শিরোনামঃ
বিশ্বজুড়ে আবারও বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু: ডব্লিউএইচও কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে ইউরেনিয়াম চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র ইলন মাস্কের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে যে বার্তা দিলেন জিলিস কোনো অন্যায়কে বিএনপি সরকার ছাড় দেবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু আখতারুজ্জামানের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তি দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার মাল্টার কেজি ৫২০ টাকা, দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের জবাব চাইলেন বাণিজ্যমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৮ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১১২২ ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬০৮ গাজীপুরে গার্মেন্টসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৯ ইউনিট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

মেয়াদ শেষের দ্বারপ্রান্তে গঙ্গা চুক্তি: ন্যায্য হিস্যার গ্যারান্টিসহ নতুন চুক্তির অনড় অবস্থানে ঢাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

গঙ্গার পানি বণ্টন ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আবারো এক গভীর ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘ তিন দশক আগে, ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে যে ঐতিহাসিক ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। চুক্তির একেবারে শেষ প্রান্তে এসে ঢাকা তার নিজস্ব কূটনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের পরিষ্কার বার্তা হলো—তারা পুরনো চুক্তির কোনো গতানুগতিক নবায়ন বা মেয়াদ বৃদ্ধি চাইছেন না, বরং দেশের শুষ্ক মৌসুমের ভয়াবহতা মাথায় রেখে সম্পূর্ণ নতুন, অধিকতর আধুনিক এবং কার্যকর একটি চুক্তি সম্পাদন করতে চান। এই নতুন চুক্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় এবং প্রধান দাবিটি হলো, এতে অবশ্যই একটি সুনির্দিষ্ট আইনি ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ বা নিশ্চয়তার ধারা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই ধারার মূল উদ্দেশ্য হবে, খরা বা যেকোনো চরম প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সময়ও বাংলাদেশ যেন তার ন্যায্য হিস্যার একটি ন্যূনতম পানিপ্রবাহ পাওয়ার পূর্ণ আইনি নিশ্চয়তা পায়।

অন্যদিকে, গঙ্গা চুক্তির বিষয়ে ভারতের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া এখনো কিছুটা রক্ষণশীল। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, গঙ্গার মতো আন্তর্জাতিক ও অভিন্ন নদীগুলোর পানি বণ্টন সংক্রান্ত যেকোনো ধরনের আলোচনা কেবল যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) কাঠামোর মাধ্যমেই পরিচালিত হবে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন যে, চুক্তি নবায়ন বা পরিমার্জন সংক্রান্ত কারিগরি পর্যায়ের বৈঠকগুলো বর্তমানে নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রয়েছে। ভারতের এই সতর্ক ও মেপে কথা বলার কৌশল প্রমাণ করে যে, তারা এখনই কোনো বড় ধরনের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি দিতে নারাজ। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা থাকলেও, মূল প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত রয়ে গেছে—নতুন চুক্তিতে বাংলাদেশ যে কার্যকর ন্যূনতম পানিপ্রবাহের গ্যারান্টি চাইছে, ভারত শেষ পর্যন্ত তা মেনে নিতে কতটা প্রস্তুত?

১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গা চুক্তির মূল কাঠামোগত ভিত্তি হলো, ভারতের ফারাক্কা ব্যারাজে বা পয়েন্টে গঙ্গার পানিপ্রবাহ ঠিক কতটা আছে তা পরিমাপ করে একটি পূর্বনির্ধারিত গাণিতিক সূত্রের সাহায্যে দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগি করা। এই চুক্তিটি মূলত প্রতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত—এই পাঁচ মাসের চরম শুষ্ক মৌসুমে কার্যকর থাকে। চুক্তির পরিশিষ্ট-১ অনুযায়ী পানি বণ্টনের সূত্রটি বেশ পরিষ্কার। ফারাক্কা পয়েন্টে পানিপ্রবাহ যদি ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হয়, তবে ভারত ও বাংলাদেশ সমান ৫০ শতাংশ হারে পানি পাবে। প্রবাহ যদি ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হয়, তবে বাংলাদেশ নির্দিষ্টভাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পাবে এবং অবশিষ্ট প্রবাহ ভারতের ভাগে যাবে। আর প্রবাহ যদি ৭৫ হাজার কিউসেক বা তার বেশি হয়, তবে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে ছেড়ে দেবে। এর বাইরেও, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়কালের মধ্যে উভয় দেশ চক্রানুক্রমিক পদ্ধতিতে তিন দফায় ১০ দিনের জন্য ৩৫ হাজার কিউসেক করে পানি পাওয়ার বিশেষ সুবিধা লাভ করে।

কিন্তু সমস্যাটি তৈরি হয় ঠিক অন্য জায়গায়, যেখানে ঢাকার বর্তমান দাবির সাথে ১৯৯৬ সালের কাঠামোর একটি বড় ধরনের আইনি ও ঐতিহাসিক পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ১৯৭৭ সালের চুক্তির মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ গ্যারান্টি ক্লজ বা ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করার ধারা রাখা হয়নি। ১৯৯৬ সালের চুক্তির ২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ যদি কখনো ৫০ হাজার কিউসেকের নিচে নেমে যায়, তবে দুই দেশ কেবল জরুরি ভিত্তিতে আলোচনায় বসে পরিস্থিতি সমন্বয়ের উদ্যোগ নেবে। অর্থাৎ, পানির চরম সংকটের সময় বাংলাদেশকে একটি ন্যূনতম পরিমাণ পানি দেওয়ার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি, রাখা হয়েছে কেবল আলোচনার পথ। এই জায়গাতেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আপত্তি। ঢাকার বর্তমান চাওয়া অত্যন্ত সুস্পষ্ট—যেকোনো পরিস্থিতিতেই হোক, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেলেও বাংলাদেশের অংশের ন্যূনতম পানি যেন আইনিভাবে সুরক্ষিত থাকে এবং এর জন্য যেন বারবার নয়াদিল্লির দয়ার ওপর নির্ভর করতে না হয়।

এই গ্যারান্টি ক্লজের দাবিটি হঠাৎ করে আসেনি। ১৯৭৭ সালের গঙ্গা চুক্তিতে বাংলাদেশের জন্য ঠিক এ ধরনেরই একটি আইনি সুরক্ষা বা গ্যারান্টি ক্লজ বিদ্যমান ছিল। পানিসম্পদ সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণা ও পুরনো চুক্তির বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ১৯৭৭ সালের ওই ব্যবস্থায় নদীতে পানির প্রাকৃতিক প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলেও বাংলাদেশ তার নির্ধারিত অংশের একটি ন্যূনতম মাত্রার পানি পাওয়ার পূর্ণ আইনি নিশ্চয়তা পেত। সম্প্রতি বাংলাদেশের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জোরালোভাবে এই গ্যারান্টি ক্লজ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, ভাটির দেশ হিসেবে শুষ্ক মৌসুমে নদীর ন্যূনতম প্রবাহ সুনিশ্চিত করা বাংলাদেশের পরিবেশ, প্রকৃতি ও সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য আক্ষরিক অর্থেই জীবন-মরণের প্রশ্ন।

কেন এই শুষ্ক মৌসুমের পানি এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বুঝতে হলে গঙ্গা বা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পদ্মার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত প্রভাব বুঝতে হবে। গঙ্গার প্রবাহ বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, মৎস্যসম্পদ, নৌপরিবহন, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বজায় রাখা এবং সামগ্রিক পরিবেশগত ভারসাম্যের সাথে সরাসরি ও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ কমে গেলে এই পুরো অঞ্চলের নদীগুলোতে সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দেয় এবং বঙ্গোপসাগর থেকে আসা লবণাক্ত পানি হু হু করে ভেতরে ঢুকে চরম পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টি করে। এর ফলে শুধু কৃষি ও মৎস্যসম্পদ ধ্বংস হয় না, বরং সুন্দরবনসহ পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত সাম্যাবস্থা চরম ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যায়। তাই বাংলাদেশের বর্তমান দাবিটি শুধু বেশি পানি চাওয়ার বিষয় নয়, এটি মূলত চরম সংকটের সময় পানি প্রাপ্তির একটি দৃঢ় আইনি নিশ্চয়তার দাবি।

চলমান এই দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় সবচেয়ে নতুন ও ভয়াবহ যে উপাদানটি সামনে এসেছে, তা হলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন। ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে যেসব ডাটা বা উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছিল, তার প্রায় সবই ছিল ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের মধ্যে সংগৃহীত। ভারতের ‘ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব ওয়ার্ল্ড অ্যাফেয়ার্স’-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোও স্বীকার করেছে যে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেছে এবং ঘন ঘন খরা দেখা দিচ্ছে, যা নদীর পুরনো হিসাব-নিকাশকে অকার্যকর করে দিয়েছে। তাই নতুন চুক্তিতে যদি আবার সেই পুরনো ডাটা ব্যবহার করা হয়, তবে ভবিষ্যতে চরম বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ তিনটি বিষয়ের ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে—নদীর পানিপ্রবাহের সঠিক রিয়েল-টাইম ডাটা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির হিসাব এবং পানি সংকটে উভয় দেশের সমতার ভিত্তিতে ঘাটতি ভাগাভাগি করার ফর্মুলা।

পানি বণ্টনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো তথ্যের স্বচ্ছতা। ফারাক্কায় কতটুকু পানি আছে এবং হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পার হয়ে কতটুকু পানি বাংলাদেশে ঢুকছে, তার সঠিক পরিমাপ ও তথ্য বিনিময় অত্যন্ত জরুরি। সম্প্রতি দুই দেশের কারিগরি বিশেষজ্ঞ দল ফারাক্কায় যৌথ পরিদর্শন সম্পন্ন করে তথ্য সংগ্রহ করেছে। ভবিষ্যতে চুক্তির স্থায়িত্বের জন্য দুই দেশের প্রবাহ পরিমাপের অভিন্ন পদ্ধতি, ডিজিটাল মাধ্যমে তথ্য প্রকাশ এবং বিরোধ দেখা দিলে তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষার ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত জরুরি।

তবে এই চুক্তি সম্পাদনের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হলো ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। গঙ্গার পানি বণ্টনের বিষয়টি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের স্বার্থের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ইতিমধ্যেই কেন্দ্রকে কড়া ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, রাজ্যের পানীয় জল, শিল্প এবং কলকাতা বন্দরের স্বার্থ বিঘ্নিত করে এমন কোনো চুক্তি তারা মেনে নেবে না। বিহার থেকেও চুক্তির বিরোধিতায় জোরালো সুর শোনা যাচ্ছে। ফলে নয়াদিল্লির জন্য এই চুক্তি নবায়নের সমীকরণটি অত্যন্ত জটিল ও স্পর্শকাতর হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কেবল একটি গ্যারান্টি ক্লজ যুক্ত করলেই সব সমস্যার জাদুকরি সমাধান হবে না। জলবায়ুর প্রভাবে নদীতে পানিই যদি না থাকে, তবে কাগজে লেখা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। তাই নতুন চুক্তির খসড়ায় ন্যূনতম প্রবাহ সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি সমতার ভিত্তিতে ঘাটতি বণ্টন, রিয়েল-টাইম ডাটা বিনিময়ের আইনি বাধ্যবাধকতা, জলবায়ু অভিযোজনের সুযোগ এবং নদীর পরিবেশগত প্রবাহ নিশ্চিত করার মতো ধারাগুলো যুক্ত করা প্রয়োজন। পানিসম্পদমন্ত্রী যদিও আন্তর্জাতিক ফোরামে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন, তবে বর্তমানে উভয় দেশ দ্বিপক্ষীয় জেআরসি কাঠামোর মাধ্যমেই সমাধান খুঁজছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর বেশি দিন বাকি নেই। তাই কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা পেরিয়ে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। আসন্ন কূটনৈতিক দরকষাকষিতেই নির্ধারিত হবে বাংলাদেশ বাস্তবে কতটুকু পানি পাবে এবং সংকটের সময় সেই পানি পাওয়ার নিশ্চয়তা ঠিক কতটা শক্তিশালী হবে।

তথ্যসূত্র: নয়া দিগন্ত


এ জাতীয় আরো খবর...