শিরোনামঃ
গডফাদার রেখে বস্তিতে ‘ফাটাকেষ্ট’ অ্যাকশন: বিতর্কের মুখে পদ ছাড়লেন ইশরাক রাষ্ট্র ব্যবস্থা নিতে পারছে না বলে ইশরাককে অস্ত্র হাতে নামতে হয়েছে: আখতার সালাহউদ্দিনের ব্যর্থতার দায় ইশরাকদের নিতে হবে কেন? প্রশ্ন হাসনাতের মন্ত্রিসভার যে কাউকে পদত্যাগ করতে বলার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর রয়েছে: অ্যাটর্নি জেনারেল পদত্যাগ করলেন ইশরাক ক্যান্সার হাসপাতালগুলোতে রেডিওথেরাপি মেশিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী দুর্গাপূজার বার্তা সর্বজনীন, সকল সম্প্রদায়ের: রিজভী সারাদেশে দিন-রাতের তাপমাত্রা কমতে পারে সর্বজনীন পেনশনে সুখবর, লাভবান হবেন গ্রাহকরা আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই সারের ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে: আইনমন্ত্রী
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:১৭ পূর্বাহ্ন

মরুভূমির রুদ্ধদ্বার আদালত ও আমাদের কূটনৈতিক বধিরতা: দুই প্রবাসীর শিরশ্ছেদ যেসব মৌলিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে

রিন্টু আনোয়ার / ৩২ বার
প্রকাশ: সোমবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৬

গত চৌদ্দই অক্টোবর পবিত্র মক্কা নগরীতে বাংলাদেশের দুই নাগরিক নাজিরুল ইসলাম আবদুল বশির এবং স্মৃতি বা ইতি আক্তারের শিরশ্ছেদ কার্যকর করেছে সৌদি আরব কর্তৃপক্ষ। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সৌদি প্রেস এজেন্সি যখন এই মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংক্ষিপ্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে, ঠিক তখনই বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদ ও জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশি কূটনৈতিক মিশনের দীর্ঘ নীরবতা ও অজ্ঞতার পর্দাটি সরে যায়। অভিযোগ আনা হয়েছে যে ওই দুই বাংলাদেশি নারী ও পুরুষ মক্কার একটি মসজিদের অভ্যন্তরে অনৈতিক ও অশালীন কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছিলেন এবং স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘন ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় ইসলামি শরিয়াহ আইনের তাআজির বিধানের আওতায় আদালত তাঁদের মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন। পরবর্তীতে রাজকীয় আদেশে সেই চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর করা হয়। ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে মসজিদের পবিত্রতা রক্ষা এবং যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা নিঃসন্দেহে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। কোনো পবিত্র স্থানে সত্যিই কোনো গর্হিত অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকলে তার যথাযথ বিচার হওয়া নিয়ে কারও দ্বিমত থাকার অবকাশ নেই। কিন্তু একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের দুই নাগরিককে যখন ভিনদেশের মাটিতে প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করে হত্যা করা হয়, অথচ তাঁদের নিজ দেশের সরকার বা দূতাবাস ঘুণাক্ষরেও তা জানতে পারে না, তখন বিষয়টি আর নিছক একটি সাধারণ ফৌজদারি অপরাধের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি তখন বিচারিক স্বচ্ছতা, শাস্তির আনুপাতিকতা, আন্তর্জাতিক কনস্যুলার আইন, কূটনৈতিক জবাবদিহি এবং প্রবাসী শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদার মতো অত্যন্ত গভীর ও মৌলিক প্রশ্নগুলোকে সামনে নিয়ে আসে।

সৌদি প্রশাসনের প্রকাশিত বিবৃতির দিকে তাকালে সবার আগে যে বিষয়টি যেকোনো সচেতন ও বিবেকবান মানুষকে বিচলিত করে, তা হলো তথ্যের চরম অস্পষ্টতা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিশ্ছিদ্র গোপনীয়তা। মৃত্যুদণ্ড হলো পৃথিবীর সবচেয়ে চূড়ান্ত এবং অপরিবর্তনীয় শাস্তি, যা একবার কার্যকর হয়ে গেলে শত প্রমাণেও আর ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় থাকে না। অথচ এমন একটি চরম দণ্ড কার্যকরের পরও জনসমক্ষে বা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রকাশ করা হয়নি যে মক্কার ঠিক কোন মসজিদে এবং কবে এই ঘটনাটি ঘটেছিল। ওই দুই বাংলাদেশি ঠিক কী ধরনের অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ছিলেন, তাঁদের কি হাতেনাতে আটক করা হয়েছিল নাকি অন্য কারও মৌখিক অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিংবা আদালতে তাঁদের বিরুদ্ধে কী ধরনের অকাট্য সাক্ষ্যপ্রমাণ বা ফরেনসিক আলামত উপস্থাপন করা হয়েছিল—এসব মৌলিক প্রশ্নের কোনো উত্তরই সৌদি কর্তৃপক্ষ দেয়নি। এমনকি তাঁরা কতদিন কারাভোগ করেছেন বা বিচার চলাকালে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য কোনো দক্ষ আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ পেয়েছিলেন কি না, তাও অন্ধকারে রয়ে গেছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় অপরাধের সুনির্দিষ্ট বিবরণ ও প্রমাণের ভিত্তি প্রকাশ না করে কেবল একটি প্রহেলিকাময় বিবৃতির মাধ্যমে দুটি তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া হলে সেই বিচারের নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন ওঠাটাই স্বাভাবিক।

এই মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় ইসলামি আইনশাস্ত্র বা ফিকহশাস্ত্রের দৃষ্টিকোণ থেকেও একটি বড় ধরনের তাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত বিতর্ক সামনে এসেছে, যা দেশের অনেক প্রাজ্ঞ আলেম ও ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞরাও উল্লেখ করেছেন। সৌদি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে তাঁদের এই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে শরিয়াহ আইনের তাআজির বিধানের অধীনে। ইসলামি ফিকহ অনুযায়ী অপরাধের শাস্তিকে মূলত হদ, কিসাস এবং তাআজির—এই তিন ভাগে ভাগ করা হয়। হদ হলো পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সুনির্ধারিত শাস্তি, যা প্রমাণের জন্য অত্যন্ত কঠোর শর্ত পূরণ করতে হয় এবং যেখানে বিচারকের নিজস্ব বিবেচনার কোনো সুযোগ থাকে না। ইসলামি শরিয়াহর সর্বজনস্বীকৃত মূলনীতি অনুযায়ী ব্যভিচার বা জিনার অপরাধ যদি চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীর মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিতও হয়, তবু অভিযুক্ত ব্যক্তি অবিবাহিত হলে তাঁর নির্ধারিত হদ বা শাস্তি হলো একশটি বেত্রাঘাত, কোনোভাবেই মৃত্যুদণ্ড নয়। কেবল বিবাহিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে কঠোরতম শর্ত সাপেক্ষে রজম বা প্রস্তরাঘাতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। প্রাথমিক তথ্যমতে দণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশি ছিলেন অবিবাহিত। অন্যদিকে তাআজির হলো এমন এক ধরনের লঘু বা সংশোধনমূলক শাস্তি, যা সুনির্ধারিত হদের আওতায় পড়ে না এবং যা অপরাধের পারিপার্শ্বিকতা বিবেচনা করে বিচারক নিজের এখতিয়ার অনুযায়ী নির্ধারণ করেন। ফিকহশাস্ত্রের সাধারণ নীতি হলো তাআজিরের শাস্তি কখনোই হদের শাস্তিকে অতিক্রম করতে পারে না। এখন মৌলিক প্রশ্ন হলো, যে অপরাধে স্বয়ং শরিয়াহর সুনির্ধারিত হদ অনুযায়ীই অবিবাহিতদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার বিধান নেই, সেখানে বিচারকের একক বিবেচনাধীন তাআজির আইনের দোহাই দিয়ে কীভাবে দুটি মানুষের শিরশ্ছেদ করা হলো? স্থানের পবিত্রতা লঙ্ঘনের যুক্তি দিলেও তা কি মৃত্যুদণ্ডের মতো চরম শাস্তির শরিয়াহসম্মত ভিত্তি হতে পারে, নাকি এটি বিচারকের নিরঙ্কুশ ও অবারিত ক্ষমতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ?

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল দীর্ঘদিন ধরেই সৌদি আরবের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার এই কাঠামোগত ত্রুটিগুলোর দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে আসছে। মানবাধিকার গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সৌদি আরবের আদালতে দরিদ্র প্রবাসী শ্রমিকরা মূলত তিনটি ভয়ংকর ফাঁদের শিকার হন। প্রথমত, দক্ষিণ এশিয়া বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে যাওয়া এই স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিকরা আরবি ভাষা এবং সেখানকার জটিল আইনি কাঠামো সম্পর্কে সম্পূর্ণ অজ্ঞ থাকেন। দ্বিতীয়ত, পুলিশি হেফাজতে বা আটকাবস্থায় তাঁদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ প্রয়োগ করে আগে থেকেই আরবিতে লিখে রাখা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে টিপসই বা স্বাক্ষর আদায় করে নেওয়া হয়, যার অর্থ পর্যন্ত অভিযুক্তরা বুঝতে পারেন না। তৃতীয়ত, তাআজির আইনের এই অবারিত এখতিয়ার, যার মাধ্যমে বিচারক যেকোনো অহিংস বা সাধারণ অপরাধেও নিজের মর্জিমাফিক মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন। ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলালে দেখা যায়, দুই হাজার পাঁচ সালে সতেরো বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান কিশোরী গৃহকর্মী রিজানা নাফিককে চার মাসের এক শিশুকে বোতলে দুধ খাওয়ানোর সময় দুর্ঘটনাবশত শ্বাসরোধ হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় কোনো ময়নাতদন্ত বা উপযুক্ত আইনি সহায়তা ছাড়াই শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল। আরও মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছিল ইন্দোনেশিয়ার গৃহকর্মী তুতি তুরসিলাবতীর ক্ষেত্রে। দুই হাজার এগারো সালে তায়েফ শহরে নিজের নিয়োগকর্তার ধর্ষণের হাত থেকে বাঁচতে আত্মরক্ষার্থে আঘাত করলে ওই নিয়োগকর্তার মৃত্যু হয়। সেখান থেকে পালানোর সময় পথে নয়জন সৌদি নাগরিক মিলে তুতিকে গণধর্ষণ করে। অথচ সৌদি আদালত তুতির আত্মরক্ষার যুক্তি আমলেই নেননি এবং দুই হাজার আঠারো সালের ঊনত্রিশে অক্টোবর ইন্দোনেশিয়া সরকারকে কোনো আগাম নোটিশ না দিয়েই তাঁর শিরশ্ছেদ কার্যকর করে। অথচ যে নয়জন সৌদি নাগরিক তাঁকে গণধর্ষণ করেছিল, তাঁদের কারওরই শিরশ্ছেদ হওয়ার কোনো খবর আজ পর্যন্ত পৃথিবীর মানুষ জানতে পারেনি।

এখানেই অত্যন্ত সংগত কারণে প্রশ্ন ওঠে যে সৌদি আরবের শরিয়াহ আইন কি তবে ধনী ও দরিদ্রের জন্য কিংবা ক্ষমতাবান ও ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য আলাদাভাবে প্রযুক্ত হয়? যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ভিশন টু থাউজেন্ড থার্টি বা দুই হাজার ত্রিশ মহাপরিকল্পনার অধীনে আধুনিক সৌদি আরবে আজ পশ্চিমা পর্যটক, ধনকুবের বিনিয়োগকারী এবং তারকা ফুটবলারদের জন্য আইনের সব কড়াকড়ি শিথিল করে দেওয়া হয়েছে। লোহিত সাগরের বিলাসবহুল রিসোর্ট কিংবা প্রমোদতরীতে পশ্চিমা সংস্কৃতি, অবাধ মেলামেশা ও পানীয়ের ক্ষেত্রে শরিয়াহর কোনো কঠোরতা চোখে পড়ে না। এমনকি রাজপরিবারের সদস্য বা স্থানীয় প্রভাবশালী শেখদের গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রেও দিয়াহ বা রক্তপণের অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে সহজেই দায়মুক্তির পথ খোলা থাকে। খোদ সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম আজেল ডটকমে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ডের সংবাদের নিচে স্থানীয় সচেতন পাঠকদের মন্তব্যেই এই বৈষম্যের দিকটি ফুটে উঠেছে। হালিম এবং মীর নিসার আলীর মতো পাঠকরা সেখানে আক্ষেপ করে লিখেছেন যে, এই কঠোর আইনগুলো যেন কেবল পরিবার-পরিজন ছেড়ে হাজার মাইল দূরে নিঃসঙ্গ ও মানবেতর জীবন কাটানো দরিদ্র অভিবাসী শ্রমিকদের ওপরই প্রযুক্ত হয়, অথচ স্থানীয় নাগরিকদের বেলায় একই মানদণ্ড অনুসরণ করা হয় না।

এই বৈষম্যের সবচেয়ে রক্তাক্ত ও বেদনাদায়ক অধ্যায়টি লেখা হচ্ছে বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী গৃহকর্মীর নীরব কান্নায়। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যান বলছে, দুই হাজার চার থেকে দুই হাজার পঁচিশ সালের মধ্যে দেশ থেকে যাওয়া সাড়ে বারো লাখের বেশি নারী শ্রমিকের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ আশি হাজারই গেছেন সৌদি আরবে। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের দুই হাজার পঁচিশ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাত্র ছয় বছরে শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে সাতষট্টি হাজার একশ নিরানব্বই জন নারী শূন্য হাতে দেশে ফিরেছেন। গত আট বছরে বিদেশের মাটি থেকে সাতশ নিরানব্বই জন নারী শ্রমিকের নিথর মরদেহ কফিনবন্দি হয়ে বাংলাদেশে ফিরেছে, যার সিংহভাগই এসেছে সৌদি আরব থেকে এবং যাদের মৃত্যুসনদে ঢালাওভাবে লিখে দেওয়া হয়েছে আত্মহত্যার কথা। কেবল এই দুই হাজার ছাব্বিশ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই পটুয়াখালীর লিজা আক্তার ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরেন, যাঁকে পরপর চারটি বাড়িতে বিক্রি করে পাশবিক শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চালানো হয়েছিল। গত এপ্রিল মাসে একত্রিশ বছর বয়সী আরেক বাংলাদেশি নারী দেশে ফিরে জানান, তাঁকে একটি কক্ষে আটকে রেখে দিনের পর দিন ধর্ষণ করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দিস্তা দিস্তা প্রতিবেদনে প্রবাসী নারী গৃহকর্মীদের ওপর এই মধ্যযুগীয় বর্বরতার চিত্র উঠে এলেও আজ পর্যন্ত একজন সৌদি নিয়োগকর্তাকেও গৃহকর্মী ধর্ষণের দায়ে শরিয়াহ আইনের আওতায় প্রকাশ্যে শিরশ্ছেদ করার নজির নেই। তবে কি শরিয়াহর ন্যায়বিচার কেবল অসহায় প্রবাসীর ঘাড়েই তলোয়ার হয়ে নেমে আসে, আর প্রবাসীর সম্ভ্রম ও প্রাণের কোনো আইনি মূল্য সেখানে নেই?

সৌদি আরবের বিচারব্যবস্থার এই একপাক্ষিক কঠোরতার পাশাপাশি এই ঘটনায় সবচেয়ে বড় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশের নিজস্ব কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং প্রবাসী কল্যাণ কাঠামোর চরম দেউলিয়াত্ব। উনিশশো তেষট্টি সালের ভিয়েনা কনভেনশন অন কনস্যুলার রিলেশনসের দুই দেশই স্বাক্ষরকারী পক্ষ। এই আন্তর্জাতিক সনদের ছত্রিশ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, কোনো বিদেশি নাগরিককে আটক করা হলে তাঁকে অবিলম্বে নিজ দেশের কনস্যুলেটের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার সম্পর্কে জানাতে হবে এবং আটক ব্যক্তি চাইলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে দ্রুত অবহিত করে আইনি সহায়তার সুযোগ দিতে হবে। সাঁইত্রিশ অনুচ্ছেদে বিদেশি নাগরিকের মৃত্যু বা দণ্ডের তথ্য বিনা বিলম্বে জানানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমাদের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং জেদ্দা কনস্যুলেটের কর্মকর্তারা এখন অজুহাত দিচ্ছেন যে সৌদি সরকার তাঁদের আগে থেকে কিছুই জানায়নি এবং অনেক সময় অভিযুক্তরা সামাজিক লজ্জার ভয়ে দূতাবাসকে জানাতে চান না। সাবেক কূটনীতিকদের কেউ কেউ এই কারিগরি যুক্তি দিলেও সৌদি আরবে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহ অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন যে, জানি না বলে দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ মিশনের নেই। কারণ সৌদি আরবে কোনো মৃত্যুদণ্ডের বিচার এক দিনে বা গোপনে হঠাৎ করে সম্পন্ন হয় না, এটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। তাছাড়া প্রবাসী সূত্রগুলো থেকে দেশের প্রথম সারির গণমাধ্যমে তথ্য এসেছে যে জেদ্দার আদালতে যখন এই দুই বাংলাদেশির বিচার চলছিল, তখন সেখানে দোভাষী হিসেবে দুজন বাংলাদেশিই কাজ করেছেন। রিয়াদ ও জেদ্দা মিশনে যেখানে অন্তত বিশজন কর্মকর্তা এবং লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট রয়েছেন যাঁদের মূল কাজই হলো স্থানীয় কারাগার ও আদালতের খোঁজখবর রাখা, সেখানে এত বড় একটি মৃত্যুদণ্ডের মামলা কীভাবে তাঁদের চোখের আড়ালে চলে গেল? যদি ওই দুই প্রবাসী কোনো পশ্চিমা পরাশক্তি বা ধনী রাষ্ট্রের নাগরিক হতেন, তবে সৌদি আরব কি তাঁদের দূতাবাসকে অন্ধকারে রেখে এভাবে শিরশ্ছেদ করার সাহস পেত?

আমাদের কূটনৈতিক ব্যর্থতার স্বরূপটি আরও নগ্নভাবে উন্মোচিত হয়ে পড়ে যখন আমরা ঠিক একই সময়ে প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার কূটনৈতিক সাফল্যের দিকে তাকাই। যে চৌদ্দই অক্টোবর বাংলাদেশের নাজিরুল ও সীতির শিরশ্ছেদ কার্যকর হয়, ঠিক সেই একই সপ্তাহে সৌদি আরবের সুপ্রিম কোর্ট সাতাইশ বছর বয়সী শ্রীলঙ্কান প্রবাসী শ্রমিক আনোজান শিবরাজার মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে দেন। উল্লেখ্য, শিবরাজার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আরও ভয়াবহ—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা)-কে নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য বা ব্লাসফেমির অভিযোগ, যে অপরাধে সৌদি আইনে ক্ষমার কোনো সুযোগই থাকে না। প্রথমে তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ত্রিশ লাখ রিয়াল জরিমানা করা হলেও আপিল আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু শ্রীলঙ্কা সরকার তাদের এই দরিদ্র শ্রমিককে মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে শুরু থেকেই সর্বোচ্চ কূটনৈতিক ও আইনি শক্তি নিয়োগ করে। কলম্বোর উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী অরুণ হেমচন্দ্র এবং আইনপ্রণেতা ফাইজার মুস্তাফার নিরবচ্ছিন্ন কূটনৈতিক তৎপরতা ও আইনি লড়াইয়ের ফলে সৌদি সর্বোচ্চ আদালত সেই মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করতে বাধ্য হন। অথচ বাংলাদেশের ইতিহাসও এমন নিষ্ক্রিয়তার ছিল না। দুই হাজার দশ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে এক পাকিস্তানি নাগরিককে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ছয় বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবন বাঁচাতে তৎকালীন সরকার সরকারি তহবিল থেকে পঁচানব্বই লাখ সত্তর হাজার টাকা ব্লাডমানি বা রক্তপণ পরিশোধ করে তাঁদের মুক্ত করে এনেছিল। দুই হাজার ষোলো সালেও সৌদি আরবে ছয় বছর কারাভোগের পর শিরশ্ছেদের মুখোমুখি হওয়া নরসিংদীর ছিদ্দিক মিয়াকে দূতাবাসের হস্তক্ষেপে বাঁচিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। তাহলে দুই হাজার ছাব্বিশে এসে আমাদের কূটনৈতিক মিশনগুলো কেন এতটা অকার্যকর ও স্থবির হয়ে পড়ল যে দুটি তাজা প্রাণ ঝরে যাওয়ার পর এখন তারা সৌদি রাষ্ট্রদূতকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় ডেকে কিংবা নোট ভার্বাল পাঠিয়ে মরদেহের খোঁজ নিচ্ছে?

সবচেয়ে পীড়াদায়ক বিষয় হলো, দেশের ভেতরেও এই ঘটনা নিয়ে একধরনের দায়িত্বহীন মন্তব্য ও অমানবিক উন্মাদনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে সরকারি নীতিনির্ধারকদের কণ্ঠে শোনা যাচ্ছে যে ভিনদেশের আইন ভাঙলে সরকারের খুব একটা কিছু করার থাকে না এবং এটি প্রবাসীদের জন্য একটি শিক্ষা। একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যখন তার নাগরিকের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে এমন অসহায় আত্মসমর্পণের ভাষা ব্যবহার করে, তখন প্রবাসীদের অভিভাবকত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমাদেরই দেশের একশ্রেণির মানুষ ঘটনার আগাপাছতলা না জেনে, অপরাধের প্রমাণ ও বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা যাচাই না করেই কেবল ধর্মের দোহাই দিয়ে নিজ দেশের দুই নাগরিকের শিরশ্ছেদে উল্লাস প্রকাশ করছেন। ধর্মের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা রাখা এবং একটি ভিনদেশি রাষ্ট্রের অস্বচ্ছ ও একপাক্ষিক বিচারিক হত্যাকাণ্ডকে অন্ধভাবে সমর্থন করা কখনোই এক বিষয় হতে পারে না। যাঁরা আজ হাততালি দিচ্ছেন, তাঁরা ভুলে যাচ্ছেন যে সৌদি আরবে নির্যাতিত ও ধর্ষিত হওয়া আমাদের হাজারো মা-বোনের বিচারের প্রশ্নে ওই একই বিচারব্যবস্থা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে।

প্রবাসী শ্রমিকরা কেবল আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ সচল রাখার যন্ত্র বা রেমিট্যান্স পাঠানোর হাতিয়ার নন; তাঁরা এই প্রজাতন্ত্রের সম্মানিত নাগরিক। তাঁদের হাড়ভাঙা শ্রম ও ঘামের ওপর দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি। সৌদি আরব আমাদের বৃহত্তম শ্রমবাজার এবং বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র হতে পারে, কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে আমাদের নাগরিকদের ন্যূনতম মানবাধিকার ও আইনি সুরক্ষার প্রশ্নটিকে বিসর্জন দিতে হবে। নাজিরুল ইসলাম ও সীতি আক্তারের জীবন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, কিন্তু তাঁদের এই ট্র্যাজিক মৃত্যু রাষ্ট্রের সামনে এক বিশাল দায় রেখে গেছে। বাংলাদেশ সরকারকে অবিলম্বে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ওই মামলার পূর্ণাঙ্গ নথি, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট বিবরণ, উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার আদ্যোপান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করতে হবে। একই সঙ্গে রিয়াদ ও জেদ্দা মিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে যে কেন তাঁরা এই দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার কোনো খোঁজ রাখেননি। ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে আটক প্রতিটি বাংলাদেশি শ্রমিক যেন আটক হওয়ার প্রথম দিন থেকেই কার্যকর কনস্যুলার সহায়তা, দক্ষ দোভাষী এবং শক্তিশালী আইনি প্রতিনিধিত্ব পান, তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসগুলোর শ্রম ও আইন কল্যাণ উইংকে আমূল ঢেলে সাজাতে হবে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি প্রবাসীদের জীবন ও মর্যাদার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে ইতিহাস আমাদের এই রাষ্ট্রীয় উদাসীনতাকে কখনো ক্ষমা করবে না।


এ জাতীয় আরো খবর...