শিরোনামঃ
বিশ্বজুড়ে আবারও বাড়ছে মানুষের গড় আয়ু: ডব্লিউএইচও কঠোর নিরাপত্তায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছেছে ইউরেনিয়াম চীনের সাথে সম্পর্ক স্থাপনে বাংলাদেশকে থামাতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র ইলন মাস্কের সঙ্গে বিচ্ছেদ নিয়ে যে বার্তা দিলেন জিলিস কোনো অন্যায়কে বিএনপি সরকার ছাড় দেবে না: প্রতিমন্ত্রী টুকু আখতারুজ্জামানের মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করে মুক্তি দিতে হবে: গোলাম পরওয়ার মাল্টার কেজি ৫২০ টাকা, দাম নিয়ে ব্যবসায়ীদের জবাব চাইলেন বাণিজ্যমন্ত্রী হামের উপসর্গে আরও ৮ মৃত্যু, মোট প্রাণহানি ১১২২ ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ১৬০৮ গাজীপুরে গার্মেন্টসে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ৯ ইউনিট
রবিবার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৫০ পূর্বাহ্ন

পরিবারতন্ত্র ভাঙার উদ্যোগে ভাটা: ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনে পিছু হটছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক / ১০ বার
প্রকাশ: শনিবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৬

দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যাংক কোম্পানি আইন সংশোধনের যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তা শুরুতেই হোঁচট খেতে বসেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক একটি খসড়া প্রণয়ন করে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর জন্য কঠোর প্রস্তাব দিয়েছিল, কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ (এফআইডি) সেই প্রস্তাবগুলোর অধিকাংশতেই শিথিলতা বা ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিশেষ করে, একই পরিবার থেকে ব্যাংকের পর্ষদে পরিচালকের সংখ্যা কমানোর যে জোরালো দাবি ছিল, তা নাকচ করে দিয়ে বিদ্যমান আইনই বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছে মন্ত্রণালয়। এর ফলে ব্যাংকিং খাতে পরিবারতন্ত্র ভাঙার স্বপ্ন আবারো দীর্ঘায়িত হতে পারে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষকরা।

বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের তৈরি করা সর্বশেষ সংশোধনী খসড়ায় ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে একই পরিবার থেকে পরিচালকের সংখ্যা সর্বোচ্চ ৩ জন থেকে কমিয়ে ২ জন করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব দিয়েছিল। একই সঙ্গে একজন পরিচালকের একটানা সর্বোচ্চ মেয়াদ ১২ বছর থেকে কমিয়ে ৬ বছর করারও প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই দুটি প্রস্তাবই বাতিল করে দিয়েছে। জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) এবং অন্যান্য অংশীজনদের চাপে নতি স্বীকার করে মন্ত্রণালয় পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানোর পরিকল্পনা থেকে পিছু হটেছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, পরিবারকেন্দ্রিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩ জনের বিধানই বহাল রাখতে হবে এবং খসড়াটি পুনর্গঠন করে পুনরায় মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে। তবে টানা মেয়াদের ক্ষেত্রে বর্তমান ১২ বছরের স্থলে কিছুটা কমিয়ে ৯ বছর করার বিষয়ে বৈঠকে একটি সমঝোতা হয়েছে।

ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো খেলাপি পরিচালকদের বিষয়ে শিথিল আইন। বর্তমান ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী, কোনো পরিচালকের নিজ নামে নেওয়া বা গ্যারান্টিকৃত ঋণ যদি খেলাপি হয়ে যায়, তবে ওই পরিচালক তার ঋণ নিয়মিত করার জন্য পুরো ২ মাসের সময় পান। এই ২ মাসের মধ্যেও যদি তিনি ঋণ নিয়মিত করতে ব্যর্থ হন, কেবল তখনই তিনি তার পরিচালক পদ হারান। এ ছাড়া ঋণ পরিশোধের এক বছর পার হলেই তিনি পুনরায় যে ব্যাংকে পরিচালক ছিলেন—সেই ব্যাংকে অথবা পদ খালি থাকা সাপেক্ষে অন্য যেকোনো ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে বীরদর্পে ফিরে আসার সুযোগ পান। বাংলাদেশ ব্যাংক তাদের খসড়ায় এই নিয়ম কঠোর করে প্রস্তাব করেছিল যে, কোনো পরিচালকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঋণ খেলাপি হলেও তিনি সরাসরি পরিচালক পদ হারাবেন। কিন্তু বিস্ময়করভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই কঠোর প্রস্তাবটি বাতিল করে দেওয়া হচ্ছে। উল্টো পরিচালক পদে পুনরায় ফেরার সময়সীমা এক বছর থেকে কমিয়ে ৬ মাস করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এমনকি ব্যাংক মালিকদের পক্ষ থেকে শেয়ার বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় এবং নোটিশে ঋণ নিয়মিত করার সময় বাড়িয়ে কমপক্ষে ৬ মাস করার সুপারিশও করা হয়েছে, যা নিয়ে মন্ত্রণালয় এখনো চিন্তা-ভাবনা করছে।

গত ২০ সেপ্টেম্বরের পর্যালোচনা বৈঠকে আইন ও বিচার বিভাগ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), বাংলাদেশ ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক এবং ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই, বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ-সহ মোট ১৭টি প্রতিষ্ঠানের প্রভাবশালী প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছিলেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারহোল্ডারদের স্বার্থ রক্ষা, ব্যাংকের স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা এবং ব্যবসার স্থিতিশীলতার কথা বিবেচনায় রেখেই মূলত প্রস্তাবিত কঠোর বিধানগুলোর কয়েকটি শিথিল বা বাতিল করার বিষয়ে অংশগ্রহণকারীরা একমত হয়েছেন। বিএবির পক্ষ থেকে জোরালো যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, পরিচালকদের মেয়াদ যদি অতিরিক্ত কমিয়ে দেওয়া হয়, তবে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে মারাত্মক অভিজ্ঞতার ঘাটতি তৈরি হতে পারে। দীর্ঘদিন ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে যুক্ত এবং যাদের ভালো অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন পরিচালকদের ধরে রাখার প্রয়োজনীয়তার কথাও সভায় বারবার তুলে ধরা হয়েছে।

তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এই পিছু হটার সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আহসান এইচ মনসুর। তিনি অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রণীত সংশোধনী আইনের মূল খসড়াটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখেই নিখুঁতভাবে তৈরি করা হয়েছিল। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দল সমর্থিত ব্যাংক মালিকেরা সব ধরনের ব্যবসায়িক নিয়মকানুন এড়িয়ে এবং প্রভাব খাটিয়ে সংসদ সদস্যদের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থে আইন পাস করিয়ে নিয়েছিলেন। সেই আইনের মাধ্যমেই মূলত একই পরিবারের ৩ জন সদস্যের পর্ষদে বসার এবং এক পরিচালকের টানা ১২ বছর পদে থাকার মতো অনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংক সে সময়ও এ ধরনের রাজনৈতিক ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পক্ষে ছিল না। তিনি জোর দিয়ে বলেন, একজন ব্যক্তি বা একটি নির্দিষ্ট পরিবার যাতে কোনো ব্যাংককে নিজেদের পৈতৃক সম্পত্তি মনে করতে না পারে, সেই অপসংস্কৃতির চিরতরে অবসান ঘটাতেই এসব সংশোধনী প্রস্তাব করা হয়েছিল।

সাবেক এই গভর্নর সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “যদি এই সংশোধনীগুলো পাশ না করা হয়, তবে ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার পুরো প্রক্রিয়াটি চরমভাবে ব্যাহত হবে। অতীতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ব্যবসায়ীরা ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করত, আর এখন বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা নিয়ন্ত্রণ করবে। ব্যাংকগুলো আবারও সেই পারিবারিক ব্যাংকেই রূপ নেবে।” তিনি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও সরাসরি প্রশ্ন তোলেন। তার মতে, এই বিভাগটি বিলুপ্ত করার আলোচনা বারবার হয়েছে এবং বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারেও এটি বিলুপ্তির সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল।

এদিকে, সংকটে পড়া ব্যাংকগুলোকে উদ্ধার করার লক্ষ্যে খসড়ায় ব্যাংকে কৌশলগত বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ১০ শতাংশ পরিশোধিত মূলধনের সীমা তুলে দেওয়ার একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে এ ধরনের বিশাল বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদনের কঠোর বাধ্যবাধকতা রাখা হচ্ছে। সম্প্রতি সংকটগ্রস্ত পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের মাধ্যমে গঠিত ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’-এর বিপুল পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি মূলধনের প্রয়োজনীয়তার কথা মাথায় রেখেই মূলত এই প্রস্তাবটি তৈরি করা হয়েছে। একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, এই ব্যাংকটির কৌশলগত অংশীদার হওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে কাতারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে এবং অন্যান্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ ও আন্তর্জাতিক ইসলামিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগের প্রস্তুতি চলছে। ওই কর্মকর্তা আরও ব্যাখ্যা করেন যে, কৌশলগত বিনিয়োগকারীরা মূলত বড় অঙ্কের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সরবরাহ করবে এবং ব্যাংকের সুশাসন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের সরাসরি ভূমিকা থাকবে। ঠিক এ কারণেই তাদের বিনিয়োগের কোনো নির্দিষ্ট সীমা না রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে দেশের আরও কয়েকটি ব্যাংকেরও এ ধরনের কৌশলগত বিনিয়োগকারীর প্রয়োজন হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দেন।

পর্ষদ না ভেঙে প্রশাসক নিয়োগের বিষয়েও ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭ ধারায় পরিবর্তনের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, আমানতকারী বা ব্যাংকের স্বার্থবিরোধী কার্যক্রমের কোনো প্রমাণ পেলে বাংলাদেশ ব্যাংক পুরো পর্ষদ ভেঙে দিতে পারে এবং সেখানে প্রশাসক বসাতে পারে। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর অনেক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আইনি বাধার সম্মুখীন হয়েছে, বিশেষ করে শেয়ারহোল্ডারদের ভোটে নির্বাচিত পরিচালকদের অপসারণ করার বিষয়টি বারবার প্রশ্নের মুখে পড়েছে। এজন্য নতুন ব্যবস্থায় ‘পরিচালনা পর্ষদ বহাল রেখেই প্রশাসক নিয়োগের সুযোগ’ রাখা হতে পারে, যাতে প্রয়োজন হলে পুরোপুরি বাতিল না করেও ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা যায়।

এছাড়া, একই পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন সম্পর্কের পরিচয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে থাকার যে ফাঁকফোকর রয়েছে, তা সীমিত করতে খসড়ায় ‘পরিবার’-এর সংজ্ঞাকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র পরিচালকদের অনুপাত বাড়িয়ে পর্ষদের মোট সদস্যের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করারও একটি যুগান্তকারী প্রস্তাব রাখা হয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত সংশোধিত খসড়া চূড়ান্ত করে পাঠাতে বলা হয়েছে। এরপর আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং এবং মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন শেষে জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনেই আইনটি পাসের জন্য উপস্থাপন করা হতে পারে।

তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা


এ জাতীয় আরো খবর...