ক্ষমতায় আসার পর মাত্র সাড়ে আট মাসের ব্যবধানে সরকার ও সরকারি দলের ভেতরে এক অভূতপূর্ব ও কঠোর জবাবদিহিতার নজির প্রত্যক্ষ করছে দেশবাসী। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে দুজন পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রী, একজন প্রতিমন্ত্রী এবং একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যকে নিজেদের পদ থেকে পদত্যাগ করতে বাধ্য হতে হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গ, নীতিভ্রষ্টতা, অনিয়ম কিংবা জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ওঠার পরপরই প্রতিটি ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন সরকারপ্রধান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার পর কোনো ধরনের দ্বিধা বা পক্ষপাত না দেখিয়ে তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পদত্যাগের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে সরকার ও রাজনীতির উচ্চ মহলে এই কঠোর বার্তাটি স্পষ্টভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে ক্ষমতার মসনদে কেউ অপরিহার্য কিংবা জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে নন।
সরকারপ্রধানের এমন আপসহীন অবস্থানের কারণে প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু অর্থাৎ মন্ত্রিসভা ও দলীয় সংসদ সদস্যদের ভেতরে এক ধরনের সতর্কতা ও নতুন কম্পন তৈরি হয়েছে। অতীতে যেকোনো সরকারের আমলে দলীয় নেতাকর্মী বা দায়িত্বশীল মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ধামাচাপা দেওয়ার প্রবণতা দেখা গেলেও বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার এই রূপরেখা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। যেসকল মন্ত্রী ও দলীয় নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠছে, তাঁরাও এখন নিজেদের দায়িত্ব পালনে আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হচ্ছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারপ্রধানের এই কঠোর ও বলিষ্ঠ অবস্থান যদি শেষ পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকে, তবে প্রশাসনে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব হবে। অন্যথায় ক্ষমতার দাপটে মন্ত্রী ও দলীয় নেতাকর্মীরা লাগামহীন হয়ে পড়লে সার্বিক শাসনব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে, যা অতীতে বারবার ঘটতে দেখা গেছে।
সরকারের এই অবস্থানকে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন সরকারের আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে সরকারে কেউই অপরিহার্য নন এবং এই সত্যটি এখন মন্ত্রিসভার প্রতিটি সদস্যের সামনে অত্যন্ত খোলাসা হয়ে গেছে। তাঁর মতে, কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী বা সরকারের শীর্ষ মহলের যতই ঘনিষ্ঠ বা আস্থাভাজন হোন না কেন, তিনি যদি জনগণের স্বার্থ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার পরিপন্থী কোনো কাজ করেন, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে শীর্ষ নেতৃত্ব মুহূর্তের জন্যও ভাববেন না। ইতিমধ্যে পর পর কয়েকটি কার্যকর পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী তা বাস্তবে প্রমাণ করে দেখিয়েছেন। একই সঙ্গে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী কিংবা এমপিদের মনে করিয়ে দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান এবং দেশের প্রচলিত আইন ও নীতিমালার ঊর্ধ্বে কেউ অবস্থান করতে পারেন না।
সরকারের চলমান শুদ্ধি অভিযান ও প্রশাসনিক জবাবদিহিতা প্রসঙ্গে সাবেক সচিব এএফএম সোলায়মান চৌধুরী নিজস্ব বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশ সঠিকভাবে পরিচালনা করার জন্য যোগ্য ও দক্ষ নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। তবে সেই যোগ্যতার আসল মাপকাঠি হওয়া উচিত ব্যক্তিগত সততা, দায়িত্বে অবিচল নিষ্ঠা এবং কর্মের একাগ্রতা। ইতিহাসের বহু বাঁকে দেখা গেছে, একজন সৎ ও নীতিবান মানুষ যখন কোনো সংস্থার নেতৃত্বে থাকেন, তখন তাঁর অধীনস্থ পুরো দলটিই সঠিক পথে কাজ করার প্রেরণা খুঁজে পায়। তিনি আরও সতর্ক করে দিয়ে বলেন যে বর্তমান মন্ত্রিসভায় এখনো এমন কিছু সদস্য রয়েছেন, যাঁদের সামগ্রিক আচার-আচরণ, বক্তব্য ও কার্যক্রম নিয়ে জনমনে নানান প্রশ্ন ও অসন্তোষ রয়েছে। তিনি প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন যে সরকার অত্যন্ত সজাগ দৃষ্টি রেখে সেইসব বিতর্কিত ব্যক্তিদের বিষয়েও একইভাবে নিরপেক্ষ ও কঠোর মনোভাব দেখাবে।
সরকারের এই দফায় পদত্যাগের ধারাটি শুরু হয়েছিল ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র চার মাসের মাথায়। সে সময় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানকে আকস্মিকভাবে মন্ত্রিত্ব ছাড়তে হয়। যদিও পদত্যাগপত্রে দীপেন দেওয়ান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়েছিলেন, তবে রাজনৈতিক মহলে জানা যায় যে দলের অভ্যন্তরীণ তীব্র মতবিরোধ ও কোন্দলের কারণেই মূলত তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। স্থানীয় রাজনীতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে দলের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে একমত হতে না পারা এবং ভেতরে ভেতরে দূরত্ব বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় সরকারে অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান।
পরবর্তী বড় ঘটনাটি ঘটে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে, যেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন জহির উদ্দিন স্বপন। তাঁকে সেই পদ থেকে সরিয়ে নতুন মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় আন্দালিভ রহমান পার্থকে। তবে জহির উদ্দিন স্বপনকে একদম সরকারের বাইরে ঠেলে না দিয়ে মন্ত্রীর সমমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে পুনর্বাসন করা হয়। জহির উদ্দিন স্বপনের পদত্যাগের নেপথ্যেও নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসে। মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু অনিয়ম ও দুর্বলতার অভিযোগের পাশাপাশি ঢাকা ক্লাবে বসে কারাগারে আটক থাকা এক আওয়ামী লীগপন্থী সাংবাদিকের স্ত্রীর সঙ্গে গোপন বৈঠকের বিষয়টি রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। সেই বৈঠকের সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব থেকে তাঁকে প্রত্যাহার করে নেন।
সম্প্রতি সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ ইশরাক হোসেনকে ঘিরে। গত সোমবার দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে এসে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মন্ত্রিসভা থেকে নিজের পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানান। পদত্যাগের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ইশরাক হোসেন দাবি করেন যে দলের বিশেষ সিদ্ধান্তের কারণে এবং দল না চাওয়ায় তিনি সরে দাঁড়িয়েছেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে গেন্ডারিয়া এলাকায় মাদকবিরোধী অভিযান দেখতে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি কোনো ধরনের আইনবিরোধী কাজ করেননি। তবে ঘটনাটির পেছনের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় পরিচালিত ওই মাদকবিরোধী অভিযানে প্রতিমন্ত্রী নিজেই হাতে পিস্তল উঁচিয়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে ধাওয়া করেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার পেলে দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
একজন প্রতিমন্ত্রীর প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শন ও জনসমক্ষে এমন আগ্রাসী আচরণের ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সরকার ও মন্ত্রিসভার ভেতরে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক ও সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তোলেন, অস্ত্রটি লাইসেন্স করা হলেও একজন প্রতিমন্ত্রী কি এভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মতো বস্তিতে অভিযান চালাতে পারেন। যদি মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরাই এভাবে নিজের হাতে আইন তুলে নিয়ে অভিযানে নামেন, তবে দেশে পুলিশ ও অন্যান্য পেশাদার বাহিনীর কার্যকারিতা এবং প্রয়োজনীয়তা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাবমূর্তি যেমন ক্ষুণ্ণ হয়, তেমনি সরকারের নীতিনির্ধারণী ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়ে। সার্বিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কালক্ষেপণ না করে ইশরাক হোসেনকে অবিলম্বে পদত্যাগের নির্দেশ দেন এবং সেই নির্দেশনা মেনেই তিনি পদ ছাড়েন।
মন্ত্রিসভার এই তিন সদস্যের পাশাপাশি জাতীয় সংসদের একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যকেও একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে। রাজধানীর মিরপুর এলাকার সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি গত ১ অক্টোবর জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে গিয়ে সশরীরে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দেন। এই পদত্যাগের নেপথ্যে ছিল সরাসরি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এক মারাত্মক অভিযোগ। মিরপুর-১ নম্বরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা ক্লিনিকে একদল দুর্বৃত্তের হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে, যার সঙ্গে এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির প্রত্যক্ষ মদদ ও সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়। একটি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের নজিরবিহীন তাণ্ডবের ঘটনা শীর্ষ নেতৃত্বের নজরে আসার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কোনো দলীয় পক্ষপাত না দেখিয়ে মিষ্টিকে তাৎক্ষণিকভাবে সংসদ সদস্যের পদ ছাড়ার কড়া নির্দেশ দেন।
স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘটে যাওয়া এই চারটি পৃথক পদত্যাগের ঘটনা প্রমাণ করে যে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলীয় পদবি কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ কমে আসছে। দলীয় কোন্দল, বিরোধীদের সঙ্গে গোপন আঁতাত, প্রশাসনিক অদক্ষতা, অস্ত্র উঁচিয়ে ক্ষমতার দাপট দেখানো কিংবা জনস্বার্থবিরোধী হামলা-লুটপাটে জড়িয়ে পড়ার মতো অপরাধগুলোকে কোনোভাবেই বরদাশত না করার যে কঠোর বার্তা শীর্ষ পর্যায় থেকে দেওয়া হয়েছে, তা দেশের সামগ্রিক রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সাধারণ মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে রাজনৈতিক নেতৃত্বের এই জবাবদিহিতা অব্যাহত থাকবে বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর