দীর্ঘদিন ধরে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজার এখন এক গভীর ও বহুমুখী সংকটের আবর্তে নিমজ্জিত। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধের ভয়াবহতা, কূটনৈতিক ব্যর্থতা, বন্ধ হয়ে থাকা বড় বাজারগুলো উন্মুক্ত করতে না পারা এবং নতুন বাজারের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থতার কারণে দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত এক নজিরবিহীন চ্যালেঞ্জের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানোর বিষয়ে বড় বড় লক্ষ্যমাত্রা এবং আশ্বাসের কথা বলা হলেও, বাস্তব পরিসংখ্যানে এর কোনো ইতিবাচক প্রতিফলন নেই। বরং পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত) বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী গমনের হার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩৩ শতাংশ কমে গেছে।
বর্তমান সরকার আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী বিদেশে পাঠানোর একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বিএমইটি-এর দেওয়া পরিসংখ্যান এই লক্ষ্যের সাথে বাস্তবতার বিস্তর ফারাক তুলে ধরছে। গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মোট ৮ লাখ ৩৮ হাজার ৮৯৪ জন বাংলাদেশী কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে গিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের একই সময়ে সেই সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে মাত্র ৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৯৩ জনে নেমে এসেছে। সহজ অঙ্কে হিসাব করলে, গত বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম নয় মাসেই বাংলাদেশ থেকে ২ লাখ ৭৫ হাজার ২০১ জন কর্মী কম বিদেশে গিয়েছেন।
বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা এসেছে মালয়েশিয়ার বাজার থেকে। একসময় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে বিদেশী কর্মীর উৎস দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানে ছিল এবং দেশটির মোট বিদেশী শ্রমশক্তির প্রায় ৩৭ শতাংশই ছিল বাংলাদেশী। কিন্তু নানা অনিয়মের কারণে ২০২৪ সালের ৩১ মে এই গুরুত্বপূর্ণ বাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর থেকে সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং বর্তমান সরকার বারবার চেষ্টা করেও এই বাজারটি উন্মুক্ত করতে পারেনি। গত ২৮ আগস্ট প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বেশ ঘটা করে জানিয়েছিল যে ‘শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলে যাচ্ছে’। এমনও খবর রটেছিল যে মালয়েশিয়া আগামী ছয় মাসে বাংলাদেশ থেকে দুই লাখ কর্মী নেবে। কিন্তু চলতি মাসের শুরুর দিকে মালয়েশিয়া সরকারের মুখপাত্র ও যোগাযোগমন্ত্রী ফাহমি ফাদজিল পুত্রজায়ায় এক সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, এটি মালয়েশিয়া সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। তার এই বক্তব্য বাংলাদেশের মন্ত্রণালয়ের দাবির বিপরীত। তাছাড়া, মালয়েশিয়ার আগামী পাঁচ বছরের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ‘থার্টিন্থ মালয়েশিয়া প্ল্যান ২০২৬-৩০’ অনুযায়ী, দেশটি ২০৩০ সালের মধ্যে বিদেশী শ্রমিকের অংশগ্রহণ বর্তমানের চেয়ে কমিয়ে ১০ শতাংশে এবং ২০৩৫ সালে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ফলে আগামীতে বাজারটি খুললেও সেখান থেকে বাংলাদেশের কতটা লাভ হবে, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মনে গভীর সংশয় রয়েছে।
শুধু মালয়েশিয়া নয়, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারগুলোতেও চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই সৌদি আরব, কুয়েত ও কাতারের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে বাংলাদেশী কর্মীর চাহিদা বিপুলভাবে কমে গেছে। জানা গেছে, এই চাহিদা ৫ শতাংশ থেকে নেমে প্রায় শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার হলো সৌদি আরব। সেখানে কর্মী গমনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাওয়ায় সামগ্রিক পরিসংখ্যানে বিশাল প্রভাব পড়েছে। ২০২৫ সালের প্রথম নয় মাসে সৌদি আরবে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ৮৩ জন কর্মী গিয়েছিলেন, কিন্তু চলতি বছর তা প্রায় অর্ধেক কমে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৭ হাজার ৮৮৭ জনে। অর্থাৎ, দেশের প্রধান এই শ্রমবাজারে এক বছরের ব্যবধানে কর্মী গমন কমেছে ৪৫ দশমিক ৮০ শতাংশ।
একই অবস্থা সংযুক্ত আরব আমিরাতেও, যা একসময় বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার ছিল। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের সময় প্রবাসী বাংলাদেশীদের বিক্ষোভের জেরে সেখানে বাংলাদেশীদের ভিজিট ও কর্মী ভিসা বন্ধ হয়ে যায়। এমনকি সম্প্রতি কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই ছুটিতে দেশে আসা প্রায় ৪ হাজার ৮০০ প্রবাসী বাংলাদেশীর ভিসা বাতিল করেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ। কাতারের চিত্রও হতাশাজনক। বর্তমানে সেখানে চার লাখেরও বেশি বাংলাদেশী কাজ করলেও, গত বছরের প্রথম নয় মাসে যেখানে ৮০ হাজার ৫৭০ জন কর্মী গিয়েছিলেন, এ বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৪৯ হাজার ৭৭৯ জনে। চলতি বছর মে মাসে কাতারের শ্রমমন্ত্রীর সাথে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রীর বৈঠক হলেও গত চার মাসে সেখানে কর্মী প্রেরণে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। কুয়েতের বাজারেও পতনের ধারা অব্যাহত রয়েছে; গত বছর যেখানে প্রথম নয় মাসে ৩৪ হাজার কর্মী গিয়েছিলেন, এ বছর তা কমে ২২ হাজারে দাঁড়িয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও মালয়েশিয়ার বাইরে জাপানের বাজার নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস বড় আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। গত বছর জাপান সফরে গিয়ে তিনি আগামী পাঁচ বছরে অন্তত এক লাখ শ্রমিক জাপানে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে জাপানে গেছেন মাত্র ১ হাজার ৫৬৪ জন এবং চলতি বছরের প্রথম নয় মাসে গেছেন মাত্র ১ হাজার ৬০৮ জন।
শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার এই প্রত্যক্ষ প্রভাব দেশের অর্থনীতির অন্যতম লাইফলাইন রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ওপর পড়তে শুরু করেছে। পরিসংখ্যান বলছে, চলতি বছরের মে মাসের পর থেকে টানা চার মাস দেশে রেমিট্যান্স প্রবাহ ৩ বিলিয়ন বা ৩০০ কোটি ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করতে পারেনি। অথচ এর আগে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে টানা ছয় মাস দেশে প্রতি মাসে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্রমতে, চলতি সেপ্টেম্বরে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ২ দশমিক ৭ শতাংশে, যেখানে বছরের শুরুতে এই প্রবৃদ্ধি ছিল ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে একটি অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন। অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারপারসন শাকিরুল ইসলাম মনে করেন, মালয়েশিয়ার বাজার নিয়ে সরকারের বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি আমাদের প্রধান দুর্বলতা হলো শক্তিশালী অভিবাসনকেন্দ্রিক কূটনীতির অভাব। এছাড়া অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় কর্মীদের এক ধরনের ‘ঋণ দাসত্বে’ ঠেলে দিচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর জোর দিয়ে বলেছেন যে, কেবল রাজনৈতিক ইশতেহার দিয়ে বাজার উন্মুক্ত করা যাবে না; এর জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদানুযায়ী অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণের মান উন্নয়ন করতে হবে এবং দক্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে শক্তিশালী অভিবাসন কূটনীতি গড়ে তুলতে হবে।
সরকার দেশে দক্ষ কর্মী তৈরির জন্য বিএমইটির অধীনে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) পরিচালনা করছে এবং আরও ৫০টি কেন্দ্র স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে। কিন্তু হতাশার বিষয় হলো, এসব কেন্দ্রে যারা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন, তাদের বেশির ভাগেরই বিদেশে যাওয়ার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেই। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাইফুল হক চৌধুরী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি কর্মী পাঠানোর যে লক্ষ্যমাত্রা সরকারের রয়েছে, তা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতার মাত্র ৫৫-৬০ শতাংশ বর্তমানে বাংলাদেশের রয়েছে।
এতসব নেতিবাচক খবরের মাঝেও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক আশা প্রকাশ করেছেন যে, বৈদেশিক শ্রমবাজার শিগগিরই ঘুরে দাঁড়াবে। তিনি জানিয়েছেন, বিশ্বের কোন দেশে কী ধরনের কর্মীর চাহিদা রয়েছে তা চিহ্নিত করে কর্মীদের ভাষা ও কারিগরি দক্ষতায় পারদর্শী করে গড়ে তোলার পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং বন্ধ থাকা বাজারগুলো চালুর জন্য কয়েকটি দেশে এমওইউ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিমন্ত্রীর এই আশার বাণী কবে নাগাদ বাস্তবে রূপ নেবে এবং বিদেশে কর্মী প্রেরণের এই নিম্নমুখী ধারা কবে রোধ করা সম্ভব হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তথ্যসূত্র: বণিকবার্তা