিক কারণেও হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণে বৃদ্ধি পেতে পারে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের স্বনামধন্য অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী বাংলাদেশের হৃদরোগের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন। তিনি জানান যে, সারা বিশ্বে যেখানে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার গড় বয়স সাধারণত ৬০ বছরের কাছাকাছি, সেখানে বাংলাদেশে এই গড় বয়স অনেক নিচে নেমে প্রায় ৫৩ বছরে এসে দাঁড়িয়েছে। এই বয়সের ব্যবধানটি দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি বিশাল ও ভয়ংকর সতর্কবার্তা। তিনি অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার হার আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রায় যে কৃত্রিমতা এসেছে, তা মানুষকে কায়িক শ্রম থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে এবং ক্ষতিকর খাদ্যের প্রতি আকৃষ্ট করছে, যা প্রকারন্তরে হৃদরোগের মহামারি ডেকে আনছে।
বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রতি বছর পালিত হয় বিশ্ব হার্ট দিবস। এ বছর মঙ্গলবার সারা দেশে ‘ডোন্ট মিস এ বিট’ বা ‘একটি স্পন্দনও যেন না থামে’—এই অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হচ্ছে। কিন্তু শুধুমাত্র দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই কি এই রোগের সমাধান লুকিয়ে আছে? পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের একটি নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, ওই বছর দেশে প্রায় ৯ লাখ ৯৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এর মধ্যে প্রায় ১৭ দশমিক ৫ শতাংশ মৃত্যুই ঘটেছে হৃদরোগের কারণে। অর্থাৎ, দেশের মোট মৃত্যুর একটি বিশাল অংশই এখন এই ব্যাধির দখলে চলে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল হেলথ রিসার্চ সেন্টার ‘ইনস্টিটিউট ফর হেলথ মেট্রিকস অ্যান্ড ইভালুয়েশন’ (আইএইচএমই) ২০২৪ সালের মে মাসে একটি অত্যন্ত বিশদ ও শিউরে ওঠার মতো পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তাদের সংগৃহীত তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর শুধুমাত্র হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েই ২ লাখ ৫ হাজারেরও বেশি মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। হিসাব করলে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫৬২ জন মানুষ এই একটিমাত্র রোগের কারণে প্রাণ হারাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিসংখ্যানে আরও একটি ভয়াবহ তথ্য উঠে এসেছে যে, বর্তমানে দেশের প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের হৃদরোগ নিয়ে জীবনযাপন করছে। আর সবচেয়ে শঙ্কার বিষয় হলো, প্রতি বছর নতুন করে প্রায় ৯ লাখ ৯২ হাজার ৭৩৬ জন মানুষ এই দীর্ঘমেয়াদী ও প্রাণঘাতী রোগের খাতায় নিজেদের নাম লেখাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, হৃদরোগের এত বিশাল বিস্তারের পেছনে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন। অর্ধেকেরও বেশি হৃদরোগের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে এই উচ্চ রক্তচাপকে দায়ী করা হয়। ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল সার্ভে অন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ রিস্ক ফ্যাক্টরস ২০১৮’ বা সংক্ষেপে এনসিডি স্টেপস সার্ভে ২০১৮-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৮ থেকে ৩৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে প্রায় ১২ শতাংশই উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এর অর্থ হলো, দেশের কর্মক্ষম জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশ অত্যন্ত নীরবভাবে হৃদরোগের চরম ঝুঁকির মধ্যে দিন পার করছে। অধ্যাপক সোহেল রেজার মতে, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৫ শতাংশ মানুষ উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত। কিন্তু সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, এই আক্রান্তদের মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষই জানেন না যে তাদের শরীরে এই নীরব ঘাতক লুকিয়ে আছে। অজ্ঞতার কারণে তারা রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কোনো ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাও গ্রহণ করেন না। ফলশ্রুতিতে উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস এবং অতিরিক্ত শারীরিক ওজন বা স্থূলতা মিলে মানুষের কার্ডিওভাসকুলার রোগের ঝুঁকি চরম পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের নিজস্ব রোগীর পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও পরিষ্কারভাবে ফুটে ওঠে। চলতি বছরের মাত্র প্রথম আট মাসেই এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসে ৫ হাজার ৫৫২ জন রোগী মারা গেছেন। এই একই সময়ে হাসপাতালটিতে প্রায় ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৫৭৫ জন হৃদরোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। বিগত বছরগুলোর রোগীর সংখ্যা তুলনা করলে দেখা যায়, ২০২৪ সালে যেখানে এই হাসপাতালে ৪ লাখ ৮৫ হাজার ৩৭২ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছিলেন, সেখানে এক বছরের ব্যবধানে ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা লাফিয়ে বেড়ে ৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫২৮ জনে গিয়ে দাঁড়ায়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা মোট রোগীদের অন্তত ৩০ শতাংশেরই বয়স ৫০ বছরের নিচে। অথচ আজ থেকে মাত্র এক দশক আগেও এমন পরিস্থিতি ছিল একেবারেই অকল্পনীয়। স্টেপস ২০১৮ সার্ভের তথ্য বিশ্লেষণ করে পরিচালিত অপর একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ থেকে ৬৯ বছর বয়সী প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যাদের আগে কখনো হৃদরোগ ছিল না, তাদের প্রতি দশজনের মধ্যে অন্তত একজনের আগামী দশ বছরের মধ্যে কার্ডিওভাসকুলার রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমপক্ষে ১০ শতাংশ।
হৃদরোগের এই ভয়াবহ বিস্তারের পাশাপাশি দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা ও এর ব্যয়ভার নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের স্বনামধন্য অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ। তার মতে, বাংলাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসায় যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হয়, তা দেশের অন্যান্য যেকোনো রোগের চিকিৎসার তুলনায় অনেক বেশি ব্যয়বহুল। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, আমাদের দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো এত বিপুল সংখ্যক হৃদরোগীর চাপ সামলানোর জন্য কোনোভাবেই প্রস্তুত নয়। শয্যা সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং আধুনিক যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতার কারণে রোগীদের চিকিৎসার পেছনে অনেক বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে। তিনি অবিলম্বে হৃদরোগের চিকিৎসাসুবিধা দেশব্যাপী সম্প্রসারণের পাশাপাশি জোরালো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন। বাজারে হৃদযন্ত্রের চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্ট বা রিং, পেসমেকার এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যকীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের সম্পূর্ণ বাইরে। এই জীবনরক্ষাকারী সামগ্রীগুলোর দাম এবং গুণগত মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারি পর্যায়ে কোনো কার্যকর ব্যবস্থা বা শক্ত মনিটরিং না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমতো দাম হাঁকাচ্ছেন এবং সাধারণ রোগীরা সর্বস্বান্ত হচ্ছেন।
দেশের এই নাজুক চিকিৎসাব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০১৯ সালে একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছিল সরকার। সেই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রতিটি বিভাগীয় শহরে ক্যান্সার, কিডনি এবং হৃদরোগের চিকিৎসার জন্য একটি করে পূর্ণাঙ্গ ও বিশেষায়িত হাসপাতাল নির্মাণ করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা এবং নানা জটিলতায় সেই হাসপাতালগুলো আজও পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখন নিরুপায় হয়ে মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সরকারের কাছে পুনরায় আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এদিকে, মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় আরেক বিশাল সংকট ঘনীভূত হয়েছে। গত ২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারের একটি নির্দিষ্ট অপারেশনাল প্ল্যানের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর থেকে দেশের কমিউনিটি ক্লিনিক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জেলা সদর হাসপাতালগুলোতে অসংক্রামক রোগের জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহের এই কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের প্রায় ৩০ লাখ মানুষ, যারা নিয়মিত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ সংগ্রহ করতেন, তারা এখন এক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছেন। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, এই বিপুল সংখ্যক মানুষ যদি অবিলম্বে সঠিক নিয়মে তাদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সেবন করতে না পারেন, তবে দেশে হৃদরোগজনিত অকাল মৃত্যুর এক নতুন সুনামি আঘাত হানতে পারে।